নাসিরুদ্দিন হোজ্জা প্রাজ্ঞ, জ্ঞানী এক তুর্কি বুড়ো। সাতশ বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর গল্প দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে হাসি আর জ্ঞান উপহার দিয়ে চলেছে। তাঁর ছোট ছোট গল্পে হাসির পেছনে থাকে জীবনদর্শন, বিচক্ষণতার শিক্ষা। ইউনেস্কো ১৯৯৬ সালকে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
অনেক গবেষক নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে অনুসন্ধান করেছেন। তাদের অনেকেই মনে করেন, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা হচ্ছেন সপ্তম শতকের আরব সাহিত্য, লোককথার চরিত্র ‘জুহা’র তুর্কি রূপায়ণ। ষোড়শ শতকে অটোমান তুর্কিরা যখন আরব অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত, তখন জুহার চরিত্রটিকে তারা তুর্কি সংস্কৃতিতে গ্রহণ করে এবং তাঁর নতুন নাম হয় নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। এর পর মধ্যযুগে যখন তুর্কি ও পারস্য সংস্কৃতির যোগাযোগ গড়ে ওঠে, তখন পারস্যের মানুষ আরব ও তুর্কিদের আদরণীয় চরিত্রটিকে নিজেদের সংস্কৃতিতে নতুন নামে ঠাঁই দেয়, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এবার হয়ে যান মোল্লা নাসিরুদ্দিন।
প্রতি বছর তুরস্কে ‘নাসিরুদ্দিন হোজ্জা আন্তর্জাতিক উত্সব’ অনুষ্ঠিত হয়। বিরাট আকারে ৫ থেকে ১০ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় এ উত্সব। তুরস্কের যে শহরে হোজ্জাকে সমাহিত করা হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে, সেখানেই অনুষ্ঠিত হয় এ উত্সব। উত্সবে নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে নিয়ে লেখক ও শিল্পীরা তাদের তৈরি নাটক, চলচ্চিত্র, অ্যানিমেশন, সংগীত, চিত্রকর্ম পরিবেশন করেন। প্রতি বছর প্রচুর মানুষ হোজ্জার সমাধি পরিদর্শনে আসে। হোজ্জার গল্পে সুফিবাদের দারুণ প্রভাব লক্ষ করা যায়। তাই অনেকে মনে করেন, তিনি ছিলেন একজন সুফি।
হোজ্জার গল্প সরস; মানুষ এবং তাদের জীবনযাপন নিয়েই তাঁর গল্প। মানুষের জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের পর্যবেক্ষণ উঠে আসে তাঁর গল্পে। নৈতিকতার ব্যাখ্যা থাকে তাঁর কথায়। সমাজের নানা স্তরের মানুষের চরিত্র ও জীবনকে পাওয়া যাবে হোজ্জার গল্পে; আছে সাধারণ মানুষ, ভিখারি, রাজা, পণ্ডিত, রাজনীতিবিদ, বণিক, সেনা এবং আরো অনেকে। আর কিছু গল্প আছে তাঁর নিজের জীবন, স্ত্রী ও গাধা সম্পর্কে।
অনেক গবেষকের মতে, হোজ্জার জন্ম ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে, আনাতোলিয়ার পশ্চিমাংশে হোর্তু সিভরিহিসার শহরের কাছে একটি গ্রামে। ১২৩৭ খ্রিস্টাব্দে বিশিষ্ট পণ্ডিতদের কাছে শিক্ষা গ্রহণের জন্য হোজ্জা আকসেহির শহরে গমন করেন সেখানে তিনি সায়িদ মাহমুদ হায়রানি ও সায়িদ হাচি ইব্রাহিমের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। ১২৮৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কাজি (বিচারক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক, বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী মানুষ। তুর্কি ভাষায় হোজ্জা অর্থ শিক্ষক। আরব, তুরস্ক আর পারস্য ছেড়ে হোজ্জার গল্প কালে কালে ছড়িয়ে গেছে আফ্রিকা, চীন, ভারত ও ইউরোপে। তবে বলা বাহুল্য, শত শত বছর ধরে তাঁর নামে প্রচলিত সব গল্পই হোজ্জার নয়। অন্যদিকে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা নিজে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত: তুরস্কে বলা হয় নাসেরদীন হোচা, কাজাখস্তানে কোজা নাসরেদ্দিন, গ্রিকদের কাছে নাসরেদ্দিন হোজা, আজারবাইজান ও ইরানে বলা হয় মোল্লা নাসরেদ্দিন। আরবরা ডাকে জুহা, তাজিকিস্তানে মুশফিকি।
অর্থাত্ এভাবে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা কোথাও হয়ে যাচ্ছেন মোল্লা নাসিরুদ্দিন আবার কোথাও জুহা। এই তিন চরিত্রের মধ্যে জুহাই সবচেয়ে পুরনো। জুহার সঙ্গে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা ও মোল্লা নাসিরুদ্দিনের সম্পর্ক নিয়ে লেখার শুরুর দিকে কিছু ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। তবে রূপান্তর যা-ই ঘটুক না কেন গবেষকরা বলছেন, জুহা ও নাসিরুদ্দিন হোজ্জার চরিত্র দুটি ঐতিহাসিক। অর্থাত্ তাঁরা বাস্তবে ছিলেন। হতে পারে তাদের গল্পগুলোয় অনেক কাল্পনিক উপাদান রয়েছে, কিন্তু তাদের চরিত্র দুটি বাস্তব। অথচ মোল্লা নাসিরুদ্দিনের চরিত্রটি কাল্পনিক।
নাসিরুদ্দিন হোজ্জা ও মোল্লা নাসিরুদ্দিনের পূর্বসূরি জুহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মজার গল্প। জুহার চরিত্রটি বৈচিত্র্যময়, কখনো তিনি জ্ঞানী আবার কখনো বোকা। তাঁর কৌতুকগুলোও নানা স্বাদের, কখনো বেদনার আবার কখনো আনন্দের। অনেক গবেষক দেখিয়েছেন, জুহা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার জনপ্রিয় লোকচরিত্র। কোথাও জুহা একজন মজার মানুষ আবার কোথাও প্রাজ্ঞ নেতা। সাধারণ মানুষ করতে অক্ষম, এমন অনেক সমস্যার সমাধান তিনি করে দিতেন।
আসি-সায়খশিয়াহ হাকিকিয়াহ (২০১০) প্রবন্ধে জুহার প্রকৃত নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আবু আল-ঘুশনি ইবনে থাবিত আল-দুজায়নি ফাজারি (৬০-১৬০ হিজরি/৬৮০-৭৭৭ খ্রিস্টাব্দ)। জুহা কি সত্যিই রক্তমাংসের চরিত্র? উত্তরটি ‘হ্যাঁ’। যদিও ইতিহাসের বিবরণীতে তাঁর নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। আরবি ভাষায় জুহা নামটি শিল্প ও কৌতুকের প্রতীক হয়ে ওঠে। মানুষ একসময় তাঁর ঐতিহাসিক পরিচয় ভুলে গেছে, কিন্তু গল্পগুলো কখনো ভোলেনি। আরবের গল্পগাথায় প্রচুর কৌতুক আছে কিন্তু জুহার জনপ্রিয়তাকে আর কেউ ছুঁতে পারেনি। আরব সাহিত্যে জুহা এখনো জীবন্ত। জুহার জনপ্রিয়তার কারণ শুধু তাঁর গল্পের সৃষ্টিশীলতা নয়, বরং আরবদের স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয় তাঁর গল্পে। জুহার চরিত্রটি দুই ভাগে বিভক্ত— বোকা ও পাগলাটে জুহা এবং চালাক ও বুদ্ধিমান জুহা। এখন গল্পগুলোকে ভাগ করা হয় বিষয়ানুসারে— রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি। তবে জুহার প্রভাব কিন্তু শুধু রাজনৈতিক, সামাজিক চিন্তায় নয়; বরং মানসিকতা, নন্দনতত্ত্বেও। জুহা মানুষের বাস্তব জীবনকে তাঁর গল্পে তুলে এনেছেন। শুরুতে জুহার গল্পগুলো ছিল মৌখিক রূপে, পরবর্তীতে সেগুলো লিখিত রূপ পায়।
জুহার গল্প সমাজের ওপরের তলার মানুষের যৌনতা-বিষয়ক বা আদিরসাত্মক নয়, বরং একেবারে সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প। বাজারে গিয়ে ভেড়ার মাংস কেনা থেকে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক— এসব নিয়েই ছিল জুহার গল্প। এর পর সতেরো ও আঠারো শতকে আঞ্চলিক ভাষায় জুহার গল্পে যুক্ত হয় যৌনতার সুড়সুড়ি।
জুহাকে আরবদের জীবনের সর্বক্ষেত্রের মুখপাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি একজন বিচারক, উপদেষ্টা, দার্শনিক, প্রাজ্ঞজন, রসিক ও সাধারণ মানুষের বন্ধু। তাঁর গল্পের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে সমালোচনা করা, মানুষের নানা অবক্ষয় প্রতিরোধ করা। জুহার গল্প কৌশলে খুব সরলভাবে আলোচনা করে মূল সমস্যার সমাধান করে দেয়।
‘জুহা আসি-সায়খশিয়াহ হাকিকিয়াহ’ (২০১০)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ষোলো শতকে অটোমান তুর্কিরা যখন আরব অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত, তখন জুহাকে তুর্কি সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেয় এবং নাম দেয় নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। এর পর পারসিদের সঙ্গে তুর্কি সংস্কৃতির যোগাযোগ ঘটলে হোজ্জা হয়ে যান পারস্যের, নতুন নাম হয় মোল্লা নাসিরুদ্দিন। তাহলে আসল মোল্লা নাসিরুদ্দিন কে ছিলেন? মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্প নিয়ে প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে, বইয়ের নাম ছিল ‘সালতুকনামা’। এ বইয়ে উল্লেখ আছে যে, নাসিরুদ্দিনের জন্ম তুরস্কের সিভরিহিসারে, ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে। অন্য আরেকটি উত্সমতে, সিভরিহিসারের কাছে হোর্তু গ্রামে তাঁর জন্ম। এর পর ১২৩৭ খ্রিস্টাব্দে আকসেহির শহরে চলে যান এবং ১২৮৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মোল্লা নাসিরুদ্দিন ছিলেন সুফি, তাই জাগতিক বিষয়াদি পরিহার করেছিলেন। আরবি ভাষায় মোল্লা মানে ‘উলেমা’।
মোল্লার কিংবদন্তি মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে— আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, তাজিকিস্তানসহ আরো কিছু দেশে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরা সবাই দাবি করে যে হোজ্জার জন্ম তাদের দেশে। এমনকি উজবেকিস্তানের মানুষ মনে করে, তাঁর জন্ম দেশটির বুখারায়।
সত্যি বলতে, কেউই নিশ্চিত নন যে, মোল্লা নাসিরুদ্দিন কোথায় জন্মেছিলেন। অনেকে মনে করেন, মোল্লার চরিত্রটি সুফিদের কোনো একটি গোষ্ঠীর সৃষ্টি, তারা সুফিদের শিক্ষাগুলো ছড়িয়ে দিতে এবং নিজেরা সেসব শিক্ষা আত্মস্থ করতে মোল্লার চরিত্রটির সহায়তা নিয়েছিলেন। অর্থাত্ সুফিদের কাছে মোল্লা নাসিরুদ্দিন কোনো ব্যক্তি নন, বরং তিনি একটি বার্তা। এ কারণে তাঁর ইতিহাস ও জন্ম-মৃত্যু সম্পর্কে কখনো স্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পাওয়া যায়নি।
আফগানিস্তানের বিখ্যাত লেখক ইদ্রিস শাহ মোল্লা নাসিরুদ্দিনের শ-খানেক গল্প একত্রিত করে তিন খণ্ডের গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। সুফিরা তাদের শিক্ষা সহজ পন্থায় মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্পকে ব্যবহার করেছেন। বিশিষ্ট সুফি কবি মওলানা জালালুদ্দিন রুমি, হাফিজ ও সাদির অনেক গল্প মোল্লা নাসিরুদ্দিনের কাহিনীতে স্থান পেয়েছে। এসব গল্পে স্বভাবতই মোল্লার কৌতুক ঢুকে পড়েছে এবং শেষ হয়েছে একটি প্রশ্ন দিয়ে।
নাসিরুদ্দিন হোজ্জা, মোল্লা নাসিরুদ্দিন ও জুহা চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য নির্দিষ্ট করার জন্য এদের তিনজনের নামে প্রচলিত গল্প বিশ্লেষণ করা হবে। হোজ্জার একটি গল্প এ রকম:
একদিন আকসেহির একদল লোক নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে বলল, ‘তুমি বলো যে, তোমার জ্ঞান নাকি সন্তদের চেয়ে বেশি। প্রমাণ করে দেখাও!’ নাসিরুদ্দিন হোজ্জার মুখে কথা নেই। লোকজনের চাপে শেষমেশ তিনি বললেন, ‘মোটামুটি ব্যাপারটা তেমনই।’ লোকেরা বলল, ‘সন্তদের অলৌকিক ক্ষমতা থাকে, তুমি নাকি তাদের চেয়েও কামেল, তাহলে এবার তোমার ক্ষমতা দেখাও।’ হোজ্জা জবাব দিলেন, ‘আচ্ছা চেষ্টা করছি।’ এই বলে হোজ্জা তাঁর সামনে থাকা একটি গাছের দিকে এগিয়ে গেলেন। বললেন, ‘হে বড় বৃক্ষ, আমার সামনে এসে দাঁড়াও।’ বলা বাহুল্য, কিছুই ঘটল না। এর পর হোজ্জা গাছের কাছে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত মানুষ হেসে হোজ্জাকে উপহাস করে বলল, ‘ওহে হোজ্জা, কী করছ? গাছকে হাঁটাতে না পেরে এখন নিজেই গাছের সামনে গেলে!’ হোজ্জা জবাবে বললেন, ‘সন্তদের চেয়ে যিনি উন্নততর, তাকে অবশ্যই বিনয়ী হতে হবে। গাছটা যদি এখানে হেঁটে আসতে না পারে তাহলে আমাদের উচিত গাছের দিকে এগিয়ে যাওয়া।’
প্রথমেই বুঝে নেয়া যায় যে, গল্পটা কাল্পনিক। শুরুতে একদিন শব্দটি দিয়েই এটা নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে এই একদিন আবার ঘটনাটিকে নির্দিষ্টতা দিচ্ছে। অর্থাত্ গল্পের চরিত্রগুলো যে বাস্তব ছিল, সেটা প্রকাশ হয়। গল্পটা সত্য বা কাল্পনিক যা-ই হোক না কেন, আকসেহির শহরের উল্লেখ চরিত্রটির ঐতিহাসিকতা নিশ্চিত করে। কারণ আকসেহির শহরটি বাস্তবেই আছে। অন্যদিকে বিভিন্ন উেস উল্লেখ আছে যে, এ শহরেই তিনি পড়াশোনা করেছেন। ফলে হোজ্জার ঐতিহাসিকতার দাবিটি আরো পোক্ত হয়।
এবার যদি জুহার কোনো গল্পের দিকে দৃষ্টি দেয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে সেখানেও গল্প শুরু হয়েছে ‘একদিন’ দিয়ে। কিন্তু মোল্লা নাসিরুদ্দিনের কোনো গল্পকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সেগুলো শুরু হয়েছে ‘কোন এক সময়ে’ দিয়ে। এতে গল্পগুলোর চরিত্র ও কাহিনীর কাল্পনিকতার বিষয়টি ফুটে ওঠে। হোজ্জা ও জুহার গল্পগুলোর কৌতুক সহজেই বোঝা যায় কিন্তু মোল্লার গল্পের রস আস্বাদন করতে চিন্তা ও কিছুটা জ্ঞানের প্রয়োজন। অন্যদিকে মোল্লার জন্মতারিখ ও জন্মস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার জন্মতারিখ ও জন্মস্থানকে।
উপরের বর্ণনা ও রচনার কাঠামোগত বিশ্লেষণ থেকে এটা বলা যায় যে, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা ও জুহার চরিত্রটি ঐতিহাসিক এবং বাস্তব। কিন্তু মোল্লা নাসিরুদ্দিনের চরিত্রটি কাল্পনিক। মোল্লা নাসিরুদ্দিন ও নাসিরুদ্দিন হোজ্জার চরিত্র দুটি একটি অন্যটির সঙ্গে মিশে গেছে। এটি খুব ভালোভাবেই বোঝা যায়, যখন দেখা যায় যে একই গল্পে একবার মোল্লা নাসিরুদ্দিন আবার নাসিরুদ্দিন হোজ্জা নামটি ব্যবহার হচ্ছে। কোনো গল্পে হোজ্জা হয়ে যাচ্ছেন মোল্লা আবার কোনো গল্পে এর উল্টোটাও ঘটছে। এক জায়গায় দেখা গেছে যে, মোল্লা ও হোজ্জার জন্মস্থান ও তারিখ একই। জুহা, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা ও মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হোজ্জা ও মোল্লার কাহিনী জীবনের গল্পের মতো। কারণ এ কাহিনীগুলোর সবকিছু বাস্তব না হলেও চরিত্রগুলো বাস্তব। কিন্তু মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলো অনেক বেশি কাল্পনিক। কারণ সেগুলো সুফিদের শিক্ষা প্রচারে সৃষ্টি হয়েছিল। একই সময় হোজ্জা ও জুহার গল্পগুলোর তুলনায় মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলো অপেক্ষাকৃত জটিল এবং বুঝতে পারাটা কঠিন। কারণ মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্পের লক্ষ্য ছিল হাস্যরসের মধ্য দিয়ে পাঠকদের কিছু বার্তা দেয়া। কিন্তু হোজ্জা ও জুহার গল্পগুলো যতটা না শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে সৃষ্ট, তার চেয়ে বেশি মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য।
তিনটি চরিত্রের মধ্যে নাসিরুদ্দিন হোজ্জাই সবচেয়ে বেশি দাপুটে। পাঠক ও লেখকরা যখন হোজ্জার গল্প পড়েন, তখন তাদের এটা মেনে নিতে কষ্ট হয় যে, গল্পগুলো জুহার চরিত্র থেকে নেয়া হয়েছে। হোজ্জার তুলনায় জুহার পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অনেক কম। জুহার মতো হোজ্জার জন্মতারিখ ও স্থান বিভিন্ন উেস লিপিবদ্ধ আছে। তাই মনে করা হয় যে, হোজ্জার চরিত্রটি বাস্তব, তাকে কোনো অবস্থাতেই জুহা থেকে প্রেরণা নিয়ে সৃষ্ট চরিত্র হিসেবে আখ্যা দেয়া যায় না। এবং এর সত্যতা গল্পগুলো লেখার ধরন ও গল্পের উপাদান বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়। তুর্কি উত্সগুলোরও কোথাও এটা বলা নেই যে, হোজ্জা হচ্ছেন জুহার চরিত্রের রূপান্তর। এখন পর্যন্ত অনেক পাঠক, এমনকি লেখকরাও নাসিরুদ্দিন হোজ্জা ও মোল্লা নাসিরুদ্দিনকে একই চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণটা মূলত উভয়েরই একই নাম ‘নাসিরুদ্দিন’। অন্যদিকে জুহার নামটি আরব দুনিয়ার বাইরে সেভাবে পরিচিত নয়।
রূপান্তর: শানজিদ অর্ণব





