সারা জীবন মানুষের নাতা ঘুতা খালু, অ্যাংক্যা করে আর কয়দিন, এখন বড় হচ্ছিস, মানসম্মান নাই তোর? ক্যারে তোর চৌদ্দ গুষ্টিৎ তো কেউ তোর নাকান আছিল না। তুই অ্যাংক্যা হলু ক্যামনে?

মোকলেসকে উঠানে পেয়ে কথাগুলো শুনিয়ে দিল সাইদুল। মোকলেসও কম ত্যাঁদড় নয়, সেও হাসতে হাসতে বলে, বাপে যাক চু (..) ভাই কয়া গাল পাড়ে তার আর মানসম্মান! আর মোর চৌদ্দ গুষ্টিৎ কেউ মোর নাকান না খায়া থাকে নাই যে চুরি চামারি করবে।

মোকলেসের এমন উত্তরের পর আর সাইদুল মিয়ার কিছু বলার থাকে না। দায় স্বীকার করে নিলে এই ক্ষুদ্র অপরাধীকে আর কি-বা বলার থাকে! কিন্তু রাগ তো আর একবারে পানি হয়ে যায় না। তাই সাইদুল এবার তার বাপ-মা তুলে গালি দেয় এবং আশা করে একটা বাঁকা উত্তরের, যাতে উত্তম-মধ্যম দেয়া যায়। বলে, তোর বাপ কি তোর মাও না খাওয়ায়া তোক প্যাটত দিছিল? কেমন জাতের চ্যাংরা রে তুই? এতেও কোনো কাজ হয় না। এই তপ্ততার বিপরীতে আরো নিরুত্তাপ থাকে মোকলেস। প্রত্যুত্তরে অপরাধ স্বীকার করে নেয়া প্রাণহীন একটি হাসি পাওয়া যায়। অগত্যা থেমে যেতে হয় সাইদুলকে।

সাইদুলের পেঁপে গাছ থেকে একটা পাকা পেঁপে পেড়ে খেয়েছে মোকলেস। খুব খিদা লাগছিল, মার কাছে গিয়েছিল খাবারের জন্য, খাবার দেয়নি, উল্টা জুটেছে ঝাঁটার বাড়ি। অগত্যা বাড়ি থেকে বের হয়ে খাবারের সন্ধানে নামতে হয়েছিল। কী করবে, সব সহ্য করতে পারলেও খিদা সহ্য করার ক্ষমতা নাই। প্রথমে ঢুকেছিল মাস্টারের পেয়ারা বাগানে। তারপর হানা দিয়েছিল সাইদুল মিয়ার ছোট ভাই শাখাওয়াতের সুপারির বাগানেও। এক বাদা সুপারি চুরি করতে পারলে চিন্তা থাকত না। সেকেন্দারের দোকানে দিয়ে অন্তত চারটা বনরুটি পাওয়া যেত। সেখানেও কিছু না জুটলে যায় সাইদুলের বাড়িতে। ততক্ষণে অবশ্য চুরির মতলবটা মাথা থেকে চলে গিয়েছিল এবং তার মনে হয়েছিল সাইদুলের বউয়ের কোনো একটা কাজ করে দিয়ে দুপুরে পেট ভরানোটাই উত্তম সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই ইচ্ছে মরে যায় সাইদুলের বাড়িতে ঢোকার আগেই। উঠোনে কেউ ছিল না সে সময়। গাছে পাকা পেঁপেটা দেখে আর লোভ সামলাতে পারেনি। গাছ থেকে ছিঁড়ে লুঙ্গির মধ্যে প্যাঁচ দিয়ে নদীপাড়ের দিকে হাঁটা শুরু। কিন্তু একটা বিষয় মোকলেসের মাথায় আসছে না, উঠোনে কেউ ছিল না, দেখল কে? ভাবনাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না মোকলেসের। না বলে এর-ওর গাছ থেকে এটা-ওটা পেড়ে বেচাবিক্রি বা খাওয়া মাঝে মধ্যেই করতে হয়। মাঝে মধ্যে হাতের কাজটাজ করেও খাবার জোটে। সেটা নিতান্তই কম; সপ্তাহে দু-একদিন। কাজ পেলে কাজ করতে সমস্যা নাই কিন্তু কাজ না জুটলে কী করবে! কারণ পেট তো আর কাজ বোঝে না। তিন বেলাই তো পেটের কিছু না কিছু চাই; সে কাজ থাকুক আর না থাকুক। তাই নিতান্ত বাধ্য হয়েই এর-ওর বাগানে হাত চালাতে হয়। বাড়িতে খাবার জোটে দুবেলা। সকালে কন্ট্রোলের চালের পান্তা আর শুকনা মরিচ, রাতে বেশির ভাগ সময় শুঁটকি আর কপাল ভালো হলে মাছের ঝোল। ভাতের পরিমাণ মাপা। সকালে কালে ভদ্রে পান্তার ভাত্যান বেশি পেলেও রাতে একমুঠ ভাত বেশি পাওয়ার সুযোগ নেই।

পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মোকলেসই বড়। বাকিগুলো সব আন্ডাবাচ্চা। কেউ ক্লাস ওয়ানে পড়ে, কেউ বা ক্লাস টু-তে। মোকলেসও স্কুলে যেত একসময়। থ্রি-তে ওঠার পর আর এগোতে পারল না। দুই বছর চেষ্টা করেছিল, কাজ হয়নি। বইয়ের কালো কালো অক্ষরগুলো মাথায় জমিয়ে রাখতে পারেনি। মাস্টার মশায়ের মারের ঠ্যালায় কিছুক্ষণের জন্য ঢুকে থাকলেও বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না। চুলায় আগুন ধরালে যেমন ধোঁয়া ভগ ভগ করে বের হয়, তেমনি স্কুলঘর থেকে মাস্টার বের হলেই সব পড়া যেন মাথা থেকে হাওয়া হয়ে যেত ধোঁয়ার মতো। মাথার মধ্যে পড়া জমানোর তরিকাটা তখন শেখা হয়নি বলে ক্লাস থ্রির পর আর এগোল না। স্কুলের হেডমাস্টার একদিন মোকলেসের বাবা ফজলু মিয়াকে ডেকে নিয়ে বলে দিলেন, ওক দিয়্যা হবা নয়। বরং তোর সাথে কামত নাগ্যা দি।

ফজলু মিয়ার হয়তো মন খারাপ হয়েছিল এটা ভেবে যে, দুই অক্ষুর পড়া থাকলে পরে একটু সুবিদ্যা হয়। কামলার সর্দার হওয়া যায়। কিংবা এতে হয়তো খুশি হয়েছিল এই ভেবে, তাড়াতাড়ি খ্যাতের কামে লাগাতে পারলে মন্দ কি! দুট্যা পয়সা বেশি রোজগার হবে। এই ভরসা করে ইরি ধানের কাটামারিতে নিজের সাথে কাজে লাগিয়েছিল। এখানেও মোকলেস টিকতে পারল না। গায়ে-গতরে বড় হলেও হাত এখনো পাকেনি। একদিন ধান কাটতেই হাতে ফোসকা পড়ে গোটা পাঁচেক, সাথে হাড়কাঁপানো জ্বর। এতে হয়তো ফজলু মিয়ার মন খারাপ হয়, তার মন ভেঙে যায় বা সে হয়তো খানিকটা দমেও যায়। তবে তার এই ভগ্ন মন শরীরের ওপর দখল নিতে পারে না। ফজলু মিয়ার হাতের ওপর দিয়েই চলে সংসার। কিন্তু মোকলেসের এই বাড়ন্ত শরীর মায়ের চোখে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। কাজকাম না করে সারা দিন টইটই করে ঘুরে বেড়ানো ছেলেকে অসহ্য ঠেকে নিজের কাছে। ফলে মোকলেসের কপালে প্রতিনিয়ত খিস্তিখেউর জোটে। আর এই খিস্তি যখন মোকলেসের আত্মসম্মানে আঘাত হানে, তখন বোঝা যায় মোকলেস বড় হচ্ছে, সে শিশু থেকে কিশোর হয়ে উঠছে। স্কুল ছেড়েছে ছয়-সাত বছর। বাবার কষ্ট আর মায়ের যন্ত্রণার কথা ভেবে মাঝে মধ্যে পাড়ার আকবর দাদার কাছে যায়। বলে, দাদা মোক অ্যানা কামোৎ নেও গো। গ্রামের কামলার সর্দারের কাছে তার এই আত্মসমর্পণ কোনো ফল দেয় না। আকবর মোকলেসের এই উপায়হীন সমর্পিত দৃষ্টি দেখে কিন্তু কিছু করার থাকে না। পিঠ চাপড়ে বলে, আর কিছুদিন যাক, হাত-পায়ের গাঁটগুল্যা আরেনা পাকুক। এরপর আমি তোক নিজে ডাক্যা নেমো। তখন মোকলেসের অনাগত রাত্রির কথা মনে পড়ে, তার চোখে ভেসে ওঠে খাবারের থালি সামনে ঠেলে দিয়ে মা শুনিয়ে দিচ্ছে— খালি কোতোলের নাকান চারট্যা গেলা শিকছিস। কাম না করলে কাল থেকে ভাত নাই কয়া দিল্যাম। মোকলেস দেখতে পায়, মায়ের কথার প্রতি উত্তর দিতে গিয়ে পিঠের ওপর ধুপধাপ করে কিল বসিয়ে দিচ্ছে। তার তন্দ্রা ভাঙে আকবর দাদার ডাকে। কিন্তু পেটে খিদা মোচড় দিয়ে ওঠে ভর সন্ধ্যাবেলায়।

আজ রাতের খাওয়ার সময় তাই আর মায়ের সাথে কোনো বািচতে যায় না মোকলেস। মায়ের কথা এ কান দিয়ে শুনে ও কান দিয়ে বের করে নীরবে খেয়ে উঠে যায়। নিজের এই বুদ্ধিদীপ্ত কাজের প্রশংসা নিজেই করে বিছানায় শুয়ে। বুড়ো কাঁথা আর তেল চিটচিটে বালিশে শুয়ে সে চিন্তা করতে থাকে যদি পড়াশোনাটা হতো, কত আনন্দেই না থাকতে পারত। মাঠে কাজও করতে হতো না, হাতে ফোসকাও পড়ত না। এই আনন্দে মন কলকল করে উঠতেই চোখে ভাসে একটা মোটাসোটা বেত হাতে নিয়ে তেড়ে আসছে প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। আর কালো অক্ষরগুলো যেন হাতের বইয়ের মাঝে কিলবিল করছে। স্বপ্ন উবে যায়। নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তার বাবা অর্থাৎ ফজলু মিয়ার যদি অনেক জমিজমা থাকত, তাহলে আর নিজেকে কাজ করতে হতো না, বরং কামলার কাজের ওপর খবরদারি করা যেত। বিকালে বাজারে গিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে চা ফুঁকানো যেত। গায়ে একটা রঙ-বেরঙের শার্ট চড়িয়ে এখানে ওখানে যাত্রাপালা দেখতে যাওয়া, হাউজি খেলা, বিড়ি ফুঁকানো— কত কিছুই না করা যেত সাইদুলের বড় ব্যাটার মতো। এমন ভাবনা উবে যায় ছারপোকার কামড়ে। এরপর শুরু হয় ছারপোকা মারার অপচেষ্টা। অপচেষ্টাই বলতে হয়, অন্ধকারে কানার মতো কাঁথার ওপর হাতড়ে তো ছারপোকার মতো চালাক প্রাণী মারা সম্ভব নয়। কি আর করা, অন্ধকারেই কিছুক্ষণ চেষ্টা করে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যায় সে।

’৯৮-এর সর্বগ্রাসী বন্যায় মোকলেসের একঘেয়ে জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটায়। তার বাড়ির পাশের কালপানি নদী, তেলিয়ান বিল, দুরামাড়ির বিল, মাঝবাড়ির ডোবা, চতলের বিল থেকে পানি উপচে পড়ে এবং সেই পানিতে তলিয়ে যায় শাহারভিটা, তেলিয়ান, পদুমশহর, মাঝবাড়ি, ধানঘরা এবং তার নিবাস শ্যামপুর গ্রাম। ডুবে যায় মাস্টারের পেয়ারা বাগান, শাখাওয়াতের সুপারি বাগান, সাইদুলের পুকুর। মাইলের পর মাইল আবাদি জমি যখন পানিতে হাবুডুবু খায়, তখন বাড়িগুলো দ্বীপের মতো ভেসে থাকে, জেগে থাকে। জেগে থাকে মানুষগুলো তার গরু-ছাগল পাহারা দেয়ার জন্য। মোকলেস ও ফজলু পাহারা দেয় সাইদুল মিয়ার গরু। শোনা যায় যমুনার ওপার থেকে প্রতিদিন শ্যালোর নৌকা নিয়ে আসে ডাকাতরা। প্রতিদিনই ডাকাতি করছে কোনো না কোনো বাড়ি। তো সাইদুলের বাড়ি যেহেতু গ্রামের এক মাথায়, তখন পাহারা বসাতেই হয়। এশার নামাজের পর থেকে ফজর পর্যন্ত এই পাহারা চলে। সাইদুলের উঠানে চৌকি পেতে তাদের দুজনের থাকার ব্যবস্থা হয়। সঙ্গে দেয়া হয় তিন ব্যাটারির একটা লাইট, দুইখান ছুরি, দুটি বর্শা। এসব হাতে পেয়ে মোকলেসের মধ্যে একটা পালোয়ান পালোয়ান ভাব আসে। এক হাতে লাইট, আরেক হাতে একটা ছুরি নিয়ে বাড়ির চারপাশে চক্কর দিতে তার ভালোই লাগে। রাতে চাঁদের আলোতে বন্যার পানি রূপালি রঙ ধারণ করলে তার লাফ দিতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে সাইদুল মিয়ার নৌকাটা নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু সে পারে না। তখন পানিতে তিন ব্যাটারি লাইট মেরে সে এক অদ্ভুত খেলা শুরু করে। যে লাইটের আলো পশ্চিমপাড়ার মাস্টারবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে না, সেই আলো পানিতে ফেললেই প্রতিফলিত হয়ে মাস্টারবাড়ির পুকুরপাড় আলোকিত করে দেয়। সে দেখতে পায় মাস্টার সাহেব লুঙ্গি কাছা মেরে একটা কোদাল হাতে পুকুরপাড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তার লাইটের আলো মাস্টার সাহেবের চোখে পড়লে মাস্টার সাহেব হুঙ্কার ছাড়ে। বলে, কেডা রে? মোকলেস লাইট নিভিয়ে দেয়। মোকলেস এবার সাইদুলের বাড়ির পূর্বধারে যায়। সেখান থেকে পানিতে লাইটের আলো ফেলতেই দেখতে পায় একটা ঢোঁড়া সাপ পুঁটি মাছ ধরে নিয়ে পানির ওপর মাথাটা ভাসিয়ে রেখে মাঝবাড়ির বিলের দিকে যাচ্ছে। মোকলেসের মনে হয়, সাপটা তার বাচ্চা আর বউয়ের জন্য মাছটা ধরে নিয়ে যাচ্ছে, রাতে সবাই মিলে এই পুঁটি মাছটা খাবে। তার মনে প্রশ্ন জাগে, এই একটা মাছ দিয়ে কি তাদের সবার পেট ভরবে? মোকলেসের মনে এমন প্রশ্নের উদয় হলে বিষ, ফনাহীন ঢোঁড়া সাপের সঙ্গে বাবা ফজলু মিয়ার মিল খুঁজে পায়। তার মনে পড়ে, আব্বা ফজলু মিয়াও যে এক বা দেড় কেজি চাল নিয়ে বাজার থেকে ফেরে, সেই চালে তো আমাদেরও পেট ভরে না। সে দেখতে থাকে সাপটা ক্রমাগত বিলের দিকে যাচ্ছে এবং সে দেখতে পায় বাংলাবাজার থেকে এক কেজি চাল নিয়ে পানিতে শরীর ডুবিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে ফজলু মিয়া। সাপটা আরো দূরে চলে গেলে তিন ব্যাটারির লাইটের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায় এবং সে লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে সাইদুল মিয়ার উঠানে চলে আসে। উঠানে এলে দেখতে পায় ফজলু মিয়া খর দিয়ে ভুতি বানাচ্ছে মশা তাড়ানোর জন্য। ছেলেকে দেখে ফজলু মিয়া বলে, অ্যাংক্যা করে ঘুরে বেরাস ক্যা? তোর কি সাপ, পোকার ভয় নাই? মোকলেসের তখন হয়তো বলতে ইচ্ছে করে যে, এই আশপাশত যেসব সাপ আছে, এগুলো তোমার নাকান ঢোঁড়া সাপ। কিন্তু সে বলে না, কারণ তার ঘুম পায়, ঘুমিয়ে যায়।

বন্যার পানি ঢোকার চার সপ্তাহ পর পানি কমতে শুরু করে এবং গরু-ছাগলের নানা অসুখ দেখা দেয়। যমুনাপাড়ের বাজার ভরতখালিতে সস্তায় গরু-ছাগল বেচাবিক্রি শুরু হয়। সুযোগটা নেয় সাইদুলের আরেক ভাই জাইদুল মিয়া। বাছুরসহ দুটি বিদেশী জাতের গাই কেনে সে। শ্যামপুর গ্রাম থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে বোনারপাড়া বাজারে নতুন বাড়ি করেছে জাইদুল। এই বাড়িতে স্থায়ী কাজ জুটে যায় মোকলেসের। কাজ বলতে গাই-বাছুরের যত্ন করা। থাকা-খাওয়ার বন্দোবন্ত হয় জাইদুল মিয়ার বাড়িতেই, মাস অন্তর পাবে ৩০০ টাকা। মোকলেসের বাবা এতেই খুশি। মাস অন্তর ৩০০ টাকা মন্দ নয়। বন্যার পানি কমেছে কিন্তু কামলার কাজ আর ঠিকঠাক চলছে না। ’৮৮-এর বন্যার ১০ বছর পর এত বড় বন্যা। সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঘোলা পানিতে। আমন ধান লাগানোর মোক্ষম সময়ে বন্যা। কিছু গৃহস্থ ধান লাগাতে শুরুও করেছিল। ধান যেগুলোয় লাগানো হয়েছিল, মৌসুম শুরুর দিনকয়েকের মধ্যে ঘোলা পানিতে সেগুলো তো তলিয়ে গেছেই, সেই সঙ্গে বীজতলাও তলিয়ে গেছে। তাই গৃহস্থদের মাথায় হাত। এমন সময় কামলার কাজ চলবে কী করে! এতগুলো বালবাচ্চার পেট চালানো বেশ দায় এখন ফজলু মিয়ার। তাই মোকলেসের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বোনারপাড়া জাইদুল মিয়ার বাড়ি যেতে হয়। জাইদুল মিযার নতুন গোয়াল ঘরেই গাই দুটি বাঁধার জায়গা থেকে খানিকটা তফাতে একটা চৌকি পেতে বিছানা করে দেয়া হয় মোকলেসের জন্য।

দিনে কয়েকবার পল কেটে দিতে হয়, আর পানি দিতে হয় চালের গুঁড়া, লবণ, গুড়ের লালি মিশিয়ে। বিপত্তিটা হয় গোয়াল ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে, বস্তায় বস্তায় গোবর টানতে হয় প্রতিদিন। ঘাম ছুটে যায় তখন, যখন দিনের মধ্যে দুই-তিনবার এই কাজ করতে হয় এবং মোকলেস চেতে যায়। সে গাভী দুইটাকে শালা-গরু বলে গালি দেয়। এই গালি দেয়ার পর যখন মনে হয় গাইকে আসলে গরু বলে গাল দিয়ে লাভ নাই, তখন সে জানোয়ারের বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা ও চামারের বাচ্চা বলে গালি দেয় এবং সে সুখ পায়। দূর থেকে এসব দেখে বেশ মজা পায় রেলওয়ে ড্রাইভার জাইদুল মিয়া। বাড়ির ভেতরে চলে যাওয়ার সময় সে মোকলেসকে বলে, বাজান গরু যদি তোর গাল বুঝত তাইলে তো আর গরু থাকত না। এই কথা শুনে মোকলেস রাগে গজগজ করতে থাকে। বলে, তাঁই কি হছে? আগ উটছে গাল পারছি! এই জাইদুলের বাড়ি এসে মোকলেসের একটাই সুবিধা হয়েছে, খাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা নাই। কিন্তু অসুবিধা হয়েছে বিস্তর। ঘুরে বেড়াতে পারে না, এই যে বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর তেলিয়ান বিলের শাপলা ফুলের ভ্যাট, পদ্ম ফুল তোলা, পেলি জাল দিয়ে ইচল্যা মাছ ধরা— কিছুই হয় না, হাডুডু খেলারও সুযোগ নাই। দিন যত যায়, এসবের অভাব তাকে তীব্রভাবে পেয়ে বসে। এই না পাওয়া তীব্র থেকে তীব্রতর হলে জাইদুল মিয়ার বাড়িসহ বোনারপাড়া বাজারটাকে একটা মুরগির খোঁয়াড় মনে হয়। প্রতিদিনের রেলগাড়ির শব্দ, টেম্পোর ভেঁপু, রিকশা-ভ্যানের বেল, বাজারে মানুষের সারাক্ষণের চিত্কার-চেঁচামেচি, কোলাহল তার মুরগির কক-কক শব্দে পরিণত হয়। এই খোঁয়াড় থেকে তার মুক্তি পেতে ইচ্ছে করে কিন্তু উপায় নেই।

জাইদুল মিয়া আসার দিন চল্লিশেক পর মাসের মাইনার টাকাসহ একবার বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পায়। বাড়িতে এখন তার বেশ কদর বোঝা যায়। মা তাকে পাশে বসিয়ে অনেক কথা জিজ্ঞেস করে। আসলে এই অনেক কথার মাঝে ঘুরেফিরে ওই একটা জিজ্ঞাসাই থাকে, বাবা তুই কেমন আছিস? জিজ্ঞেস করে, তোর চাচি মানুষটা কেমন, খাবারদাবার ঠিকঠাক দেয় কিনা, কাজকামের চাপ কেমন, কী কী কাম করা নাগে? মায়ের এসব প্রশ্ন শুনে সে অবাক হয়ে যায়। তার খুব কষ্ট হয় এটা ভেবে যে, তার মা তাকে গালি ছাড়া কথা বলছে। সে এক ধরনের সংকট অনুভব করে, কথার খেই হারিয়ে ফেলে। ফলে সে তার মায়ের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে। মা তার বিপন্ন বিস্ময় বুঝতে পারে, তার সংকট বুঝতে পারে। মা বলে, বাপরে বেন্নের ঘরেত জন্মিছিস, কাম করেই খাওয়া নাগবে। মার এই কথা শুনে তার ভেতরে একটি নতুন সংকট তৈরি হয়, সে বুঝতে পারে কামলার জীবনই তার নিয়তি, এই জীবন থেকে তার কোনো মুক্তি নেই এবং তার মাও চায় সে এই জীবনই যাপন করুক। ফলে বন্দির যন্ত্রণা অনুভব করে এবং তার মন খারাপ হয়ে যায়। সে ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কালপানি নদীর পাড়ে গিয়ে বসে এবং নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিস্তৃত হাওয়া তার কাছে নতুন লাগে, অচেনা লাগে। নদীর পাড়ে নিজেকে অবাঞ্ছিত এবং বহিরাগত মনে হয়। সে সিদ্ধান্ত নেয় আজই বোনারপাড়া ফিরে যাবে। বিকালে বোনারপাড়া ফিরে আসার সময় বাবা ফজলু মিয়া বলে, কী করবু ক, আমারের কপালেৎ তো আর কিছু নাই কামকাজ ছাড়া। আর কিছুদিন থাক ওটি, আর অ্যানা বড় হ, তারপর না হয় বাড়িত আস্যা মোর সাথে কাম করিস। এই কথার মধ্যে মোকলেস নতুন কোনো আশা খুঁজে পায় না। ফলে সে শান্তি পায় না।

যে অশান্তি মনের ভেতরে নিয়ে মোকলেস বোনাপাড়া ফিরে আসে, তা আর কমে না। দিন দিন এই অশান্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপও বাড়তে থাকে। সারা দিনের কাজ শেষে প্রতিদিন তাকে বাজার করতে হয়। কাজের চাপে নিজের অশান্তি ভুলে থাকার চেষ্টা করে। এবং সে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে, পেটের দায়ই আসলে সব। এই দায় থেকেই মানুষ আসলে এত কিছু করে। এই পেটের দায় থেকেই সে নিজে যেমন গরুর গোবর পরিষ্কার করে, তেমনি জাইদুল মিয়া ট্রেন চালায়, তার বাবা ফজলু মিয়া মাঠে কাজ করে, গ্রামের মাস্টার সাহেব স্কুলে পড়াতে যায়। যে রাতে মোকলেস নিজেকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়, সেই রাতে তার খিদা আরো বেড়ে যায় এবং রাগ করে সে আরো বেশি খায়। জাইদুল মিয়া তার খাওয়া দেখে বলে, কম করে খাও বাজান। বেশি খালে অসুক ধরবে। এই খাওয়া, এই খিদা যে শুধু পেটের নয়, তা বোঝানোর ক্ষমতা মোকলেসের নেই। কারণ সে বোঝাতে পারবে না, এই খিদা অভিমানের, এই খিদা না পাওয়ার যন্ত্রণার, এই খিদা হতাশার, এই খিদা পরাজয়ের, এই খিদা একটি পরাজিত পরিবারের। এই যে কয়েকটা টাকা উপার্জনের জন্য গ্রাম ছেড়ে বোনারপাড়া বাজারে এসে এই গাই-বাছুরের যত্ন নেয়া, তা শুধু নিজের খিদা নিবারণের জন্য নয়, আরো কয়েকটা পেটের খিদা নিবারণের জন্যও বটে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মোকলেস টের পায়, রাতে গলা পর্যন্ত খাওয়াটা ঠিক হয়নি। তার মনে পড়ে ফজরের আজানের পর থেকে পেটের মধ্যে মোচড়ামুচড়ি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকবার পায়খানায় যেতে হয়েছে। দুপুর গড়ালে তার পেটের মোচড়ামুচড়ি আরো বাড়তে থাকে। অনবরত বমি আর পাতলা পায়খানার ফলে সে কাহিল হয়ে পড়ে। মোকলেসের অবস্থা খারাপ দেখে জাইদুল মিয়া রেলওয়ের ডাক্তারকে ডেকে আনে। ডাক্তারের পরামর্শে মোকলেসের হাতে একটা স্যালাইন ফুটিয়ে ভ্যানে করে শ্যামপুর পাঠিয়ে দেয়া হয়। মোকলেসের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় এ মাসের মাইনে বাবদ টাকা ৩০০, আর কিছু ওষুধ।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হচ্ছে। একটা ভ্যান যাচ্ছে বোনারপাড়া থেকে শ্যামপুরের দিকে। দিনের আলো নিভে যেতে না যেতেই আকাশের উত্তর-পূর্ব কোণে চাঁদ ওঠে। কুয়াশা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের আলো ঘন হয়। মোকলেসের শীত বাড়তে থাকে। খানাখন্দ রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে চলে ভ্যান। বোনারপাড়া থেকে শ্যামপুর গ্রামে যাওয়ার পথ যেন আর ফুরায় না মোকলেসের।