নাটের গুরু
না হঠাৎ
নবাব?
মীর
জাফর নামখানা
বাংলায় বিশ্বাসঘাতকের
চূড়ান্ত ও
মোক্ষম প্রতিশব্দ
বলে গণ্য
হয়, বাংলা
ও বাঙালি
সম্পর্কে কিঞ্চিৎ
অবগত প্রত্যেকেই
বিন্দুমাত্র দ্বিধা
ছাড়া এ
কথা স্বীকার
করবেন। কিন্তু
তিন শতক
ধরে বাঙালি
ও অবাঙালি
ঐতিহাসিকরা মীর
জাফর লোকটি
ঠিক কেমন
ছিলেন, তা
নিয়ে বিচিত্র
কিসিমের বহু
রকম মত
প্রকাশ করে
গেছেন। কেউ
তাকে পলাশী
ষড়যন্ত্রের নাটের
গুরু হিসেবে
দেখাতে চেয়েছেন,
কেউবা মনে
করেন, মীর
জাফর নেহাত
ইংরেজদের মগজ
দ্বারা নির্মিত
এক ষড়যন্ত্রী
ও ভাগ্যক্রমে
বনে যাওয়া
‘হঠাৎ নবাব’—তিনি
না থাকলে
তার বদলে
অন্য কাউকে
তৈরি করে
সময়মতো সিরাজউদ্দৌলার
বিরুদ্ধে ব্যবহার
করা হতো।
বিভিন্ন সময়
নানা প্রেক্ষাপটে
ঐতিহাসিকেরা কীভাবে
মীর জাফরকে
দেখতে চেয়েছেন,
তার খতিয়ানও
তাই বেশ
কৌতূহলোদ্দীপক হতে
পারে বটে।
সমকালীন ঐতিহাসিকদের কলমে: বিলাসী, মদ্যপ, ভীরু
ও লম্পট
আঠারো
শতকের বাংলায়
নবাবের দরবারের
সঙ্গে ঘনিষ্ঠ
অভিজাত ঐতিহাসিকেরা
মীর জাফরের
চরিত্র অঙ্কন
করতে গিয়ে
তার সম্পর্কে
কোনো ইতিবাচক
কথা দূরে
থাক, নিরপেক্ষ
থাকার কষ্টদায়ক
চেষ্টাও কখনো
করেননি। যদিও
ওই সময়ের
ঐতিহাসিকদের বেশির
ভাগই ছিলেন
সিরাজউদ্দৌলার প্রতি
বিরূপ ও
ইংরেজ কোম্পানির
প্রতি মোহগ্রস্ত।
ইতিহাস রচনার
ক্ষেত্রে তারা
আদতে ‘সিরাজ
ও মীর
জাফর সমান
খারাপ’ এমন
অবস্থান গ্রহণ
করেছিলেন।
১৭৮১ সালে
প্রকাশিত সৈয়দ
গোলাম হোসেন
খান তবাতবায়ির
বিরাটকায় ইতিহাসগ্রন্থ
সিয়ার-উল-মুতাখখিরিনের
সিংহভাগ জুড়েই
আছে পলাশী
যুদ্ধ ও
নবাব সিরাজউদ্দৌলার
পতনের ঘটনাবলি।
ফার্সি ভাষায়
রচিত সিয়ারের
বহু অংশেই
মীর জাফরের
কথা প্রাসঙ্গিকভাবে
স্বভাবতই এসেছে।
ঐতিহাসিক হিসেবে
তবাতবায়ির দক্ষতা
মেনে নিয়েও
তার বিরুদ্ধে
‘সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে
কল্পিত বিষোদ্গারে
পটুতা’ প্রদর্শনের
অভিযোগ অনেকেই
করেছেন। তবে
এও খেয়াল
করতে হবে
যে মীর
জাফরের চরিত্র
অঙ্কনে তবাতবায়ি
যথেষ্ট সমালোচনামুখর
ছিলেন। সিয়ারের
একাংশে তবাতবায়ি
অকপটেই বলেছেন,
মীর জাফরের
সঙ্গে আলাপ
করার কোনো
ইচ্ছাই তার
হয়নি। যদিও
মীর জাফর
তবাতবায়ির পিতার
সঙ্গে সর্বদা
‘আন্তরিক আচরণ
ও পরিপূর্ণ
শ্রদ্ধার সঙ্গে
বাক্যালাপ করতেন’
এবং তার
ছোট ভাই
নকী আলী
খানের প্রতি
‘মীর জাফরের
যথেষ্ট পক্ষাপাতিত্ব
ছিল’।
পলাশীর যুদ্ধ
শেষে সিরাজ
নিহত হওয়ার
পর মীর
জাফর যখন
বিহারের পাটনা
তথা তখনকার
আজিমাবাদে অবস্থান
করছিলেন, তখন
তার সঙ্গে
একাধিকবার দেখা
করার সুযোগ
থাকা সত্ত্বেও
তবাতবায়ি তা
এড়িয়ে গেছেন।
তার বয়ানে,
‘[মীর জাফরের]
সঙ্গে সাক্ষাতের
ব্যাপারটাতে আমার
কিছুতেই সায়
দিচ্ছিল না।
কারণ, তার
চরিত্র সম্পর্কে
আমি পূর্ণমাত্রায়
ওয়াকিবহাল ছিলাম।
তার মসনদ
লাভের অনেক
আগে থেকেই
আমি তাকে
জানতাম। এই
ব্যক্তির সান্নিধ্য
লাভের ইচ্ছা
আমার আদৌ
ছিল না।’
অতীতে তার
পরিবারের সঙ্গে
মীর জাফরের
সুসম্পর্ক থাকলেও
তবাতবায়ি এ
উপলব্ধিতে পৌঁছেন
যে মীর
জাফর নবাব
হওয়ার আর
অতীত যোগাযোগের
ন্যূনতম তোয়াক্কা
করবেন না:
‘এ ব্যক্তির
তার অতীতের
বাধ্যবাধকতাকে স্মরণে
রাখা অথবা
সেই অধিকারকে
প্রশ্রয় দেয়ার
মতো ক্ষমতা
বা মনোবৃত্তি
নেই।...মীর
জাফর খান
ফুলের সুগন্ধ
বিতরণ করতে
পারবেন না।
এ মানুষটিকে
আমি ভালো
করেই জানতাম
বলে তার
সম্পর্কে খুব
আশাবাদী হতে
পারিনি।’ মীর
জাফরের চরিত্র
সম্পর্কে তবাতবায়ি
আরো বেশকিছু
কৌতূহলোদ্দীপক ও
সাধারণ পাঠকের
কাছে প্রায়
অজানা বিবরণ
উপস্থাপন করেছেন।
যেমন এক
জায়গায় পাই
‘হঠাৎ নবাব’
বনে যাওয়া
মীর জাফরের
আচমকা রত্ন-অলংকারপ্রাপ্তির
ফলে দেখা
দেয়া বিলাসী
আদেখলাপনার কথা:
‘মীর জাফর
হীরা-জহরত
খুবই পছন্দ
করতেন এবং
সেগুলোর ব্যবহারে
খুবই আনন্দ
লাভ করতেন।
জীবনের শেষ
প্রান্তে এসে
তিনি হঠাৎ
করে অসংখ্য
হীরা-জহরতের
অধিকারী হয়ে
এসব চাকচিক্যময়
বস্তুর ভারে
নুয়ে পড়েন।
সে সময়
তিনি তার
হাতে ছয়
কি সাতটি
কবজির অলংকার
(ব্রেসলেট) পরতেন...গলায়
পরতেন তিনটি
কি চারটি
মুক্তার মালা
এবং সেগুলো
তার গলা
থেকে বুক
পর্যন্ত ঝুলে
থাকত।...’ আরেক
অংশে তবাতবায়ি
মীর জাফরের
পাটনায় গিয়ে
পুরোদমে হোলি
উৎসব পালন
ও পেট
ভরে তিলের
তেল দিয়ে
ভাজা কুচি
কুচি করা
ষাঁড়ের মাংস
ভক্ষণ করার
মজাদার বর্ণনা
দিয়েছেন। এমনকি
পাটনা থেকে
মুর্শিদাবাদে ফেরার
সময় পথের
ধারে মীর
জাফরের উদ্ভট
গানবাজনা শুনে
ও শিকার
করে অবসর
সময় কাটানোর
বিবরণও তবাতবায়ি
বাদ রাখেননি।
মুর্শিদাবাদে ফেরার
পর বৃদ্ধ
মীর জাফরের
লাম্পট্যে মজবার
ও দেদার
অর্থ অপচয়ের
বিষয়ে তবাতবায়ির
বিদ্রূপমাখা মন্তব্য
ছিল এমন:
‘নবাবের অমনোযোগিতা
ও সীমাহীন
অর্থ অপচয়ের
কারণে অনেক
সময় তাকে
তার মদ্যপানরত
সঙ্গীদের চেয়ে
অনেক দরিদ্র
দেখা যেত।’
তবাতবায়ির শেষোক্ত
মন্তব্যের অংশভাগ
মাত্র তুলে
দেয়ায় মনে
হতে পারে,
মীর জাফর
বুঝি অপচয়কারী
বা লম্পট
হলেও মাতাল
ছিলেন না।
তা আদপেও
নয়। মীর
জাফরের মদ্যপানের
বর্ণনা তবাতবায়িসহ
তার সমকালের
আরো কয়েকজন
ঐতিহাসিকই দিয়ে
গেছেন। আলিবর্দি
খাঁর নির্দেশে
ওড়িশার মেদিনীপুর
অঞ্চল থেকে
মারাঠা বর্গিদের
তাড়িয়ে দেয়ার
উদ্দেশ্যে সেখানে
(তখন ওই
এলাকার ফৌজদার
হিসেবে নিযুক্ত)
মীর জাফরকে
যেতে হয়েছিল।
মেদিনীপুরে শিবির
স্থাপনের পর
সেখানে মীর
জাফর নাকি
‘দিন-রাত
মদ খেয়ে
সম্পূর্ণ মাতাল
হয়ে পড়ে
থাকতেন’।
এ বর্ণনা
দিয়েছেন আলিবর্দি
খাঁর একান্ত
অনুগত সহচর
ইউসুফ আলী
খান, আনুমানিক
১৭৬৩-৬৪
সালে রচিত
তার ফার্সি
ভাষায় রচিত
তারিখ-ই-বাঙ্গালা-মহাবত-জঙি
গ্রন্থে। মীর
জাফরের স্বভাব
সম্পর্কে তিনি
আরো লিখেছেন,
‘তার [মীর
জাফরের] মেজাজ
ছিল আরাম-আয়েশের
প্রতি খুব
বেশি অনুরক্ত’।
পরে মারাঠা
বাহিনীর মুখোমুখি
হয়ে যথেষ্ট
সৈন্য (১৬-১৭
হাজার) থাকা
সত্ত্বেও তাদের
মোকাবেলা না
করে মীর
জাফর কীভাবে
বোকার মতো
বর্ধমানে পলায়ন
করলেন, তার
বিবরণও মেলে
তারিখ-ই-বাঙ্গালায়।
জানুজি ভোঁসলের
নেতৃত্বে আসা
ক্ষুদ্রকায় মারাঠা
বাহিনীর সামনে
মীর জাফরের
এমন অসহায়
অবস্থা দেখে
আলিবর্দি খাঁ
বুঝতে পেরেছিলেন,
এ মাতালের
দ্বারা যুদ্ধজয়
অসম্ভব। তাই
কিছুদিন বাদেই
তিনি মীর
জাফরকে পদচ্যুত
করেন, তার
অধীনে থাকা
সৈন্যদল ভেঙে
দেয়া হয়।
মীর জাফর
সম্পর্কে
সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন
বা তারিখ-ই-বাঙ্গালার
মতো খুব
বেশি না
হলেও কিছু
কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
দিয়েছেন আঠারো
শতকের আরেক
ঐতিহাসিক করম
আলি খান।
আলিবর্দি খাঁর
ঘরে প্রতিপালিত
বা তারই
দ্বারা একদা
ফৌজদার পদে
নিয়োগ পাওয়া
করম আলি
খান তার
নাতিদীর্ঘ ফার্সি
গ্রন্থ মোজাফফরনামায়
(রচনাকাল আনু.
১৭৭৩) একটি
নতুন তথ্য
দিয়েছেন, সেটি
হলো মীর
জাফর নাকি
সিরাজউদ্দৌলাকে পলাশীর
যুদ্ধক্ষেত্রেই এক
দুর্বল মুহূর্তে
হত্যা করতে
চেয়েছিলেন। ‘কিন্তু
নবাবের অসংখ্য
সৈন্য সেখানে
উপস্থিত থাকার
কারণে তিনি
সে অভিসন্ধি
থেকে বিরত
থাকেন।’ করম
আলি খানের
লেখায় আরেকটি
তথ্য মেলে,
তা হলো
সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যার
পর তার
স্ত্রী লুত্ফুননিসার
প্রতি মীর
জাফরের কুনজর
পড়েছিল। মীর
জাফর লুত্ফুননিসাকে
বিয়ে করতে
চাইলে তিনি
তা ঘৃণাভরে
প্রত্যাখ্যান করে
বলেছিলেন, ‘আগে
যে আমি
হস্তীপৃষ্ঠে আরোহণ
করেছি, সেই
আমি এখন
গর্দভের পৃষ্ঠে
উপবিষ্ট হতে
সম্মত হতে
পারি না।’
করম আলি
খানের চোখে
মীর জাফরই
পলাশী ষড়যন্ত্র
ও সিরাজ
হত্যার মূল
কুচক্রী, এমনটা
মোজাফফরনামা পড়তে
পড়তে মনে
হতে পারে।
আধুনিক
বাঙালি
ঐতিহাসিকেরা যেভাবে দেখেন
সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত
বাঙালি সমাজের
তরফ থেকে
সর্বপ্রথম যে
লিখিত জোরগলার
‘সওয়াল’ হাজির
করা হয়,
সেটি ১৮৯৭
সালে প্রকাশিত
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
প্রণীত ইতিহাসগ্রন্থ
সিরাজদ্দৌলা। মজার
ব্যাপার এই,
সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে
সর্বপ্রথম প্রকাশিত
এ যুগপৎ
গবেষণাঋদ্ধ ও
আবেগপূর্ণ বইতেও
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
মীর জাফরের
চরিত্র অঙ্কনে
দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন
যেনবা। সিরাজ
হত্যার সঙ্গে
মীর জাফর
এককভাবে জড়িত
কিনা এ
নিয়ে তার
সংশয়: ‘মীর
জাফর নিজে
সিরাজউদ্দৌলার ভাগ্য
নির্ণয়ের তর্ক-বিতর্কে
কোনো পক্ষেই
সম্মতিজ্ঞাপন করেননি।’
অতএব তিনি
সিদ্ধান্ত টানেন,
সিরাজকে গদিচ্যুত
করার ব্যাপারে
ষড়যন্ত্র করলেও
তার প্রতি
মীর জাফরের
এক ধরনের
‘আত্মহূদয়ের স্নেহমমতা’
ছিল। আর
সেই ‘স্নেহমমতা’
সমূলে মুছে
যাওয়ার নেপথ্যে
রবার্ট ক্লাইভ
ছাড়া আর
কারো প্ররোচনা
থাকতে পারে
না বা
কার্যকরী হতে
পারে না—এই
হলো অক্ষয়কুমারের
মত। বেয়াদবি
হলেও বলি,
বস্তুত ক্লাইভের
(পড়ুন, ‘ইংরেজের’)
ওপর ক্ষোভ
ঝাড়তে গিয়ে
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
আবেগে ভেসে
গিয়ে মীর
জাফরের কূটকাণ্ডকে
খানিক লঘু
করেই দেখেছিলেন
মনে হয়।
অবশ্য তখন
ব্রিটিশরাজের শাসনযন্ত্রের
চাপ ও
তাপ ছিল
রমরমা অবস্থায়।
কাজেই মীর
জাফরকে খানিক
ছাড় দিয়ে
পুরোদমে ইংরেজ
সংহার ব্যতীত
জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকের
আর করারই
বা ছিল
কী?
এর ৫০
বছরেরও বেশি
সময় পর
প্রকাশিত যদুনাথ
সরকার ও
রমেশচন্দ্র মজুমদারের
যৌথভাবে লেখা
বই হিস্ট্রি অব
বেঙ্গল: মুসলিম
পিরিয়ড-এ
(১৯৪৮) লেখকদ্বয়
অবশ্য সরাসরিই
লিখেছেন, মীর
জাফর ছিলেন
সিরাজউদ্দৌলার সবচেয়ে
‘শক্তিশালী শত্রু’।
তিনি নিজের
‘পরিণত বয়স,
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা
ও পদমর্যাদার
কারণে’ শক্তিমত্তার
পরীক্ষায় সিরাজকে
চ্যালেঞ্জ ছুড়ে
দিতে পারতেন।
তবে মীর
জাফরের এমন
স্থানে আসার
ক্ষেত্রে আলিবর্দি
খাঁর প্রশ্রয়ও
একটা বড়
কারণ বলে
এ দুই
ঐতিহাসিক মত
দিয়েছেন। কারণ
আলিবর্দি খাঁর
সম্মতি না
থাকলে মীর
জাফরকে কখনই
‘বক্সি’ বা
প্রধান খাজাঞ্চির
(কার্যত ছিলেন
প্রধান সেনাপতি)
পদে বসানো
হতো না।
আলিবর্দি খাঁ
যেন মীর
জাফরকে নিজের
উত্তরসূরি হিসেবেই
গণ্য করে
চলছিলেন— এমনটাই
মত যদুনাথ-রমেশচন্দ্র
জুটির।
তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়ের
পলাশীর
যুদ্ধ (১৯৬৫)
বইতে
অবশ্য লেখক
ইংরেজদের ওপর
সব দোষ
দিয়ে মীর
জাফর নেহাত
‘পরিস্থিতির শিকার’
বা ‘আর
সবার মতোই’
এমন বয়ান
দেননি। লেখার
সময়টাও এক্ষেত্রে
বিবেচ্য, বিংশ
শতাব্দীর অর্ধেক
পার হওয়ায়
খোলামনে ইতিহাসকে
দেখার অবস্থা
তখন হালকা-পাতলা
তৈরি হয়েছে।
মীর জাফরের
চারিত্রিক দোষের
বিষয়ে তপনমোহনের
বিশ্লেষণ বেশ
তীক্ষ,
শ্লেষময়ও কখনো
কখনো: ‘সিরাজের
চেয়ে মীর
জাফরের চরিত্রে
যদি কেউ
একটু কিছু
বেশি ভালো
দেখতে পেয়ে
থাকেন তো
সে কথা
তিনি কোথাও
প্রকাশ করে
যাননি। বরং
যে দোষ
এক মূঢ়মতি
শিক্ষাদীক্ষাহীন অর্বাচীনের
মধ্যে দেখতে
পেলে লোকে
তাকে খানিকটা
ক্ষমার চোখে
দেখে, সে
দোষটা তার
ঠাকুরদার বয়সী
কোনো লোকের
স্বভাবে দেখলে
সেটা আর
কিছুতেই বরদাশত
করা যেতে
পারে না।...সারা
দিন গাঁজা-আফিম
টেনে কতকগুলো
ইতর ইয়ারবক্সি
নিয়ে নাচওয়ালিদের
ঘিরে মীর
জাফর বাংলার
নবাবি করতে
লাগলেন। যে
রাজত্বের এই
কর্ণধার, সে
রাজত্ব কীভাবে
চলল, সেটা
কি আর
খুলে বলে
দিতে হবে?’
ঐতিহাসিক রজতকান্ত
রায় তার
পলাশীর
ষড়যন্ত্র ও
সেকালের সমাজ
(১৯৯৪) বইতে বৃহত্তর
পরিপ্রেক্ষিতে পলাশীকাণ্ডের
পূর্বাপরের অভিনব
বিশ্লেষণ করেছেন।
তার চোখে
মীর জাফর
তথা নবাবদের
ষড়যন্ত্রেই সিরাজউদ্দৌলা
গদিচ্যুত হলেন।
মীর জাফরের
যোগ্যতা না
থাকা সত্ত্বেও
তিনি শাসনযন্ত্রের
ভার নিজের
কাঁধে তুলে
নেয়ার লোভ
সামলাতে পারেননি।
তার এ
লোভের সঙ্গে
বাংলার জনজীবনের
যোগ ছিল
না। ইংরেজরাও
প্রথমে শাসনভার
চায়নি, চেয়েছিল
মুনাফা। কিন্তু
ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের
অস্ত্র হিসেবে
ব্যবহার করতে
গিয়ে দিনের
শেষে নিজের
তৈরি ফাঁদে
মীর জাফর
নিজেই পড়েছিলেন:
“মহাবত্জঙ্গ নামে
খ্যাত হতে
চেয়েছিলেন কিন্তু
‘ক্লাইভের গাধা’
নামে তার
প্রসিদ্ধি হলো।”
এর উল্টো
মত আবার
আরেক ইতিহাসবিদ
সুশীল চৌধুরীর।
বহু দুর্লভ
ও আগে
না দেখা
নথিপত্র ঘেঁটে
পলাশীর
অজানা কাহিনী বইতে
(২০০৪) তিনি
এমন সিদ্ধান্ত
টানেন, মীর
জাফর ইংরেজদের
তৈরি করা
দাবার ঘুঁটি
মাত্র। তারা
মীর জাফরের
জায়গায় ইয়ার
লতিফ খানকেও
রাখতে পারত;
কিন্তু মীর
জাফরের দিকে
জগৎ শেঠদের
সমর্থন ছিল
দেখে শেষমেশ
তাকেই মূল
শিখণ্ডী করা
হয়। এমনকি
ইংরেজরাও পলাশীর
যুদ্ধের আগ
মুহূর্ত অবধি
মীর জাফরের
ওপর পুরো
ভরসা করতে
পারছিল না।
তারা ভাবছিল:
‘সম্ভবত তার
উদ্দেশ্য নিজেকে
সম্পূর্ণ উন্মোচন
না করে
বেড়ার ধারে
অপেক্ষা করা
এবং যে
দল শেষ
পর্যন্ত জয়ী
হবে, তার
সঙ্গে যোগ
দেয়া।’ অভ্যন্তরীণ
ষড়যন্ত্রে মীর
জাফরের ভূমিকা
তেমন ছিল
বলে তাই
সুশীল চৌধুরী
মনে করেন
না। সুযোগসন্ধানী
ইংরেজ কোম্পানিই
তার কাছে
মূল কুচক্রী।
বাংলাদেশের অগ্রগণ্য
ইতিহাসবিদ সিরাজুল
ইসলামের মতও
সুশীল চৌধুরীর
প্রায় কাছাকাছি।
মীর জাফর
বিষয়ে ঐতিহাসিকের নোটবই
(২০১০) গ্রন্থে তার
মন্তব্য এমন:
‘মীর জাফর
আসলে ষড়যন্ত্রে
ততটুকু সক্রিয়
ছিলেন না,
যতটুকু ধারণা
করা হয়।
ষড়যন্ত্রটি পাকিয়েছে
জগৎ শেঠের
নেতৃত্বে কোম্পানির
সঙ্গে ব্যবসায়
জড়িত কলকাতা,
কাশিমবাজার ও
মুর্শিদাবাদের বণিকগোষ্ঠী।’
ঋণ স্বীকার: নিবন্ধে ব্যবহূত
সমস্ত ফার্সি
টেক্সটের অনুবাদ
প্রয়াত প্রত্নতাত্ত্বিক-ইতিহাসবিদ
আবুল কালাম
মোহাম্মদ যাকারিয়ার
মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক





