পর্তুগিজরা এসেছে সবার আগে। ১৪৯৮ সালের ২০ মে ভাস্কো দা গামা যখন মালাবার উপকূলে কালিকটের মাটিতে পা রাখলেন, ভারতবর্ষের ইতিহাস সেদিন থেকে বদলে যেতে শুরু করল।
পর্তুগিজ অভিযাত্রী
ভারতবর্ষে আসার সমুদ্রপথ ভাস্কো দা গামা আবিষ্কার করে ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে দিলেন। বিচিত্র স্বাদ ও গন্ধের মসলার টানে লাভের আশায় ইউরোপীয় বণিক জাতির প্রায় সবারই ভারতে আগমন ঘটে। ১৬০০ সালে ব্রিটেনের রানীর চার্টার নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি আসে। শুরুটা ছিল বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ, শেষ পর্যন্ত তারা রাষ্ট্রই নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ভারতবর্ষের কোনো কোনো স্থান বাদ দিয়ে বাকিটায় ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকে, সর্বোচ্চ উপনিবেশকাল ১৯০ বছর। বিস্মিত হওয়ার কথাই, ব্রিটেনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভারতের কয়েকটি অংশে পর্তুগিজরা দাপটের সঙ্গে একটানা ৪৫১ বছর রাজত্ব করেছে। এ সময়ে ভারতের অভ্যন্তরে এই পর্তুগাল রাজ্যে লর্ড ক্লাইভ ও তার উত্তরসূরিরা এতটুকুও দাঁত বসাতে পারেনি। উপনিবেশবাদের দিন ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু পর্তুগাল সরকার বলে গেছে ভারতে তাদেরটা কোনো উপনিবেশ নয়, পর্তুগালেরই অংশ।
১৯৪৭-এর আগস্টে ধর্মীয় রেখা টেনে ভারতবর্ষ দুই খণ্ড এবং স্বাধীন হলো। কিন্তু ভারতের ভেতরের ১ হাজার ৫৪০ বর্গমাইল এলাকা এবং সাড়ে ছয় লাখ মানুষ ভারতে অন্তর্ভুক্ত হলো না, তা রয়ে গেল পর্তুগাল। গোয়া, দমন ও দিউ— পর্তুগালের তিনটি ছিটমহল। সম্মিলিত ছিটমহলের রাজধানী গোয়া। পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে উনিশ শতকে গোয়া লিবারেশন মুভমেন্ট নামে একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে। উনিশ শতকে আন্দোলনকারীরা ছোট আকারের গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে সমর্থ হয়। এটা মানতেই হবে গোয়ার অধিবাসীদের একটি অংশের কাছে পর্তুগিজ শাসনই কাম্য ছিল। তারা সরাসরি পর্তুগাল সরকারের সাহায্যে তুলনামূলকভাবে স্বস্তিকর জীবন যাপন করছিল।
গোয়া এখন ভারতের একটি রাজ্য আর দমন ও দিউ গুজরাট উপকূলে।
গোয়া, দমন ও দিউ— এ তিন ভূখণ্ডে পর্তুগাল উপনিবেশ নিয়ে সমঝোতা করার জন্য ভারত আহ্বান জানালে পর্তুগাল সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল ভারতীয় উপমহাদেশে পর্তুগাল রাষ্ট্রের যে অংশ রয়েছে, তা কোনোভাবেই উপনিবেশ নয়; বরং তা মেট্রোপলিটন পর্তুগালের একটি অংশ। পর্তুগাল সরকার তার দেশের একটি অংশ কোনোভাবেই ভারত সরকারকে দিতে পারে না এবং এ স্থান তিনটি নিয়ে সমঝোতা করারও কোনো সুযোগ নেই। আরো স্পষ্ট করে বললে, প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর আগে সেখানে যখন পর্তুগিজ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ভারত রিপাবলিকের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
জবাব পেয়ে ক্ষুব্ধ ভারত সরকার ১১ জুন ১৯৫৩ সালে পর্তুগালের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। দূতাবাস প্রত্যাহার করে নেয়। গোয়া, দমন, দিউ পরস্পরসংলগ্ন নয়, বিচ্ছিন্ন; ভারতীয় ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে তিন জেলার অধিবাসীদের আসা-যাওয়া করতে হয়। তাদের পর্তুগাল পাসপোর্টে ভারতীয় ভিসা নিতে হয়। এবার ভারত গোয়া থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার প্রশ্নে ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি হতে নির্দেশ দেয়। ১৯৫৪ সালে ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে শুরু করলে এ তিন জেলা এবং দাদরা ও নগর হাভেলির মধ্যে পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ল। এদিকে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন অব ডকল্যান্ডের সদস্য শ্রমিকরা পর্তুগিজ ইন্ডিয়াগামী সব জাহাজ বয়কট করলেন।
১৯৫৫ সালের স্বাধীনতা দিবসে তিন থেকে পাঁচ হাজার ভারতীয় ছয়টি পয়েন্ট থেকে গোয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করলে পর্তুগিজ পুলিশ তাদের প্রতিহত করতে নির্বিচার গুলি চালায়, তাতে অনেকের মৃত্যু ঘটে (পুলিশের হিসাবে ২১ জন, অন্য হিসাবে ৩০ জন)। এ হত্যাকাণ্ডের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা ভারতীয় অঞ্চল থেকে পর্তুগিজদের উচ্ছেদের দাবি জানায়। ভারত গোয়ায় কনসাল অফিস বন্ধ করে দেয়। এর আগে ১৯৫৪ সালের ২২ জুলাই থেকে ২ আগস্টের মধ্যে চারদিকে ভারতীয় ভূখণ্ডবেষ্টিত ছোট দুটি ছিটমহল দাদরা ও নগর হাভেলিতে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ঢুকে পড়লে দুটি স্থানের স্বল্পসংখ্যক পর্তুগিজ সেনা সদস্য আত্মসমর্পণ করে।
১৯৫৬ সালে পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও সালাজার গোয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য গণভোটের প্রস্তাব দিলে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৬১ সালের ১০ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেন, পর্তুগিজ শাসনে ভারতীয় সীমানায় গোয়ার উপস্থিতি অসম্ভব ব্যাপার। ১৮ ডিসেম্বর ভারত আকাশপথে আক্রমণ চালায়। প্রধানমন্ত্রী সালাজারকে পর্তুগাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুদ্ধ না করে গোয়া দমন ও দিউ ভারতের কাছে হস্তান্তরের পরামর্শ দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পর্তুগিজ ইন্ডিয়ার গভর্নর জেনারেল ম্যানুয়েল আন্তোনিও সিলভাকে নির্দেশ পাঠান— পর্তুগিজ সৈন্যরা হয় বিজয়ী হবে না-হয় মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু তিনি অর্থহীন লড়াইয়ের পক্ষে ছিলেন না, অযথা প্রাণহানি এড়াতে তিনি পরদিন আত্মসমর্পণ করেন। যুদ্ধবন্দি হিসেবে প্রায় সাড়ে চার হাজার সৈন্য আরো ছয় মাস তাদের ক্যাম্পে থাকার পর দেশে প্রত্যাবর্তন করে। আন্তোনিও সিলভার কোর্ট মার্শাল হয়, চাকরিচ্যুত করে তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তখনকার সরকারের পতন ঘটলে ম্যানুয়েল সিলভাকে আবার সেনাবাহিনীর চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি যখন গোয়া সফরে আসেন, সেখানকার পর্তুগিজ ভারতীয় নাগরিকরা তাকে আন্তরিক সংবর্ধনা জানায়। তিনি তখন আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত না নিলে হয়তো তাদের অনেকেই জীবিত থাকত না।
১৯৬১ সালের ১৯ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ৪৫১ বছরের পর্তুগিজ ইন্ডিয়া— গোয়া, দমন ও দিউতে পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটে।
প্রতিহিংসা, নৃশংসতা, জিঘাংসা, লুণ্ঠন ও বাণিজ্যের বিপুল মুনাফা সেকালের জলদস্যুর প্রায় সব চরিত্রই ভাস্কো দা গামা ধারণ করতেন। কালিকটের আরব সাগরীয় সৈকতে জাহাজের নোঙর ফেলে ভাস্কো দা গামার লোকজন স্থানীয় জেলেদের জাহাজে ডাকল, তাদের বাণিজ্যের অভিপ্রায়ের কথা বলল, ততক্ষণে ভারতীয় সামগ্রী তাদের জাহাজে আসতে শুরু করেছে। একজন পর্তুগিজ নাবিক জেলেদের সঙ্গে ডাঙায় গেল এবং একজন তিউনিসিয়ান মুসলমানের সঙ্গে আলাপ হলে তিনি কিছু উপহারসামগ্রী নিয়ে আগে কালিকটের শাসক, সেখানকার ভাষায় জামোরিনকে দিয়ে তার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করে ব্যবসায়ের অনুমতি নেয়ার পরামর্শ দিলেন। ভাস্কো দা গামার প্রতিনিধিরা সামান্য নিম্নমানের উপহার সঙ্গে নিয়ে যায়। কালিকটের সঙ্গে আরবদের ব্যবসায়ের ইতিহাস শত শত বছর আগের। পর্তুগিজদের ব্যবসায়ের অনুমতি না দিতে তারা জামোরিনকে অনুরোধ জানায়। তার পরও জামোরিন তাদের ব্যবসায়ের একটি অনুমোদনপত্র প্রদান করেন।
পর্তুগিজরা তাদের তুলে নেয়া মালপত্রের জন্য প্রদেয় শুল্ক ও দ্রব্যের দাম স্বর্ণমুদ্রায় দিতে সক্ষম না হওয়ায় জামোরিন অসন্তুষ্ট হন। কালিকটের কর্মকর্তারা ভাস্কো দা গামার প্রতিনিধিদের প্রদেয় স্বর্ণমুদ্রার জিম্মি হিসেবে আটকে রাখেন। এতে ভাস্কো দা গামা ক্ষুব্ধ হন এবং জাহাজে ফেরার সময় বলপূর্বক কয়েকজন স্থানীয় অধিবাসী ও ১৬ জন জেলেকে জাহাজে তুলে আনেন।
এ অভিযানেই ভাস্কো দা গামা ইউরোপকে ভারতের পথ চিনিয়ে দেন। প্রথম অভিযানে যা খরচ হয়, ভারত থেকে নেয়া পণ্যে তার ৬০ গুণ মুনাফা অর্জিত হয়।
পেদ্রো আলবারেস ক্যাব্রাল ১৩ সেপ্টেম্বর ১৫০০ ব্রাজিল হয়ে ভারতের কালিকটে এসে অবতরণ করেন। ততদিনে পর্তুগিজদের সম্পর্কে স্থানীয় লোকদের ধারণা অনেকটাই খারাপ হয়ে আসে। ক্যাব্রাল জামোরিনের সঙ্গে দরকষাকষি করে কালিকটে একটি কুঠি স্থাপন করেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই পর্তুগিজদের অনাচার ও অনৈতিক কাজে ক্ষুব্ধ জনগণ তাদের কুঠি আক্রমণ করে এবং ৫০ জনেরও বেশি পর্তুগিজ নাগরিককে হত্যা করে। পর্তুগিজদের হটানোর ব্যাপারে আরব বণিকদের প্ররোচনা ছিল।
ক্ষুব্ধ পেদ্রো ক্যাব্রাল আরব ব্যবসায়ীদের জাহাজ অবরোধ করে ছয়শর বেশি আরবীয় ও স্থানীয় নাবিককে হত্যা করেন। তাদের বাণিজ্য জাহাজের সব মালপত্র নিজেদের জাহাজে তুলে আরবদের জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেন। শুধু তা-ই নয়, সৈকত থেকে জামোরিনের প্রাসাদ তাক করে অনেকবার গোলাবর্ষণ করেন; থেকে থেকে শহরের ওপর সারা দিন কামানের গোলা নিক্ষেপের পর কালিকট শাসকের মনোবল ভেঙে পড়ে। ২৩ জুন ১৫০২ ক্যাব্রাল যখন পর্তুগাল ফিরে যান, তখন তার সঙ্গে কেবল চারটি জাহাজ। আরো নয়টি ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ ফেলে আসতে হয়েছে।
পর্তুগিজরা ১৫০২ সালে বিজয়নগরের শাসকের সমর্থন নিয়ে দুর্গ নির্মাণ করে। ৮০০ পর্তুগিজ ও ১৫টি জাহাজ নিয়ে ভাস্কো দা গামা ৩০ অক্টোবর ১৫০২ দ্বিতীয়বার কালিকট আসেন এবং ভয়ঙ্কর নির্মমভাবে আরবীয় বণিকদের হত্যা করেন। মালপত্র লুটে নিয়ে তাদের জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেন। তার বাহিনী কালিকট শহরে ব্যাপক গোলাবর্ষণ করে।
২২টি জাহাজ ও ১ হাজার ৫০০ পর্তুগিজ নাগরিক নিয়ে ফ্রান্সিসকো দে অ্যালমিদা ভাইসরয় অব ইন্ডিয়া পদবি নিয়ে ভারতে আসেন। তিনি একাধিক দুর্গ নির্মাণ করেন। একাধিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। পর্তুগিজরা কানপুরে প্রবেশে করে অ্যালমিদা কোচিনে বসবাস শুরু করে। পর্তুগিজরা দমন, বোম্বে, দিউ ও গোয়া নিজেদের সম্পূর্ণ অধিকারে নিয়ে নেয়। ১৬৬১ সালে বোম্বে ব্রিটিশদের অধিকারের আসে। পর্তুগিজরা দাদরা ও নগর হাভেলি দখল করে নেয়। কিছু সময়ের জন্য গোয়াও ব্রিটিশের দখলে আসে (১৭৯৯-১৮১৩)।
গোয়া, দমন, দিউ, দাদরা ও নগর হাভেলি পর্তুগাল রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত এবং তা পর্তুগিজ ইন্ডিয়া হিসেবে পরিচিত হয়। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরের আগে পর্তুগিজ ইন্ডিয়ায় ভারতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পর্তুগিজ অভিযাত্রী বা জলদস্যুরা তাদের জাহাজে পাদ্রি ও বাইবেল আনতে ভুল করেনি। সাম্রাজ্য বিস্তারে ধর্ম যে অন্যতম হাতিয়ার, পর্তুগিজরা তা বেশ অনুধাবন করেছিল। গোয়াভিত্তিক রোমান ক্যাথলিক ধর্ম বিস্তারের কেন্দ্র গড়ে ওঠে, যার ধর্ম প্রচারের সীমানায় একদিকে ছিল জাপান, অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা। পর্তুগিজ ইন্ডিয়ায় বহুসংখ্যক আকর্ষণীয় গির্জা নির্মাণ হয়েছে। ১৯৬১ পর্যন্ত পর্তুগাল সরকারের বাজেটে পর্তুগিজ ইন্ডিয়ার জন্য বিশেষ বরাদ্দ ধরা থাকত। পর্তুগিজ নাগরিক হিসেবে পর্তুগিজ ইন্ডিয়ার অধিবাসীদের ইউরোপে প্রবেশাধিকার সহজ ছিল।
পর্তুগিজ ইন্ডিয়ায় উপনিবেশবাদবিরোধী যে স্বাধীনতা আন্দোলন চলছিল, ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরের যুদ্ধে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর কাছে গোয়া, দমন ও দিউর আত্মসমর্পণের পর তা তলিয়ে যায়; বিশেষ করে পর্তুগিজ ইন্ডিয়ার খ্রিস্টান সম্প্রদায় ভারতের সঙ্গে সংযুক্তি মেনে নিতে পারেনি। সেই অসন্তোষ এখনো সমাহিত হয়নি।
একটি পাদটীকা
ঢাকার প্রাচীনতম চার্চ তেজগাঁয়ের মেরি রোজারি চার্চ পর্তুগিজদেরই নির্মাণ, ১৪৯৯ সালে। পর্তুগিজরা তাদের ভাষায় যেসব শব্দ বাংলা ভাষার জন্য রেখে গেছে, তা অবাক করা। বাংলায় আত্তীকৃত কিছু পর্তুগিজ শব্দ— আতা (ফল), ফর্মা, বাসন, টাংকি, কর্নেল, মাস্তুল, পেরেক, জুয়া, রশিদ, ইস্পাত, গুদাম, বোমা, গরাদ, বেহালা, বয়া, বয়াম, আনারস, পেঁপে, নিলাম, ফালতু, মিস্ত্রি, ইস্ত্রি, কার্তুজ, আলকাতরা, পেয়ারা, নোঙর, চুরুট, বারান্দা, পিরিচ, ফিতা, সাবান, সন্ত, বিধবা, যিশু, জাম্বুরা, খ্রিস্টান, তামাক, তোয়ালে, সালোয়ার, পিপা, ফিতা, পাদ্রি, কাজু, মর্মর, কামরা, কেদারা, চাবি, জানালা, আলমারি, বোতল, বালতি, গামলা, সায়া, কামিজ, গির্জা, আলপিন, বোতাম, কপি, পাউরুটি।
দুর্ভাগ্য ভাস্কো দা গামার স্বজনদের। ষোড়শ শতকের শুরুতে হুগলিকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করলেও তাদের দস্যুবৃত্তি, লুণ্ঠন প্রবণতা ও অত্যাচার একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণ ও বাংলায় কর্মরত মোগলদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। বিয়য়টি দিল্লিকে ভাবিয়ে তোলে। শাহজাহান দিল্লির মসনদে আসীন হওয়ার পর তারই নির্দেশে বাংলার সুবাদার ১৬৩২ সালে তার সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে পর্তুগিজদের হুগলি থেকে বিতাড়ন করেন। তারা পালিয়ে চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলে চলে যায় এবং মূলত দস্যুতা ও লুণ্ঠনের মুনাফায় জীবন ধারণ করতে থাকে। বাংলার সঙ্গে আরাকানি মগদের লড়াই চলাকালে পর্তুগিজরা বাংলাকে সামরিক সাহায্য দেয় এবং লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে মগদের পরাজিত করে। বিনিময়ে সুবেদার শায়েস্তা খান তাদের যে জমি বরাদ্দ করেন, তার ওপরই গড়ে উঠে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজার।
পর্তুগিজরা ঢাকায় কুঠি স্থাপন করলেও তাদের দস্যু-স্বভাবের কারণে স্থানীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি। একই সঙ্গে ইংরেজ ও ডাচ ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও তারা পেরে ওঠেনি। তবে জলদস্যু হিসেবে তাদের সাফল্য মুখে মুখে।





