এমিলি টেম্পল। অনুবাদ: শওকত হোসেন

এফএসজি সুসান সন্টাগের নতুন ছোটগল্প সংকলন ডিব্রিফিং বের করেছে। আরো বেশি করে সন্টাগের রচনা পড়তে সবসময়ই উদগ্রীব থাকি আমি— ২০০৪ সালে পরলোকগত সন্টাগের পাঠযোগ্য আরো বেশি রচনা আছে মনে হওয়ায় ব্যাপারটা সুবিধাজনকই বটে। লক্ষণীয়ভাবে দ্রুতপ্রজ লেখক ছিলেন তিনি, বিশেষত যদি তার দিনলিপির হিসাব নেন। আমার কাছে এগুলোকে পরমানন্দময় টেক্সট মনে হয়। পরমানন্দের কথা বলতে গেলে, সন্টাগ আবার বহু লেখকের কাছে পূজনীয়, কারণ অংশত লেখালেখি আর ভালো লেখা কেমন হওয়া উচিত, সে ব্যাপারে বহু পরামর্শ রয়েছে তার। ক্বচিৎ স্ববিরোধিতা সত্ত্বেও এর সবই সম্ভবত খাঁটি। তার নতুন বইটি উদযাপনের লক্ষ্যে সেগুলোরই কিছু সংগ্রহ করেছি আমি।

 

লেখকের কেমন হওয়া উচিত:

উন্মাদ, বিকারগ্রস্ত, নির্বোধ, স্টাইলিস্ট, সমালোচক

 

প্রথমটি রসদের জোগান দেয়; দ্বিতীয়টি তাকে বেরিয়ে আসতে দেয়; তৃতীয়টি হলো রুচি; চার নম্বরটি মেধা।

একজন মহান লেখকের চারটি বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। তবে স্রেফ প্রথম দুটি থাকলেই ভালো লেখক হতে পারেন আপনি; এগুলোই বেশি জরুরি। —রিবর্ন: জার্নালস অ্যান্ড নোটবুকস, ১৯৪৭-৬৩ থেকে

কিংবা আরো সহজভাবে:

বড় লেখক হতে হলে:

বিশেষণ সম্পর্কে সমস্ত কিছুই জানতে হবে এবং যতিচিহ্নের (ছন্দ) নৈতিক গুণ রয়েছে, যা লেখকের ভেতর সত্যিকারের কর্তৃত্ব সৃষ্টি করে। —অ্যাজ কনশাসনেস ইজ হার্নেসড টু ফ্লেশ: জার্নালস অ্যান্ড নোটবুকস, ১৯৬৪-৮০ থেকে

 

রোজকার জীবনে অনুপ্রেরণা লাভ সম্পর্কে:

কাজ করো। লেগে থাকো, কৌতূহলী হও। অনুপ্রেরণার তাগিদ বা কপালে সমাজের চুম্বনের অপেক্ষা না করা। —ভাসারে সন্টাগের ২০০৩ সালের কমেন্সমেন্ট স্পিচ

 

লেখকের নৈতিকতা সম্পর্কে:

আমি অবশ্যই উপন্যাস, গল্প ও নাটক রচয়িতাদের নৈতিকতার বাহক মনে করি... এটা কোনো প্রত্যক্ষ বা স্থূল অর্থে নৈতিক ব্যাখ্যার দাবি করে না। সিরিয়াস গল্পকাররা বাস্তব ক্ষেত্রে নৈতিক সমস্যা নিয়ে ভাবেন। গল্প বলেন তারা। বয়ান দেন। তারা হয়তো আমাদের কাছ থেকে বহু দূরে থাকেন, কিন্তু বয়ান মারফত আমাদের সাধারণ মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলেন, যার সঙ্গে আমরা একাত্ম হতে পারি। আমাদের কল্পনাকে তারা উসকে দেন। তাদের বলা বিভিন্ন গল্প আমাদের সহানুভূতিকে প্রসারিত ও জটিল করে তোলার ভেতর দিয়ে উন্নত করে। সেগুলো আমাদের নৈতিক বিবেচনা বোধের ক্ষমতাকে প্রশিক্ষিত করে। —সন্টাগের ‘অ্যাট দ্য সেম টাইম: দ্য নোভেলিস্ট অ্যান্ড মরাল রিজনিং’ থেকে

 

সমসাময়িক কথাকাহিনীতে জায়গা করে নেয়া প্রসঙ্গে:

আমি সমসাময়িক গদ্যের একঘেয়ে বিষণ্নতার বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত হওয়ায় খুশি। আমি বিচ্ছিন্নতা প্রকাশে ইচ্ছুক নই। আমি তেমনটা ভাবি না। আমি বিভিন্ন ধরনের আবেগময় সম্পর্কে আগ্রহী। আমার সব লেখা বলছে সিরিয়াস হও, আবেগি হও, জেগে ওঠো। —লেসলি গ্যারিসকে দেয়া ১৯৯২ সালের এক সাক্ষাত্কার থেকে

 

অহম সম্পর্কে:

আমার ‘আমি’ ক্ষুদ্র ও দুর্বল, সতর্ক, বেশি মাত্রায় প্রকৃতিস্থ। ভালো লেখকরা এমনকি জড়ত্ববোধের পর্যায় পর্যন্ত শোরগোল তোলা অহমবাদী। প্রকৃতিস্থ সমালোচক আমি তাদের শুধরে দিই, কিন্তু তাদের সুস্থতা প্রতিভার সৃষ্টিক্ষমতার ক্ষেত্রে পরজীবীসুলভ। —রিবর্ন: জার্নাল অ্যান্ড নোটবুকস, ১৯৪৭-৬৩ থেকে

 

দুই ধরনের লেখকের ভেতর কে কেমন হতে পারে:

একজন হয় বহিরাগত (হোমার, তলস্তয়) কিংবা অভ্যন্তরীণ (কাফকা) লেখক হতে পারেন। জগৎ কিংবা উন্মত্ততা। হোমার + তলস্তয় আলঙ্কারিক পেইন্টিংয়ের মতো জগেক বিবেচনার অতীত নিগূঢ় উদরতার সঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিংবা কারো উন্মত্ততাকে উসকে দেন। প্রথমটি অনেক বেশি মহান। আমি কেবল দ্বিতীয় কাতারের লেখকই হব। —রিবর্ন: জার্নালস অ্যান্ড নোটবুকস, ১৯৪৭-৬৩ থেকে

 

মনোযোগ সম্পর্কে:&dquote;&dquote;

মনোযোগী হোন। গোটা ব্যাপারটাই মনোযোগ সম্পর্কিত। সাধ্যমতো গ্রহণের ব্যাপার এটা; আপনার কিছু দায়দায়িত্বের অচিরেই আপনার জীবনকে সংকীর্ণ করে ফেলা অজুহাত ও বিষণ্নতাকে সুযোগ দেয়া নয়। মনোযোগই সজীবতা। আপনাকে এটা অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। আপনাকে ব্যাকুল করে। উদগ্রীব রাখে। —সন্টাগের ২০০৩ সালের ভাসারের কসন্সমেন্টট স্পিচ থেকে

 

নিজের লেখালেখির সূচনা সম্পর্কে:

পড়াশোনা— কী লিখছি বা লেখার আশা করছি, তার সঙ্গে খুব কমই সম্পর্ক থাকে তার। আমি শিল্পকলার ইতিহাস, স্থাপত্যের ইতিহাস, সংগীতবিদ্যা, নানা বিষয়ে প্রচুর একাডেমিক বইপত্র পড়ি এবং কবিতা। পড়াশোনা ও গান শোনার ভেতর দিয়ে অংশত বিরত থাকাই লেখার সূচনা। এটা আমাকে শক্তি জোগায় এবং অস্থির করে তোলে। লিখছি না বলে অপরাধী বোধ জাগায়। —দ্য প্যারিস রিভিউর সঙ্গে সাক্ষাত্কার থেকে

 

কী ধরনের বইপত্র পড়া উচিত:

যা পড়ছি তার সম্পর্কে ভাবতে হয় আমাকে। তার ছোঁয়া পেতে হয়। বুদ্ধিবৃত্তিতে যোগ করবে না, এমন কোনো বই নিয়ে মাথা ঘামাই না এবং জাঁকালো গদ্যশৈলীর প্রতি আমি দুর্বল। আরো সহজ করে বলতে গেলে, আমার পক্ষে আদর্শ গদ্য হচ্ছে কবির গদ্য; আমি যেসব লেখকের লেখা পছন্দ করি, তাদের অনেকেই তরুণ বয়সে কবি ছিলেন বা কবি হতে পারতেন। এখানে তাত্ত্বিক কিছু নেই। আসলে আমার রুচিবোধ অদম্যভাবে ক্যাথলিক। দ্রেইসারের জেনি গারহার্টড ও দিসিনের ডেমোক্রেসি, গ্লেনওয়ে ওয়েসকটের দ্য পিলগ্রিম হক ও ডোনাল্ড বার্থেলমের দ্য ডেড ফাদারে দাগ টানা থেকে ঠেকানো আমলে নেয়া উচিত হবে না আমার। —দ্য প্যারিস রিভিউর সঙ্গে সাক্ষাত্কার থেকে

 

আত্মপ্রকাশ (বা অপ্রকাশ) সম্পর্কিত লেখালেখি নিয়ে:

লেখালেখি এক রহস্যময় কাজ। এজন্য পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ভীষণ সতর্কতা ও সচেতনতা আর বিপুল আনাড়িপনা ও মূর্খতার ভেতর থাকতে হয়। এটা হয়তো বা সব ধরনের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রেই খাটে, তবে লেখালেখির বেলায় ঢের বেশি সত্যি, কারণ চিত্রশিল্পী বা সংগীতকারের বিপরীতে লেখক এমন এক মাধ্যমে কাজ করেন, যা কিনা কারো সারা জীবন কাজে আসে। কাফকা বলেছেন, ‘কথোপকথন আমার সমস্ত চিন্তা থেকে গুরুত্ব, গাম্ভীর্য ও সত্যি ছিনতাই করে।’ আমার ধারণা, বেশির ভাগ লেখকই কথোপকথন সম্পর্কে সন্দিহান, মামুলি ভাষার ব্যবহারে যেটা ঘটে থাকে। লোকে বিভিন্নভাবে এর মোকাবেলা করে। কেউ আদৌ কথা বলে না। অন্যরা লুকোচুরি ও স্বীকারোক্তি নিয়ে খেলে, আমার মতো, সন্দেহ নেই, আপনার সঙ্গে খেলছি। কারো পক্ষে খুব বেশি প্রকাশ করার জো নেই। কারণ প্রতিটি আত্মপ্রকাশে এক ধরনের আত্মগোপনের ব্যাপার থাকতে বাধ্য। লেখালেখির প্রতি জীবনব্যাপী অঙ্গীকারের এসব বেমানান চাহিদার ভেতর ভারসাম্য রাখা দরকার রয়েছে। তবে আমি মনে করি, আত্মপ্রকাশ হিসেবে লেখালেখির আদর্শ বড় বেশি কাঁচা। লেখার সময় নিজেকে প্রকাশ করছি মনে হলে টাইপরাইটার ছুড়ে ফেলে দেব। একসঙ্গে থাকার মতো থাকবে না সেটা। লেখালেখি তার চেয়ে ঢের বেশি জটিল কাজ। —জিওফ্রি মোভিয়াসের সঙ্গে সাক্ষাত্কার থেকে

 

ভালো লেখকদের করণীয় সম্পর্কে:

প্রায়ই আমাকে প্রশ্ন করা হয়, লেখকদের কর্তব্য হওয়া উচিত এমন কিছু আমি ভাবি কিনা। সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে নিজেকে বলতে শুনেছি: ‘বেশ কিছু জিনিস। শব্দকে ভালোবাসা, বাক্য নিয়ে যোঝা এবং দুনিয়াদারির দিকে নজর দেয়া।’

বলা বাহুল্য, আমার মুখ থেকে এ জোরালো কথা বেরোনোর পর পরই লেখকদের গুণাগুণ সম্পর্কে আরো কিছু রেসিপি মনে এসেছিল আমার।

উদাহরণস্বরূপ: ‘সিরিয়াস হতে হবে।’ এ কথা দিয়ে আমি বুঝিয়েছি: সিনিক্যাল হওয়া চলবে না এবং এটা হাস্যকর হওয়ার পথে বাধা হতে পারবে না।

এবং আমাকে আরো যোগ করার সুযোগ দেয়া হলে ‘এমন একটা সময়ে জন্ম নেয়ার ব্যবস্থা রাখেন, যাতে স্পষ্টভাবে মহৎ এবং দস্তয়ভস্কি, তলস্তয়, তুর্গেনিভ ও চেকভে প্রভাবিত হতে পারবেন। —সন্টাগের ‘অ্যাট দ্য সেম টাইম: দ্য নোভেলিস্ট অ্যান্ড মরাল রিজনিং’ থেকে

 &dquote;&dquote;

দুনিয়ার সঙ্গে লেখকদের আচরণ সম্পর্কে:

প্রশ্ন তৈরি ও চলমান ধার্মিকতার প্রতিবিবৃতি নির্মাণ সাহিত্যের অন্যতম দায়িত্ব। এমনকি শিল্পকলাবিরোধী পক্ষের না হলেও শিল্পকর্ম বৈপরিত্যের দিকেই ঝুঁকে পড়তে চায়। সাহিত্য হচ্ছে সংলাপ; সাড়া দেয়ার বিষয়। সাহিত্য বিভিন্ন সংস্কৃতি বিকশিত হওয়ার সময় পারস্পরিক লেনদেনের সময় সজীব ও মুমূর্ষুর প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়ার ইতিহাস।

লেখকরা আমাদের বিচ্ছিন্নতার, আমাদের ভিন্নতার কিছু ক্লীশে বিষয়ের মোকাবেলা করতে পারেন। কারণ লেখকরা নির্মাতা, স্রেফ কিংবদন্তির হস্তান্তরকারী নন। সাহিত্য কেবল কিংবদন্তি নয়, বরং পাল্টা কিংবদন্তিও জুগিয়ে থাকে, ঠিক যেমন জীবন প্রতি-অভিজ্ঞতার জোগান দিয়ে থাকে, যে অভিজ্ঞতা আপনার চিন্তা, বোধ বা বিশ্বাসকে তালগোল পাকিয়ে দেয়।

আমার মনে হয়, একজন লেখক জগৎ সংসারের প্রতি মনোযোগী কেউ। তার মানে মানুষের নষ্টামি আওতাকে উপলব্ধি, আত্মস্থ, সংযোগ তৈরির প্রয়াসী। কিন্তু এ উপলব্ধির কারণে কলুষিত-ছিদ্রান্বেষী, উপরিগত না হওয়া। —২০০৩ সালে জার্মান বুক ট্রেডের শান্তি পুরস্কার-পরবর্তী সন্টাগের ভাষণ থেকে

 

নিজ সম্পর্কে লেখালেখি প্রসঙ্গে:

মূলত আমার নিজের সম্পর্কে লেখাকে যা লিখতে চাই তারই পরোক্ষ উপায় মনে হয়। লেখক হিসেবে আমার বিবর্তন ‘আমাকে’ নিয়ে ঢের বেশি স্বাধীনতা ও একান্ত অভিজ্ঞতার ব্যবহারমুখী ছিল যদিও, আমার রুচি, আমার পছন্দ আর দুর্ভাগ্যের বিশেষ কোনো দৃষ্টান্তমূলক বৈশিষ্ট্য আছে বলে কখনই বিশ্বাস করিনি। আমার জীবনই আমার পুঁজি, আমার কল্পনার পুঁজি। আমি উপনিবেশ গড়তে পছন্দ করি। —জিওফ্রি মোভিয়াসের সঙ্গে সাক্ষাত্কার থেকে

 

নিষ্কৃতি হিসেবে শিল্পকর্ম:

আমার চোখে সাহিত্য একটা আহ্বান, এক ধরনের নিষ্কৃতিও বটে। আমাকে এটা দুই হাজারেরও বেশি বছরের প্রাচীন এক উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। অতীত থেকে কী পেয়েছি আমরা? শিল্পকলা ও চিন্তা। এটাই টিকে আছে। এটাই মানুষকে রসদ জোগাচ্ছে এবং আরো ভালো কিছুর ধারণা দিচ্ছে। কারো অনুভূতির উন্নত অবস্থা কিংবা স্রেফ কারো সত্তায় নীরবতার ধারণা ভাবতে বা বোধ করার সুযোগ দেয়া স্রেফ ধারণা। আমার কাছে দুটোই সমান। —লেসলি গ্যারিসের সঙ্গে সাক্ষাত্কার থেকে

 

আরো ভালো লেখক হওয়া সম্পর্কে:

এটা পাগলামি... আপনাকে আচ্ছন্ন হতে হবে। লোকে সবসময় ‘আরো ভালো লেখক হতে চাইলে কী করা উচিত?’ প্রসঙ্গ নিয়ে আমার কাছে লিখছে বা যোগাযোগ করছে। আমি বলি, আদৌ কি লেখক হতে চান? ব্যাপারটা কিন্তু আপনার হতে চাওয়ার মতো কিছু নয়, বরং না হয়ে উপায় নেই, এমন কিছু। তবে আপনাকে আচ্ছন্ন হতে হবে।

নইলে অবশ্যই ছবি আঁকা কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর মতো লেখালেখি পুরোপুরি ঠিক আছে। লোকে তা করবে না কেন? কেবল লেখকরাই লিখতে পারেন, আমি এটা অস্বীকার করি। লোকে কেন এটাকে শিল্পকর্মের মতো করে নিতে পারবে না?... কিন্তু আপনার জীবনকে সত্যিকার অর্থে লেখক করে তুলতে হলে অবশ্যই এটা এক ধরনের আত্মদাসত্ব। আপনি একাধারে দাস ও মনিব এবং এটা খুবই কঠিন বিষয়।

—১৯৯২ সালে ৯২ স্ট্রিট ওয়াইতে দেয়া ভাষণ থেকে