মূল গল্পটি পাশ্চাত্যের হলেও চোরাচালান করে সাফল্যের সঙ্গে বাংলায় বাজারজাত করেছেন ডক্টর সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি হাতুড়ে ডক্টর নন, রীতিমতো মেহনত করে ১৯৩২ সালে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘দি অরিজিন অব খোজাস অ্যান্ড দেয়ার রিলিজিয়াস লাইফ টুডে’ নামের একটি অভিসন্দর্ভ লিখে এবং তা ‘ডিফেন্ড’ করে পিএইচডি ডিগ্রি পেয়েছেন। তারও চার বছর আগে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯২৮ সালে ফ্রান্সের প্যারিস নগরীতে অবস্থিত সরোবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চর্যাপদ বিষয়ের গবেষণায় পিএইচডি হয়েছেন। তিনি প্রথম বাঙালি মুসলমান পিএইচডি।
মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কাছে চিকিৎসা নিতে এসে পুরান ঢাকার রোগীরা বুঝতে পেরেছে, তার বিদ্যা বেড়েছে বটে, কিন্তু তিনি বিদেশ থেকে ফেরার সময় স্টেথোস্কোপ আনেননি।
সৈয়দ মুজতবা আলী পিএইচডিকে একেবারে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছেন। গল্পটা এ রকম:
অশ্বারোহী এক ব্যক্তি টগবগ ঘোড়া ছুটিয়ে যাওয়ার সময় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড দেখলেন। সাইনবোর্ডে এটাও লেখা আছে যে, এখানে পিএইচডি দেয়া হয়। অশ্বারোহী যথাস্থানে এলেন এবং জানলেন যে, ১০০ ডলার জমা দিয়ে পিএইচডি প্রসেসড হওয়ার জন্য আধঘণ্টা অপেক্ষা করলে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী হতে পারবেন। তিনি ১০০ ডলার জমা দিলেন এবং আধঘণ্টা পর পিএইচডি ডিগ্রি পেয়ে গেলেন।
সানন্দে ফেরার পথে তার মনে হলো, আর ১০০ ডলার খরচ করলে তিনি ঘোড়াটার জন্যও একটা পিএইচডি নিতে পারতেন। তিনি ফিরে গিয়ে ঘোড়ার নামে যখন টাকা জমা দিতে যাচ্ছেন, জানতে পারলেন এ বিশ্ববিদ্যালয় অশ্বদের পিএইচডি দেয় না; গর্দভদেরই দেয়।
মেহনতি পিএইচডি
২৫ বছর আগে বিলেতের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে নাম লিখিয়ে মাঝপথে এসে সৈয়দ মুজতবা আলীকে মনে পড়ায় ভেবেছিলাম ফিরে যাই, বরং ঘোড়া কিংবা অশ্ব হয়েই থাকি। যখন বোধোদয় হয় যে, সৈয়দ সাহেব নিজে কিন্তু কনভোকেশনে মাথা নুইয়ে ক্যাপ পরেছেন (গাধার টুপি নয় তো?), আমিও কেন তাকে অনুসরণ করব না? সুতরাং অশ্ব-স্বীকৃতি আমিও পাইনি।
নতুন সহস্রাব্দ আরো ভয়ঙ্কর বিব্রতকর অবস্থায় ফেলল ডক্টরেটদের। বেশি বিব্রতকর হলো পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডিদের। ৫ অক্টোবর, ২০০০ সালে উদ্বোধন হলো পেনসিলভানিয়া অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের। ঠিকানা প্রকাশিত হলো বাংলাদেশের অন্তত এক ডজন দৈনিকসহ পৃথিবীর সব দেশের গণমাধ্যমে:
www.petsylvaniauniversity.com
বেজি থেকে শুরু করে ছাগলছানা পর্যন্ত আপনার পোষা যেকোনো যোগ্য জন্তুর জন্য উচ্চতর ডিগ্রি-পিএইচডি আনিয়ে নিতে পারেন। জন্তুটির ছবি ও কর্মকাণ্ডের বিবরণ উপরের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত ফর্মে দাখিল করতে হবে, দুজন রেফারির সুপারিশপত্রও সঙ্গে থাকতে হবে। একাডেমিক কাউন্সিল আবেদন বাছাই ও বিবেচনা করবে। তারপর পিএইচডি দেবে। এখানেও ১০০ ডলার আন্তর্জাতিক যেকোনো প্লাস্টিক কার্ডে প্রদান করা যাবে। টাকাটা আবেদনের সঙ্গেই পৌঁছতে হয়।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাছে মার খেয়ে যায়, এ আশঙ্কায় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও দেদার পিএইচডি দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে কোনটা কোন ধরনের পিএইচডি, কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছে, এসব নিয়ে কথা বলে নিজেদের অবস্থান দুর্বল করতে চাই না। তবে অধ্যাপক ও ডক্টর আইনুন নিশাত পিএইচডির কয়েকটি ধরন তুলে ধরেছিলেন, স্মৃতি থেকে কয়েকটি ধরনের নাম কেবল বলছি: গায়ে গতরে খেটে যে পিএইচডি, তার নাম মেহনতি পিএইচডি। গাধাকেও যথেষ্ট মেহনত করতে হয় বলেই মানুষ ও গাধার পিএইচডি হচ্ছে মেহনতি। থিসিস লেখার ঝামেলা নেই ভিভিআইপি কাতারের মানুষরা পিএইচডি পেয়ে থাকেন, এর নাম মারফতি পিএইচডি। এ ধরনের তেজারতি পিএইচডি, খয়রাতি পিএইচডি, কেরামতি পিএইচডি, শরিয়তি, বেশরিয়তি— এ রকম আরো কিছু পিএইচডি থাকার কথা। কার কোনটা পছন্দ, সেটাই দেখার বিষয়।
ভাইস চ্যান্সেলরের পিএইচডি
পাকিস্তানের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী নারী প্রগতির উল্লেখযোগ্য আইকন ডক্টর মারিয়া সুলতান অনেকদিন ধরে বলে আসছেন পাকিস্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের কথা। আল্লামা ইকবাল মাপের মেধাবী কেউ পাকিস্তানে না থাকায় তিনি আক্ষেপ করেছেন। ডক্টর মারিয়া সুলতান পাকিস্তানের সাউথ এশিয়া স্ট্র্যাটেজিক স্ট্যাবিলিটি ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং মুসলিম ইয়োথ ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর। সমাজবিজ্ঞানী ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হিসেবে তিনি নিয়মিত টকশোতে হাজির থাকেন। কায়েদে আজম ইউনিভার্সিটির প্রতিরক্ষা কৌশল বিভাগের বোর্ড সদস্য হিসেবে তাকে মনোনয়ন দেয়া হলে বিভাগীয় প্রধান ডক্টর রিফাত হোসেইনের কাছে তার পিএইচডির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন আসতে শুরু করে। মারিয়া সুলতান জানিয়েছেন, তিনি ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি।
ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা হলে তারা জানিয়ে দেয়, এ নামের কেউ ব্র্যাডফোর্ড থেকে পিএইচডি ডিগ্রি পাননি। একসময় তিনি লন্ডনের সারে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন বলে জানিয়েছিলেন, পরে থুকুক দিয়ে ব্র্যাডফোর্ডে আসেন। উইকিপিডিয়ায় এমনকি মারিয়া সুলতানের পিএইচডি থিসিসের শিরোনামও উল্লেখ করা হয়েছে— “পাকিস্তান’স নিউক্লিয়ার আর্মস পলিসি প্রসেস।”
মারিয়া সুলতান যে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য, সেটির মালিকানা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওয়াকাস আকরাম শেখের পরিবারের। আর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব সায়িদ মেহদি। এটাও মিথ্যে নয়, মারিয়া সুলতানের উদ্যোগেই বিশ্ববিদ্যালয়টি দাঁড়িয়েছে।
এখন তাহলে কী করা?
পাকিস্তানের সিনেটর ডক্টর বাবর আওয়ানের পিএইচডিও ভুয়া প্রমাণিত। তাতে কী হয়েছে, তিনি নামের সঙ্গে ডক্টর ব্যবহার বন্ধ করেননি; বরং তার রাজনৈতিক সমর্থকদের বোঝাতে সমর্থ হয়েছেন যে, এটা তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।
পাঞ্জাব উচ্চশিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ডক্টর নিজামুদ্দিনের পিএইচডি নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি, কিন্তু গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালে তিনি পিএইচডি সরবরাহ দুর্নীতির নাটের গুরু ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ডক্টর পারভেজ হুদবয় তার পিএইচডির ছাত্রদের পাস করিয়ে আনতে রেফারিদের জাল সুপারিশ প্রণয়নের সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন।
তিন সপ্তাহে পিএইচডি!
ধর্মমন্ত্রীকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী হতে হবে— এমন বাধ্যবাধকতা পৃথিবীর কোনো দেশেই নেই। কোনো মন্ত্রীর বেলাতেই নেই। তাহলে ডিগ্রির জন্য মন্ত্রী এত উতলা কেন? তিনি ডিগ্রির ভার দিয়ে কাকে মোহিত করতে চান? সচিবদের বোঝাতে চান, আমি তোমাদের চেয়ে কম কিসে; পেশাজীবীদের বলতে চান, হাইকোর্ট দেখাবে না— আমিও জানি; মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের বলতে চান তিনি বিদ্যার জাহাজ; স্ত্রী ও স্বজনদের বোঝাতে চান পড়াশোনা করেছি বলেই এতদূর এসেছি; শ্যালিকা কিংবা পর্দার আড়ালের একজন নারীকে বলতে চান, তার তুলনীয় মেধাবী আর কেউ নেই, তিন সপ্তাহেই মহাকামেল।
তিনি পাকিস্তানের ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আমির লিয়াকত হোসেন। তিনি পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে জোটে এমকিউএম দলের টিকিটে এমপি হয়েছেন, পরে প্রতিমন্ত্রী।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি বিএ পাসও ছিলেন না। কিন্তু ব্যাকডেটে তিনি স্পেনের ট্রিনিটি কলেজ অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ১৭ মাচর্, ১৯৯৫ ‘ব্যাচেলর অব আর্টস ইন ইসলামী স্টাডিজ’ ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৫ মার্চ, ২০০২ অর্জন করেছেন ‘মাস্টার অব আর্টস ইন ইসলামিক স্টাডিজ’। আর পুরো পাকিস্তানসহ বিশ্বের শিক্ষাঙ্গনকে হতবাক করে দিয়ে ৫ এপ্রিল, ২০০২ সালে তিনি ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ থেকে ‘ডক্টর অব ফিলসফি ইন ইসলামিক স্টাডিজ’।
সংবাদপত্রে খবর বের হয়, যদি প্রতিমন্ত্রী আমীর লিয়াকতের পিএইচডিকে বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, তিনি তিন সপ্তাহে পিএইচডি অর্জন করেছেন। দ্রুততম সময়ে পিএইচডি লাভের কৃতিত্বের জন্য তার নাম গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ঠাঁই পাওয়ার কথা।
সাধারণ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার মাত্র কয়েক দিন আগে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আকিল বার্নি আমির লিয়াকতের সার্টিফিকেট ‘অথেনটিকেট’ অর্থাৎ নিশ্চায়ন করেছেন।
জেনারেল পারভেজ মোশাররফ চাইছিলেন ডক্টর আমির লিয়াকত হোসেনকে এমকিউএম প্রধান আলতাফ হোসেনের স্থলাভিষিক্ত করতে। পিএইচডি না থাকলে বরং কাজটা সহজ হতো, ডক্টর (!) আমির লিয়াকত যথেষ্ট টাকা-পয়সা খরচ করে উচ্চতর ডিগ্রিধারী হয়ে পারভেজ মোশাররফকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিলেন।
বিশ্বাসই করতে পারি না, আমি পিএইচডি নই!
ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ সরকারে মন্ত্রীবদল একটু বেশিই হয়েছে। অধ্যাপক ডক্টর কোর্দান তেলমন্ত্রী। আরো গুরুত্বপূর্ণ সব পদে তিনি আসীন ছিলেন। ঘটনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অক্সফোর্ডের পিএইচডি বলে কথা। বড় পদ তো পাবেনই।
ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য ইব্রাহিম নেকুনাম সংসদেই প্রশ্ন তুলেছেন, কোর্দানের মতো মানুষের কাছে রাষ্ট্র ও জনগণ নিরাপদ কিনা?
কোর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের অধ্যাপক ছিলেন। ইব্রাহিম নেকুনাম জানিয়েছেন, মন্ত্রী যে আইন বিষয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি— এ তথ্য সঠিক নয়। অক্সফোর্ড কেন, তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েরই পিএইচডি নন। আরো আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, তিনি মাস্টার ডিগ্রিধারী নন এবং এমনকি তিনি স্নাতকও নন।
তিনি প্রতিবাদ জানালেন। বললেন, এটি ইসরায়েলের প্রচারণা চক্রান্ত, তার দুশমনরা ইরানের বাইরের কোনো রেডিও সেন্টার থেকে অপপ্রচার চালিয়ে তাকে কলুষিত করার চেষ্টা করছে।
কোর্দান এক পর্যায়ে বললেন, তিনি তার প্রতিনিধিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন তার সার্টিফিকেটের যথার্থতা যাচাই করতে। তার প্রতিনিধি ফিরে এসে তাকে জানান, অক্সফোর্ড বলেছে এটি ভুয়া সার্টিফিকেট।
তিনি বললেন, আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না, আমি পিএইচডি নই।
তিনি বলেন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কথিত এক প্রতিনিধির মাধ্যমে তিনি অক্সফোর্ডের পিএইচডি অর্জন করেছেন। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় তার সার্টিফিকেট ‘অথেনটিকেট’ করেনি, তিনি বুঝতে পারলেন যে, প্রতারিত হয়েছেন।
এবার বিবৃতি দিয়ে তিনি বললেন, অক্সফোর্ডের সেই প্রতিনিধিকে এখন খুঁজে বের করতে হবে। তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দিতে হবে।
অন্য একজন সংসদ সদস্য বললেন, মন্ত্রী এখনো মিথ্যে চালিয়ে যাচ্ছেন।
মন্ত্রী তার ডিগ্রি ও সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য এমনকি অক্সেফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। এমপি ও মন্ত্রীদের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব, অধ্যাপকদের পক্ষেও।
নাইজেরিয়া যথেষ্ট দুর্নীতিপরায়ণ দেশ, সন্দেহ নেই। তবুও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কমিশন অব নাইজেরিয়া নিশ্চিত করেছে, সিমেটর ফস্টার ও গোলার পিএইচডি সার্টিফিকেট ইনভ্যালিড— আকার্যকর। ভুয়া বলেনি, কারণ তা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। তবে তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেছেন— জিএমএফ ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটি— সেটি অননুমোদিত এবং কমিশন সেই প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি ২০১২ সালে পিএইচডি লাভ করেছেন কিন্তু কোথাও তার থিসিসের দেখা মিলছে না। সিমেটর তবুও বলছেন, এটি দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণা। সব ডক্টরেটধারীরই থিসিস থাকে নাকি?
মন্ত্রী বেশি টাকা দিয়ে ডক্টরেট কিনতে রাজি হননি— এমন নজিরও আছে। (টাকা কম হলে কি কিনতেন?) কর্ণাটকের সাবেক আইনমন্ত্রী সুরেশ কুমার নিজেই বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। ভিক্টোরিয়া গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি পৌনে দুই লাখ রুপির বিনিময়ে তাকে ডক্টরেট দিতে চেয়েছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত তা নেননি।
ফার্স্ট লেডির পিএইচডি
ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবের সঙ্গে তার অপেক্ষাকৃত কম বয়সী স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান ৪১ বছর। স্ত্রীর নাম গ্রেস। একসময় গ্রেস তার দপ্তরেই চাকরি করতেন, দুজনের সম্পর্ক তখনই গড়ে উঠেছে। গ্রেস প্রেসিডেন্ট মুগাবের মিসট্রেস, এটা প্রায় সবাই জানতেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মুগাবে তাকে বিয়ে করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত তিনি জিম্বাবুয়ের ফার্স্ট লেডি। বিপুল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। মুগাবের পর তিনিই ক্ষমতাসীন হচ্ছেন, এ প্রচারণা ছিল। গ্রেস মুগাবের অমিতাচার মুগাবের পতন ও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের অন্যতম কারণ।
ফার্স্ট লেডির পিএইচডি চাই।
জিম্বাবে ইউনিভার্সিটি তাকে পিএইচডি দিতে এগিয়ে এল। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর প্রেসিডেন্ট বরার্ট মুগাবে নিজেই। সুতরাং স্ত্রীর মাথায় পিএইচডির টুপি পরিয়ে দিলেন। সমালোচকরা বললেন, তাকে পড়তে দেখলাম না, গবেষণা করছেন, এমনও শুনলাম না। তার থিসিস কী, তাও জানলাম না, পিএইচডি কি আকাশ থেকে পড়ল নাকি?
বিশ্ববিদ্যালয় বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে (এমনও হতে পারে কাউকে দিয়ে লিখিয়ে) গ্রেস মুগাবের নামে ২২৬ পৃষ্ঠার ডিসার্টেশন ‘দ্য চেঞ্জিং সোস্যাল স্ট্রাকচার অ্যান্ড দ্য ফাংশন অব দ্য ফ্যামিলি’ ওয়েবসাইটে দিয়ে দিল। মুগাবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০১৮-এর ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার হলেন জিম্বাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর লেভি নিয়াগুরা। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে গ্রেসকে পিএইচডি দেয়ার অভিযোগ বেশ ফেনিয়ে উঠছে।
হারারের ম্যাজিস্ট্রেট ৭২ বছর বয়সী ভাইস চ্যান্সেলরের জামিন নামঞ্জুর করে বলেছেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট কিংবা কোনো বোর্ডের সুপারিশ ছাড়া এককভাবে তাকে পিএইচডি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিয়াগুরা পরীক্ষককে নিয়ে ফার্স্ট লেডির একটি এতিমখানায় যান এবং সেখানে তাকে থিসিস ডিফেন্ড করতে বলেন। তিনি ডিফেন্ড করেন এবং সাফল্যের সঙ্গে ডক্টরেট অর্জন করেন। কিন্তু মানুষ যে সহজে ছাড়ার নয়, তিনি কেন পিএইচডি হলেন, তার বিচার দাবি করছে।
ডক্টর কনস্ট্যান্টিনোস বেরহ এক্সপোজড
ডক্টর কনস্ট্যান্টিনোস বেরহ আদ্দিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসি বিভাগের নামকরা প্রফেসর। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। তিনি অনেকেরই পিএইচডি সুপারভাইজার ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছাড়াও বেশ কয়েকটি এনজিওর বোর্ড সদস্য। নিজে দু-একটির প্রেসিডেন্টও। দেশ-বিদেশের বড় বড় ব্যবসায়ী ও সেলিব্রেটির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে তিনিই প্রধান বক্তা। ২০১১ থেকে ২০১৩ মেয়াদে তিনি ‘আফ্রিকান ইউনিয়ন অ্যাডভাইজরি বোর্ড অন করাপশন’-এ ইথিওপিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
কিন্তু ১৯৭৫ সালে অক্সফোর্ড থেকে এমএ করেছেন এবং ১৯৯৯ সালে ‘রিসোর্স ইকোনমিকস’ বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন।
কিন্তু সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে, অধ্যাপকের এ বিদ্যের বহরটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে তিনি নিউমেক্সিকোর সেঞ্চুরি ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ও পিএইচডি করেছেন বললে ভুল হবে, তিনি ৪ হাজার ডলারের বিনিময়ে ছয় সপ্তাহের মধ্যে দুটো ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি যে মেধাবী, সেটা প্রমাণ করার জন্য সেঞ্চুরি ইউনিভার্সিটি তাকে ১৫ হাজার ২২৫ ডলারের একটি বৃত্তিও প্রদান করে। এ ভুয়া পত্রটি তার জ্ঞাতসারেই তাকে দেয়া হয়। তিনি ধরা পড়েন। জীবনের শেষ প্রহরে ধরা পড়ে বলছেন, তিনি আসলেই সেঞ্চুরি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি। সম্ভবত তার লেডি সেক্রেটারি ভুলে তার বায়োডাটায় অক্সফোর্ড আর ক্যালিফোর্নিয়ার কথা লিখেছেন।
জেনুইন পিএইচডি ফেইক থিসিস!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যথাযথভাবেই থিসিস জমা দিয়েছেন। যথাযথভাবে থিসিস ডিফেন্ড করে পিএইচডি ডিগ্রিও পেয়েছেন। সমস্যাটা দাঁড়াল পদোন্নতির সময় পদোন্নতিপ্রত্যাশী আরো কয়েকজন শিক্ষক জোরদার অভিযোগ করে বসলেন, তার থিসিসে ভেজাল আছে, জালিয়াতি আছে, নকল আছে ইত্যাদি। অভিযোগকারীরা শক্তিশালী হওয়ায় অভিযোগ কর্তৃপক্ষের আমলে নিতেই হয়েছে। আরো শক্তিশালী একটি বোর্ড থিসিস পরীক্ষা করেছে এবং অনেক অভিযোগ তাদের কাছে যথার্থ মনে হয়েছে। থিসিসটির নাম সম্ভবত মার্ক্সবাদ চর্চা ও আধুনিক বিশ্বে তার প্রভাব। গবেষক-শিক্ষক ১৩ লাখ রেসপন্ডেন্টের সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এবং তা বিশ্লেষণ করে থিসিস প্রতিষ্ঠা করেছেন। ১৩ লাখ! বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পিএইচডি প্রত্যাহার করেছে।
গাঁজার তরী পাহাড়ের ওপর দিয়েও যায়; যিনি সুপারভাইজার ছিলেন, তিনিও কি গাঁজার তরীতে চেপেছিলেন— ১৩ লাখ রেসপন্ডেন্টের সাক্ষাত্কার নিতে কয় বছর লাগার কথা তিনি নিশ্চয়ই হিসাব করেননি। যারা পরীক্ষা করেছেন, সেসব অধ্যাপক একই ঘোরে ছিলেন বলে সম্ভবত অভিসন্দর্ভের পাতাও ওল্টাননি, কিন্তু একবাক্যে পিএইচডি দিতে সম্মত হয়েছেন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড! রাষ্ট্রের শতকোটি টাকা ব্যয় করে কয়েক বছরে যেসব শুমারি/সমীক্ষা করা হয়, তাতেও তো ১৩ লাখ রেসপন্ডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সম্ভব হয় না!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অন্য একজন শিক্ষক, যিনি পরবর্তীতে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছিলেন, তিনি সেই চাকরিটি খুইয়েছেন। কারণ তার পিএইচডির সার্টিফিকেটটি ভুয়া! ব্যাপারটা ধরা পড়ে গেছে। ধরা না পড়লে হয়তো একসময় তিনি ভাইস চ্যান্সেলরও হয়ে যেতেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের একজন সদস্য বলেছেন, এটা তার জানা যে বেশকিছু ভুয়া পিএইচডিধারী পুলিশ, বেসরকারি ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন। কিন্তু মঞ্জুরী কমিশনের আইন প্রয়োগের সামর্থ্য নেই বলে ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও ভুয়া ডিগ্রিধারীদের ব্যাপারে কিছু করতে পারছে না। তিনি এটাও বলেন, এ পিএইচডিধারীদের কেউ কেউ বড়জোর আইএ পাস।
৭ লাখ টাকায় কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি, ৫ লাখ টাকায় আমেরিকান ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি এবং ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকায় আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির পিএইচডি ঢাকার কাকরাইলের একটি অফিস থেকে বিক্রির সংবাদ খবরের কাগজে বেরিয়েছে।
কী দরকার মেহনতি পিএইচডির?
পিএইচডি বিক্রির বেলায় টাকার হেরফেরটা লোক দেখানো; বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির উপায়। খরচ একই— দরকার শুধু ভালো কম্পিউটার, ভালো প্রিন্টার, ভালো কাগজ এবং একজন দক্ষ ও সৃজনশীল অপারেটর।
মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দেশে পিএইচডি উৎপাদন শিল্প’ স্থাপিত হয়েছে!
মন্দ কী! লার্জ স্কেল প্রডাকশনে সার্টিফিকেট মুদ্রণের খরচ যে কারো ক্রয়সীমার মধ্যে চলে আসার কথা। শিক্ষার যে হাল, তাতে জিপিএ ৫ যা, পিএইচডিও তা-ই। বাংলাদেশে জিপিএ ৫ বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষা বিভাগের পুলকিত হওয়ার কারণ রয়েছে। সম্প্রতি জিপিএ ৫ কেনার পুরো প্রক্রিয়াটি গোপন ক্যামেরায় ধারণ করে শিক্ষামন্ত্রীকে দেখানো হয়েছে। বিভিন্ন পদে আসীন কে কীভাবে পিএইচডি এনেছেন, এর ওপর একটি ডকুমেন্টরি তৈরি করতে পারলে মন্দ হতো না!
ইন্টারভিউতে ৪০ জন পিএইচডি-ই বাদ! সবাই শিক্ষক!
২০১৭-এর জুনের ঘটনা।
কর্ণাটক সরকারি কলেজের প্রভাষকরা পদোন্নতির জন্য ইন্টারভিউতে যাবেন। যাদের প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা নেই, তাদের ক্ষেত্রে পিএইচডি থাকলেই চলবে। কর্ণাটক এক্সামিনেশন অথরিটি পরীক্ষা নিল; পিএইচডি, নন-পিএইচডি অনেকেই পরীক্ষা উতরে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য মনোনীত হলেন। আগেরবারের দু-একটি পিএইচডি কেলেঙ্কারির কারণে উত্তীর্ণ সব পিএইচডির সার্টিফিকেট ভেরিফিকেশনের জন্য পাঠানো হলো।
শেষ পর্যন্ত ৪০ জন ডক্টরেটপ্রাপ্ত শিক্ষক বাদ পড়ে গেলেন। ভেরিফিকেশনে দেখা গেল, তারা ভুয়া সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন। এ ভুয়া পিএইচডিরা কোন কোন বিষয়ের শিক্ষক? সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ইংরেজির শিক্ষক; গণিত, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও কম্পিউটার সায়েন্সের বাকিরা।
ফেইক পিএইচডি অ্যালার্ট
সার্বিয়ার সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মেগাট্রেন্ড ইউনিভার্সিটির ডিন মাইকা ইয়োভানোভিক লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি।
দেশে শিক্ষা বিভাগে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির পর মন্ত্রী বেকায়দায় ছিলেন। অধ্যাপক ইয়োভানোভিক এসব কেলেঙ্কারির চাপ সামাল দিতে মন্ত্রীর পাশে থেকে তাকে সহায়তা করেছেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। এবার অভিযোগ ডিনের বিরুদ্ধেই, কেউ তার থিসিস দেখেননি। মন্ত্রী বললেন, লন্ডনে অবশ্য আছে, নিয়ে আসব।
কিন্তু আনলেন না।
মন্ত্রী তাকে বললেন, হয় থিসিস দেখান, নতুবা পদত্যাগ করুন। তাকে পদত্যাগই করতে হয়েছে।
মন্ত্রী অবশ্যই পদত্যাগ করার কথা বলতে পারেন। কিন্তু মন্ত্রীকে বলবে কে?
২০১৬ সালে মিয়ানমারের পরিকল্পনা ও অর্থমন্ত্রী, সাবেক আমলা ইউ কিয়ো উইন কিছুকাল আগে মিয়ানমার কম্পিউটার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতাও করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি অর্জন করেছেন। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্রুকলিন পার্ক ইউনিভার্সিটি।
এ বিশ্ববিদ্যালয়টি যে অনুমোদিত নয় এবং কালো তালিকাভুক্ত, তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়।
ইউ কিয়ো উইন নিতান্ত ভদ্রলোক, তিনি অন্য দেশের মন্ত্রী- এমপিদের মতো গায়ের জোর খাটিয়ে বলেননি যে, তার ডক্টরেট অবশ্যই হালাল। তিনি মিয়ানমার টাইমসকে নিজেই বলেছেন, এখন থেকে আমি আর নামের আগে ডক্টর ব্যবহার করব না। থ্যাংক ইউ ডক্টর উইন।
মন্ত্রীর চেয়েও বড় পদে যারা, তাদের কারো কারো ডক্টরেটের ছড়াছড়ি। ক্ষমতা অনেক কিন্তু বিদ্যা কম, বিদ্বানরা যাতে ছোট চোখে না দেখেন, সেজন্যই হীনম্মন্যতা বোধ থেকে কিছু বড় ডিগ্রি জোগাড় করতে হয়। যারা সেধে পিএইচডি দেন, তারাও নিঃস্বার্থ নন। ক্যাশ হোক কাইন্ড হোক, কিছু আদায় করে ছাড়েন।
হেক্টর হিউ মনরোর মিসেস প্যাকলটাইডস টাইগার গল্পটি একসময় কলেজপাঠ্য ছিল। তিনি ঢাকঢোল পিটিয়ে একটি অর্ধমৃত বাঘ শিকার করেছিলেন। এখন আর শিকারে যান না। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেন, আনুমানিক খরচ বড্ড বেশি। পিএইচডির বেলাতেও কি তাই?
পেপারলেস অফিস ক্যাম্পাসলেস ইউনিভার্সিটি
ডিজিটাল এ বিশ্বে বহু অফিসে কাগজের ব্যবহার উঠে গেছে। বাকিগুলোয়ও উঠি উঠি করছে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ই-মেইল অফিসের ভেতরে ও বাইরে জাদুকরী পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
উদ্যোক্তারা ক্যাম্পাসলেস ইউনিভার্সিটি বানিয়েছেন। শুধু ক্যাম্পাসহীন নয়, ক্লাসরুমহীন, লাইব্রেরিহীন, ল্যাবরেটরিহীন, সেমিনারহীন, রেজিস্ট্রার বিল্ডিংবিহীন, বটতলাবিহীন, রেসিডেন্সিয়াল হল-ডরমিটরি-প্রভোস্ট হাউজবিহীন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন। কেবল ই-মেইলসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়।
আরো কত সুবিধে— এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের মুণ্ডুপাত করা আন্দোলন নেই, শিক্ষামন্ত্রীর ওপর চড়াও হওয়ার সুযোগ নেই, বোমাবাজির সম্ভাবনা নেই, পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। কী অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটিয়েছে এ ই-মেইলসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়!
সবচেয়ে বড় কথা পড়াশোনারও প্রয়োজন নেই।
স্পেনের ট্রিনিটি কলেজ অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি সম্ভবত সবচেয়ে সস্তায় ইউরোপীয় ডিগ্রি প্রদান করছে। সাধারণ স্নাতক ১২ পাউন্ড, সম্মানসহ স্নাতক ১৫০ পাউন্ড, মাস্টার ডিগ্রি ১৯৫ পাউন্ড এবং পিএইচডির জন্য ২৯৫ পাউন্ড। যেখানে বাংলাদেশে বসে ইউরোপীয় (কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি) পিএইচডির জন্য সাত লাখ টাকা চার্জ করবে, সেখানে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায় অবলীলায় স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিটা নিয়ে নেয়া যায়। ট্রিনিটির কন্ট্রাক্ট পারসন ডক্টর পিল বেইলি মুখে কিছু বলেন না, সাক্ষাত্কারও দেন না; যা কিছু সব ই-মেইলেই সেরে নিতে হয়। লন্ডনের ট্রিনিটি অ্যান্ড অল সেইন্টস ইউনিভার্সিটি পিএইচডির জন্য একটু বেশি নেয়, ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ট্রিনিটি অ্যান্ড অল সেইন্টস আবার ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব লার্নিং নামের একটি দুনম্বরি সমিতির অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত। বলা বাহুল্য, এসব পিএইচডির ক্রেতাদের সিংহভাগই ইউরোপের বাইরের, বাংলাদেশে এ রকম দু-একজন পিএইচডি থাকবেন না, মনে করার কারণ নেই।
নিজের দেশের শিক্ষকদের কথা না-ই বললাম। প্রতিবেশী দেশ ভারতের হায়দরাবাদে জওহর লাল নেহরু টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির ৩০ জন ফ্যাকাল্টি সদস্যের পিএইচডি নিয়ে কোনো না অভিযোগ রয়েছে। অল্পকাল আগে ‘পিএইচডি ধরো’ ধরনের একটি ছোট অভিযানে এ বিশ্ববিদ্যালয় কম্পিউটার সায়েন্সের তিনজন, বিজনেস ম্যানেজমেন্টের তিনজন, ফার্মেসির একজন এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন ভুয়া পিএইচডিধারীকে শনাক্ত করেছে। কম্পিউটার সায়েন্সে ভুয়া পিএইচডিধারী বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের মহারাষ্ট্রের অ্যাডভেটিস্ট ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর নিজেই ভুয়া পিএইচডিধারী। এতে ধাক্কা খাওয়ার কারণ নেই। তিনি ভুয়া বলেই তো দক্ষতার সঙ্গে পিএইচডি বিস্তারে ভূমিকা রাখতে আরো বেশি সক্ষম হয়েছেন।
কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি?
নিজ দেশে পিএইচডি এখনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমিত। বেসরকারিগুলো এখনো দাঁত বসাতে পারেনি।
এ বছরই এপ্রিলের শেষদিকে ভারতের ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন ভারতের ২৪টি ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রাজধানী নয়াদিল্লিতেই সাতটি। কয়েকটির নাম উল্লেখ করছি: বারানসি সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, গান্ধী হিন্দি বিদ্যাপীঠ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তর প্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনাইটেড ন্যাশনস ইউনিভার্সিটি দিল্লি, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়, মৈথিলি বিশ্ববিদ্যালয়, সেইন্ট জন’স ইউনিভার্সিটি কেরালা।
বাংলাদেশেও বাবা চেয়ারম্যান, ছেলে ভাইস চ্যান্সেলর, স্ত্রী ট্রেজারার— এক অ্যাপার্টমেন্টেই গোটা ইউনিভার্সিটির সন্ধান পাওয়া গেছে। সার্টিফিকেট কোনটা চাই— এমবিএ, ট্রিপল ই-র মাস্টার্স?
ভুয়া পিএইচডি, অন্যের থিসিস দাখিল করা পিএইচডি, নকল করা পিএইচডি, খাতির জমার পিএইচডির অধিকারী চাকরিতে তো আছেই, এমনকি পাবলিক ইউনিভার্সিটিতেও মিলবে।
ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ডিগ্রিদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কয়েক হাজার হবে
কেবল কয়েকটির নাম উল্লেখ করছি: একাডেমিয়া নরমানা— ইতালি, গাম্বিয়া, ফ্লোরিডা; অ্যাডাম স্মিথ ইউনিভার্সিটি, লাইবেরিয়া; অ্যাডামস অ্যান্ড ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি, ইংল্যান্ড; অ্যালবাডিন ইউনিভার্সিটি, নিউ মেক্সিকো; আলবার্ট ইউনিভার্সিটি, ভেলাওয়ার, ইউএসএ; আলেকজান্দ্রিয়া ইউনিভার্সিটি, নেভাদা; অল-আমেরিকান ইউনিভার্সিটি, নেভাদা; আমেরিকান সেঞ্চুরি ইউনিভার্সিটি, নিউ মেক্সিকো; আমেরিকান কলম্বাস ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া; আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ওরেগন, ক্যালিফোর্নিয়া, লেবানন; আমেরিকান প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি, ভিয়েতনাম এবং আরো কয়েকটি এশীয় দেশে; অ্যামস্টেড ইউনিভার্সিটি, ইউএসএ; অ্যান্ডারসন ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া; আটলান্টিক ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, হাওয়াই; ব্যারিংটন ইউনিভার্সিটি, অ্যালাবামা; বেলফোর্ড ইউনিভার্সিটি, টেক্সাস (ঠিকানা হিসেবে কেবল পোস্ট বক্স নম্বর আছে); বার্ন ইউনিভার্সিটি, পেনসিলভানিয়া; বেথলেহাম ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটি, ভার্জিনিয়া; ক্যালিফোর্নিয়া সাউথ ইউনিভার্সিটি; ক্যালিফোর্নিয়া তক্ষশীলা ইউনির্ভার্সিটি; ক্যামব্রিজ স্টেট ইউনিভার্সিটি, মিসিসিপি; কেন্টারব্যারি ইউনিভার্সিটিজ, সিমিলিজ; শ্যাডউইক ইউনিভার্সিটি, অ্যালাবামা; কলম্বাস ইউনিভার্সিটি, ইংল্যান্ড, নাইজেরিয়া; কলম্বিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি; ডাবলিন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, স্কটল্যান্ড; ডেল্টা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিয়েন্স; ডাবলিন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি; ইস্টার্ন ক্যারিবিয়ান ইউনিভার্সিটি, টেক্সাস; ইস্ট পয়েন্ট ইউনিভার্সিটি; এলিংটন ইউনিভার্সিটি; ইউরোপিয়ান ওপেন ইউনিভার্সিটি; ফেয়ারফ্যাক্স ইউনিভার্সিটি; ফেরিংটন ইউনিভার্সিটি; গোল্ডেন স্টেট ইউনিভার্সিটি; গ্রিনিচ ইউনিভার্সিটি, নরফক আইল্যান্ড; হার্ডফোর্ড ইউনিভার্সিটি, হেডওয়ে ইউনিভার্সিটি (সম্ভবত পাকিস্তানে); ইন্ডিয়ানা ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটি; দি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইতালি; আইরিশ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; কেনেডি ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি; জেমস মনরো ইউনিভার্সিটি; কিংস্টন ইউনিভার্সিটি, নাইট ব্রিজ ইউনিভার্সিটি, লোরেঞ্জ ইউনিভার্সিটি; ম্যাকফোর্ড ইউনিভার্সিটি (সম্ভবত পাকিস্তানে); মেট্রো ইউনিভার্সিটি, নাইজেরিয়া; নোবেল ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া; ওপেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নাইজেরিয়া; পেস্টন ইউনিভার্সিটি, পাকিস্তান; রচভিল ইউনিভার্সিটি; রাদারফোর্ড ইউনিভার্সিটি; স্যাক্রামেন্টো ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সিলিকন ভ্যালি ইউনিভার্সিটি; সাউথ প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি; ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকা; ট্রাইডেন্ট ইউনিভার্সিটি, সিঙ্গাপুর; ট্রাম্প ইউনিভার্সিটি, নিউইয়র্ক; ইউনিভার্সিটি অব অ্যান্টার্কটিকা; ইউনিভার্সিটি অব রেডউড (অবস্থান অজানা); উইলিয়াম কেরি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ইয়র্কার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; জেনিথ ইউনিভার্সিটি, হাওয়াই।
পিএইচডি কাস্টমার কি নিষ্পাপ?
যখন ধরা পড়বে পিএইচডিটা ভুয়া, তখন দায়টা প্রতিষ্ঠানের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বলাই যায়, আমি বুঝতে পারিনি যে প্রতারিত হয়েছি।
এফবিআইয়ের একজন সাবেক কর্মকর্তা কানাডায় ভুয়া পিএইচডিধারীদের ওপর সমীক্ষা চালাতে গিয়ে বলেন, কমপক্ষে এ ধরনের ৮০০ ডক্টরেট, যাদের সবাই কানাডিয়ান, এ দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
তাকে সঙ্গে নিয়ে একটি গবেষণা সংস্থার তিনটি পিএইচডি ক্রয়ও করেন। বাইবেল গবেষণা মাস্টার ও পিএইচডির জন্য আলমেডা ইউনিভার্সিটি ৩ হাজার ২০০ ডলার দাবি করে। দরকষাকষি করার পর গেইটসভিল ইউনিভার্সিটি ২ হাজার ৫০০ ডলারে রাজি হয়। কিছুদিন পর প্রাপক ডাকে একটি প্যাকেট পান। তাতে বিবলিক্যাল স্টাডিজে মাস্টার ডিগ্রির সার্টিফিকেট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজিরার রিপোর্ট পান। কিন্তু একই বিষয়ে পিএইচডি সার্টিফিকেট না থাকায় যোগাযোগ করে গালমন্দ করেন। কর্তৃপক্ষ তাকে আশ্বস্ত করে, কয়েক দিনের মধ্যে পিএইচডিও হয়ে যাবে।
ডাকযোগে আরেকটা প্যাকেট পেলেন। তাতে পিএইচডি আছে কিন্তু বিষয় ভিন্ন— সাইকোলজি। প্রাপক আবার যোগাযোগ করলে কয়েক দিনের মধ্যে সঠিক সার্টিফিকেট পাঠায়। আড়াই হাজার ডলারে তিনি এখন একটি মাস্টার ডিগ্রি, সাইকোলজিতে একটি পিএইচডি ও থিওলজিক্যাল স্টাডিজের আরেকটি পিএইচডির মালিক।
এফবিআই কর্মকর্তা বললেন, পিএইচডিদাতা প্রতিষ্ঠান অপরাধী সন্দেহ নেই। কিন্তু পিএইচডির কাস্টমারও নিষ্পাপ নন।
পিএইচডিফাইড রাশিয়া: ডক্টরেটে সয়লাব
সমাজতন্ত্রের পতনের পর যে রাশিয়ার উত্থান হয়েছে, তাতে সমাজতাত্ত্বিকদের মতে পিএইচডিফিকেশন হয়েছে। রাশানদের হাতে টাকা আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিদ্যা অর্জনের আগ্রহ যত না বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি বেড়েছে ডিগ্রিধারী হওয়ার, পিএইচডির। টেনেটুনে স্কুল ফাইনাল পাস করা অনেকেরই এখন পিএইচডি রয়েছে।
ডিসার্নেট নামক একটি অ্যান্টি প্লেজারিজম গ্রুপ সম্প্রতি ৩ হাজার ৫০০ নকল করা, বাজে এবং ভুয়া থিসিস শনাক্ত করেছে। বাজে অগ্রহণযোগ্য থিসিসের ৪০ শতাংশই অর্থনীতিবিষয়ক।
পিএইচডি প্রদানের ডিগ্রি মিলগুলো মূলত মস্কো ও সেইন্ট পিটার্সবার্গে। এত অধিসংখ্যক পিএইচডিকে ধারণ করার মতো প্রতিষ্ঠান রাশিয়ায় না থাকায় এসব ডক্টরেটধারীর কেউ কেউ কেরানির চাকরির জন্যও আবেদন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রেসিডেন্টের ইমমিউনিটি!
প্রেসিডেন্ট মিথ্যে বললেও তা সঠিক। আইন তাকে ইমমিউনিটি দিয়েছে। ২০১২ সালে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট তমিস্লাভ নিকোলিক যেখান থেকে গ্র্যাজুয়েশন করছেন, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বললেন। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয় সাফ জানিয়ে দিল, তারা তমিস্লাভ নিকোলিককে চেনে না।
সমস্যা নেই, প্রেসিডেন্ট মিথ্যে কথা বলতে পারেন।
বরং আমরা বলব, বললেনই যখন পিএইচডি ডিগ্রির কথা বললেই পারতেন।
ডিগ্রি মিল বিলিয়ন ডলার শিল্প
যেসব প্রতিষ্ঠান বিপুল লাভের উদ্দেশ্যে কোনো বিষয়ে কিছু পড়িয়ে কিংবা না পড়িয়ে সার্টিফিকেট প্রদান করে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে ডিগ্রি মিল বা ডিপ্লোমা মিল বলা হয়। এ ব্যবসাটি পৃথিবীজুড়ে চলছে এবং তা বিলিয়ন ডলার ব্যবসা।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অ্যাক্রেডিটেশন থাকে না কিংবা আজগুবি কোনো প্রতিষ্ঠানের অ্যাক্রেডিটেশন থাকে। এমনকি জাতিসংঘের ইউনেস্কোর অ্যাক্রেডিটেশন দেখায়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার প্রশ্নে এ ধরনের কোনো সনদ দেয়ার অধিকারই ইউনেস্কোর নেই। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের যদি বাস্তব অস্তিত্ব থেকেও থাকে, এখানে ভর্তির ন্যূনতম কোনো মান থাকে না। এদের টিউশন ফি টার্ম কিংবা কোর্সভিত্তিক নয়, ডিগ্রিভিত্তিক। ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো বছরের প্রথমে কিংবা মাঝে কিংবা শেষে এ রকম কোনো বিধিবিধান নেই, যেকোনো সময় ভর্তি হওয়া যায়। নিজেকে মেধাবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে তারা বৃত্তির কাগজও দেয়। ‘ডিগ্রি মিল’ গবেষক জন বিয়ার লিখেছেন: ডিগ্রিটা বায়োডাটায় টাইমবোমার মতো, যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে এবং পরিণতিও হতে পারে ভয়াবহ। যারা বিক্রি করে তাদের কমই ভুগতে হয়। কিন্তু যারা কেনেন তাদের ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ায় ৩৯টি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বাইরে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত করা ফৌজদারি অপরাধ।
চীনে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ই সরকারি; ২০১৫ সালে চীন সরকার ২১৫টি ডিগ্রি মিল শনাক্ত করেছে। জার্মানি সরকারের অনুমোদন পাওয়ার আগে ইউনিভার্সিটি শব্দটি কোথাও সংযুক্ত করা যায় না। পৃথিবীর সব দেশেই আইন আছে। প্রয়োগ কম। ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ট কমিশনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ কম নয়।
খ্রিস্টীয় হুজুরেরও ভুয়া পিএইচডি
ধর্মযাজকদের পিএইচডি খেতাবধারী হতে হবে— এমন কোনো নির্দেশনা খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থে নেই। কিন্তু রেভারেন্ডরাও পিএইচডি সংগ্রহে পিছিয়ে নেই।
কলাম্বিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ধর্মতত্ত্ব কিংবা বাইবেল পাঠবিষয়ক কোনো কোর্সই নেই, কিন্তু দেড় হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ ডলার খরচ করে যাজকদের কেউ কেউ ডিগ্রি নিয়েছেন। ধর্মযাজকদের পিএইচডি থাকতে হবে— এটা নব্য ফ্যাশন। এর সঙ্গে যিশুর শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই।
পিএইচডি-প্রত্যাশী খ্রিস্টীয় হুজুরদের সতর্ক করা হয়েছে বাইবেলের পঙিক্ত উদ্ধৃত করে:
করিন্থিয়ানস ১৩:৫-এ পল বলেছেন: ‘নিজেকে পরীক্ষা করে দেখো তুমি বিশ্বাসের পথে আছো কিনা। তুমি যদি এই পরীক্ষায় পাস করতে না পারো তাহলে এটা কখনো মনে করবে না, তোমার ভেতরে জিসাস রয়েছেন।’
টিমথি ২:১৫-তে আছে ঈশ্বরের অনুমোদন লাভ করার জন্য পড়াশোনা করো।
কোনো ধর্মই তার যাজককে উচ্চ ডিগ্রিধারী হতে বলেনি। তাহলে পিএইচডির কী দরকার?
পাদটীকা: অশ্ব-পিএইচডি, গর্দভ-পিএইচডি সম্ভবত দুই-ই আছে। সারমেয়-পিএইচডি বলে কি কিছু আছে? অবশ্যই আছে। মারফতি, কেরামতি, তেজারতি প্রভৃতি পিএইচডিধারীদের সারমেয় চিত্কারে জানান দিতে হয়, আমি কিন্তু পিএইচডি। মেহনতি পিএইচডিধারীদের কারো কারো এটিই একমাত্র ভূষণ হওয়ায় তাদেরও মাঝে মাঝে সারমেয় আওয়াজ তুলতে হয়— মূলত পরিচিতি সংকটের কারণেই একই পথে হাঁটতে হয়।
সব শেষে: আমার পিএইচডি নিয়ে আমিও যথেষ্ট বিব্রত।





