আমি যখন চণ্ডীগড়ে আসার পরিকল্পনা করি, তখন আইআইটির বন্ধু লিপিকা দে আমায় বলেছিল, “চণ্ডীগড়ে কেন যাবে? সেখানে এক ‘রক গার্ডেন’ ছাড়া আর কী আছে দেখার?” বহুভ্রমণের অভিজ্ঞতা যার ঝুলিতে, তার ওই উক্তি আমাকে যে বার্তা দেয় তা হলো, আর কিছু না হলেও চণ্ডীগড়ে রক গার্ডেন দেখো। এখানে বহুবিধ গার্ডেন আছে, যেমন রোজ গার্ডেন, বাটারফ্লাই গার্ডেন, জাপানি গার্ডেন। আমরা কোনোটিই দেখি না, সোজা চলে যাই রক গার্ডেনে, সফট ছেড়ে হার্ডে। রক গার্ডেনটি সম্ভবত সারা দুনিয়াতেই অভিনব। কোনো একক ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এমন এক বিশাল শিল্পমেলা গড়ে তোলা যায়, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সুদীর্ঘ ৫০ বছরের সাধনায় একটু একটু করে গড়ে তোলা হয়েছে এ শিল্পের বাগান। যিনি গড়ে তুলেছেন, তার নাম নেক চাঁদ (Nek Chand)। লিলি শরণ মনে করতে পারলেন, তিনি তার বালিকাবেলায় ও কিশোরীকালে এ শিল্পীকে দেখেছেন চণ্ডীগড়ের পথে সাইকেল চালিয়ে যেতে আর পথ থেকে বিবিধ ফেলে দেয়া বস্তু সংগ্রহ করতে। বস্তুত নেক চাঁদ রক গার্ডেন গড়ে তুলেছেন পরিত্যক্ত গৃহনির্মাণসামগ্রী, ইট-পাথরের টুকরো, ভাঙা সিরামিক, পোরসেলিন, চীনা মাটির ভাঙা তৈজস, ভাঙা কাচের চুড়ি প্রভৃতি বিচিত্র বস্তু জড়ো করে, জোড়া লাগিয়ে। এখন যে recycling-এর ধারণা ও চেতনা সারা পৃথিবীতে সোচ্চার, নেক চাঁদ সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে সেটাই দেখিয়ে দিচ্ছিলেন, কী করে ফেলে দেয়া তৈজস, ছুড়ে ফেলা পাথর, জমাট হয়ে যাওয়া সিমেন্ট শিল্পবস্তু হয়ে উঠতে পারে। বস্তুত নেক চাঁদের দুনিয়ায় কিছুই ফেলনা নয়, নয় বিবর্জিত। প্রথাগত শিল্পসৃষ্টির ধারণাটিই তিনি ভেঙে দেন।
রক গার্ডেনের টিকিটঘরের সাথের বাইরের দেয়ালটি দেখে মনে হয়, ঘন সন্নিবেশিত নারকেল গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো। আসলে বৃত্তাকার পিঠের ঢেউ খেলানো সিমেন্টের দেয়াল। তার ওপর বসানো পাখা মেলা, গলা উঁচানো, ঠোঁট খোলা সিরামিকের তৈরি উল্লসিত হাঁসসারি দেখে নেক চাঁদের শিল্পসৃষ্টির প্রাথমিক ধারণাটি হয় মুগ্ধতাজাগানিয়া। একটি-দুটি নয়, একই প্রকার হাঁসের দল যতদূর সম্মুখ দেয়াল, ততদূর দণ্ডায়মান। বিস্ময়টি তখনো বাকি ছিল, তা ঘটল কবি লিলি শরণ যখন জানালেন, ওই হাঁসগুলো তৈরি হয়েছে ভাঙা ও পরিত্যক্ত কমোড দিয়ে। প্রবেশপথের বাইরে শান বাঁধানো চত্বরে তিনটি গোলাকার পাথরের এক স্মারকস্তম্ভ। উপরের বড় পাথরটির গায়ে লেখা Rock Garden— A Fantasy created by Nek Chand। স্মারকস্তম্ভটি উদ্বোধন করেছেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়, যিনি সে সময় পাঞ্জাবের গভর্নর হিসেবে চণ্ডীগড়ের প্রশাসক ছিলেন। কংগ্রেসের এ নেতা একসময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। নেক চাঁদের একক ও নিভৃত শিল্পচর্চা একসময় আর গোপন থাকেনি, এখানে তাঁর যে রহস্যময় কুটির ছিল, তা হয়ে ওঠে শিল্পরসিকদের তীর্থ। নেক চাঁদকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে চণ্ডীগড়বাসী ও সরকার। যে বিপুল আয়োজন এ পাথুরে বাগানের, তা একার পক্ষে গড়ে তোলা অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত কঠিন।
রক গার্ডেনের প্রবেশপথটি সংকীর্ণ। প্রথমেই যে প্রাঙ্গণটি পড়ে, সেটিও অপরিসর, দুই পাশে হেঁটে চলার পথের দুই ধারে পাথরের বা সিরামিকের ছোট ছোট ভাস্কর্য বসানো, আকাশখোলা উন্মুক্ত গ্যালারির শিল্পসম্ভার জটিল মুখভঙ্গি করে বিমূঢ় দর্শকদের দেখছে। দেয়ালটির গায়ে সিরামিকের ভাঙা টুকরো লাগানো। সেখানে একটি সাদা দেয়ালের সম্মুখে ছবি তুলি, প্রথমে চুন লাগানো নিরেট দেয়াল ভেবেছিলাম, পরে দেখি দেয়ালটিতে অসংখ্য বৈদ্যুতিক সকেট লাগানো। ওই দেয়ালের পাশেই মাটির কলসি পরপর সাজিয়ে আরেকটি ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে। পথ চলে গেছে সুড়ঙ্গের মতো এক প্রবেশপথে, যেখানে একটি পাথুরে থামওয়ালা নিচু ছাদের বারান্দা, সেখানে দারুণ আলোছায়া নির্মিত। এর পরের পথটি সংকীর্ণ। মনে হলো, এক ভুলভালাইয়ায় এসেছি। রক গার্ডেন যত দেখেছি, তত এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, এটি এক labyrinth, মস্ত এক ভুলভালাইয়া।
এরপর যা দেখি তা ধারণার অতীত, প্রবেশপথের দৈন্য যে স্বল্প প্রত্যাশা সৃষ্টি করে, তাকে এক ঝটকায় বড় করে তোলে দৃশ্যটি। বিরাট এক চত্বর, তার একপাশে পাথুরে দেয়াল গড়িয়ে জল পড়ছে, তৈরি করেছে এক কৃত্রিম জলপ্রপাত, অন্য পাশে নিরেট পাথুরে দেয়াল। প্রবেশপথের নির্জনতা ও জনবিরল ভাবটি এখানে অন্তর্হিত। জল দেখে উল্লসিত দর্শনার্থীরা এখানে এসে স্বভাবতই আটকে গেছেন। জলপ্রপাতের শীর্ষে একটি থাম বসানো টানা বারান্দা, তারও চূড়ায় মোগল স্থাপত্য। দুটি পাথুরে দেয়াল চওড়া চত্বরে শুরু হলেও ক্রমশ সংকীর্ণ প্যাসেজে গিয়ে মিশেছে। সেখানে এক পাশে প্রাকৃতিক পরিবেশের পরই একটি দুর্গচূড়া, তার পাশ দিয়ে চক্রাকারে এক পথ উঠেছে। অন্য পাশে একটি প্রাসাদের নকশা, যার জানালাগুলো কিছু প্রতীকের ধারাপাত। জলপ্রপাতের মেঝেয় দুই পাশে পাথর বসানো হাঁটার পথ, পাথরপথের নিচে জলাশয়। তবে এসবই ওই দুর্গচূড়া, প্রাসাদদেয়াল, জলপ্রপাতের মাথায় মোগল স্থাপত্য সিনেমার সেটের মতো, দেখতে নান্দনিক, কিন্তু সেসবে কেউ বাস করে না। নেক চাঁদের জলপ্রপাতসমেত পাথুরে স্টুডিওটি দেখে পরিব্রাজকরা আত্মহারা। না চাইতেই জলের মতো জলপ্রপাত পেয়ে তারা ক্রমাগত ছবি তুলে যাচ্ছে, সেখানে পশ্চাত্পট উপলক্ষ মাত্র, মূল বস্তু তাদের দন্তবিকশিত হাসিভরা মুখ বা মুখ বাঁকা করা সেলফি।
এ স্থাপনাকে যে গোলকধাঁধা বলেছি তা যথার্থ। আমরা জলপ্রপাতের পাশ দিয়ে কিছুটা উপরে উঠে উঁচু দেয়ালঘেঁষে হাঁটি। উঁচু দেয়ালের মাথায় ছোট ছোট বাড়ির অনুকৃতি (prototype) বসানো, ছোটদের পুতুল ঘরবাড়ি। নেক চাঁদের পিতৃপুরুষের ভিটে ছিল অবিভক্ত ভারতের লাহোরে। দেশ বিভাগের দগদগে ঘা পিঠে নিয়ে আজীবন পিতৃভিটে হারানোর বেদনা বুকে বয়ে বেড়িয়েছেন। অনেকের ধারণা, সেই হারানো শৈশবকে পুনর্নির্মাণ করেছেন ফ্যান্টাসি দিয়ে। বাকিদের মতে, তিনি সৃষ্টি করেছেন সব মানুষের জন্য সম্প্রীতির এক জগৎ, যখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ খুঁজে পাবে ভালোবাসা, প্রিয় শৈশব। দেয়ালের সাইনপোস্টে লেখা— ‘এ পার্ক দেশের সম্পদ। একে রক্ষা করুন।’ আরেকটিতে দেয়াল বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা না করার অনুরোধ। মানুষের মাঝে পূর্বপুরুষের কিছু জিন আজো সক্রিয়, তাই বোধকরি ওই অনুরোধ।
দুই পাড়কে জুড়ে দেয়া দুটি সেতু রয়েছে, একটি উঁচুতে, অন্যটি কোমর বরাবর, দুটোই দুর্গকে জুড়ে দিয়েছে প্রাসাদের সাথে। তারা ওই ত্রিমাত্রিক স্টুডিওর আরেকটি ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করেছে। যদিও দুটো সেতু এপাড়কে ওপাড়ের সাথে জুড়েছে। আমরা ওপাড়ে যাই কোনো সেতু দিয়ে নয়, কাটা চাকতির মতো দেখতে পাথরখচিত পথ নেমে গেছে নিচে জলাশয়ের সমান্তরালে, সেই পথ দিয়ে। এরপর রেলিংঘেরা সরু পথ ধরে যেখানে আসি, সেটা জলপ্রপাতের বিপরীত দেয়াল। এ যেন পাহাড়ি পথ, বাঁক ঘুরে ফিরে এসেছি একই দৃশ্যের কাছে। নিচে ছবি তোলার উৎসব চলছে জল দেখে উল্লসিত সকল প্রাণে। আমি ক্রমাগত ছবি তুলে যাই, নেক চাঁদের দুনিয়ার, যে দুনিয়ার সর্বত্র শিল্পের ছোঁয়া। এমনকি খাড়া পাথুরে দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফির মতো পেঁচানো গাছের মোটা শিকড় দিয়ে তৈরি হয়েছে শিল্প এবং তা সচেতনভাবেই।
ভূমি থেকে কিছুটা উপরে সরু পাথুরে পথের শেষে যে জগিট উন্মোচিত হয় তা অভাবিত। প্রথমে নিচে নেমে আসি অতঃপর একটা প্রাঙ্গণে উঠে যা দেখি, তা আগের চেয়েও মনোহর। ভাবি, নেক চাঁদ আমাদের জন্য কত রহস্য সৃষ্টি করে রেখেছেন। এখন যা দেখছি তা অভাবিত শুধু নয়, ভীষণ অভাবিত!
নেক চাঁদের কল্পনার পৃথিবীটি বহুধাবিস্তৃত, তাতে প্রকৃতির অনেক উপাদানই জড়ো হয়েছে, তিনি তৈরি করেছেন কৃত্রিম পাহাড়, জলাশয়, জলপ্রপাত। তৈরি করতে পারেননি নদী, সমুদ্র ও জঙ্গল। তার পাথুরে বাগানটিকে অবশ্য concrete jungle বলা যায়। এর সাথে তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন মানুষের তৈরি স্থাপত্য। এক সরু পথের ভুলভালাইয়া ধরে যেখানে এসে পৌঁছেছি, সেটি একটি খোলা চত্বর, মানুষের তৈরি এক উন্মুক্ত শিল্প সংগ্রহশালা। চত্বরটির এক পাশে কৃত্রিম ঢিবির উপরে শতখিলানের টানা বারান্দাবেষ্টিত কক্ষগুলো আর শির তোলা গম্বুজের প্রাচীন দালান, অন্য পাশে কয়েকটি ধাপবিশিষ্ট দেয়াল। একটি দেয়ালের একেবারে উপরিভাগটি গ্রামে ঘুটে কুড়ুনি মেয়েরা যেভাবে শলাকায় গেঁথে ঘুটে শুকাতে দেয়, তেমনি লাল পাথরের টুকরোয় সাজানো, এরপর সিমেন্টের দেয়ালে চীনামাটির টুকরো গেঁথে দেয়া মধ্যভাগ আর নিচে দুটি বা তিনটি ধাপে ভাস্কর্য বসানো।
নেক চাঁদ পথ থেকে কুড়িয়ে পেয়েছেন বিবিধ নির্মাণসামগ্রী, তাদের শিল্পিত রূপ দিয়ে বুঝি প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন পাথরে। নইলে সিরামিকের টুকরো বসানো চাতালে যেসব পুতুল বসানো, কোনোটি মাটির, কোনোটি সিরামিকের, কোনোটি ভাঙা চুড়ির, কোনোটিবা পাথরের টুকরোর— তারা মানুষের মুখ ধরে আছে কেন? খোলা আকাশের নিচে তাকে তাকে বসানো পাথুরে মূর্তি রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে। প্রাঙ্গণটির চারপাশে কৃত্রিম ঢিবির ওপর দিয়ে রেলিংঘেরা পথ চলে গেছে। রক গার্ডেনের অনেক স্থানে যে আমার পা পড়েনি, ওই ক্যাপিটল হিলের মতো, তার প্রমাণ হলো উপরের রেলিংঘেরা পথটি ধরে আমি হাঁটিনি, লোকদের হাঁটতে দেখেছি কেবল। তেমনি পেছনের জলপ্রপাতের প্রাঙ্গণের দুটি সেতুর একটিও পেরিয়ে যাইনি, না উঠেছি মোগল স্থাপত্য বা দুর্গের চূড়ায়, প্রাচীন প্রাসাদের বারান্দা ধরেও হাঁটিনি। কখনো দূর থেকে দেখাই ভালো বলে মনকে প্রবোধ দিয়েছি। নেক চাঁদের দুনিয়ার পুরোটা হেঁটে পার হতে, খুঁটিয়ে দেখতে গোটা দিনই লাগে, কিংবা কয়েকটি দিন। আমার কি সে সময় আছে? নেই বলেই দ্রুত পা চালাই। পাথরের তৈরি এক গ্রাম, তাতে পাতকুয়ো, উঠোন, উঠোনে সিমেন্ট বাঁধানো নারকেল গাছ, নিচু গৃহস্থ ঘরবাড়ি সবই আছে। ভাবি, এটাই কি নেক চাঁদের সেই গ্রাম, যা সে ফেলে এসেছে সীমান্তের ওপাড়ে আর স্মৃতি থেকে তুলে এনে বসিয়েছে তার পাথুরে বাগানে?
এ বাগান এক রহস্য পুস্তক, পরের পৃষ্ঠায় কী আছে, তা ধারণা করা যায় না। পৃষ্ঠাগুলো লেগে আছে শক্ত আঠায়, পাহাড়ের ভাঁজের মতো, ঘুরে দেখা যায় একই স্থাপনার অন্য রূপ। রক গার্ডেনের এই পেঁচানো জটিল জ্যামিতি যে শহরের বড় হয়ে ওঠার সমবয়সী, সেই চণ্ডীগড় কিন্তু রহস্যহীন, সরলরেখা আর আয়তক্ষেত্রের সোজা জ্যামিতিক্ষেত্র। রেলিংঘেরা পাথুরে সিঁড়ি, তা বেয়ে একটি পাথুরে দালানের বারান্দায় দাঁড়াই আর তখনই চোখে আসে আরেকটি বিস্ময়কর অভাবিত চত্বর। এখানেও ঝরনা আছে, আরো গতিময়। অনেকটা নিচে, পাথুরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়, একসঙ্গে চোখে আসে দৃশ্যটি। ঝরনার জল দিয়ে তৈরি নালা, জলের উপরে একটি ছোট সেতু, বিপরীত পাশের খাড়া ও উঁচু দেয়ালের পাশঘেঁষে আঁকাবাঁকা পাথুরে মেঝে। ধারণার অতীত সুন্দর!
কবি লিলি শরণ নিজের ছবি তুলতে পছন্দ করেন, আমি পছন্দ করি সুন্দর যা কিছু রয়েছে চোখের সম্মুখে, সেসবের ছবি তুলতে। ফলে আমার ক্যামেরায় তার অনেক ছবি। ঝরনা ও নিচের সমগ্র দৃশ্যটি যেখান থেকে এক লহমায় দেখা যায়, সেখানে সিঁড়ির মুখটায় দাঁড়িয়ে তিনি পোজ দেন, আমি পরপর ছবি তুলি। কর্নেল সাহেব একটু পিছিয়ে পড়েছিলেন, ফিরে সম্মুখে না তাকিয়ে চোখ ফেলেন আমার ক্যামেরার পর্দায়। ভেবেছিলেন সেখানে কেবলই নেক চাঁদ, কিন্তু আবিষ্কার করেন, পাথুরে কবিতার ভেতর কবি নিজেই ফুটে আছেন গোলাপের মতো। লিলিজি আজ পরেছিলেন গোলাপি রঙের পোশাক, তাতে বিভ্রম আরো বেড়ে যায়। লিলি শরণ, বোধকরি ক্ষতিপূরণ দিতেই আমার ও সুখবিন্দার শরণের ছবি তুলে দেন, ঝরনা বলি আর জলপ্রপাত বলি, তার নিচে। সেটি আরেক সুনন্দ স্টুডিও ছবি তোলার। ততক্ষণে বলাই বাহুল্য, আমরা নেমে এসেছি নিচে আর সেতু পেরিয়ে, পাথুরে মেঝের ওপর পা ফেলে ফেলে এসেছি জলধারার সিক্ততায় চোখ নরম করে তুলতে। কেবল চোখের শুশ্রূষা নয়, কানেরও নিরাময় ঘটে জলপতনের শব্দে। নেক চাঁদ সম্ভাব্য সব স্থানকেই শিল্পিত করার চেষ্টা করেছেন। যেমন এখানে একটি পাহাড়সদৃশ ঢালে হাঁড়ি মাথায় চারটি পুতুল দাঁড়িয়ে, বনভূমে স্থির চার চরিত্রের মতো। জল যে শীর্ষ থেকে গড়িয়ে নামছে, সেখানে কিছু মানুষ দেখে অবাক হয়েছিলাম, পরে বিভ্রম ভাঙল, সেগুলো ছিল পাথুরে মূর্তি। ঠিক এমনটিই আমি দেখেছি হায়দরাবাদের রামোজি ফিল্ম সিটিতে। বুঝি নেক চাঁদের প্রভাব। তা চাঁদের প্রভাব মন্দ নয়, জ্যোত্স্না ছড়ায় বহুদূর।
এখানে জলপ্রপাতের বিপরীতে খাড়া উঁচু দেয়াল নির্মিত হয়েছে। ব্যাগের ভেতর বাতাস ঢুকে বা পানি পড়ে যেভাবে সিমেন্ট জমাট বেঁধে আস্ত খণ্ড পাথর হয়ে যায়, এমনি তাক তাক অসংখ্য সিমেন্ট বস্তায়। চণ্ডীগড় শহর নির্মাণ শুরু হয় ১৯৫৮ সালে, শূন্য (scratch) থেকে একটি আস্ত শহর নির্মাণ করতে বিপুল নির্মাণসামগ্রী লাগে তার, যা কিছু নষ্ট বা পরিত্যক্ত হয়েছে, তার সবই নেক চাঁদ কাজে লাগিয়েছেন। সে অর্থে বিনষ্ট হয়নি কিছুই, সবকিছু কাজে লেগেছে। তাঁর শিল্পসৃষ্টির বড় মাহাত্ম্য এখানেই।
নেক চাঁদের কল্পনাশক্তি ও সৃষ্টির সৌন্দর্য অবিরল বিস্ময় জাগাচ্ছে চোখে ও হূদয়ে। কখনো তা উদ্দীপ্ত করছে মস্তিষ্ককে। একটি মানুষের ভালোবাসা ও একাগ্রতা কতখানি গভীর হলে এমন সৃষ্টি সম্ভব, তাই ভাবি। অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি তিলে তিলে গড়েছেন তার তাজমহল, ২০ হাজার শ্রমিক নিয়ে নয়, ছোট একটি দল নিয়ে এবং বলতে গেলে প্রায় একাই। প্রথম দিকে একাই করতেন সবকিছু। পরে এ মহতী শিল্পসৃষ্টির পেছনে সরকার ও চণ্ডীগড়ের নাগরিকরা এগিয়ে এলে তার কাজটি সহজ হয়। তার এ অভূতপূর্ব কাজের কথা অবশেষে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরিত্যক্ত ও বর্জ্যসামগ্রী ব্যবহার করে শিল্পসৃষ্টির ধারণাটি পরিবেশবাদীদের recycling-এর মাধ্যমে প্রকৃতি ও পরিবেশকে রক্ষা করার ধারণার সাথে মিলে যায়। নেক চাঁদকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় তার কাজ নিয়ে কথা বলতে। শিল্পের নান্দনিকতার পাশে তার দর্শন সমান আকর্ষণীয়। তার চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয় এর ব্যবহার উপযোগিতা ও সমাজে অভিঘাত (impact)। আশ্চর্য নয় যে, তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পাশ্চাত্যের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।
এ পর্যন্ত যে দুটো কৃত্রিম ঝরনা বা জলপ্রপাত আমরা অতিক্রম করেছি, তার ভেতর দ্বিতীয়টি অধিকতর সুন্দর। কেননা এর দুই পাশে গভীর গিরিখাতের, হোক কৃত্রিম, গম্ভীর সৌন্দর্য রয়েছে। নিচে প্রবাহিত জলের ওপর পাথুরে সেতু ও পাশে পাথুরে মেঝে তৈরি করেছে অধিবাস্তবতা। সে পথের বক্রতা এনেছে পরাবাস্তব সৌন্দর্য। এর শেষ প্রান্তে একটি প্রেক্ষাগৃহ। দর্শকশূন্য গ্যালারি, কিন্তু সম্মুখের বড় টিভি পর্দায় কার্টুন ছবি চলা দেখে বুঝি, এটি ছোট দর্শকদের হল। সেখান থেকে ভুলভালাইয়া পথ ধরে যাচ্ছি, দেখি চারজন আঁকিয়ে, তাদের ভেতর একজন পাগড়ি মাথার শিখ, অন্যজনের মাথায় হ্যাট, বাকি দুজন শিরস্ত্রাণহীন, সরু পথের এক পাশে বসে আছে। তারা দর্শনার্থীদের মুখ আঁকার জন্য তাদের রঙ-তুলি ও ইজেল নিয়ে প্রস্তুত, টাকার বিনিময়ে দর্শকরা তাদের মুখাবয়ব আঁকিয়ে নিতে পারেন। সম্মুখে চারটি চেয়ার পাতা, চারটিই শূন্য। পরে আরো দুজন আর্টিস্ট পেলাম, যাদের সম্মুখে দুজন পর্যটক ধৈর্য নিয়ে মুখ বাগিয়ে স্থিরভাবে বসে আছেন ঈশ্বরপ্রদত্ত মুখ শিল্পীর তুলিতে কী বিচিত্ররূপ ধারণ করে তা দেখতে। এই পথখানিকে মনে হলো দুর্গে প্রবেশের পথ, পাথরে মোড়ানো উঁচু টানেল। এমন পথ দেখেছিলাম জয়পুরের আম্বর দুর্গে।
দুর্গ নয়, ভেতরে একটি বিরাট চত্বর, অভাবিত তার আয়োজন। এতক্ষণ যে সরু ও আঁকাবাঁকা গোলকধাঁধার মতো পথ ধরে এসেছি, এখানে তার বিপরীত চিত্র। মনে হলো, মেলার ভিড় ঠেলে সার্কাসের মাঠে এসে পড়েছি। এখানে প্রথমেই যে দালানটি পড়ল, তা মোগলদের দরবার হলের মতো স্তম্ভখচিত দালান, তবে এর ছাদ নিচু। দেয়ালের দিকটায় বিবিধ ছোট ছোট ঘর, তাতে বিচিত্র সব মাছ অ্যাকুরিয়ামে রাখা। সেখানে দেয়ালঘেঁষে কিছু একতলা দালান, একটি চিত্রশালা ও দুটি খাবারের দোকান রয়েছে। মাঝের উঠোনে, কী বলব তাকে, অনেক খিলানওয়ালা প্রবেশপথ, নাকি আর্চসংবলিত এক দেয়াল, নাকি খিলান তোলা রেলসেতু? সে গেছে দৃষ্টিনন্দন বক্রতায়, উঁচু মাথার উপরে সারি সারি ঘোড়ার মূর্তি সাজিয়ে। বাঁকানো আর্চের ওপর থেকে তারে ঝুলছে দোলনা, বেশ উঁচু সে ঝুলনরশি। ক্ষণিক দুলে নিই তাতে। দুলতে দুলতে দেখি ওপাশের দেয়ালে কিছু গাছ এমনভাবে লেপ্টে আছে, যেন তারা দেয়ালের ম্যুরাল। দেয়ালটির একেকটি খোপ যেন একেকটি ছবির ফ্রেম, তাতে বৃক্ষগুলো ভাস্কর্যচিত্র হয়ে আছে। কাজটি কঠিন ও অতীব যত্নে করা। কবি লিলি শরণ, কর্নেল সুখবিন্দার শরণ ও আমি চিত্রশালায় উঁকি দিই আর একটি মুকুলশোভিত আম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নরম পানীয় পান করে শীতল হই। ফেরার পথে দেখি কিছু বিদেশী রমণী সিনেমার চিত্রনাট্যে চরিত্ররা যেমন ক্যামেরা রোলের জন্য অপেক্ষা করে, তেমনি বিভিন্ন ভঙ্গিতে পাথুরে বেঞ্চি ও চাতালে বসে আছে।
রক গার্ডেনে ততক্ষণে আড়াই ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এবার ফেরার পালা, ফেরার পথে পথে অনেক ছোট ছোট ভাস্কর্য দেখি, এসবই নেক চাঁদের নিজ হাতে তৈরি। দর্শকের মাথা সমান উঁচুতে উন্মুক্ত গ্যালারিতে সারি সারি সব মূর্তি দর্শকের দিকেই তাকিয়ে আছে দর্শকদের সমান আগ্রহে। তাতে বিবিধ জীবজন্তু থাকলেও মানুষের মূর্তিই অধিক। একটি জায়গায় সবগুলো স্ট্যাচু একই প্রকার। সামান্য ঢালু সিরামিকের টুকরো বসানো সিমেন্ট চত্বরে এসব শিল্প দেখতে দেখতে যাই। স্ট্যাচুগুলো ছোট আকারের, একেকটি একেক প্রকার, সেখানে রিয়ালিজম যেমন আছে, সুররিয়ালিজমও তেমনি আছে। একটি বাঙালি পরিবার ও দুজন শিখ যুবকের সাথে দেখা হলো। বাঙালি পরিবারটি সিমলা থেকে ফিরেছে। আমি সিমলা যাব শুনে তারা আমাকে বিবিধ পরামর্শ দিল। বেরোনোর আগে নেক চাঁদের আরো কাজ দেখি, বিশেষ করে ভাঙা চুড়ি জোড়া দিয়ে বানানো ময়ূর, নারী। লিলি শরণ বললেন, এগুলো নেক চাঁদের একেবারে গোড়ার দিকের কাজ। এক স্বপ্নময় দুনিয়া থেকে আমরা বাস্তবের দুনিয়ায় ফিরে আসি। আশ্চর্য রক গার্ডেনে প্রবেশ ও প্রস্থানের দুটি পথই সংকীর্ণ! কেন এ ব্যবস্থা, নেক চাঁদই ভালো বলতে পারতেন। তবে তিনি আর ইহধামে নেই। তাঁর শিল্পের বাগান অসংখ্য মানুষকে প্রত্যহ মুগ্ধ ও বিহ্বলিত করে রাখছে। শিল্পীর চেয়ে শিল্প যে বড়, তার বড় প্রমাণ এই রক গার্ডেন।






