১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের অভিযোগে অমর শহীদ বন্ধু সিংকে ডুমুর গাছ থেকে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় এক কিংবদন্তি জন্ম নেয়। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, অমর সিংকে ফাঁসি দিতে গিয়ে ইংরেজরা সাতবারের চেষ্টায় সফল হয়েছিল এবং অমরের মৃত্যুর পর সেই ডুমুর গাছ থেকে রক্ত বেরোতে শুরু করে
মৃত্যুদণ্ডের জন্য ব্যবহূত সবচেয়ে প্রাচীন পদ্ধতি হচ্ছে ফাঁসিতে ঝোলানো। বিশেষত মধ্যযুগ থেকে এ পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়াটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়। তবে এ পদ্ধতিতে অতীতে অনেক সময়ই দণ্ডপ্রাপ্তের মৃত্যু ঘটত না, ফাঁসি দেয়ার পরও বেঁচে যাওয়ার ইতিহাস আছে। কিন্তু তার পরও বহু শতক ধরে এ পদ্ধতি অপরিবর্তিত ছিল। ফাঁসি দিলে কীভাবে মানুষের মৃত্যু হয়, তার সুনির্দিষ্ট প্যাথোসাইকোলজিক্যাল প্রক্রিয়া উদ্ভাবিত হয় উনিশ শতকের শুরুর দিকে। মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত আত্মহত্যার জন্য গলায় ফাঁস নেয়াটা দুনিয়াজুড়েই দেখা যায়।
ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রথম লিখিত বিবরণীটি পাওয়া যায় গ্রিক কবি হোমারের মহাকাব্য ওডেসিতে। আর ওডেসি লেখা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৬০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। নায়ক অডিসিয়াস ও তার স্ত্রী পেনেলোপে তাদের ১২ জন চাকরকে ফাঁসি দেয়। এরপর ফাঁসির দৃষ্টান্ত দেখা যায় পঞ্চম শতকে। এ সময় বিভিন্ন জার্মান জাতি রোমান সাম্রাজ্য ও ইংল্যান্ড আক্রমণ করে।
ইউরোপে শাস্তি হিসেবে ফাঁসি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রাজদ্রোহ, ডাকাতি, খুন, দস্যুতার শাস্তি হিসেবে ফাঁসিকে গ্রহণ করা হয়। রাজা অষ্টম হেনরির শাসনামলে তিনি ৭২ হাজার মানুষের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করেন। এ মৃত্যুদণ্ডের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি সুপারিশ করা হয়েছিল, যার মধ্যে ফাঁসিও ছিল। শুধু যে পুরুষদেরই ফাঁসিতে ঝোলানো হতো তা নয়, নারী ও শিশুদেরও দেখা যেত ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে।
ফাঁসি দেয়ার কৌশল দুনিয়ায় জনপ্রিয় করেছিল অ্যাংলো, স্যাক্সন ও জার্মান গোষ্ঠী জুটস। পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্যে আক্রমণ করে তারা এ শাস্তিকে বহুল ব্যবহার করেছিল এবং এ সংস্কৃতি অনেকটাই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে আজকের দুনিয়াতেও। সেই আমলে ফাঁসিকাষ্ঠ ছিল গাছের ডাল, ভুক্তভোগীদের গাছের ডাল থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। এরপর ফাঁসি দেয়ার পদ্ধতিতে নানা ধরনের সংস্কার হলেও মূল কৌশলটি একই রয়ে যায়, আর তা হলো শ্বাসরোধ।
তবে পুরনো দিনে ফাঁসি দেয়ার পর অনেকে বেঁচে যাওয়ারও উদাহরণ আছে। এমনকি আদালতের বিচারে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অনেকেও ফাঁসি দেয়ার পর বেঁচে গেছে। ফাঁসি দেয়ার আদর্শ পদ্ধতির যাত্রা হয় উনিশ শতকে। ১৮৬৬ সালে ডা. স্যামুয়েল হগটন ফাঁসির একটি আদর্শ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যা স্ট্যান্ডার্ড ড্রপ পদ্ধতি নামে পরিচিত। এরপর ১৮৭২ সালে চালু হয় উইলিয়াম মারউডের তথাকথিত লঙ ড্রপ পদ্ধতি। তবে গিঁটের পিছলে যাওয়া রোধ করতে সাবঅরাল গিঁটের পরিবর্তে ঐতিহ্যবাহী সাবমেন্টাল গিঁট ব্যবহার শুরু হলো। সাবঅরাল গিঁটের বেশকিছু দুর্বলতা ছিল। এরপর এ পদ্ধতিকে আরো আদর্শকরণ করেন জন বেরি। এই জন বেরি ছিলেন একজন জল্লাদ, যিনি ফাঁসি কার্যকর করতেন। বেরি ফাঁসি দেয়ার আগে প্রত্যেকজনের জন্য কত উঁচু থেকে ফেলতে হবে, তার আলাদা হিসাব করতেন। লর্ড অ্যাবেরডেয়ারের নেতৃত্বে মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে একটি ব্রিটিশ কমিটি গঠিত হয়, যারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিভিন্ন পদ্ধতি আলোচনা করে। এ কমিটি সাবমেন্টাল গিঁটকেই সুপারিশ করে। ১৯১৩ সালে ফ্রেডেরিক উড জোনস ফাঁসিতে মৃত্যু সম্পর্কে তার আলোচিত কাজ প্রকাশ করেন। তিনিই প্রথম ফাঁসিতে মানুষের শারীরিক বৃত্তান্ত প্রকাশ করেন। তিনি দেখান যে, ঘাড় ভেঙে মানুষের মৃত্যু হয় আর এটা নিশ্চিত হয় লং ড্রপ ও সাবমেন্টাল গিঁটের মাধ্যমে। শ্নেইডার ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম ‘হ্যাঙম্যানস ফ্রাকচার’ টার্মটি ব্যবহার করেন। তিনি বিচারিক ফাঁসি ও মোটরগাড়ি দুর্ঘটনার ফলে মানুষের ঘাড় ভাঙার যে সাদৃশ্য রয়েছে, তা ব্যাখ্যা করেন।
অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, দেড় হাজার বছর ধরে ফাঁসিতে ঝোলানোর পদ্ধতি একই রয়ে গেছে। শুরুতে ফাঁসিকাষ্ঠ ছিল গাছ। জল্লাদ নিজেই বন্দিদের গাছে টেনে তুলত অথবা মই ব্যবহার করা হতো। ১৫৭১ সালে লন্ডনের টাইবার্নে বিখ্যাত ‘ট্রিপল ট্রি’ ফাঁসিকাষ্ঠের প্রচলন ঘটে। এর মাধ্যমে আগের ছোট ফাঁসি কাঠামোর যুগ শেষ হয় এবং এ নতুন কাঠামো ১৭৫৯ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। টাইবার্নে ‘ট্রিপল ট্রি’তে তিনটি লম্বা খাম্বা থাকত (গড়পড়তা ১২ ফুট লম্বা)। এ খাম্বাগুলো মাথায় কড়িকাঠ দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকত। এগুলো ত্রিভুজাকারে যুক্ত থাকত। ফলে তিনটি ফাঁসিকাষ্ঠ তৈরি হতো। ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে বন্দিকে এ ফাঁসিকাষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হতো। গণহারে ফাঁসি দেয়ার জন্য এ ‘ট্রিপল ট্রি’ ব্যবহার করা হতো।
১৬৪৯ সালের ২৩ জুন ২৩ জন পুরুষ ও একজন নারীকে চুরি ও ডাকাতির শাস্তিস্বরূপ ফাঁসি দেয়া হয়। সে সময় ফাঁসি দেয়া হতো প্রকাশ্যে এবং সেই ফাঁসি দেখতে বিপুল মানুষের জমায়েত হতো। আধুনিক গালা ডে টার্মটি এসেছে অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগের ‘গ্যালোজ ডে’ থেকে। ১৭৮৩ সালে বিচারিক ফাঁসি দেয়ার স্থান হয় নিউগেট কারাগার। এখানেই ‘নিউ ড্রপ’ ফাঁসিকাষ্ঠের বিকাশ হয়। নিউগেট গ্যালো ছিল বড় আকারের বাক্সের মতো কাঠামো, ১০ ফুট দীর্ঘ ও ৮ ফুট প্রশস্ত। বাক্সের ওপর দুটি খুঁটিতে দুটি সমান্তরাল দণ্ড যুক্ত থাকে। এ দুই দণ্ড থেকে একসঙ্গে প্রায় ১২ জন বন্দিকে ফাঁসি দেয়া যেত। নিউ ড্রপ গ্যালোজ ঘোড়ার গাড়িতে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেয়া যেত। নিউগেট ফাঁসি দেয়ার আদর্শ ব্যবস্থা হিসেবে জনপ্রিয়তা পায় এবং ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকার কারাগারে এর অনুকরণ করা হতে থাকে।
১৮৮৫ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল অ্যালটন বিমিশকে ইংল্যান্ডের জন্য একটি আদর্শ ফাঁসিকাষ্ঠ তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি যে মঞ্চ তৈরি করেন, তাতে তিনজনকে একসঙ্গে ফাঁসি দেয়া যেত। এতে ছিল ট্র্যাপডোর। একটি ধাতব লিভারের সাহায্যে এ ট্র্যাপডোর খুলে দেয়া হতো এবং তাতে আসামির ফাঁসি কার্যকর হতো। ভিক্টোরীয় আমলের এ নকশা অধিকতর দক্ষভাবে ফাঁসির কাজটি সম্পন্ন করত। এ নতুন পদ্ধতি ও যন্ত্রে প্রথম ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল ১৮৯০ সালে ম্যাথু উইলিয়াম চ্যাডউইকের। এ ফাঁসি অনুষ্ঠিত হয়েছিল লিভারপুলের কার্কডেল কারাগারে। তবে তখনো ফাঁসির কারণে কোনো শারীরিক পরিবর্তনে মানুষের মৃত্যু হতো কিংবা ফাঁসি দেয়ার পর মানুষের মরতে কত সময় লাগে, তা মানুষ জানত না। এ কারণেই বিচারকরা তাদের রায়ে লিখতেন, আসামিকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে আসামিকে অন্তত আধা ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখা হতো এবং একজন সার্জনের দায়িত্ব ছিল আসামির মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে প্রত্যয়নপত্র প্রদান করা। মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে কিনা তা বুঝতে ডাক্তার ফাঁসিতে ঝোলা ব্যক্তির হূত্স্পন্দন পরীক্ষা করতেন। লন্ডনে ১৭৫২ থেকে ১৮০৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে খুনিদের মরদেহ সার্জনদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হতো এবং তারা সেই মরদেহগুলোকে প্রকাশ্যে ব্যবচ্ছেদ করতেন।
ফাঁসিতে মৃত্যু নিশ্চিত হতে সময় লাগছে দেখলে জল্লাদ হস্তক্ষেপ করতেন। তিনি আসামির পা টেনে ধরতেন, দেহকে তুলে আবার ছেড়ে দিতেন কিংবা তার কাঁধে চেপে বসতেন— এসবের উদ্দেশ্য ছিল বন্দির দেহে নিচের দিকে চাপ প্রয়োগ করে তার মৃত্যু দ্রুত নিশ্চিত করা। এত চেষ্টার কারণ ছিল অনেক সময়ই আসামির ফাঁসি নিশ্চিত হতো না, আসামি বেঁচে যেত। জল্লাদ অনেক সময় প্রায়োজন হলে ফাঁসির প্রক্রিয়াটি পুনরাবৃত্তি করত। যেমন জন লি নামে একজন বন্দিকে ১৮৮৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনবার ঝোলানো হয়েছিল। কিন্তু একবারের চেষ্টাও সফল হয়নি। এরপর তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছিল। ফাঁসির ব্যর্থতার পেছনে মূল কারণ ছিল হার্ডওয়্যারের সমস্যা, নয়তো জল্লাদের অদক্ষতা। হার্ডওয়্যারের সমস্যার মধ্যে ছিল দড়ি ছিঁড়ে যাওয়া, ট্র্যাপডোর ঠিকভাবে কাজ না করা। অনেক সময় জল্লাদ মাতাল থাকত, তাই সঠিকভাবে ফাঁসির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করত না। আবার বন্দির গলায় ট্র্যাকেওসটমি থাকলে ফাঁসিতে তার মৃত্যু নিশ্চিত হতো না। এ ট্র্যাকেওসটমির উল্লেখ ঋগ্বেদেও পাওয়া যায়। আর নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও ধারণা না থাকায় অনেক সময়ই নিখুঁত, কার্যকর ও ধারাবাহিক ফল পাওয়া যেত না। ঐতিহাসিক রেকর্ডে এমন অনেক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়, যেখানে ফাঁসি দেয়া ব্যক্তি জীবিত রয়ে গিয়েছিলেন। অনেকে ফাঁসির মঞ্চেই বেঁচে ছিলেন আবার অনেকে ব্যবচ্ছেদের টেবিলে এমনকি গোরস্তানে নেয়ার পথে কফিনের মধ্যেই জীবিত হয়ে উঠেছেন বা বলা ভালো, তিনি মারা যাননি। রাস্তাগুলো ছিল খুবই অমসৃণ আর মরদেহ বহন করা ওয়াগনগুলোতে কোনো শক অ্যাবজরভার ছিল না। তাই যখন মরদেহগুলো এসব ওয়াগনে করে গোরস্তানে নেয়া হতো, তখন রাস্তার ঝাঁকি তাদের শরীরে কৃত্রিম শক দিত এবং তারা জীবন ফিরে পেত। অনেক সময় দণ্ডপ্রাপ্তের বন্ধু-স্বজনরা তার মৃত্যু ঘোষণার পর পরই ডাক্তারদের দিয়ে তার প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা করত। এক্ষেত্রে অনেক সময় ডাক্তাররা মৃত ঘোষিত বন্দিকে অ্যালকোহল বা শক্তিবর্ধক ওষুধ দিতেন। যদি সেই বন্দির শরীরে প্রাণ ফিরত, তাহলে তাকে পুনরায় ফাঁসিতে ঝোলানো হতো অথবা ক্ষমা করে দেয়া হতো আবার অনেক সময় সেই বন্দি দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করত।
ফাঁসির পর বন্দির বেঁচে থাকার সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাটি ঘটেছিল স্কটল্যান্ডে। নিজের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থা গোপন করার দায়ে মার্গারেট ডিকসনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। ১৭২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর এডিনবরার গ্রাসমার্কেটে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। জল্লাদ তার পা ধরে টেনে রেখেছিল এবং দীর্ঘ সময় তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। মার্গারেটের বন্ধুরা ডাক্তারের কাছ থেকে তার মরদেহ নিয়ে যেতে সমর্থ হন। ডাক্তার মরদেহটি ব্যবচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন। মুসেলবার্গে দাফন করতে নিয়ে যাওয়ার সময় মার্গারেটের বন্ধুরা অবাক হয়ে লক্ষ করেন, মার্গারেটের শরীরে প্রাণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গোরস্তানে পৌঁছতে পৌঁছতে মার্গারেট পুরোপুরি জীবিত হয়ে উঠলেন। চারপাশের মানুষজন বিস্ময়ে বলে উঠল, ‘মিরাকল!’ মার্গারেট নতুন করে জীবন শুরু করল এবং পরবর্তী সময়ে তার আরো কয়েক সন্তানেরও জন্ম হয়। আরেকটি চমকপ্রদ বেঁচে ওঠার কাহিনী পাওয়া যায় অক্সফোর্ডশায়ারে। সেখানে স্যার টমাস রিডের বাসার চাকর অ্যানি গ্রিন ফাঁসির পর বেঁচে উঠছিলেন। তখন অ্যানির বয়স ছিল ২২ এবং টমাস রিডের নাতির নির্যাতনে তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। একসময় অ্যানির একটি প্রিম্যাচিউর শিশুর জন্ম হয়। সেই সন্তানকে হত্যার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১৬৫০ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এটা ছিল প্রকাশ্য ফাঁসি। যথারীতি তার দেহ আধা ঘণ্টা ধরে ঝুলিয়ে রাখা হলো। বন্ধুরা তাকে যন্ত্রণা কমাতে তার দেহকে পা ধরে নিচের দিকে টেনে তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে চেষ্টা করেছিল। মৃত ঘোষণার পর অ্যানিকে ডা. উইলিয়াম পেটির (১৬২৩-৮৭) কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডা. পেটি ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগের রিডার। তিনি স্যার টমাস উইলিজের (১৬২৩-৮৭) সহকর্মী ছিলেন। পেটির বাসা ছিল বাকলি হলে। সেখানেই দুজন মিলে অনেক মরদেহের ব্যবচ্ছেদ করতেন। অ্যানির কফিন খোলার পরই দেখা গেল, সে শ্বাস নিচ্ছে। তার গলা থেকে অদ্ভুত ধরনের আওয়াজও শোনা যাচ্ছিল। উইলিস ও পেটি দুজনই তত্ক্ষণাৎ অ্যানিকে সুস্থ করতে চেষ্টা শুরু করলেন। প্রথমে তারা অ্যানির মুখে কিছুটা স্পিরিট ঢেলে দিলেন এবং তারপর মুখের ভেতর পাখির পালক দিয়ে ঘষতে লাগলেন, যেন তার কাশি শুরু হয়। তার হাত-পা ঘষতে শুরু করলেন, যতক্ষণ না অ্যানি চোখ খুলে তাকায়। এরপর তার শরীরকে গরম করার জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়। শেষে তাকে উষ্ণ রাখতে তার বিছানায় একজন নারীকে শুতে দেয়া হয়। এসব ব্যবস্থা নেয়ার ফলে অ্যানি একসময় সুস্থ হতে শুরু করে। ১২ ঘণ্টা পর সে কথা বলার মতো অবস্থায় পৌঁছে যায়। একদিনের মধ্যে অ্যানি প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করে। চারদিনের মাথায় সে শক্ত খাবার খেতে শুরু করে। এক মাসের মাথায় অ্যানি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু ফাঁসি ও পরবর্তীতে বেঁচে ওঠার সংগ্রাম তার স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আদালত তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে। অ্যানির বিয়ে হয় এবং সন্তানের জননীও হয়।
ফাঁসির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মৃত্যুর কয়েকটি কারণ রয়েছে— শ্বাসরোধ, রক্ত সরবরাহে বিঘ্ন ঘটা ও গলার হাড় ভেঙে যাওয়া। আঠারো শতকের শেষভাগ পর্যন্ত মানুষের ধারণা ছিল, ফাঁসিতে শ্বাস বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যায়। এ কারণেই সে আমলে মানুষকে অনেক্ষণ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখা হতো। তবে শ্বাসরোধই ফাঁসিতে মানুষের মৃত্যুর একমাত্র কারণ নয়। ঝুলিয়ে দেয়ার পর মানুষের শরীরের দাপাদাপি দেখে মানুষের মনে ধারণা জন্মেছিল, এটা শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার কারণেই হতো। ১৯০৮ সালে ডা. ফ্রেডেরিক উড জোনস নীল নদের আসওয়ান বাঁধের কাছে ১০০ জন নুবীয় জাতির মানুষের মরদেহ কবর থেকে তুলে পরীক্ষা করেন। এদের সবাইকে রোমান শাসকরা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। ডা. উড পরীক্ষা করে জানান, খুলির ভিত্তি অংশে আঘাতই তাদের মৃত্যুর কারণ। ফাঁসি দিলে গ্রীবার হাড় ভেঙে যাওয়ায় যে মানুষের মৃত্যু হয়, তা প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন এই ডা. ফ্রেডেরিক উড জোনস। ১৯১৩ সালে এ বিষয়ে তিনি তার যুগান্তকারী কাজটি প্রকাশ করেন। রেঙ্গুন কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যাপ্টেন সিএফ ফেজার কর্তৃক সংগৃহীত পাঁচটি মরদেহকে পরীক্ষা করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন। তিনি দেখান, এসব মরদেহে গ্রীবার হাড় ভেঙে যাওয়াটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
এ তো গেল মৃত্যুদণ্ড হিসেবে ফাঁসির কথা। ইতিহাসে ধর্মীয় উৎসর্গেও ফাঁসির রীতির সন্ধান পাওয়া যায়। ভাইকিংরা তাদের দেবতা ওডিনের উদ্দেশে ফাঁসির মাধ্যমে নিজেদের উৎসর্গ করত। ওডিন নিজে ইগড্রাসিল নামে এক পৌরাণিক গাছ থেকে ফাঁসিতে ঝুলে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। আর তাই তার অনুসারীদের অনেকে এ রীতি পালন করত। উত্তর ইউরোপে লৌহ যুগের কিছু মরদেহ পাওয়া গেছে, যেগুলোয় গবেষকরা ফাঁসিজনিত মৃত্যুর আলামত দেখেছেন। ধারণা করা হয়, এগুলো ছিল ধর্মীয় উৎসর্গ।
১৮৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্য দুনিয়ার প্রথম ইংরেজিভাষী সরকার হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রথা রদ করে, তা সে যেকোনো অপরাধই হোক না কেন। তবে একটি অপরাধ এ সুবিধার বাইরে ছিল, সেটা হলো রাজদ্রোহ। বিচারিক ফাঁসি ইংল্যান্ডে রদ করা হয় ১৯৬৫ সালে। আমেরিকায় সর্বশেষ ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার ও ওয়াশিংটনেই শুধু ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নিয়ম চালু আছে। মৃত্যুদণ্ড অমানবিক নাকি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, সেটা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত আছে বা ভবিষ্যতেও চলবে। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রে যুক্ত গবেষকরা মনে করেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসি অন্যতম মানবিক উপায়, যদি সঠিক নিয়ম মেনে তা করা হয়। দুনিয়ার অনেক দেশেই এখনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসি প্রচলিত আছে। এসব দেশের মধ্যে আছে— অস্ট্রেলিয়া, বুলগেরিয়া, ব্রাজিল, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, কানাডা, মিসর, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইরাক, ইসরায়েল, জাপান, জর্ডান, লেবানন, লাইবেরিয়া, মালয়েশিয়া, পর্তুগাল, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, সিরিয়া।
ফাঁসি বলতে সাধারণত গলায় ফাঁস দেয়াটাই বোঝায়। তবে মধ্যযুগের শেষ পর্বে জার্মান ইহুদিদের মধ্যে এক অদ্ভুত ধরনের ফাঁসির রীতি প্রচলিত ছিল। এক্ষেত্রে বন্দি বা অপরাধীকে উল্টো করে ফাঁসি দেয়া হতো, মানে তাকে পা বেঁধে উল্টো করে একটা দণ্ড থেকে ঝুলিয়ে রাখা হতো। তবে বিতর্ক আছে যে এটা মৃত্যুদণ্ড নাকি নির্যাতন করার পদ্ধতি! সাধারণত ইহুদি চোরদের এ শাস্তি দেয়া হতো। ইহুদি ধর্মশাস্ত্রবিদ উলরিখ তার প্রভাবশালী রচনা ‘লায়েনস্পিগেল’-এ উল্টো ফাঁসি সম্পর্কে বিশদ বিবরণী লেখেন—
‘প্রথমে অপরাধী ইহুদিকে পাগল ও হিংস্র কুকুরের মধ্য দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে হবে ফাঁসির মঞ্চে। তারপর তাকে পায়ে দড়ি বা শিকলে বেঁধে ফাঁসির মঞ্চ থেকে ঝুলিয়ে দিতে হবে। নিচে হিংস্র কুকুরগুলোকে ছেড়ে দিতে হবে। এভাবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।’
তবে এ উল্টো ফাঁসি শুধু ইহুদিদের চর্চা ছিল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রথমত. জার্মান ইহুদি ছাড়াও ইউরোপের আরো কিছু এলাকায় এ চর্চার অস্তিত্ব ছিল বলে জানা গেছে। এ পদ্ধতিতে শাস্তি বরাদ্দ ছিল মূলত বিশ্বাসঘাতকদের জন্য। চতুর্দশ শতক থেকে মূলত এ রীতি ইহুদি সম্প্রদায়ের নিজস্ব বলে পরিচিত হতে থাকে। কিন্তু মধ্যযুগের শেষভাগেও এ রীতি উত্তর ও ভূমধ্যসাগরীয় ইউরোপে প্রচলিত ছিল। তবে এ চর্চা মূলত ইহুদিদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল, যা ক্ষেত্রবিশেষে অন্যরাও গ্রহণ করেছিল। জার্মানিতে এভাবে উল্টো ঝুলিয়ে ইহুদিদের ফাঁসির প্রথম নিদর্শনটি পাওয়া যায় ১২৯৬ সালে। এ ধরনের ফাঁসিতে বন্দির মৃত্যু হতো ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ব্যবধানে। কারো ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা আবার কোনো ক্ষেত্রে কয়েক দিনও লাগত। যেমন— ১৫৮৮ সালে জার্মানিতে একটি ঘটনার কথা জানা যায়, যেখানে তিনজন বন্দিকে মৃত্যু নিশ্চিত করতে ছয় থেকে আটদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ শাসকরা যেকোনো বিদ্রোহ দমাতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। এ ফাঁসির সঙ্গে বট ও পিপুল গাছ জড়িয়ে আছে। এ দুই গাছই এ অঞ্চলের হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনদের কাছে ধর্মীয়ভাবে পবিত্র। কিন্তু ব্রিটিশরা এ দুই গাছই ব্যবহার করত স্থানীয়দের ফাঁসি দেয়ার জন্য। আর এক্ষেত্রে অনেক গল্পগাথাও তৈরি হয়েছিল। যেমন— ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের অভিযোগে অমর শহীদ বন্ধু সিংকে ডুমুর গাছ থেকে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় এক কিংবদন্তি জন্ম নেয়। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, অমর সিংকে ফাঁসি দিতে গিয়ে ইংরেজরা সাতবারের চেষ্টায় সফল হয়েছিল এবং অমরের মৃত্যুর পর সেই ডুমুর গাছ থেকে রক্ত বেরোতে শুরু করে।
১৮৬০ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের বেরিলিতে ব্রিটিশরা একটি বটগাছকে ফাঁসিকাষ্ঠ হিসেবে ব্যবহার করে, যেখানে একদিনে একটি মাত্র বটগাছে ২৫৭ জন বিদ্রোহীকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। এভাবে বটগাছকে ব্যবহার করে ফাঁসি দেয়াটা নিছক দণ্ড কার্যকর করা ছিল না, বরং স্থানীয়দের মনে ত্রাস সৃষ্টি করাটাই ছিল উদ্দেশ্য। ১৮৫৭ সালে কানপুরে একটি বিরাটাকার বটগাছ থেকে ১৪৪ জন বিদ্রোহীকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। অনেক সময় এ মরদেহগুলো গাছেই ঝুলিয়ে রাখা হতো পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। কানপুরের ঐতিহাসিক বটগাছটি ২০১০ সালে অবহেলায় মারা যাওয়ার খবর ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সিপাহী বিদ্রোহের সূচনাকারী মঙ্গল পাণ্ডেকে বটগাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। সিপাহী বিদ্রোহের সময় ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের বটগাছে বিদ্রোহীদের ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়।
সূত্র:
দ্য ট্রিজ অব লাইফ দ্যাট বিকেম কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’জ এজেন্ট অব ডেথ, মাইক শানাহান
হ্যাংম্যান’স ফ্র্যাকচার: আ হিস্টরিক্যাল অ্যান্ড বায়োকেমিক্যাল পারস্পেক্টিভ





