টাইফয়েড মেরিকে বাদ দিলে কেবল জ্বর নয়, বিশ শতকের চিকিৎসার ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

টাইফয়েড মেরি নামের ভারে মূল নাম মেরি ম্যালন চাপা পড়ে গেছে। মেরির জন্ম আয়ারল্যান্ডের কুকসটাউন গ্রামে, ২৩ সেপ্টেম্বর ১৮৬৯ সালে। উনিশ শতকের শেষার্ধে আইরিশদের আমেরিকায় অভিবাসনের হিড়িক পড়ে যায়। ১৮৮৩ কিংবা ১৮৮৪— মেরির বয়স ১৪ কিংবা ১৫ বছর, তাকেও অভিবাসী হয়ে আমেরিকায় চলে আসতে হয়। সে আসে চাচা ও চাচির সঙ্গে, নতুন দেশে এসে নিত্যকার জীবনসংগ্রাম শুরু হয় তার। এ-বাড়ি ও-বাড়ি কাজ করে খাবার ও বাসস্থানের সংস্থান হয়। গ্রীষ্মের অবকাশে নিউইয়র্কের সচ্ছল পরিবারগুলো সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি কোথাও অস্থায়ী আবাসন খুঁজে নেয়। বাড়ির মালিকদের জন্য এটা বেশ লাভজনক মৌসুমি ব্যবসা।

১৯০৬ সালে নিউইয়র্কের ব্যাংকার চার্লস হেনরি ওয়ারেন মজার সময় কাটানোর জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে লং আইল্যান্ডের ওয়েস্টার বেতে এলেন এবং জর্জ থম্পসন ও তার স্ত্রীর কাছ থেকে তাদের গ্রীষ্মকালীন বাড়িটি ভাড়া নিয়ে সেখানে উঠলেন। তাদের এখানে অবস্থানের সময় রান্নাবান্নার জন্য মেরি ম্যালনকে নিয়োগ করলেন।

২৭ আগস্ট ১৯০৬, ওয়ারেন পরিবারের মেয়েদের একজন জ্বরে আক্রান্ত হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই মিসেস ওয়ারেন বিছানায় পড়েন। সঙ্গে জ্বরে ককাতে থাকে তাদের সঙ্গে আসা দুজন পরিচারিকাও। তারপর জ্বর এল বাগানের মালিটার, বিছানায় পড়ল ওয়ারেনদের আরো একটি মেয়ে। সব মিলিয়ে ১১ জনের ছয়জনই জ্বর নিয়ে পড়ে আছে। ততদিনে অসুখটাও শনাক্ত হয়ে গেছে— টাইফয়েড।

টাইফয়েড তো ছড়ায় পানিতে, খাবারে। বাড়ির মালিক দুশ্চিন্তায় পড়লেন, টাইফয়েডের এ বিস্তারের উৎস যদি বের করা না যায়, তাহলে এ গ্রীষ্মনিবাস আগামীতে ভাড়া দিতে সমস্যা হবে। কারণটা বের করার জন্য তিনি কয়েকজন অনুসন্ধানী গবেষককে ভাড়া করে আনলেন। তারা পানি সরবরাহসহ অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও উৎস শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলেন।

এবার বাড়ির মালিক জর্জ থম্পসন জর্জ সোপার নামের একজন স্যানেটারি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়োগ করলেন; টাইফয়েড রোগের মহামারী আকারে বিস্তার নিয়ে তিনি আগে কাজ করেছেন। তিনি এসে পানি সরবরাহ থেকে শুরু করে খুঁটিনাটি সব পরীক্ষা করলেন, টাইফয়েডের জীবাণু পেলেন না।

জজ সোপার তার তদন্তের ধারা পাল্টালেন। তিনি মানুষকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন। তার সন্দেহ গিয়ে পড়ল তিন সপ্তাহ আগে এ বাড়ির কাজ ছেড়ে যাওয়া কুক মেরি ম্যালনের ওপর।

এ তো কেবল সন্দেহ! তিনি আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য মেরির চাকরির ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করতে শুরু করলেন— কবে কোথায় রান্নার কাজ করেছে, সেসব বাড়িতে রোগবালাইয়ের কী পরিস্থিতি, ঠিকানা ধরে ধরে গবেষণা শুরু করলেন।

তিনি মেরি ম্যালনের আরো খোঁজ নিলেন। প্রায় ১৫ বছর বয়সে এ দেশে আসা মেয়েটি কাজের মেয়ে হিসেবেই এ-বাড়ি ও-বাড়ি করতে করতে বুঝতে পারে রান্নায় তার হাত ভালো। সে কুক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সাধারণ কাজের মেয়ের চেয়ে দক্ষ কুকের আয়-রোজগার বরাবরই বেশি।

জর্জ সোপার ১৯০০ সাল থেকে পরীক্ষা করে দেখলেন মেরি যে বাড়িতে কাজ করেছে, সে বাড়িতেই মানুষজন টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছে।

তিনি টাইফয়েড আক্রান্ত ২২ জনের কথা জানতে পারেন, তাদের মধ্যে একটি বালিকার মৃত্যুও ঘটেছে। সবার ক্ষেত্রেই মেরি রান্নার কাজে যোগ দেয়ার অল্প কয়েক দিনের মধ্যে টাইফয়েড দেখা দিয়েছে। জর্জ সোপার আরো নিশ্চিত হলেন যে টাইফয়েডের ক্যারিয়ার— রোগজীবাণু বহনকারী মেরি ম্যালনই।

কিন্তু এটাও তো প্রায় অনুমানই বলা যায়। এবার তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ দিয়ে নিশ্চিত করতে চান টাইফয়েডের মূলে রয়েছে এ অভিবাসী আইরিশ নারী।

নিশ্চিত প্রমাণ মিলবে তার রক্ত ও মলের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু তাকেই বা কোথায় পাবেন আর এ নমুনাই বা কেমন করে সংগ্রহ করবেন।

সোপার ১৯০৭ সালের মার্চে মেরিকে খুঁজে বের করলেন। তখন সে ওয়াল্টার বাওয়েন পরিবারের কুক। সোপার তার কর্মক্ষেত্রে গিয়ে পরীক্ষা করানোর জন্য নমুনা চাইলেন।

‘এ বাড়ির রান্নাঘরে মেরির সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয়। যতটা সম্ভব কূটনীতিকের মতো আমি এগোই। একসময় আমি বলি যে তার কারণে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে বলে আমি সন্দেহ করছি। ব্যাপারটা সত্যি কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার মূত্র, মল ও রক্তের নমুনা দরকার, পরীক্ষা করতে হবে। আমার প্রস্তাব শুনে ক্ষুব্ধ হতে মেরি সময় নেয়নি। সে বড় কাঁটা চামচ নিয়ে আমার দিকে তেড়ে এল, আমি লম্বা ও অপরিসর হলরুমের ভেতর দিয়ে ছুটলাম। উঁচু গেট পেরিয়ে রাস্তায় পড়লাম। আমি যে তার আক্রমণ থেকে বেঁচে আসতে পেরেছি, সেজন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করলাম।’

মেরি ম্যালনের সহিংস প্রতিক্রিয়া জর্জ সোপারকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এবার তাকে অনুসরণ করতে করতে তার বাড়ি খুঁজে বের করলেন। ডাক্তার বার্ট র্যায়মন্ড হুবলারকে তার সহকারী হিসেবে দলে ভেড়ালেন। আবার মেরির কাছে গেলেন। ক্ষুব্ধ মেরি চিত্কার ও চেঁচামেচি করে, গাল দিয়ে বুঝিয়ে দিল যে তারা কোনোভাবেই স্বাগত নয়।

জর্জ সোপার বুঝতে পারলেন মেরির কাছে পৌঁছতে হলে অন্য পথ ধরতে হবে। টাইফয়েড ও মেরিকে নিয়ে তার যে অনুমান, তা লিখিত প্রবন্ধ আকারে এবং মেরিই যে টাইফয়েডের ‘ক্যারিয়ার’, তা হাইপোথিসিস হিসেবে নিউইয়র্ক স্বাস্থ্য বিভাগের হারমান বিগসের কাছে দাখিল করলেন। তাকে বোঝালেন, যুক্তি দিলেন এবং এক পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা তার হাইপোথিসিসের সঙ্গে অনেকটা একমত হলেন। তিনি একজন মহিলা ডাক্তার জোসেফিন বেকারকে মেরি ম্যালনের কাছে পাঠালেন।

মেরি ডাক্তার জোসেফিনকে পাত্তাই দিল না। ভয়ঙ্কর আগ্রাসী আচরণ তার। কোনো কথাই শুনতে চায় না। জোসেফিন ফিরে গিয়ে তাকে সহায়তার জন্য পুলিশ চাইলেন।

পাঁচজন পুলিশ সদস্যের একটি টিম ও একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আবার হাজির হলেন তার বাড়িতে।&dquote;&dquote;

হাতে ছুরি নিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে মেরি, দ্বন্দ্বযুদ্ধে এখনই ঝাঁপিয়ে পড়বে এভাবেই সে প্রস্তুত। জোসেফিন বলেছেন, আমাকে দেখেই কাঁটা চামচ তাক করে ছুটে এল, আমি তাড়াতাড়ি পিছিয়ে গিয়ে পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে আবার ফিরে এসে হতভম্ব হয়ে যাই। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখি মেরি ম্যালন নেই, নিরুদ্দিষ্ট হয়ে গেছে। নিরুদ্দিষ্ট বলাই যথেষ্ট নয়, কয়েক মিনিটের মধ্যে সে সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে গেছে।

জোসেফিন নিজে ঘর তল্লাশি করলেন, পুলিশ সদস্যরা সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করলেন। মেরি সত্যিই নেই। হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল পায়ের ছাপ, ঘরের বাইরে একটি দেয়ালের কাছে একটি চেয়ার পাতা, পায়ের পাতার চিহ্ন সে পর্যন্ত। তাহলে কি সে দেয়াল টপকে পালিয়েছে। কোথায়? দেয়ালের ওপারে তার এক প্রতিবেশীর বাড়ি। ৫ ঘণ্টা তল্লাশির পর সিঁড়ির কাছের একটি আলমারির ওপর দিকের দরজায় দেখা গেল একটি কাপড়ের একাংশ আটকে আছে।

জোসিফিনের বর্ণনা:

ভীষণ সাহস ও দক্ষতার সঙ্গে ভয়ঙ্কর লড়াকু হয়ে গালাগাল দিতে দিতে আলমারির ভেতর থেকে মেরি আবির্ভূত হলো। আমি তাকে শান্ত হয়ে আমার কথা শোনার এবং নমুনাগুলো পরীক্ষা করার জন্য দেয়ার অনুরোধ করতে থাকি, তবু কাজ হলো না। কিন্তু যখন বুঝতে পারল পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যাবে এবং তার সাজা হবে, তখন বলল, তার কখনো টাইফয়েডই হয়নি, তাহলে কেমন করে সে টাইফয়েডের ক্যারিয়ার হবে? আবার সে উন্মত্ত আচরণ শুরু করে দিল। বাধ্য হয়ে পুলিশকে দিয়ে তাকে ধরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছতে পুরোটা পথ তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পুলিশ তার গায়ের ওপর বসেই রইল। পুরো ব্যাপারটা ক্ষুব্ধ সিংহকে খাঁচায় ভরার মতো একটা ঘটনা।

মেরি ম্যালনকে নিউইয়র্কের উইলার্ড প্যাকার হাসপাতালে নেয়া হলো। তার সব ধরনের নমুনা সংগ্রহ করা হলো। তার মনে আবিষ্কৃত হলো, টাইফয়েড ব্যাসিলি— টাইফয়েডের জীবাণু। স্বাস্থ্য বিভাগ মেরিকে পাঠিয়ে দিল নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডের একটি বিচ্ছিন্ন কটেজে। এ কটেজ হাসপাতালেরই একটি দূরবর্তী বর্ধিত অংশ।

* * *

ম্যারি ম্যালনকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পুলিশ দিয়ে জোর খাটিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং কোনো রকম বিচার না করে আদালতের কোনো আদেশ ছাড়াই তাকে আটকে রেখেছে।

সরকার কি এমনটা করতে পারে? এমন নিঃসঙ্গ কারাবাস! সে তো কোনো আইন অমান্য করেনি।

এর সহজ উত্তর নেই।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ডের আইনি যৌক্তিকতা দেখাতে গ্রেটার নিউইয়র্ক চার্টারের ১১৬৯ এবং ১১৭০ ধারার আশ্রয় নিলেন।

১১৬৯ ধারায় বলা হয়েছে, সমাজের সদস্য ঘাতক রোগবালাই থেকে রক্ষা করার জন্য স্বাস্থ্য বোর্ড যুক্তিসম্মত যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারে।

১১৭০ ধারা অনুযায়ী ছোঁয়াচে ও হুমকি সৃষ্টিকারী রোগে আক্রান্ত রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে কোনো নিরাপদ স্থানে আবদ্ধ রাখতে পারে যেন তার সংস্পর্শ সুস্থ কাউকে আক্রান্ত করতে না পারে। রোগীকে হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণে বিশেষভাবে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে।

স্বাস্থ্যবান মানুষ যে রোগের বাহক হতে পারে, এই সত্য আবিষ্কৃত হওয়ার আগে এ চার্টার প্রণয়ন করা হয়েছে। কাজেই মেরি ম্যালনের মতো নীরোগ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী একজন নারীকে আটকে রাখা কি অন্যায্য নয়? এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বললেন, স্বাস্থ্যবান ক্যারিয়ার অসুস্থ ক্যারিয়ারের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক।

মেরি ম্যালন বিশ্বাস করল, অন্যায়ভাবে তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। সে কেমন করে রোগ বিস্তার করবে এবং কেমন করে সে রোগে মানুষের মৃত্যু হবে, তা বুঝতে পারল না।

মেরি বলল: আমি কখনো টাইফয়েডে আক্রান্ত হইনি, আমার স্বাস্থ্য সবসময়ই ভালো। আমাকে কেন কুষ্ঠ রোগীর মতো সমাজচ্যুত করে কেবল একটি মাত্র কুকুরের সান্নিধ্যে নিঃসঙ্গভাবে বন্দি করে রাখা হবে?

দুই বছর নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডে নিঃসঙ্গ জীবনযাপনের পর ১৯০৯ সালে মেরি স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধে মামলা করে। স্বাস্থ্য বিভাগ দুই বছরে মেরির ১৬৩টি নমুনা মলের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে ১২০টিতে টাইফয়েড জীবাণু পেল। এদিকে মেরি নিজেও প্রাইভেট ক্লিনিকে নমুনা পাঠিয়ে পরীক্ষা করে ‘নেগেটিভ’ ফল পেল অর্থাৎ সে টাইফয়েড জীবাণু বহন করছে না।

মেরি করুণ আবেদনে বলল, আমি নিরপরাধ মানুষ, আমি কোনো অন্যায় করিনি, অথচ আমার সঙ্গে সমাজচ্যুত মানুষের আচরণ করা হচ্ছে, যেন আমি অপরাধী। এটা অন্যায়, বর্বর এবং অসভ্য কাজ। খ্রিস্টান সমাজের প্রতিরক্ষাহীন একজন নারী এমন আচরণ পেতে পারে না।

স্বাস্থ্য বিভাগের যুক্তি— সুস্থ মানুষের খাবার যারা নাড়াচাড়া করে, তাদের কেউ টাইফয়েড ক্যারিয়ার হলে অসুখ তারাই ছড়ায়।

বিচারক রায় দিলেন স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে। ততদিনে গোটা আমেরিকা তার নাম জেনে গেছে— মেরি ম্যালন হয়ে গেছে টাইফয়েড মেরি।

নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডের জনবিচ্ছিন্ন কটেজ থেকে তার মুক্তির সম্ভাবনা কমে গেল। মেরির আপিলে আরো এক বছর পর ১৯১০ সালে নতুন যোগ দেয়া হেলথ কমিশনার আর্নস্ট লেডার্লি এ শর্তে তাকে মুক্তি দিলেন যে, মেরি আর কখনো কোথাও কুক হিসেবে কাজ করবে না, অন্যের জন্য রান্না করবে না। হেলথ কমিশনার তাকে নিউইয়র্ক স্বাস্থ্য বোর্ডের হেফাজতে রিমান্ডে মুক্তি দিলেন।

বন্দিদশা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মেরি যেকোনো শর্ত মেনে চলতে অঙ্গীকার করতে প্রস্তুত। সে শর্ত অনুযায়ী শপথনামা সই করে জানিয়ে দিল, সে আর কুক হিসেবে কাজ করবে না। ভিন্ন কোনো পেশায় চাকরি খুঁজবে।

মেরি কিছুদিন ধোপার কাজ করতে চেষ্টা করল। কিন্তু তা কুকের মতো আকর্ষণীয় ও ভালো বেতনের নয়। তাছাড়া সে টাইফয়েড ছড়াতে পারে, এমন দাবি তার কাছে বরাবরই ‘গাঁজাখুরি’ মনে হয়েছে। বোর্ডের দৃষ্টির আড়ালে টাইফয়েড মেরি আবার কুকের চাকরিতেই ফিরে গেল।

                              * * *

মেরির মুক্তির প্রায় পাঁচ বছর পর ১৯১৫ সালে ম্যানহাটনের স্লোয়ান মেটার্নিটি হাসপাতালে টাইফয়েড মহামারী দেখা দিল। ২৫ জন রোগীর দুজন মারাও গেল।&dquote;&dquote;

এ রোগীদের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেল, তাদের কুক জনৈক মিসেস মেরি ব্রাউন।

আরো গভীর তদন্তে বেরিয়ে এল মিসেস ব্রাউন আসলে মেরি ম্যান— টাইফয়েড মেরি।

প্রথম অন্তরীণের সময় তার প্রতি জনসমর্থন ও সহানুভূতি ছিল, এটাকে সবাই সরকারের রোগ দমনে ব্যর্থতা ও স্বাস্থ্য বিভাগের স্বৈরাচার হিসেবে দেখেছে। কিন্তু মিসেস ব্রাউনই যে টাইফয়েড মেরি, এটা প্রকাশিত হওয়ার পর সহানুভূতি উবে গেল। একসময় যারা তার মুক্তি দাবি করেছেন, তারা মনে করলেন— মেরিই আসল ‘শয়তান’; সে জেনেশুনে মানুষকে টাইফয়েডের মতো ভয়ঙ্কর রোগে ভোগাচ্ছে। সুতরাং সে অপরাধীই।

আবার তাকে ধরা হলো। পাঠিয়ে দেয়া হলো নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ কটেজে। ১৯৩২ সালে বড় ধরনের স্ট্রোকে মেরি প্যারালাইজড হয়ে যায়। আরো ছয় বছর পর ১১ নভেম্বর ১৯৩৮ সালে টাইফয়েড মেরি হাসপাতালের শিশুবিভাগে একটি বিচ্ছিন্ন বেডে মারা যায়। ১৯২২ থেকে মেরি এ দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত একটি যক্ষ্মা হাসপাতালে সহযোগী নার্স হিসেবে কিছুদিন কাজ করে। তবে তাকে কোনো কিচেনেই ঢুকতে দেয়া হতো না, কেবল নিজের রান্নাটুকু সেই নিঃসঙ্গ কটেজের চুলায় করতে পারত।

১৮৮০ সালে কার্ল লিবারমিস্টার আবিষ্কার করেন সালমোনেলা টাইফি নামের যে মাইক্রোঅর্গানিজম টাইফয়েড সৃষ্টির জন্য দায়ী, তা রোগীর মলে স্পর্শ লাগা পানিবাহিত হয়ে নতুন রোগী সৃষ্টি করে। কার্ল জোসেফ এবার্থ তারও আগে ১৮৭৯ সালে আবিষ্কার করেন যে উদরের লস্ফি নোড ও প্লীহায় টাইফয়েড জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে। জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কোচ এ আবিষ্কারটির নিশ্চয়ন করেন। মেরির ক্ষেত্রে মনে করা হয়, তার রান্না করা খাবারে জীবাণু বেঁধে থাকার কথা নয়, কিন্তু যখন হাত দিয়ে খাবার পরিবেশন করেছে, বিশেষ করে যখন পিচ ফল কেটে আইসক্রিমের সঙ্গে মিশিয়ে ওয়ারেন পরিবারের সদস্যদের দিয়েছে, ঘটনাটা ঘটেছে তখন। ১৯১১ সালের আগে টাইফয়েডের কোনো টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। ১৯৩৮-এর আগে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের সুযোগও ছিল না।

মেরি ম্যালনকে তিনটি মৃত্যু এবং ৪৭টি অসুস্থতার জন্য দায়ী করা হয়। যদিও টনি লেবেলা নামের স্বাস্থ্যবান একজন টাইফয়েড জীবাণু ক্যারিয়ারের কারণে পাঁচটি মৃত্যু ঘটেছে এবং ১২২ জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এসেছে। আলফোস কোটিস নামের এক বেকারি মালিকও স্বাস্থ্যবান ক্যারিয়ার হিসেবে ধরা পড়েছেন। টনি লেবেলাকে মাত্র দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টাইনে রেখে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর আলফোঁস যখন প্রতিজ্ঞা করল খাবারে হাত দেবে না, তাকেও ছেড়ে দেয়া হলো।

কিন্তু মেরি ম্যালনকে পরিচিত হতে হলো টাইফয়েড মেরি হিসেবে। ২৬ বছর নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে হয়েছে, প্রথমবার ধরা পড়ার পর একজন পুলিশ তাকে খুব মারধর করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের আচরণ বরাবরই অসৌজন্যমূলক ছিল। আবার একই সঙ্গে এটাও সত্য, মেরির ঔদ্ধত্য তাকে শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত করে রেখেছে।

অন্তরীণ মেরি স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধে যে মামলা করেছে, সে টাকা কোত্থেকে এসেছে— এ প্রশ্নের জবাব মিলেছে পরে। সংবাদপত্র টাইকুন উইলিয়াম র্যানডলফ হার্স্ট এ টাকা জুগিয়েছেন। কেবল টাইফয়েড জ্বরের নয়, চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে রোগের জীবাণুর বাহক হওয়ার অপরাধে এত বড় শাস্তির দ্বিতীয় কোনো নজির নেই।