আমি তো আমার জামাইরে নিজের মতো করে গড়ে নিছি’— মুখরোচক ও সুস্বাদু দাম্পত্য আলাপের প্রসঙ্গে এমনই গৌরবদীপ্ত আত্মপ্রসাদ মেশানো বাক্য ছুড়ে শ্রোতাদের চোখে ঈর্ষার আভা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিল সে। ছক্কা চেলে লুডু প্লেয়ার যে রকম আত্মপ্রসাদে পরের প্লেয়ারের কাছে দান হস্তান্তর করে, সে রকম দাও মারা চেহারা তখন তার। এরপর ফিরিস্তিও দিতে থাকে, তার ‘জামাই’য়ের স্বভাবের কোন কোন আগাছাসুলভ বৈশিষ্ট্যকে সে দক্ষ কৃষকের মতো নিড়ানি দিয়ে উপড়ে ফেলেছে। জামাই একসময় গানবাজনা, নাটকফাটক করত, তাতে নিয়মিত টিএসসি ফিএসসি যেতে হতো আবার বাসায়ও বিস্তর লোকের আনাগোনা হতো; কাজেই ওসব তার পছন্দ নয়। আবার সে গাছ লাগাতে পছন্দ করত। ঘরে বারান্দায় রাজ্যের গাছ দিয়ে ভরিয়ে ফেলত। মশার দোহাই দিয়ে সেসবও তাড়িয়েছে। তার প্রতাপে মাটির শোপিস দিয়ে ঘরের আনাচে-কানাচে ভরে ফেলার ভীমরতিও ছেড়েছে জামাই। এখন সে পুরোপুরি আগাছামুক্ত ফসল ফলানো আবাদি জমি— সহকর্মীদের আলাপ থেকে এসব জীবনমুখী উপকরণ আহরণ করেছিল দীপিতা। যিনি সেদিন গৌরবময় আলাপের মধ্যমণি ছিলেন, সেই যৌবন-উত্তীর্ণ সহকর্মী ওকেও একদিন উপদেশ দিয়েছিল, বিয়ের প্রথম থেকেই যেন জামাইকে নিজের মতো করে গড়ে নেয়। দীপিতা সে উপদেশ ফেলে দিতে পারেনি। পুরোপুরি সচেতনভাবে না হলেও সংরক্ষণ করেছিল।
তার বছর দুই পরই সে রেজাকে বিয়ে করে। অনেকটা দুম করেই। অল্প দিনের আলাপ-পরিচয়েই তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ের জন্য দীপিতাকে পরিবারছিন্ন হতে হয়। হওয়াটাই অনিবার্য ছিল। কারণ তার ব্রাহ্মণ মা-বাবার কাছে তাদের মেয়ের একটা মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করার ঘটনাটি অচিন্তনীয়। দীপিতা রেজাকে বিয়ে করেছিল যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো হলো. প্রথমত ধর্ম নিয়ে রেজার অতটা মাথাব্যথা নেই। নিজের ধর্ম পালন করলেও ও বাদ সাধবে না। রেজা অন্য ছেলেদের থেকে আলাদা। খুব ডোমিনেটিং হাজব্যান্ড হয়ে যাবে বলে মনে হয়নি দীপিতার। ওর আগের সম্পর্ক নিয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন করেনি, জানতে চায়নি কিছুই। তাছাড়া রেজা পড়তে ভালোবাসে, টুকটাক লেখালেখিও করে। কাজেই সংসারের ব্যাপারে খুব নাক গলাতে আসবে দীপিতার মনে হয়নি। সংসারটা সে নিজের মতো সাজিয়ে নিতে পারবে। অবশ্য এ রকম ছেলেরা যে একটু বেখেয়ালি হয়, এটাও সে ভেবেছে। কিন্তু মস্তিষ্ক ধরে রেখেছিল পুরনো সহকর্মীর উপদেশ, ‘জামাইরে নিজের মতো গড়ে নিবা।’ এসব হিসাব-নিকাশ করে গড়ে নেয়ার সক্ষমতার ওপর বাকি ভরসা রেখে রেজাকে সে চূড়ান্ত নির্বাচন করে। পরিবার-ধর্ম-সমাজ ছেড়ে রেজার সঙ্গে ঘর বাঁধে। ততদিনে পুরনো চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছে। তাই বিয়ের পর রেজাই হয়ে ওঠে তার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু।
এতে লাভ-ক্ষতি দুটোই হয়। রেজা দীপিতার ভালোবাসার প্রাবল্যে খড়কুটোর মতো ভাসতে থাকে। আবার হাসফাসও করে ভেতরে ভেতরে। এই যেমন বাসায় ফিরতে দেরি হলে দীপিতা অস্থির হয়ে যায়। অদ্ভুত কারণে রেজাকে ও এক ধরনের নিশ্চুপ পাহারায় রাখে। রেজা কখনো ওর আগের সম্পর্ক নিয়ে কিছুই জানতে চায়নি। অধিকাংশ ছেলের যেমন খুঁতখুঁত থাকে— বউয়ের পুরনো প্রেমিক বউকে ছুয়েছিল কিনা, কোথায় ছুয়েছিল, চুমুটুমু দিয়েছিল কিনা, আরো কিছু করেনি তো... রেজা এগুলো নিয়ে কোনোদিন মাথা ঘামায়নি। তাই ওকে দীপিতা পুরনো সম্পর্ক-প্রেম বা নারী নিয়ে সন্দেহ করবে, সেটা কোনোভাবেই ভাবতে পারেনি। কিন্তু ও সেটা করছে। রেজা নিঃশঙ্কোচে তার জীবনের ভালোলাগা-আধো ভালোলাগা-প্রেম খুঁটিনাটি সব নারীঘটিত বৃত্তান্ত ওকে বিয়ের আগেই বলেছে। তখন দীপিতা হাসি হাসি মুখ করেই শুনেছে। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। কিন্তু কেন যেন বিয়ের পর থেকে ও খুব সন্ত্রস্ত আচরণ করতে শুরু করে। রেজা একসময় মঞ্চে অভিনয় করত। পরে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু যোগাযোগটা আছে। মাঝে মাঝে যায়। হঠাৎ সে খেয়াল করল, গ্রুপের সঙ্গে আড্ডা দিতে যেতে চাইলে দীপিতা নানা ছলে তাকে আটকে রাখছে। প্রথমে বিষয়গুলো ঢাক ঢাক গুড় গুড় থাকলেও পরে স্পষ্ট বেরিয়ে আসতে শুরু করে। একদিন তো রেজাকে ও বলেই বসে, ‘তোমার গ্রুপের ওই মেয়েটাকে দেখতে যাও?’ রেজা এত বেশি বিস্মিত হয় যে, তত্ক্ষণাৎ ওর কথার মানে দাঁড় করাতে পারে না। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে— ‘মানে!’
—মানে আবার কী! আমি বুঝি না ভেবেছ, কেন তুমি দুদিন পরপর ওখানে যাও? তুমি তো এখন আর নাটক করো না, তাহলে ওখানে তোমার কী কাজ!
রেজা এতটা আহত হয় যে, প্রত্যুত্তর করাও অরুচিকর মনে হয় ওর কাছে। এরপর দুদিন অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা ধরে রাখে ওদের লাল-নীল সংসার। দুদিন পর কিছুটা স্বাভাবিক হলেও দীপিতার নজরদারি কমে না। বরং আড়াল ভেঙে যাওয়ায় সেটা আরো জোরালো হয়। তার পর থেকে দেরি হলে সরাসরি জেরা করা, প্রায়ই মোবাইল ঘেঁটে দেখা, ফোনে কথা বলার সময় উত্কর্ণ হয়ে থাকা এসব আর রাখঢাক করে করে না। একদিন তো হুট করে বলে বসে,
—রেজা, তোমার ফেসবুকের পাসওয়ার্ডটা বলো তো।
রেজা বিস্মিত গলায় বলে,
আরে অদ্ভুত! তুমি আমার ফেসবুক পাসওয়ার্ড দিয়ে কী করবে!
দীপিতা সন্দিগ্ধ চোকে তাকায়।
—কেন, আমি তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষ নই? আমার কাছে তোমার গোপনীয়তা কিসের! তাহলে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে, যেজন্য তুমি বলতে চাও না।
রেজা নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। চিত্কার করে ওঠে,
— সবকিছুর একটা সীমা থাকা উচিত দীপিতা! তোমার সমস্যা কী? আমাকে বিশ্বাস করতে না পারলে আমার সঙ্গে থেকো না। এ রকম একটা বিকৃত সম্পর্ককে বয়ে বেড়ানোর তো কোনো কারণ নেই!
দীপিতাকে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ না দিয়ে ও ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
দীপিতার মানসিক অবস্থা বিচার করে শেষ পর্যন্ত নিজেকে প্রবোধ দেয় এই বলে যে, ওর পৃথিবীতে তো সে ছাড়া আর কেউ নেই। তাই হয়তো ও এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। আর সেজন্যই হারিয়ে ফেলার ভয়ে ওকে আরো বেশি করে আটকে রাখতে চায়। স্ত্রীর সন্দেহ বাতিকের এ রকম একটা বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে পেরে রেজা সহজ হয়। সমঝোতা করে। দীপিতাকে বোঝাতে চেষ্টা করে, ওর নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কিছু নেই,
—দেখো দীপ, এমন নয় যে, তুমিই আমার জীবনে আসা একমাত্র নারী। ৩৩ বছর বয়সে তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়। এরপর তোমাকে যদি আমি বলি, আমার জীবনে তুমিই প্রথম। তার মতো মিথ্যা কিছু হতে পারে না। আমি জানি না, সেই মিথ্যায় তুমি সুখী হবে কিনা। এত বড় মিথ্যা দিয়ে তো আমি আমাদের যৌথ জীবন শুরু করতে পারি না! কিন্তু তাই বলে তো এ-ও নয় যে, আমার চারপাশের সব নারীর প্রতিই আমার দুর্বলতা ছিল বা এখনো আছে। দেখো, আমরা যদি পরস্পরকে বিশ্বাস করতে না পারি, তাহলে আমাদের যৌথতা কিসের ওপর ভর করে ঘাড় সোজা করে দাঁড়াবে! আমি তো তোমার পেছনের জীবন নিয়ে কখনো কিছু জানতে চাইনি দীপ।
দীপিতা নিশ্চুপ থাকে। কোনো জবাব দেয় না। রেজার কথা মেনে নিয়েছে কি নেয়নি, বোঝা যায় না। কিন্তু পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। তবে তার স্থায়িত্ব দীর্ঘ হয় না। রেজা ‘সব ঠিক আছে’ এ রকম একটা পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করলেও ক্ষতটা একেবারে মুছতে পারে না। আগের মতো সহজ হতে পারে না। কোথাও গিয়ে দেরি হলে দীপিতা যখন ফোন করে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কোথায়? কখন আসবে?’ তখন আর প্রশ্নগুলোকে আগের মতো সহজ মনে হয় না। মনে হয় এটা আসলে পাহারা। দীপিতা শেষ পর্যন্ত গড়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় কিছুটা সফল হয়। ঝামেলা এড়াতেই রেজা অনেক কিছু দীপিতার পছন্দমতো করতে শুরু করে। বাইরে আড্ডা না দেয়া, চায়ে চিনি না খাওয়া, রাতে ভাত না খাওয়া, ১১টার পর রাত না জাগা— এ রকম ছোটখাটো অনেক বিষয়ের সঙ্গে তার দীর্ঘ অভ্যস্ততার গিঁট সে ঢিলা করতে থাকে। দীপিতা জয়ের উৎসাহে আরো কৌশলী হয়ে ওঠে। কারণ রেজা বলেছে বটে, এখন তার জীবনে অন্য কোনো নারী নেই। কিন্তু সে ভরসা করতে পারে না। অভীকও এমন বলত। পারলে প্রতিদিনই বলত। যদি না হঠাৎ একদিন কী ভেবে রাত ২টায় অভীককে ফোন করে ব্যস্ত না পেত, তাহলে বলেই যেত। অভীকের মিথ্যার দায়ভারই হয়তো রেজাকে নিতে হচ্ছে। আর দীপিতার মা-ও তো কতবার বলেছে, পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই, সবসময় চোখে চোখে রাখতে হয়। কেন বলেছে? পুরুষ সম্পর্কে এমন প্রাজ্ঞতা অর্জনে বাবা কি মাকে সাহায্য করেছিল? বহুদিন ভেবেছে। কিন্তু রহস্য ভেদ করতে পারেনি। মায়ের পুরুষ-দর্শনকেও উপেক্ষা করতে পারেনি। সবকিছু মিলিয়েই হয়তো ওর একটা তৃতীয় চোখের জন্ম হয়েছে। যে চোখ ভালোবাসাকে নজরদারিতে রাখে চেতনে-অবচেতনে। রেজা সবকিছু ঠিকঠাক করছিল বলে দীপিতা বেশ স্বস্তিতেই ছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু যে সাপ লখিন্দরের ঘর চিনেছে, সে কি আর অন্য ঘরে হানা দেবে না!
সেদিন রাতে রেজার লেখার টেবিলের পাশে হঠাৎ করে বিস্ফোরণ ঘটে যায়। আঁৎকে উঠে ছুটে গিয়ে রেজা যা দেখল, সেটা বুঝে উঠতে সময় লাগে বেশ খানিকটা। দীপিতা ছুড়ে ফেলছে পানির বোতল, বই, কলমদানি, মোবাইল, ল্যাপটপ। আর চিত্কার করে বলে যাচ্ছে,
—আমি জানতাম, আমি আগেই জানতাম। ঠক, প্রতারক। আমাকে বলে কিনা আমার জীবনে এখন কেউ নেই... এজন্যই তো, এজন্যই তো ফেসবুকের পাসওয়ার্ড বলতে এত বাহানা...
রেজার মনে হয়, ওর শ্রবণেন্দ্রিয় অক্ষম হয়ে গেছে। উন্মত্ত দীপিতা হাত-পা ছুড়ে আরো কী বলছে ও বুঝতে পারে না। কেবল হাত-পা নাড়া দেখতে পায়। ওর লেখার খাতাগুলো ফ্লোরে স্তূপ করে যখন লাইটারটা জ্বেলে তাতে অগ্নিস্পর্শ করায় দীপিতা, তখনো ও কিছু বলতে পারে না। জিভ-শরীর-মন-মস্তিষ্ক সবকিছুই এত প্রচণ্ড ভারী ঠেকে যে, একচুলও নড়তে পারে না। একটা কথাও উচ্চারণ করতে পারে না। এমনকি যখন দীপিতা রেজার সমস্ত সৃষ্টির দাহকাজ সম্পন্ন করে ‘যাও তুমি যেখানে খুশি; আমিই তো তোমার বাধা— সরিয়ে দিচ্ছি তোমার বাধা...’ এসব বলতে বলতে রান্নাঘরে ছুটে গিয়ে ছুরি তুলে হাতের শিরা কেটে ফেলতে উদ্যত হয়, তখনো সে ঠায় দাঁড়িয়ে। দীপিতার উন্মত্ততা সে মুহূর্তে আকস্মিক মোড় নেয়। হঠাৎ রেজার দিকে ছুটে এসে বলে,
—আমি মরে গেলেও তোমার কিছু আসে যায় না! না? ও তা যাবে কেন!! তোমার তো আরো পথ পরিষ্কার হয়। দীপিতা এবার নিজেকে নয়, রেজাকেই আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। উন্মাদের মতো বলতে থাকে,
—কী ভেবেছিস, আমি মরে তোর পথ পরিষ্কার করে দেব? কিছুতেই না। তোকে শেষ করে তারপর আমি মরব। উন্মত্ততায় দীপিতা আত্মহননকারী বা খুনি হয়ে উঠতে না পারলেও রেজার ডান হাতটা ছুরির আঘাতে চিরে যায়। রক্তপাত একই সঙ্গে দুটো প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে। দীপিতা রেজার হাতে রক্ত দেখে উন্মাদনা ভুলে মাটিতে উবু হয়ে আর্তনাদ করে কাঁদতে শুরু করে, আর রেজা সচলতা ফিরে পেয়ে দীপিতার পাশে বসে ওর পিঠে হাত রাখে। কিন্তু দীপিতার ‘তুমি কেন এমন করলে! কেন?’ কান্নার ভেতর উপর্যুপরি উচ্চারিত এ প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারে না। কারণ তখনো সে নিশ্চিত না, এ আকস্মিক তাণ্ডবের কী কারণ। যতটুকু অনুমান করতে পারছে, হয়তো গত রাতে শুরু করা যে গল্পটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল, সেটা ও পড়েছে। কয়েকটা লাইন লিখে আর এগোতে পারেনি। একটা গল্পের খসড়া এতটা তাণ্ডব বইয়ে দিতে পারে, সেটা কল্পনা করার ক্ষমতা থাকলে হয়তো লিখে সরিয়ে রাখত। কিন্তু খাতাটা টেবিলের ওপরেই খোলা ছিল। কয়েকটা লাইন মাত্র— ‘ফোন বাজছে। নাম নেই। অপরিচিত নম্বর। সত্যি কি অপরিচিত! সেভ করা না থাকলেই কি জীবনে সবচেয়ে বেশিবার ডায়াল করা নম্বরটা অপরিচিত হয়ে যায়! এতদিন পর সুখী! কী ভেবে!’ এরপর আর লেখা হয়নি। দীপিতাকে বলতে পারে না রেজা, ‘ওটা গল্প ছিল দীপ।’ ও বিশ্বাস করবে না। আর তাছাড়া রেজার ইচ্ছেও করে না। দীপিতা কেঁদে ক্লান্ত হলে ওকে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পরই ও ঘুমিয়ে যায়। শরীর হয়তো এতটা ধকলে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে। রেজা কী করবে ভেবে পায় না। পালিয়ে যেতে ভীষণ ইচ্ছে করে। জীবন থেকে না, বাঁচতে ও ভীষণ ভালোবাসে। পালাতে ইচ্ছে করে জনজীবন থেকে।
দীপিতা ঘুমের মধ্যেও বারবার চমকে উঠছিল বলে ওকে ধরে শুয়ে ছিল রেজা। কখন তন্দ্রা এসে গেছে টের পায়নি। হঠাৎ অনুভব করে ও, পাহাড়ের চূড়ায় একটা গাছের ডাল ধরে শূন্যে ঝুলে আছে। ডান হাত দিয়ে গাছের ডালটা ধরে আছে আর বাঁ হাতে দীপিতার হাত। দীপিতার হাত ছেড়ে দিলে ও ডালটা ধরে উঠে যেতে পারে। কিন্তু না ছাড়লে ও এক হাতে দুটো মানুষের ভার খুব বেশিক্ষণ বইতে পারবে না। রেজা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, সে কি দীপিতার হাত ছেড়ে দুই হাতে ডালটা ধরে বেঁচে যাওয়ার চেষ্টা করবে। নাকি দুজনই শূন্যে ঝুলতে ঝুলতে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করবে। এ দোদুল্যমানতায় ছটফট করতে করতে রেজার ঘুম ভেঙে যায়, স্বপ্ন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ঘুম ভেঙেও সে ঘামতে থাকে। দীপিতা পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। স্বপ্ন ছিঁড়ে বেরোলেও বাস্তব ছিঁড়ে সে কীভাবে বেরোবে!





