ডিন কুনেজর বইটির নাম ‘দি আইজ অব ডার্কনেস’—অন্ধকারের চোখ। প্রকাশিত হলেই তখন তার বই নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার্স লিস্টে চলে যায়। কারণ তিনি তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ঘরানার ঔপন্যাসিক নন, তার লেখায় একসঙ্গে অনেক ধরনের স্বাদ মেলে: হরর, ফ্যান্টাসি, সায়েন্স ফিকশন, মিস্ট্রি, স্যাটায়ার—আর ঠাস বুনটের একটি গল্প তো থাকবেই। বইটি প্রকাশিত হলো ১৯৮১ সালে। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে, অনেক সংস্করণ হয়েছে। প্রায় চার দশক পর বইটির আবার পুনরুজ্জীবন ঘটল। ঘটাল একালের প্যানডেমিক করোনাভাইরাস। বলা হলো, ৩৯ বছর আগেই ডিন কুনত্জ সঠিকভাবেই এ মারাত্মক প্রাণঘাতী ভাইরাসের উদ্ভব ও ছড়িয়ে পড়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তার বইয়ের একটি পৃষ্ঠা একালের ভাষায় ‘ভাইরাল’ হয়ে গেল। প্রশ্ন উঠল, একজন লেখক যদি এত বছর আগে করোনাভাইরাস নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যেতে পারেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও ব্যবস্থাপকরা কি এতদিন কেবল আঙুলই চুষেছেন?

 

ডিন রে কুনত্জ

জন্ম ৯ জুলাই ১৯৪৫ যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে। বাবা র্যায়মন্ড কুনত্জ সার্বক্ষণিক মাতাল, ছেলেকে বেদম পেটাতেন, মা ফ্লোরেন্স খর্বাকৃতির নারী, স্বামীর সামনে দাঁড়ানোর মতো সাহস তার ছিল না। ডিন কুনত্জ পেনসিলভানিয়ার শিপেনসবার্গ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় মাসিক আটলান্টিক ম্যাগাজিনের ফিকশন কম্পিটিশনে জয়ী হয়ে লেখক জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিছুকাল স্কুলে ইংরেজি পড়িয়েছেন, একটি দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে কাজ করার সময় গরিব শিশুদের উন্নয়নের নামে রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর যে প্রতারণা তা প্রত্যক্ষ করেন—কল্যাণকামিতার উল্টো দিকটা তার কাছে স্পষ্ট হতে থাকে।

তিনি পুরোদস্তুর লেখালেখির জীবন বেছে নেন—বই থেকে যাদের বছরে গড়পড়তা ২৫ মিলিয়ন ডলার আয় হয়, তিনি তাদের একজন। বাজারে কেটেছে তার ৪৫ কোটি বই। এক জীবনে বহু ছদ্মনামে লিখতেন। টাকার জন্য তার পূর্ণকালীন লেখাজীবনের প্রথম ছয় বছর প্রচুর আজেবাজে বিষয় নিয়ে লিখেছেন, এমনকি পর্নো সাহিত্য আমাদের ভাষায় চটি বইও লিখেছেন। অন্তত ১১টি ছদ্মনামে তার বই প্রকাশিত হয়েছে। নামগুলো হচ্ছে লেমার্দ ক্রুস, ডেভিড অ্যাক্সটন, ভেনা ডয়ার, কে আর ডয়ার, লি নিকোলস, ব্রায়ান কফি, অ্যারন ওলফ, রিচার্ড পেইজ, অ্যান্থনি নর্থ, ওয়েন ওয়েস্ট ও জন হিল।

পর্নো কাহিনী রচনায় তার সহলেখক ছিলেন তার স্ত্রী গার্ভা। তার ১৮টি উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে হলিউড সিনেমা বানিয়েছে। ডিন কুনত্জ বলেছেন, তার প্রধান লক্ষ্য প্রকাশক তাকে যে টাকা দেন, পাঠক যে টাকা দিয়ে বই কেনেন—তারা যেন মনে না করেন যে ঠকেছেন।


 

ডিন কুনেজর ভাইরাস

দি আইস অব ডার্কনেসে উদ্ভাবিত ঘাতক ভাইরাসটির নাম উহান ৪০০। উপন্যাসের একটি চরিত্র ডনবি একজন চীন দেশীয় বৈজ্ঞানিকের কথা বলছেন, যিনি উহান ৪০০ নামের ভাইরাস আমেরিকায় এনেছেন, এটি ঘাতক বায়োলজিক্যাল উইপন।

ডনবি বললেন, এটা বোঝার জন্য তোমাকে কুড়ি মাস পেছনে যেতে হবে। সে সময় লি চেন নামের একজন চীনা বিজ্ঞানী চীনের এক দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়ংকর নতুন এক বায়োলজিক্যাল উইপন ডিস্কেট রেকর্ডে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছে। তারা এটাকে বলছে উহান ৪০০। কারণ ওহান শহরের বাইরে তাদের আর ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে এটা তৈরি করা হয়েছে, সেই গবেষণাকেন্দ্রে মানুষের তৈরি মাইক্রোঅর্গানিজমের তালিকার এটি ৪০০তম।

আরডিএনএ: রিকম্বিন্যান্ট ডি-অক্সিরিবোনিউক্লিক অ্যাসিড (সুপ্রজন বিদ্যায় রিকম্বিনেশন, যেমন মলিকিউলার ক্লোনিং)

সাউথ চায়না মর্নি, পোস্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দি আইস অব ডার্কনেসের ১৯৮১ মূল সংস্করণে এ ঘাতকের নাম রাখা হয়েছিল গোর্কি ৪০০, রাশিয়ার গোর্কি অঞ্চলের নামে। বিশ্বরাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনের কারণে ১৯৮৯-এর সংস্করণ থেকে এর নাম বদলে উহান ৪০০ রাখা হয়েছে।

ফিকশনের উহান-৪০০ ল্যাবরেটরিজাত, কিন্তু করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ তা নয়, ২০১৯-এর ডিসেম্বরে চীনের উহানেই এর উদ্ভব ও বিস্তার। কল্পিত উহান-৪০০-এ আক্রান্তের মৃত্যু ১০০ ভাগ নিশ্চিত। করোনায় মৃত্যুহার অনেক কম তিন-চার শতাংশের বেশি নয়। উহান-৪০০-তে নিশ্চিত মৃত্যু সংক্রমিত হওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী বা বস্তুর পক্ষে উহান-৪০০ লালন ও পরিবহন সম্ভব হবে না।

উহান-৪০০-এর ইনকিউবিশন পিরিয়ড ৪ ঘণ্টা। এবং করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে চার-পাঁচদিন থেকে দুই সপ্তাহ।

ডিন কুনেজর উপন্যাসে উহান-৪০০ মস্তিষ্কে আক্রমণ করে। অ্যাসিড যেভাবে জালিকাপড়কে গলিয়ে দেয় উহান-৪০০-এ তেমনিভাবে মস্তিষ্ককে খেয়ে ফেলে। করোনাভাইরাসের প্রাথমিক আক্রমণের লক্ষ্য শ্বসনযন্ত্র। উহান-৪০০ মস্তিষ্ককে দ্রুত অকেজো করে দেয়ায় শরীরের সব স্বয়ংক্রিয় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। করোনাভাইরাসের লক্ষণগুলো হচ্ছে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট।

যেহেতু ফিকশনাল ভাইরাস, তা মোকাবেলা করতে লেখকের তেমন তাড়া ছিল না, তবে বিভিন্ন সূত্র করোনাভাইরাস প্রতিকারের ওষুধ আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। প্রায় শতভাগ রোগমুক্ত করতে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এবং অ্যান্টিবায়োটিক এজিথ্রোমাইসিন দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কোথায় ঠেকে করোনার আঘাত।


 

কিম রবিনসনের ‘দি ইয়ার্স অব রাইস অ্যান্ড সল্ট’

মহামারী প্লেগ পৃথিবীর ইতিহাস কেমন করে বদলে দিতে পারত, তা নিয়ে বহুল আলোচিত একটি ফিকশন রচনা করেছেন আমেরিকান লেখক কিম স্ট্যানলে রবিনসন। যদি প্লেগ নামের কালোমৃত্যু ইউরোপের জনসংখ্যার ৩০ থেকে ৬০ ভাগ হরণ না করে পুরোপুরি ৯৯ ভাগ হরণ করত, তাহলে কী দাঁড়াত। পৃথিবী শাসন করত মুসলমান ও চীন দেশীয়রা।

কিম স্ট্যানলে রবিনসনের জন্ম ২৩ মার্চ ১৯৫২-তে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে। শৈশবেই চলে আসেন উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায়। স্যান ডিয়াগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ১৯৭৪ সাহিত্যপাঠে স্নাতক হন এবং ১৯৭৫-এ বোস্টন থেকে এমএ। ইংরেজি সাহিত্যে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পিএইচডি করেন। তিনি হয়ে ওঠেন সেরা জীবিত আমেরিকান লেখকদের অন্যতম। পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে অব্যাহত লড়াই তাকে বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে। তিনি রাজনৈতিকভাবে মার্ক্স প্রভাবিত। বিজ্ঞান বিষয়ে ভিন্ন ধারার লেখক হিসেবে তিনি স্বীকৃত ও সুপরিচিত। নিউইয়র্কার তাকে বলছে, আমেরিকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঔপন্যাসিক। তাকে বলছে, আমেরিকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঔপন্যাসিক। তার মার্স ট্রিলজি: রেড মার্স, গ্রিন মার্স ও ব্লু মার্স ইউরোপ ও আমেরিকার বিজ্ঞানবিষয়ক লেখার শ্রেষ্ঠ পুরস্কারগুলো পেয়েছে।

দি ইয়ার্স অব রাইস অ্যান্ড সল্ট বিকল্প ইতিহাসের উপন্যাস। এর একটি উপশিরোনামও আছে: আ ওয়ার্ল্ড উইদাউট ইউরোপ—ইউরোপ ছাড়া এক পৃথিবী।

উপন্যাসের শুরুতেই ধরে নেয়া হয়েছে চতুর্দশ শতকের প্লেগে ৯৯ ভাগ ইউরোপিয়ানের মৃত্যু হয়েছে। ১০ খণ্ডে বিভক্ত বইয়ের প্রথম খণ্ডের নাম শূন্যতায় জেগে ওঠা।

তৈমুরের সেনাবাহিনী দুই তরুণ সদস্য বোল্ড ও জিন হাঙ্গেরি শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে। শহরের সবার প্লেগে মৃত্যু হয়েছে। প্লেগ জীবাণুর সংস্পর্শে আসতে পারে এবং নিজেদের মধ্যে তা ছড়াতে পারে—এ আশঙ্কায় তৈমুর তাদের হত্যার নির্দেশ দিলেন। বোল্ড পালাতে সক্ষম হয় এবং পূর্ব ইউরোপে মৃতপুরীর মধ্য দিয়ে সমুদ্রের কাছে পৌঁছে যায়। মুসলমান দাস ব্যবসায়ীরা তাকে আটক করে এবং চীনের ঝেং হি জাহাজ বহরের কাছে তাকে বেঁচে দেয়। চীনারা তাকে খোজা করে দিলে আফ্রিকান

ক্রীতদাস কাইযু তার সেবাযত্ন করে। দুজনকে রান্নাঘরের কাজে নিয়োগ করা হয়। একসময় তারা পালাতে সমর্থ হয়। তারা ইয়োঙ্গল সম্রাটের উত্তরসূরি ঝু গাওঝির প্রাসাদে কাজ পায়। প্রতিশোধপরায়ণ কাইযু চীনাদের ঘৃণা করে, সে প্রাসাদের খোজাদের কনফুসিয়ান প্রশাসকদের বিরুদ্ধে সহিংস লড়াইয়ের উসকে দেয়।

দ্বিতীয় খণ্ড ‘হজব্রত’-এর শুরুতে মোগল ভারতে কোকিলা নামের এক হিন্দু তরুণী গ্রামবাসীর সঙ্গে প্রতারণার কারণে তার শ্বশুর ও ভাসুরকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে। এ অপরাধে তাকে হত্যা করা হলেও বাঘ হিসেবে পুনর্জন্ম লাভ করে এবং ইরানি বংশোদ্ভূত অতিন্দ্রীবাদী সুফি বিস্তামির সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে। বিস্তামি নিজগুণে বাদশাহ আকবরের একজন বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। কিন্তু অচিরেই তার বিরাগভাজন হয়ে মক্কায় নির্বাসিত হন। এক বছর মক্কায় কাটিয়ে বিস্তামি সড়কপথে মাগরেব ও আইবেরিয়া (আল আন্দালুস) চলে আসেন এবং সেখানে সুলতান মাওজি ও তার স্ত্রী-কাতিমার কাফেলায় যোগ দেন। সুলতান আন্দালুসিয়া ছেড়ে বাইরে নিসের অন্যদিকে খলিফার নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত অঞ্চলে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তারা ফ্রান্সের বেঅনের দিকে বারাকা শহর প্রতিষ্ঠা করেন এবং সুলতানা কাতিমার প্রভাবে একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। সুলতানা নারী ও পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য মানতে অস্বীকার করেন। আন্দালুসিয়ার খলিফা সুলতানাকে দমন করতে সেনাবাহিনী পাঠান। সুলতানা দলবল নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান এবং আরো উত্তর দিকে গিয়ে নাসারা নামের নগর প্রতিষ্ঠা করেন। তারা নিজেদের প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়ে ওঠে।

তৃতীয় খণ্ড ‘মহাসাগর মহাদেশ’-এ ওয়ানলি সম্রাট নিপ্পন আক্রমণ করে কিন্তু কুরোশিও স্রোতে তাদের নৌবহর মাহসাগরে ভেসে যায়। আশা করা হয়েছিল বহর চীনে ফিরিয়ে আনা যাবে। কিন্তু তখনো অনাবিষ্কৃত প্রশান্ত মহাসাগরের বৃত্তাকার স্রোত তাদের অন্যদিকে নিয়ে যায়, সেখানেই তারা অপ্রত্যাশিতভাবে আবিষ্কার করে ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’। নাবিকরা উত্তর আমেরিকার সমুদ্রতীরে নোঙর ফেলে এবং সেখানকার আদিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। বহরের নেতা অ্যাডমিরাল খিয়াম যখন আবিষ্কার করলেন তাদের মাধ্যমে অসতর্কতাবশত একটি মারাত্মক রোগ আদিবাসীদের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে, দ্রুত সেখান থেকে সরে গেলেন। আসার সময় তারা একটি ছোট বালিকাকে তুলে নেয়, তাকে চীনা ভাষা শেখায়, তার নাম রাখে প্রজাপতি। তাদের নৌবহর আরো উত্তরে গিয়ে আর একটি সভ্যতার সাক্ষাৎ পায়। নতুন জায়গা স্বর্ণসমৃদ্ধ। তারা সেখানে কোনোভাবে ধর্মীয় বলির হাত থেকে বেঁচে আসে, তাদের বন্দুকের গুলিতে সেখানকার আদিবাসীরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, তারা আগে কখনো আগ্নেয়াস্ত্র দেখেনি। তারা ফিরে এসে চীন সম্রাটকে জানায়, তিনি চাইলে অলস আয়েশেই নতুন ভূমি দখল করে বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন।

কিম রবিনসনের বইয়ের চতুর্থ খণ্ড আলকেমিস্টের ভূমি সমরখন্দ। এ ধরনের আরো ছটি খণ্ডের কোনোটিতে মুসলমানদের বিজয় ও মাহাত্ম্য, কোনোটিতে চীনাদের। সমরখন্দে বৈজ্ঞানিকদের বিস্কয়কর আবিষ্কার এনে দেয় ইসলামী রেনেসাঁ। পঞ্চম খণ্ডে চীনা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ন্যাটিভ আমেরিকানদের বিদ্রোহী হয়ে ওঠা, ষষ্ঠ খণ্ডে মুসলমান ও চীনাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং যুদ্ধ আবার মুসলমান পণ্ডিত ইব্রাহিম ইবনে হামাসের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতি-কবিতা ও দর্শনের আলোচনা, সপ্তম খণ্ডে শিল্পায়নের তোড়, অষ্টম খণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বযুদ্ধ, নবম খণ্ডে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের জেগে ওঠা, দশম খণ্ডে চীনে বিপ্লব ও জাগরণ। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে দ্য ইয়ার্স অব রাইস অ্যান্ড সল্টের কাহিনী শেষ হয়েছে ২০৯১ সালে—৭০০ বছরের বিকল্প ইতিহাস লিখেছেন কিম রবিনসন।

অস্কার ওয়াইল্ড লিখেছেন ইতিহাসের ঋণ শোধ করার একটিই উপায় ইতিহাসের পুনর্লিখন করা। প্লেগ ইউরোপকে নিঃশেষ করে দিলে পৃথিবীতে যে অবয়ব দাঁড়াত তারই বর্ণনা দিয়ে ইতিহাসের ঋণ শোধ করেছেন কিম রবিনসন।


মহামারীর বই

ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ নিয়ে বাইবেলের দ্য বুক অব রেভেলেশন অধ্যায়ে সতর্ক করা হয়েছে। মহামারী ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা কোরআনে রয়েছে। বোক্কাচিওর ডেকামেরন, জিওফ্রে চসারের দ্য ক্যান্টারবারি টেলস তখনকার প্লেগ যাতনা ও মৃত্যুকে তুলে ধরেছে। প্লেগ মহামারীর আতঙ্ক সেরা চিত্রশিল্পীদের পেইন্টিংয়ে ধরা পড়েছে।

করোনাভাইরাস প্যানডেমিকের সময় মহামারীর ইতিহাস, ভয়াবহতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যেসব নন-ফিকশন ও ফিকশন লিখা হয়েছে, সম্ভব হলে সেগুলো পাঠ করতে ২০টি গ্রন্থের একটি তালিকা প্রচারিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে:

১.   আ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার

      ড্যানিয়েল ডিফো (১৭২২)

২.   পেইল হর্স পেইল রাইডার  

      ক্যাথেরিন অ্যান পোর্টার ১৯৩৯

৩.  দ্য প্লেগ

      আলবেয়ার কামু (১৯৪৭)

৪.   দ্য অ্যান্ড্রোমেডা স্ট্রেইন

      মাইকেল ক্রিস্টন (১৯৬৯)

৫.   দ্য স্ট্যান্ড

      স্টিফেন কিং (১৯৭৮)

৬. লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা

      গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ (১৯৮৫)

৭.   জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার্স

      নর্মান স্পিন (১৯৮৮)

৮. দ্য চাইল্ড গার্ডেন

      জিওফ র্যায়মান (১৯৮৯)

৯.   অ্যামোনাইট

      নিকোলা গ্রিফিথ (১৯৯২)

১০.   বিউটি স্যালন

      মারিও বেলাটিন (১৯৯৪)

১১.  ব্লাইন্ডনেস

      হোসে সারামাগো (১৯৯৫)

১২. দ্য ইয়ার্স অব রাইস অ্যান্ড সল্ট

      কিম স্ট্যানলে রবিনসন (২০০২)

১৩. অরিক্স অ্যান্ড ক্র্যাক

      মার্গারেট অ্যাটউড (২০০৩)

১৪. দ্য চিলড্রেনস হসপিটাল

      ক্রিস অ্যাড্রিয়ান (২০০৬)

১৫. দ্য ট্রান্সমাইগ্রেশান অব বডিজ

      ইউরি হেরেরা (২০১৩)

১৬.  স্টেশন ইলাভেন

      এমিলি সেইন্ট জন ম্যান্ডেল (২০১৪)

১৭. ফাইন্ড মি

      লরা ভ্যান ডেন বার্গ (২০১৫)

১৮. সিভিয়ারেন্স

      লিং মা (২০১৮)

১৯. দ্য বুক অব এম

      পেঙ্গ শেপার্ড (২০১৮)

২০. দি ওল্ড ড্রিফট

      নামওয়ালি সেরপেল (২০১৯)

 

ড্যানিয়েল ডিফোর বইটি ১৬৬৫-১৬৬৬ সালের লন্ডন প্লেগ নিয়ে, ক্যাথেরিন অ্যান পোর্টারের বিষয় ১৯৯৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু। মাইকেল ক্রিটেনের উপন্যাসে মহামারীর কারণ মহাকাশ থেকে আসা কোনো অণুজীব। স্টিফেন কিংয়ের উপন্যাসে মানবজাতি বিধ্বংসী ভাইরাসের নাম ক্যাপ্টেইন ট্রিপস। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের বিষয় কলেরা। একসময় কলেরা বাংলাদেশেও সংক্রমক মরণব্যাধি ছিল। নরম্যান স্পিনর্যাডের ঘাতক যৌনতাবাহিত। এইচআইভির প্রাদুর্ভারের সময় দুর্বল সাড়ার কারণে ২০ বছর ধরে যৌনানন্দ ও মৃত্যু পরস্পরের সঙ্গে ছড়িয়ে ছিল। জিওফ র্যায়মান ঘাতক ভাইরাসকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেছেন। ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপটে প্রোথিত নিকোলা গ্রিফিথের রচনায় ভাইরাস লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

মারিও বেলাটিনের ফিকশনের ভাইরাস নারীদেহে নিষ্ক্রিয় কিন্তু এ ভাইরাস যে বৈশ্বিক মহামারী সৃষ্টি করছে, তাতে পৃথিবীর সব পুরুষ বিলুপ্ত। তার বিউটি স্যালন হচ্ছে হসপিস—এখান থেকে ফেরায় পথ নেই, সামনে একমাত্র মৃত্যুর পথই খোলা।

নোবেল বিজয়ী হোসে সারামাগোর উপন্যাসে মানুষ ক্রমাগত অন্ধ হয়ে আসছে এবং কর্তৃত্ববাদী সরকার নির্মমভাবে এ অন্ধত্বের মোকাবেলা করতে চেষ্টা চালাচ্ছে।

মার্গারেট অ্যাটউড সুপ্রজন কৌশলের ভয়াবতা তুলে ধরেছেন, যেখানে প্লেগ হরণ করে নিয়েছে মানবগোষ্ঠীর অধিকাংশ সদস্য।

এমিলি সেইন্ট জন ম্যান্ডেলের উপন্যাসে ফ্লুতে পৃথিবী প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে, প্রতি একশত জনে বেঁচে থাকে কেবল একজন মানুষ। লরা ভ্যান ডেন বার্গের লেখাতে মহামারী আক্রান্ত সব রোগীর স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, যা ফিরিয়ে আনা মূল রোগ সারানোর চেয়ে আরো কঠিন হয়ে পড়ে। পেঙ্গ শেফার্ডের কাহিনীতে মহামারী আক্রান্ত রোগীরা আবিষ্কার করে তাদের কারো ছায়া পড়ে না, আলোয় যেদিকেই যাক, তারা ছায়াহীন মানুষ। নামওয়ালি সেরপেলের বর্ণনায় উঠে এসেছে এইচআইভি আক্রান্ত জাম্বিয়া, যেখানে লেখকের আত্মীয় ও স্বজনদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে।

লেখক ও ভবিষ্যৎ বক্তা সিলভিয়া ব্রাউন তার ‘এন্ড অব ডেজ: প্রেডিকশন অ্যান্ড প্রোফেসিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ ফ্লু সংক্রমণের কথা বলেছেন, যাতে পৌনে ছয় লাখ মানুষের মৃত্যুর কথা জানিয়েছেন লেখক—তার বইতে করোনাভাইরাসের আঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা