মধ্যযুগে প্লেগ
ইউরোপে নরকের
ভীতিকে বাস্তব
করে তুলেছিল।
ধর্মগ্রন্থে থাকা
নরকের বিবরণ
যেন মানুষ
চোখের সামনে
দেখতে পাচ্ছিল।
বিপরীতক্রমে স্বর্গের
প্রতিশ্রুতি মানুষের
কাছ থেকে
দূরাগত হতে
থাকে। ধনী-গরিব
নির্বিশেষে মৃত্যুকে
দেখতে পায়
ঘাড়ের ওপর
নিঃশ্বাস ফেলতে—সবাই
ব্যস্ত হয়ে
পড়েছিল নিজের
পাপমুক্তির জন্য।
শিক্ষিতরা মন
দিয়েছিল বাইবেলের
পাতায় এবং
নিশ্চিত করতে
চাইছিলেন বোনা মোরস
(সুন্দর
মৃত্যু)।
প্লেগের কালো
মৃত্যু থেকে
ইউরোপে কেউই
নিস্তার পায়নি,
কোনো শ্রেণীর
মানুষই বাঁচতে
পারেনি। ভাস্কর
আন্দ্রেয়া পিসানো,
ব্যাংকার জিওভান্নি
ভিলানি, চিত্রকর
অ্যামব্রোজিও লোরেনজেট্টি,
কবি জিয়ুয়ান
জেথিন, অধ্যাত্মবাদী
রিচার্ড রোলে,
দার্শনিক উইলিয়াম
অব ওকহ্যাম
এবং বোকাচ্চিওর
বাবা-মা
ও বন্ধুরা
প্রাণ হারিয়েছিলেন
প্লেগের মহামারীতে।
মহামারী সমাজকে
যেভাবে উপড়ে
ফেলে সেটা
বোধ হয়
কোনো রাষ্ট্র
বিপ্লবও করতে
পারে না।
লেখক, দার্শনিক,
সমালোচক সুজান
সন্ট্যাগ লিখেছেন,
‘অসুস্থতা
হচ্ছে জীবনের
রাত। কষ্টদায়ক
অধ্যায়। জন্মের
পর সব
মানুষেরই দ্বৈত
একটা নাগরিকত্ব
থাকে—একটা
সুস্থ দুনিয়ার,
আরেকটা অসুস্থতার।
আমরা সবাই
সুস্থ দুনিয়ার
পাসপোর্টটাই ব্যবহার
করতে চাই,
কিন্তু আগে
হোক বা
পরে অন্য
দুনিয়ার নাগরিক
আমাদের হতেই
হয়।’
২০২০ সালে কভিড-১৯ ভাইরাসটি গত কয়েক মাসে নরকের আতঙ্ককে আবার পাতাল থেকে তুলে এনেছে। আধুনিক যুদ্ধ ভয়ানক প্রাণঘাতী, এ যুদ্ধ একটি দেশ কিংবা অঞ্চলকে ধ্বংস করতে যায়, কিন্তু সেখানে মানুষ জানে শত্রু আমার মতোই আরেক মানুষ। যুদ্ধে মানুষ শত্রুকে মোকাবেলা করে সমবেতভাবে। কিন্তু কভিড-১৯-কে খালি চোখে মানুষ দেখতে পায় না। একত্র হয়ে প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা বরং বাঁচতে হলে অন্যের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে; নগরকে, দেশকে অবরুদ্ধ করে দিতে হবে। এসবই হচ্ছে এখন দুনিয়ায়, আমাদের দেশেও। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন খুব নিষ্ঠুর একটি সত্যকে শুনিয়ে দিয়েছেন কয়েকদিন আগে—প্রিয়জনকে হারানোর
মানসিক
প্রস্তুতি থাকতে
হবে ব্রিটিশদের।
প্রায় অদৃশ্য
করোনাভাইরাস সীমান্ত,
জাতি, ধর্ম,
বর্ণ, ভাষার
ভেদরেখা মুছে
দিয়েছে, কিন্তু
মানুষকে জুড়ে
দিতে পারেনি।
মানুষকে বরং
ঘরে বন্দি
করে দিয়েছে।
প্রিয়জনের মুখ
দেখাও যে
পাপ! এ
মুখ দেখতে
গিয়ে তার
জীবনকে হুমকিতে
ফেলতে পারে
মানুষ। এরই
মধ্যে ইউরোপের
অনেক দেশই
অচল হয়ে
গেছে। মানুষ
কীভাবে ঘরে
সময় কাটাতে
পারে, সেসব
বিষয়ে পরামর্শ
দিচ্ছে গণমাধ্যম।
ঠিক এ
মুহূর্তে আমরা
ফিরে যেতে
পারি চতুর্দশ
শতকের মাঝামাঝি
সময়ে। জিওভান্নি
বোকাচ্চিওর দ্য ডেকামেরন প্রকাশিত
হয় ১৩৫৩
সালে। কালো
মৃত্যু বলে
কুখ্যাত প্লেগের
মহামারী থেকে
বাঁচতে ইউরোপের
মানুষ গৃহবন্দি।
ইতালির ফ্লোরেন্স
শহরের বাইরে
এক ভিলায়
দুই সপ্তাহ
ধরে স্বেচ্ছায়
বিচ্ছিন্ন অবস্থায়
অবস্থান করছিলেন
১০ জন
মানুষ। উদ্দেশ্য
প্লেগ থেকে
বেঁচে থাকা।
এ বিচ্ছিন্ন
জীবনকালে চরিত্রগুলো
নৈতিকতা, প্রেম,
যৌনতা, বাণিজ্য
আর ক্ষমতা
নিয়ে গল্প
বলতে শুরু
করলেন। গৃহবন্দি
মানুষের এ
কাহিনীগুলোই ডেকামেরন।
খেয়াল করার
বিষয় প্লেগের
মৃত্যুর ভয়ে
ঘরে আটকে
থাকা মানুষের
বলা গল্পগুলো
প্লেগ নিয়ে
নয়। গল্পে
এমনকি কৌতুকও
আছে। বোকাচ্চিও
নিজেও ইউরোপের
প্লেগে নিজের
পরিবার-বন্ধুদের
হারিয়েছেন। ডেকামেরনে
প্লেগের পরিপ্রেক্ষিতে
তার মনস্তত্ত্বটি
ধরা যায়।
যা হয়তো
কভিড-১৯
আতঙ্কে ঘরে
স্বেচ্ছাবন্দি মানুষও
টের পাচ্ছে।
অসহায় মুহূর্তে
মানুষ তার
প্রিয়জনকে সেই
অসহায় অবস্থার
কথা বলতে
চায়। দেখতে,
শুনতে, পড়তে
চায় মহামারীর
কালের কথা।
কিংবা ভবিষ্যতে
আরো কেমন
বিপর্যয় আসতে
পারে সে
সম্পর্কে সে
ধারণা পেতে
চায়। তাই
বাজারে বিক্রি
বেড়েছে আলবেয়ার
কামুর প্লেগ
কিংবা স্টিফেন
কিংয়ের দ্য
স্ট্যান্ডের। পর্দায়
হুমড়ি খেয়ে
দেখছে কন্ট্যাজিয়ন।
সম্প্রতি ভালচারে
ক্যাথরিন ভ্যান
অ্যারেনডঙ্ক লিখেছেন,
‘বাস্তবে
মহামারী নিয়ন্ত্রণহীন,
যথেচ্ছভাবে আক্রমণ
করে কিন্তু
প্লেগের কাহিনীতে
চরিত্র থাকে,
গল্পের শেষ
থাকে। এ
কারণেই ভীতিকর
হলেও মহামারীর
কালে মহামারীর
সাহিত্য পড়তে
মানুষ আগ্রহী
হয়।’
মাস্ক পরে
ঘুরে বেড়ানো
মানুষ, অনেকের
হাতে গ্লাভসও
আছে। বাজারে
কেনাকাটার হুড়োহুড়ি,
সুপারমার্কেটের সেলফ
নিমেষে খালি
হয়ে যাওয়া,
পাবলিক প্লেস
থেকে শিশুদের
অদৃশ্য হওয়া—দৃশ্যগুলো
এতদিন ডিস্টোপিয়ান
বা পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক
বই বা
ছবির মনে
হলেও এখন
চারপাশেই জীবন্ত
জগতে দেখা
যাচ্ছে। আর
এ দৃশ্য
মানুষকে খুঁজতে
বাধ্য করছে
এমন সব
চলচ্চিত্র আর
উপন্যাসকে যেখানে
সে এমন
দৃশ্যগুলো দেখতে
পায় নতুবা
দৃশ্যগুলোর খুঁটিনাটি
বিবরণ পড়তে
পারে। বিদগ্ধ,
ভাবুক পাঠক
খুঁজতে চান
এ অস্বাভাবিক
(নাকি স্বাভাবিক?)
জীবনের দর্শন;
মহামারীর কালে
অস্তিত্বের প্রশ্নটি
আরো জোরেশোরে
তার মগজে
ধাক্কা দিতে
থাকে। সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে
চোখ বোলালেও
দেখা যায়
গৃহবন্দি অনেকেই
পাতা ওল্টাচ্ছেন
কামুর দ্য প্লেগ, স্টিফেন
কিংয়ের দ্য
স্ট্যান্ডের পাতায়।
কেউবা স্মরণ
করছেন মার্কেসের
লাভ
ইন দ্য
টাইম অব
কলেরা
পড়ার স্মৃতি।
যারা দেখেননি
তারা দেখে
নিচ্ছেন স্টিভেন
সডারবার্গের ছবি
কন্ট্যাজিয়ন। বিশ্বে
করোনাভাইরাসজনিত মানুষের
আতঙ্ক, ত্রাসকে
উপলব্ধি করেছেন
স্টিফেন কিং
নিজেও, তিনি
বরং মানুষকে
ভয় না
পেয়ে করোনা
মোকাবেলায় সতর্ক
হওয়ার পরামর্শ
দিয়েছেন। তিনি
বলেছেন, করোনা
তার উপন্যাস
দ্য স্ট্যান্ডের
বায়োইঞ্জিনিয়ার্ড সুপারফ্লু
‘প্রজেক্ট
ব্লু’র
মতো ভয়ানক
নয়।
২০২০ সালের
৯ মার্চ
তিনি তার
টুইটার অ্যাকাউন্টে
লিখেছেন, ‘না,
করোনাভাইরাস দ্য
স্ট্যান্ডের গল্পের
মতো কিছু
নয়। করোনা
কোনোভাবেই সে
রকম ভয়ানক
কিছু নয়।
করোনায় মানুষ
বেঁচে যায়।
শান্ত থাকুন
এবং করোনা
প্রতিরোধে দরকারি
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা
গ্রহণ করুন।’
মহামারীর পর সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায় না। কানাডীয় ঔপন্যাসিক এমিলি সেন্ট জন ম্যান্ডেল ২০১৪ সালে প্রকাশিত তার পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক উপন্যাস স্টেশন ইলেভেনে দেখিয়েছেন মহামারীর পরও সাহিত্য বেঁচে থাকে। মানুষের সাহিত্য দরকার হয়। স্টেশন ইলেভেনে লেখক হাজির করেছেন কাল্পনিক এক ফ্লুকে—‘জর্জিয়ান ফ্লু’। এই মহামারীতে পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ প্রাণ হারায়। মানবসভ্যতা
ধসে
যায়। ম্যান্ডেলের
উপন্যাসে পাওয়া
যায় একটি
ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার
গ্রুপকে, যারা
শেকসপিয়ারের নাটক
মঞ্চস্থ করেন।
তারা গ্রেট
লেক অঞ্চলে
যুক্তরাষ্ট্র ও
কানাডীয় সীমান্তের
উভয় পাশে
বিধ্বস্ত জনপদে
নাটক দেখিয়ে
ফেরেন। স্টেশন
ইলেভেন হারিয়ে
যাওয়া এক
দুনিয়ার প্রতি
ভালোবাসার চিঠি
এবং উপন্যাসে
মহামারীতে হারিয়ে
যাওয়া দুনিয়াটা
আমাদের আজকের
সমাজ। ম্যান্ডেল
বলেছেন, মানুষের
অস্তিত্ব কখনই
নৈর্ব্যক্তিক নয়।
উপন্যাসে বর্ণিত
মহামারীতে হারিয়ে
যাওয়া দুনিয়ার
সবকিছুর জন্য
লেখক ভক্তিসংগীত
শুনিয়েছেন—ক্লোরিন দিয়ে
জীবাণুমুক্ত করা
সুইমিং পুল
থেকে ইন্টারনেটের
অর্থহীন ব্যবহার।
লেখক দেখিয়েছেন
আমাদের মূঢ়
দুনিয়ার সর্ব
ক্ষেত্রেই নরম
এক ভালোবাসা
কাজ করে
যায়, মানুষ
একে অন্যের
সঙ্গে যুক্ত
থাকে। এ
কারণে মহামারীর
বিপদ মানুষকে
গ্রাস করতে
পারে, কারণ
মানুষ তো
একে অন্যের
সঙ্গে সংযুক্ত।
‘সমাজে
সবসময়ই মানুষের
একটি বিস্তৃত
সূক্ষ্ম সংযোগ
কাঠামো থাকে,
তাই মানুষ
কাজে যাওয়া
বন্ধ করলে
সবকিছু থেমে
যায়।’
স্টেশন ইলেভেনে
মহামারী থেকে
বেঁচে যাওয়ারা
সবকিছু পুনর্নির্মাণে
সংগ্রামে নামেন।
মহামারী যা
শুষে নিয়েছে
লেখকের কাজ
সেই হারানো
অর্থকে আবার
হাজির করা।
থিয়েটার দলটির
ভ্রাম্যমাণ ক্যারাভানে
লেখা থাকে:
‘টিকে
থাকাটাই যথেষ্ট
নয়।’
সঙ্গী-সাথীকে
হারিয়ে ফেলা
মানুষের তো
এ অনুভূতিই
হবে।
জ্যাক লন্ডনের প্রায় ভুলে যাওয়া পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক উপন্যাস দ্য স্কারলেট প্লেগ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১২ সালে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইংরেজির অধ্যাপক জেমস স্মিথ। এ চরিত্রটি আমাদের দেখিয়ে দেয় ইতিহাস-স্মৃতিকে ধরে রাখতে গল্প-কাহিনী বলার প্রয়োজনীয়তা; মানবসভ্যতার অবিচ্ছিন্নতাকে বজায় রাখতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে স্মৃতিকে পৌঁছে দেয়ার আকুলতা। দ্য স্কারলেট প্লেগ উপন্যাসের কাহিনীকাল ২০৭৩ সাল। স্কারলেট প্লেগ মহামারীতে এর ৬০ বছর আগে পৃথিবীর প্রায় সব মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ২০৭৩ সালে অধ্যাপক জেমস স্মিথ বেঁচে ছিলেন মহামারীর আগের দিনগুলোর স্মৃতিকে বুকে নিয়ে। তার তিন দৌহিত্র প্রাচীনকালে মানুষের শিকারি জীবন কাটাচ্ছে।
আরো
যারা বেঁচে
ছিলেন তারা
সবাই ফিরে
গিয়েছিল আদিম
গোত্রবদ্ধ জীবনে।
তাদের তিনি
মহামারীর আগের
দুনিয়ার গল্প
শোনান, ইংরেজি
ভাষা বিভাগে
তার অধ্যাপনা
করার কথা।
স্মিথ নিজে
মাঝে মাঝে
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের
বিভ্রমে আটকে
যান—মহামারীর
আগের দুনিয়া
কি সত্য
সত্যই ছিল,
নাকি সবই
তার কল্পনা?
নিজের দৌহিত্রদের
সেই সমাজের
গল্প শোনাতে
গিয়ে স্মিথের
মনে হয়
তিনি মিথ্যা
মিথ্যা বানিয়ে
বলছেন না
তো!
সুজান
সন্ট্যাগ তার
ইলনেস
অ্যাজ মেটাফোর-এ
দেখিয়েছেন মহামারী
প্রমাণ করে
‘দুনিয়াতে
আঞ্চলিক, স্থানীয়,
সীমাবদ্ধ ধারণাগুলো
গুরুত্বপূর্ণ নয়।
এ দুনিয়ায়
অনেক কিছু
সবখানে চলাচল
করতে পারে;
দুনিয়ার সব
সমস্যাই স্থানীয়
নয়, বরং
বৈশ্বিক হয়ে
ওঠাই সেগুলোর
নিয়তি।’ বিশ্বায়িত
দুনিয়ায় পণ্য
ও জীবাণু
একইভাবে ঘুরে
বেড়াতে পারে।
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক





