খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সালের গোড়ার দিকে আথেন্সের এক জনাকীর্ণ আদালত মহাত্মা সক্রাতেসের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করে। সক্রাতেস-ছাত্র প্লাতোনের লেখা ফাইদোন নামক বই থেকে জানা যায়, গুরুর মৃত্যুদণ্ড সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর করা হয় নাই। বিচার শুরু হওয়ার আগের দিন আথেন্সের একটি জাতীয় জাহাজ দেলোস দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করে। দেশের রেওয়াজ অনুসারে জাহাজ যতদিন ফিরে না আসে ততদিন আথেন্সে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যেত না।

দেলোসযাত্রার মূল উদ্দেশ্য ধর্মীয় বিধি পালন। সে বিধি লঙ্ঘনের ক্ষমতা আদালতেরও ছিল না। রায় ঘোষণার পর সক্রাতেসকে কারাগারে আটক রাখা হয়। সেখানে তিনি প্রায় এক মাস বন্দি ছিলেন। জাহাজ ফিরে আসার পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। খোদ সক্রাতেসের সাক্ষ্য অনুসারে তাঁর বয়স ৭০ বছর।

কারাগারে আটক সক্রাতেসকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে তাঁর বন্ধু কর্তৃপক্ষের কাউকে কাউকে ঘুষ দেওয়ার ব্যবস্থা সাব্যস্ত করেন। এই ষড়যন্ত্রে সক্রাতেসের রাজি হওয়াটাই বাকি ছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় দেলোস থেকে জাতীয় তীর্থযাত্রী জাহাজটি ফিরে আসার খবর পাওয়া গেল। পরদিন ভোরে প্রায় সমবয়সী বন্ধু ক্রিতোন কারাগারে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান। তত্ত্বজ্ঞানী দার্শনিককে তিনি আপনকার প্রস্তাবে রাজি হতে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান। পলায়ন বাবদ যে টাকাপয়সা খরচা হবে তা ক্রিতোন নিজের তহবিল থেকে দিতে প্রস্তুত আছেন বলেও উল্লেখ করেন। ক্রিতোনের প্রস্তাব: সক্রাতেস ইচ্ছা করলে চলে যেতে পারেন থেসালি।

বিচারের একপর্যায়ে সক্রাতেসকে নিজের দণ্ড নিজেকেই প্রস্তাব করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তখন সক্রাতেস বলেছিলেন, দেশত্যাগের চেয়ে মরাকেই বরং স্বাগত করবেন তিনি। এক্ষণে ক্রিতোস সক্রাতেসকে সে কথা ভুলে যাওয়ার উপদেশ দিলেন।

সক্রাতেসের প্রাণ বাঁচানের প্রয়োজনে সমস্ত ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন মহাত্মা ক্রিতোন। সক্রাতেস পালিয়ে গেলে সরকারি গোয়েন্দারা ক্রিতোন আর তাঁর বন্ধুমহলকে হয়রানির চেষ্টা করতে পারে, তাঁদের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ আনতে পারে, তাঁদের জরিমানা হতে পারে, সহায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হতে পারে। এমনকি আরো বড় কোন দণ্ডও হতে পারে। তারপরও ক্রিতোন বেপরোয়া। সক্রাতেসের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘‌আপনার জীবন বাঁচানের স্বার্থে এইটুকু ঝুঁকি নেওয়ার হক আমাদের আছে। দরকার হয় আমরা আরো বড় ঝুঁকি নিব।’

১

গোপনে পালানের পক্ষে ক্রিতোনের যুক্তি ছিল, সৎ ও সাহসী মানুষ হিশাবে সক্রাতেসের উচিত নিজের ছেলেপেলের খাতিরে বেঁচে থাকা। ক্রিতোনের মনে হয়েছিল, এভাবে মৃত্যুবরণ করে সক্রাতেস আপনার ছেলেপেলের সঙ্গেও বেঈমানি করছেন। তাঁর কথায়, ‘‌মানুষের বালবাচ্চার জন্ম দেওয়াই হয়ত উচিত নয়। আর জন্মই যদি দিলেন তো ওদের মানুষ করার আর লেখাপড়া শেখানোর জন্য শেষ পর্যন্ত ওদের সাথে থাকবেন না কেন?’

ক্রিতোনের বিচারে সক্রাতেসের না পালানটা হবে ভীরুতা ও দুর্বলতার ফসল। না পালানকে তিনি ক্ষতিকর ও লজ্জাজনক মনে করেন। ক্রিতোন জনমতের দোহাই দিলেন। সক্রাতেস জনমতের তোয়াক্কা করেন না। কারণ তিনি মনে করেন, ‘আমাদের বিষয়ে প্রবল জনমত কি বলে তাতে কান দেওয়ার দরকার নাই, আমরা শুদ্ধ কান দিব তাঁর কথায় যিনি এ বিষয়ে বিশদ ওয়াকেবহাল। মানে আমরা শুদ্ধ একজনের—সত্যের—কথায় কান দিব।’

সক্রাতেস মনে করেন, এভাবে পলায়ন করলে অন্যায় হবে। তাঁর ভাষায়, ‘‌অন্যায়ের প্রশ্রয় দেওয়া কিংবা অন্যায়ের প্রতিদানে পাল্টা অন্যায় করা কখনো ঠিক নয়।’ সক্রাতেসের যুক্তি অনুসারে এ অন্যায় হবে চুক্তিভঙ্গের অন্যায়, এতে হানি হবে দেশের এবং দেশি আইনকানুনের।

ক্রিতোনের প্রশ্নের উত্তরে সক্রাতেস নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। সেই বক্তৃতায় তিনি দেখালেন, আইনকানুনকে প্রাণের চেয়েও প্রিয় মনে করেন সক্রাতেস। তাঁর এই বক্তৃতায় সতের ও আঠার শতকের এয়ুরোপিয়া সমাজচুক্তির মতবাদের খসড়া পাওয়া যায়। আঠার শতকে জাঁ-জাক রুসো রাষ্ট্রপত্তনের গোড়ায় যে সমাজচুক্তি কল্পনা করেন তার সারবস্তু সক্রাতেসের এই আলাপেই হাজির আছে। প্লাতোনের রাষ্ট্র বইতে এই ভাব আরো ফুটিয়ে লেখা হয়েছে।

বিচারসভার যে রায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে সে রায় সঠিক হয়েছে মনে করেন না সক্রাতেস। কিন্তু যেহেতু রায় বিপক্ষে গেলেও মেনে নেবেন বলে অঙ্গীকার করেছিলেন, তাই সেই রায় মেনে চলতে তিনি বাধ্য বোধ করেন। তিনি ধরে নিয়েছেন, বিচারসভার রায়ই দেশের রায়। যুক্তির জোরে দেশকে স্বমতে আনতে না পারলে দেশের দেওয়া দণ্ড মাথা পেতে নিতেই হবে তাঁকে। আথেন্সের আইনদেবতা কি বলবেন, সক্রাতেসের মুখে আমরা শুনি তারই মহড়া:

আপনার হয়তো দেশকে রাজি করিয়ে স্বমতে আনতে হবে, নয়তো তার হুকুম পালন করতে হবে। দেশ যা সইতে বলে—মারধরই হোক আর গোলামগিরিই হোক—তা আপনার সয়ে যেতে হবে। দেশ যদি বলে যুদ্ধে যাও—এ যুদ্ধে আপনি আহতও হতে পারন, নিহতও হতে পারেন—আপনাকে যুদ্ধে যেতেই হবে। যাওয়াই সঠিক। কোন মানুষেরই হাল ছাড়বার, পিছু হটবার বা লড়াইয়ের ময়দান থেকে পালাবার অধিকার নাই। যেমন যুদ্ধের ময়দানে তেমনি আইনের আদালতে, এই রকম অন্য সবখানেও মানুষকে অবশ্যই আপন দেশের হুকুম মেনে চলতে হবে, নতুবা হকবিচার কী জিনিস তা দেশকে বুঝিয়ে দিতে হবে। আপনাপন আম্মা বা আব্বার গায়ে হাত তোলা অধর্মের কাজ। আর আপন দেশের গায়ে হাত তোলা তো ঢের বড় অধর্মের কাজ। (প্লাতোন ২০০৫: ১১১ )

সক্রাতেসের বিচারে ঠিক কথাই বলেছেন আইনের প্রতিনিধি। আইনের মতে যিনি সাবালক হয়েও দেশে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন, দেশ ছেড়ে চলে যান না, তিনি দেশের আদেশ-নির্দেশ মানার অঙ্গীকারপূর্বক ঐকমত্যে পৌঁছেন। এই অঙ্গীকারই সমাজচুক্তি।

২

আথেনিয়া আইনের গলায় সক্রাতেস আমাদের জানাচ্ছেন, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব অস্বীকার করা যাবে না। সক্রাতেসের চোখে ‘‌আইন কানুনের কোন দোষ নাই, দোষ যদি কিছু হয়ে থাকে তা মানুষের।’ রাষ্ট্রের বিচারে যদি কোন অন্যায়ও হয়ে থাকে, তবে জবাবে পাল্টা অন্যায় করা যাবে না। কারাগার থেকে পলায়ন করলে সেই অন্যায়ই হবে। তাতে ক্ষতি হবে দেশের। আইনদেবতার ভাষায়, ‘‌আপনি যদি অন্যায়ের প্রত্যুত্তরে পাল্টা আরেকটা অন্যায় করেন, একটা আঘাতের প্রত্যুত্তরে আরেকটা আঘাত দিয়ে, আমাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি আর আপনার দেওয়া অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, যাদের হানি আপনার সবচেয়ে কম করা উচিত তাদের হানি করে বিদায় নেন, তবে সে বড় লজ্জার কথা হবে।’

দোহাই

১. প্লাতোন, রচনাসংগ্রহ ॥ প্রথম ভাগ [এয়ুথুফ্রোন, সক্রাতেসের সাফাই ও ক্রিতোন], দেসদিমোনা খান ও সলিমুল্লাহ খান অনূদিত, সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত (ঢাকা: অবসর, ২০০৫)।  

[সক্রাতেস ও রাষ্ট্র শীর্ষক রচনাটি সলিমুল্লাহ খানের স্বাধীনতা ব্যবসায় গ্রন্থ থেকে লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে এখানে সংকলিত হয়েছে]

সলিমুল্লাহ খান: লেখক ও অধ্যাপক