পশমিনার সঙ্গে কাশ্মীরের নাম জুড়ে গিয়েছে। কাশ্মীরের ঐতিহ্যের এটি একটি অংশ এখন। কয়েকশ বছর ধরে পশমিনা নিজেকে কাশ্মীরের সঙ্গে যুক্ত করেছে বা কাশ্মীরই পশমিনাকে নিজের করে নিয়েছে। তারপর ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। পশমিনার নিজস্ব একটি আবেদন রয়েছে। একটি পশমিনা শাল কিংবা পশমিনার তৈরি এক টুকরো কাপড় হাতে নিলে যে কেউ এর কোমলতা, সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে বাধ্য। এর পেছনে পশমিনার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এর কারিগরদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। আর কাশ্মীরের পশমিনা কারিগররা নিজেদের এক্ষেত্রে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়।

পশমিনা শব্দটির উৎপত্তিও কাশ্মীর থেকে। ফারসি পশমা বা পশম শব্দটি থেকে পশমিনার উৎপত্তি। হালকা হওয়ার পাশাপাশি উষ্ণতা দেয়ার উপযুক্ত হওয়ার কারণে পশমিনা আরামদায়ক। কারিগররা সুন্দর করে তৈরি করেন বলে এর নান্দনিকতাও রয়েছে। পশমিনা তৈরির সূচনাকাল সম্পর্কে বিভিন্ন রকম তথ্য রয়েছে। পশমিনার সঙ্গে জয়নুল আবেদিনের নাম যুক্ত। কাশ্মীরের এ রাজা (শাসনকাল: ১৪১৮-১৪১৯ খ্রি. এবং ১৪২০-১৪৭০ খ্রি.) পশমিনার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি তুর্কিস্তান থেকে কারিগর এনে পশমিনার বস্ত্র তৈরিতে নিয়োগ করেন। কিন্তু পশমিনার সূচনা নিয়ে আরেকটি ঘটনা প্রচলিত। মীর সৈয়দ আলী হামদানি নামে এক সুফি পণ্ডিত চতুর্দশ শতব্দিতে লাদাখ ভ্রমণের সময় ছাগলের লোম দেখে এর সম্ভাবনা সম্পর্কে ভাবেন। তিনি কিছু লোম সংগ্রহ করে সুলতান কুতুবউদ্দিনের কাছে নিয়ে আসেন। পশমের হালকা ও নরম ভাব দেখে কুতুবউদ্দিন পারস্য থেকে ৭০০ কারিগর পরিবার এনে তাদের কাজে লাগান। এ সময় থেকে কাশ্মীরে গালিচার ব্যবসা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে এখানে শাল বোনা শুরু হয়।

তবে পশমিনার প্রাচীনত্ব নিয়ে আরো নানা কথা প্রচলিত আছে। যেমন পশমিনার ব্যবহার সেই মহেঞ্জোদারোর সময় থেকে হয়ে আসছে বলেও অভিমত দেয়া হয়। এ সময়ের বিভিন্ন ভাস্কর্যে গায়ে বা কাঁধের ওপর যে পোশাক দেখা যায় তা পশমিনা ছিল। বুদ্ধর সময়কালেও এর ব্যবহার ছিল বলে মনে করা হয়। চতুর্দশ শতাব্দীর ইরান ও সিরিয়ায়ও পশমিনা দেখা যেত বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এগুলোকে পশমিনা না বলে পশমি বস্ত্র বলাই ভালো। পশমিনার সঙ্গে পশমের পাশাপাশি সুন্দর বুনন ও নকশার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, যা কাশ্মীর থেকেই শুরু হয়।

ধরে নেয়া যাক, হামদানিই পশমিনার আবিষ্কারক। এরপর জয়নুল আবেদিনের সময় থেকে কাশ্মীরে পশমি বস্ত্রের বুনন ও নকশার কাজ শুরু হয়। কাশ্মীরেই পশম থেকে পশমিনা নামটি প্রচলিত হলো এ সময়ের মধ্যে। পঞ্চদশ শতকে কাশ্মীরে পারস্য ও কাশ্মীরে কারিগর-শিল্পীদের হাতে পশমিনার উন্নতি হয়। পশমিনা এ সময় কাশ্মীর থেকে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও জনপ্রিয় হতে শুরু করে। বিশেষত এ সময় উত্তর ভারতে মোগল শাসকরা নান্দনিক বস্ত্র পছন্দ করতেন। তাদের আগ্রহের কারণে পশমিনা চলে আসে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে। আর মোগল দরবারে আসা ইউরোপীয়রাও তাই এ সময়ে পশমিনার সংস্পর্শে আসে। ১৬৬৪ সালে ফ্রান্সিস বার্নিয়ের পশমিনা দেখেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন এ বস্ত্র অত্যন্ত উন্নত। কাশ্মীরের নারী, পুুরুষ, হিন্দু-মুসলিম সবাই এ বস্ত্র ব্যবহার করে।

তবে বার্নিয়ের সম্ভবত অভিজাতদের কথা বলতে চেয়েছেন। কেননা সে সময় অবধি পশমিনা কেবল অভিজাতদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। তবে পশমিনা শালের কারণে যে ইউরোপীয়রা ব্যবসার জন্য ভারতে এসেছিল তাতে সন্দেহ নেই। এমনকি খোদ নেপোলিয়ন পশমিনার ভক্ত বনে গিয়েছিলেন। তিনি তার স্ত্রী জোসেফিনকে একটি পশমিনা শাল উপহার দেন। জোসেফিন এমন আরো কিছু শাল পাঠানোর জন্য নেপোলিয়নকে বলেন যেন তিনি ফ্রান্সের অভিজাত সমাজে তার প্রিয়পাত্রদের এ শাল উপহার দিতে পারেন। এত প্রভাব যে পশমিনা তৈরি করেছিল তার মূল্য সম্পর্কে আন্দাজ করাই যায়। আর সে কারণেই কাশ্মীরে গড়ে উঠেছিল পশমিনার বাণিজ্য বা পশমিনা ইন্ডাস্ট্রি। স্বর্ণের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে পশমিনাকে। অর্থনীতিতে অবদান রাখার কারণে কাশ্মীরের জন্য পশমিনা হয়ে ওঠে সফট গোল্ড।

কাশ্মীরের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ পশমিনা। কিন্তু সম্প্রতি (গত বছর) কাশ্মীর থেকে এ ইন্ডাস্ট্রি সরিয়ে নেয়ার একটা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। খাঁটি পশমিনার পাশাপাশি আধা-পশমিনা বলে একধরনের কৃত্রিম পশমিনা তৈরি করা হতো, যা তুলনামূলক স্বল্প দামের কারণে জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু খাঁটি পশমিনা কাশ্মীরেই তৈরি হয়। এ সময়ে এসে ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজীপুর ও বেনারসে পশমিনা তৈরি ও পশমিনার ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পশমিনাকে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে এ কাজ করা হয়েছে বললেও এর পেছনে কাশ্মীরকে কোণঠাসা করার একধরনের চেষ্টা রয়েছে। কেননা পশমিনার ইন্ডাস্ট্রি কাশ্মীর থেকে সরিয়ে আনলে লাদাখের লাখ লাখ মানুষের জীবিকায় প্রভাব পড়বে। এ অঞ্চলের বহু মানুষ হাতে পশমিনার বস্ত্র বিশেষত শাল বুনে থাকে। তাদের হাতের কাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রশিক্ষণ নেয়া কারিগরদের কাজের মান এক হবে না।

ভারতের খাদি অ্যান্ড ভিলেজ ইন্ডাস্ট্রিজ কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুসারে কাশ্মীর থেকে সরাসরি পশম এনে গাজীপুর ও বেনারসে তা প্রক্রিয়াজাত করা হবে। এমন করা হলে কাশ্মীরের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তির ক্ষয় হবে। কাশ্মীর পশমিনা অর্গানাইজেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মুসাদিক শাহ বলেন যে এর মধ্য দিয়ে ৭০০ বছরের পশমিনার ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার হারিয়ে যাবে। তার দেয়া তথ্য অনুসারে প্রায় সওয়া দুই লাখ কাশ্মীরি নাগরিক সরাসরি বা কোনো না কোনো মাধ্যমে পশমিনার সঙ্গে যুক্ত। এত বছরের মধ্যে কাশ্মীরের পশমিনার সমমানের পশমিনা তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

তবে এর আগেও পশমিনা ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতির মুখ দেখেছে। কভিড-১৯ মহামারী ও অন্যান্য কারণে এ ব্যবসা ক্ষতির মুখ দেখে। তবে আরো ক্ষতির কারণ হয়েছিল ৩৭০ ধারায় নিরাপত্তা ইস্যুতে কাশ্মীরকে লকডাউনের মধ্যে রাখায়। এর আগে ২০১৪ সালের বন্যার কারণেও পশমিনা তৈরি ও অন্যান্য কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। এ অবস্থায় কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী পশমিনার কাজ কাশ্মীরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ভারতের চেষ্টাকে কাশ্মীরি লোকেরা ভালো চোখে দেখছে না তা বলাই বাহুল্য। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রাথমিক চেষ্টার জন্য কাশ্মীর থেকে ৫০০ কেজি পশম নেয়া হয়েছিল। কাশ্মীরের হ্যান্ডিক্রাফট ও হ্যান্ডলুম ডিপার্টমেন্টের পরিচালক মাহমুদ আহমদ শাহ অবশ্য বলছেন যে ৫০০ কেজি পশম বা উল নিলে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা কাশ্মীরের বাইরে নেপাল, কুলু, হিমাচলেও পশমিনা তৈরি হয়। কিন্তু কাশ্মীরের পশমিনা তার নিজ গুণে বিখ্যাত। কাশ্মীরের পশমিনা ও পশমিনা শাল তার নিজের গুণেই টিকে থাকবে।

 

আলী আমজাদ: লেখক