বাংলাদেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এসডিজি-৪ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনা করে আগামী সরকারের কাছে করণীয় তুলে ধরেছেন শিক্ষা খাতের বিভিন্ন অংশীজন। এ লক্ষ্যে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে একটি সমন্বিত সুপারিশমালা প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সম্মেলন কক্ষে গণসাক্ষরতা অভিযানের আয়োজনে বাংলাদেশে এসডিজি-৪ অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ আগামী সরকারের কাছে প্রত্যাশা শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। সভার শুরুতে একটি আদিবাসী সাংস্কৃতিক দল নৃত্য পরিবেশন করে।
এ সময় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনটির প্রোগ্রাম ম্যানেজার আব্দুর রউফ। তিনি বলেন, দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার বেড়েছে। তবে বড় একটি অংশ মানসম্মত শিখনফল অর্জন করতে পারছে না। দারিদ্রতা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, জলবায়ু ঝুঁকি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও শিক্ষক সংকট শিক্ষা ব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করছে।
তিনি আরো বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, চা বাগান, চর, হাওর, পাহাড়ি অঞ্চল, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষেত্রে এসডিজি-৪ অর্জনে বৈষম্য স্পষ্ট। শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ, সারা দেশে স্কুলে মিড ডে মিল চালু, শিক্ষকদের মর্যাদা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্তরে সার্বজনীন সাক্ষরতা ও গণিত দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন তিনি।
সভায় মূখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কনসালটেশন কমিটি এবং মাধ্যমিক শিক্ষা বিষয়ক পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক ড. মনজুর আহমেদ।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন এডুকেশন লোকাল কনসালটেটিভ গ্রুপের কো চেয়ার মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, সিপিডির রিসার্চ ডিরেক্টর ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, গাজা ফেরত প্রবাসী তরুণ চিকিৎসক ও মানবিক সহায়তা কর্মী ডা. নাহরীন আহমেদ, রাইটস টু ইনডিপেন্ডেন্টের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী আসমা বেগম এবং খুলনার ডুমুরিয়ার ইয়ুথ ক্লাবের সভাপতি লোকনাথ বিশ্বাস। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক তপন কুমার দাশ।
মতবিনিময় সভায় শিক্ষা গবেষক, শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, কমিউনিটি এডুকেশন ওয়াচ গ্রুপ, ইয়ুথ গ্রুপ, গার্লস ফোরাম, পরিবেশ ক্লাব, ডিবেট ক্লাবের সদস্য এবং প্রবাসীসহ দুই শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।
সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, শিক্ষার উন্নয়নে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো একত্র করে আগামী সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
বক্তারা বলেন, সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়ন, টাস্কফোর্স ও স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন জরুরি। শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো, সংসদে শিক্ষা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা, দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় ও ট্রেডভিত্তিক কোর্স চালুর প্রয়োজন রয়েছে।
বক্তারা আরো বলেন, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষা যুক্ত করা, পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের আগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামত নেয়া, স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা সিদ্ধান্তে বিকেন্দ্রীকরণ, বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যয়ের সক্ষমতা অর্জন এবং গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
সভায় মাদ্রাসা, কেজি ও এনজিও স্কুলগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা, পাঠ্যক্রমে কারিগরি বিষয়ের পাশাপাশি সংগীত ও চারুকলার মতো সাংস্কৃতিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ রোধ, ঝরে পড়া শিশুদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সার্বজনীন মিড ডে মিল চালু এবং নারী শিক্ষা ও মানোন্নয়নে জেন্ডার বাজেট ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানানো হয়।










