কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার সাধারণ পরিবারের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। কিন্তু অনেক শহরেই এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হচ্ছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। যে প্রকল্প দুই বা তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা, তা অনেক সময় এক দশক ছাড়িয়ে যায়। বাজেট বাড়ে, নির্মাণকাজ থমকে থাকে, আর হাজার হাজার পরিবার আবাসন পাওয়ার আশায় দিন কাটায়। এ সমস্যার মূলে প্রকৌশলগত ত্রুটির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অব্যবস্থাপনা।
পেশাগত জীবনে আমি দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে এ চ্যালেঞ্জটি দেখেছি। রাজধানী ঢাকায় স্থপতি হিসেবে এক যুগেরও বেশি সময় আমি আবাসিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন কারিগরি দলের সমন্বয়ে কাজ করেছি। বর্তমানে আমি নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক হাউজিং সিস্টেমের আধুনিকায়ন প্রকল্পে কাজ করছি। আয়তন এবং সম্পদের দিক থেকে দুই ব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও, কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো আশ্চর্যজনকভাবে একই রকম। দুই শহরেই দেখা যায়, নির্মাণকারী দল কাজ শুরু করতে প্রস্তুত থাকলেও ফাইল চালাচালি আর দাফতরিক অনুমোদনের অপেক্ষায় প্রকল্পটি থমকে থাকে।
বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে আবাসন কর্তৃপক্ষ হাজার হাজার পুরনো অ্যাপার্টমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের কাজ পরিচালনা করে। প্রযুক্তিতে উন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় দেখা যায়—অনুমোদনের জটিল স্তর, রিপোর্টিংয়ের বাধ্যবাধকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়ে। স্থপতিরা নকশার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকেন, ঠিকাদাররা পারমিটের জন্য প্রহর গোনেন, আর প্রশাসকরা এমন সব নথির জন্য অপেক্ষা করেন যা হয়তো অন্য কোনো দফতরে আগে থেকেই জমা আছে। যা সুশৃঙ্খল সমন্বিত প্রক্রিয়া হওয়া উচিত ছিল কিন্তু তা রূপ নেয় দীর্ঘসূত্রতার এক শিকলে।
বাংলাদেশও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি। দেশের বৃহৎ আবাসন প্রকল্পগুলোতে পরিকল্পনা, প্রকৌশল, সংগ্রহ (প্রকিউরমেন্ট) এবং নিয়ন্ত্রক পর্যালোচনার জন্য একাধিক সংস্থা জড়িত থাকে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলেও একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি মন্থর হয়ে যায়। একটি সাধারণ কারিগরি দ্বিমত বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে মাসের পর মাস কাজ বন্ধ থাকে, অথচ নির্মাণ ব্যয় ঠিকই বাড়তে থাকে এবং আবাসন সংকট আরো ঘনীভূত হয়।
তবে আশার কথা হলো, আবাসন খাতের এ চিত্র বদলে দেয়ার মতো প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম এখন আমাদের হাতের নাগালেই আছে। বর্তমানে ডিজিটাল কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্থপতি, প্রকৌশলী, ঠিকাদার এবং সরকারি সংস্থাগুলো একই ডিজিটাল পরিবেশে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। ‘বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং-য়ের’ (বিআইএম) মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মাণকাজ শুরুর আগেই নকশার ভুলগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব। এছাড়া ইন্টিগ্রেটেড ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি, অনুমোদন এবং বাজেটের হিসাব রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যায়। যখন সব অংশীজন একই তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করেন, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়।
আবাসন চাহিদা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যকার এ ব্যবধান ঘোচাতে তিনটি ব্যবহারিক সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ, প্রকৌশল সংস্থা এবং আবাসন সংস্থাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়কে একটি মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবাসন প্রকল্পগুলোতে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গ্রহণ করতে হবে যাতে প্রকল্পের অগ্রগতি ও অনুমোদন রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তৃতীয়ত, আধুনিক নির্মাণ পদ্ধতি যেমন—প্রি-ফ্যাব্রিকেশন, ভ্যালু ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডিজিটাল প্রকিউরমেন্টকে কেবল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে না রেখে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করতে হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের পরিবর্তন অনেক সময় সংস্কারের নতুন সুযোগ তৈরি করে। পরিবর্তনের এ মুহূর্ত যদি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়, তবে দেশের পাবলিক হাউজিং খাত মন্থর প্রতিশ্রুতির থেকে বেরিয়ে মানুষের কাঙ্ক্ষিত গতিতে আবাসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
কাজী নাফিসা আঞ্জুম: রাজউক তালিকাভুক্ত সিনিয়র স্থপতি; বর্তমানে নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক হাউজিং মডার্নাইজেশন প্রজেক্টে কর্মরত










