আজ বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিবসটি কেন শুধু প্রতীকী নয়, বরং বাস্তব পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

ক্যান্সার দিবস নিয়ে সচেতনতা শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, সাধারণ মানুষের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পৃথিবীতে প্রতি বছর এক কোটির বেশি মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে আমাদের প্রতি বছর দেড়-দুই লাখ লোক ক্যান্সার আক্রান্ত হয়। আমাদের দেশের মানুষ নানা কারণে ক্যান্সার আক্রান্ত হচ্ছে। যার বেশির ভাগই তারা জানে না। এটি আমাদের মূল সমস্যা। আমাদের আশপাশে এমন অনেক উপাদান আছে, যেগুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এগুলোও যে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, সেটি আমরা জানি না। তাই সচেতনতার জন্য মূলত ক্যান্সার দিবস পালন করা হয়। সচেতনতা যত বেশি থাকবে, রোগটা সম্পর্কে যত বেশি জানবেন, ততই রোগের প্রতিকার করতে পারবেন। বিভিন্ন জায়গায় আপনি ক্যান্সার নিয়ে কথাও বলতে পারবেন, পরিবারকেও সচেতন করতে পারবেন। আমি মনে করি এ দিবস প্রতিটি মানুষেরই জন্য। এ জানাটা মনে করি তাদের নিজেদের জন্যই অনেক উপকৃত হবে।

ক্যান্সার নিয়ে এখনো মানুষের মধ্যে ভয় ও ভুল ধারণা আছে। এ মানসিক বাধা দূর করতে স্বাস্থ্য খাত ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?

আমি একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। আমরা এ রকম অনেক রোগী দেখি, যারা আসলে থার্ড বা ফোর্থ স্টেজে হসপিটালে আসে এবং আশ্চর্যজনকভাবে তারা তাদের শারীরিক লক্ষণগুলো আগেই টের পায়। কিন্তু তারা গ্রামের বাড়িতে একটা পল্লী চিকিৎসক কিংবা ওঝা দিয়ে চিকিৎসা করান। আমাদের মেডিসিন বাইবেলে এ ধরনের কোনো চিকিৎসা নেই। এগুলো আসলে ভুল চিকিৎসা। এ ধরনের ভুল চিকিৎসার জন্য আমাদের দেশের মানুষ কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হয়ে যায়। যে কারণে রোগটা অনেক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে চলে আসে। কারণ সচেতনতার অভাব। আমরা আমাদের হাসপাতালে শুধু চিকিৎসার ওপরই ফোকাস দিই না, আমরা মূলত বিভিন্ন করপোরেট সেশনও করছি। বিভিন্ন জায়গায় আমরা যাচ্ছি, আমরা ইউনিভার্সিটিতে অ্যাওয়ারনেস সেশন করছি। আমাদের চিকিৎসকরা বিভিন্ন জায়গায় পার্টিসিপেট করছে। আমরা রেগুলার কনফারেন্সে যাচ্ছি, ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে আমাদের পেপার পাবলিকেশন হচ্ছে, পাশাপাশি প্রচুর অ্যাক্টিভিটিজ করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য সচেতনতা বাড়ানো। যেমন ৪০ বছরের পুরুষকে একটা নরমাল প্রোস্টেট অ্যান্টিজেন পিএসএ টেস্ট করানোর জন্য প্রয়োজন হয়, যার খরচ ৮০০-১০০০ হাজার টাকা। এটা তারা করে না। তারপর ৩৫ বছর বা এর ঊর্ধ্বে নারীদের মাস্ট ম্যামোগ্রাম করা দরকার। এটিও নারীরা করে না। এ সচেতনতাও নারীদের মাঝে বাড়ানো দরকার। ফলে দেশে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক। আমাদের হাসপাতালেও সবচেয়ে বেশি যে ক্যান্সার শনাক্ত হয় তা হলো স্তন ক্যান্সার। আমাদের ফিমেল ব্রেস্ট ক্যান্সারই সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়। আর আশার কথা হচ্ছে, আমাদের এগুলো কিউরেবিলিটিও অনেক বেশি। ব্রেস্ট ক্যান্সারে সারভাইভাল সংখ্যাও আসলে অনেক বেশি। কিন্তু আমার মতে, রোগটা হওয়ার থেকে সচেতনতা থাকা ভালো এবং এখানে আমাদের জোর দেয়া উচিত। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি পাঁচ বছর ধরে।

ক্যান্সার এখন শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি পরিবার ও অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করে। আপনার মতে, এ আর্থিক চাপ কমাতে জাতীয় পর্যায়ে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া জরুরি?

জাতীয় পর্যায়ে অনেক উদ্যোগই নেয়া উচিত। ক্যান্সার চিকিৎসা আসলেই ব্যয়বহুল। এর বড় কারণ আমাদের প্রায় ৯৫ শতাংশ কনজিউমেবল, কেমিক্যাল, রেডিওলজি ফিল্ম—সবই আমদানিনির্ভর। এসবের ওপর ট্যাক্স বেশি, ফলে চিকিৎসার খরচ বাড়ে।

আরেকটা বিষয় ক্যান্সারের অনেক ওষুধই বিদেশ থেকে আসে। তাই দাম স্বাভাবিকভাবেই বেশি। পাশাপাশি একটা হাসপাতাল করতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ লাগে, সেটা সাধারণ ব্যবসার মতো দ্রুত রিটার্ন দেয় না। এটা লং টার্ম ইনভেস্টমেন্ট।

যেহেতু স্বাস্থ্য একটা প্রাধান্যপ্রাপ্ত খাত, এখানে সরকারের নীতিগত সহায়তা খুব জরুরি। লং টার্মে যদি সরকার এ খাতকে সাপোর্ট করে, তাহলে রোগীর খরচ কমবে এবং নতুন উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসবে।

মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে মানবসম্পদ ও প্রযুক্তির মধ্যে কোনটাকে এখন বেশি অগ্রাধিকার দেয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন?

আমার ফিলোসফি হচ্ছে ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন। মানবসম্পদে প্রথম জোরটাই আসলে দেয়া উচিত। আর হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস এগুলো আসলে খুবই ক্রিটিক্যাল সার্ভিস এবং ফার্স্ট হ্যান্ড একটা সিকিউরিটি গার্ড থেকে শুরু করে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট সবাই ভূমিকা পালন করে। এখানে আসলে আমাদের দক্ষ জনবলটাই প্রথমে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি টেকনোলজিতেও ফোকাস করতে হবে। লেটেস্ট টেকনোলজি নিয়েও আমাদের কাজ করতে হবে।

সরকার যদি সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে চায়, তাহলে পিপিপি মডেলে কী ধরনের ট্যাক্স রিলিফ, ইকুইপমেন্ট ডিউটি সুবিধা বা ফাইন্যান্সিং সাপোর্ট কার্যকর হতে পারে?

পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি নিয়ে আমাদের দেশে অনেক আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো স্বাস্থ্য খাতে এখনো এর কার্যকর বাস্তবায়ন খুব সীমিত। অথচ এ মডেলে কাজ করার বিশাল সুযোগ আছে।

প্রথমত, সরকারের হাতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর জমি রয়েছে, যেখানে প্রাইভেট সেক্টর চাইলে সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারে। বিদেশে ‘‌‍হেলথ সিটি’ বা ‘‌হেলথ ইপিজেড’ খুবই সফল একটি কনসেপ্ট। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব, এজন্য সবচেয়ে বেশি দরকার শক্ত নীতিগত সহায়তা।

নীতিগত সহায়তার ক্ষেত্রে করপোরেট ট্যাক্স একটি বড় বিষয়। বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতকে ট্র্যাডিশনাল করপোরেট ট্যাক্স সিস্টেমের আওতায় রাখা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। হেলথকে একটি প্রাধান্যপ্রাপ্ত সেক্টর হিসেবে ধরে করপোরেট ট্যাক্স সহনীয় পর্যায়ে আনা দরকার। একইভাবে ব্যাংক ঋণের সুদহারও বড় চ্যালেঞ্জ। ফুড, হেলথ ও গার্মেন্টসের মতো প্রায়োরিটি সেক্টরে সুদহার ১০ শতাংশ বা তার নিচে রাখা উচিত, না হলে দীর্ঘমেয়াদে হাসপাতালের সাসটেইনেবিলিটি কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেকটি বড় সমস্যা ডিউটি স্ট্রাকচার ও অ্যাডভান্স ট্যাক্স। একটি হাসপাতাল করতে গেলে ইকুইপমেন্ট, কনজিউমেবল ও বিভিন্ন আমদানীকৃত পণ্যের ওপর একাধিক কর দিতে হয়, যা প্রজেক্ট কস্ট অনেক বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় লাইসেন্সিং জটিলতা—একটি হাসপাতাল চালু করতে ৪০টির মতো অনুমোদন লাগে। ফলে একটি হাসপাতাল করতে পাঁচ-সাত বছর সময় লেগে যায়, যেখানে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোয় একই কাজ তিন বছরের মধ্যেই সম্ভব।

এ জটিলতা কাটাতে স্বাস্থ্য খাতের বড় প্রকল্পগুলোর জন্য সরকারের একটি স্পেশাল সেল বা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস থাকা জরুরি, যেখানে জমি, লাইসেন্স, কর, ডিউটি ও অন্যান্য অনুমোদন এক জায়গা থেকেই পাওয়া যাবে।

বর্তমানে অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, কিন্তু আমাদের ইকোসিস্টেম তাদের জন্য যথেষ্ট সহায়ক নয়। সরকারের দায়িত্ব হবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিতভাবে রিটার্ন পাবে এবং প্রয়োজনে এক্সিটের সুযোগও পাবে।

অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি। কারণ দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড প্রাইভেট সেক্টরে এবং মাত্র ৩৫ শতাংশ সরকারি খাতে। এ পরিস্থিতিতে যদি সরকার কিছু নির্দিষ্ট স্কিম বা পলিসির মাধ্যমে প্রাইভেট সেক্টরকে আংশিকভাবে সাবসিডাইজ করে, তাহলে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোও নির্দিষ্টসংখ্যক রোগীকে কম খরচে চিকিৎসা দিতে আগ্রহী হবে। এতে রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা পাবে এবং সরকারি হাসপাতালের চাপও কমবে।

কার্যকর স্বাস্থ্য বীমা চালু হলে ক্যান্সারের মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা ব্যয়ে কী পরিবর্তন আসতে পারে এবং সাধারণ মানুষ এতে বাস্তবে কতটা উপকৃত হবে?

আমাদের দেশে ইন্স্যুরেন্স নিয়ে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। মানুষের বিশ্বাসের অভাব রয়েছে। এখানে নীতির অনেক সহায়তা দরকার। ক্লেইমের একটা ব্যাপার চলে আসে। পাশাপাশি গভর্নমেন্টের ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার পলিসি যেটা নিয়ে আসলে প্রতিটা গভর্নমেন্টই চাচ্ছে, এটি বাস্তবায়ন করা, এটি বাস্তবায়ন করার জন্য প্রথমত আমাদের আসলে হেলথ ইকোসিস্টেমটা রেডি করতে হবে। আমাদের আসলে সিঙ্গেল আইডি ফর অল, যেখানে আপনি আপনার ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড থেকে শুরু করে সবকিছু একটা আইডিতে থাকবে। পাশাপাশি আমরা ট্রায়াল বেসিসে এটি একটি ছোট সিটি বেসিসেও করা যেতে পারে। এখন অনেক কোম্পানি ক্যাশলেস ইন্স্যুরেন্স বা হেলথ ইন্স্যুরেন্স করছে। কিন্তু আমাদের হেলথ সিস্টেমের সঙ্গে তারা আসলে বসছে না। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিজ, প্রাইভেট হেলথ সিস্টেম, গভর্নমেন্ট যদি ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হয়, তাহলে আসলে অনেক কিছুই সমাধান করা সম্ভব।

সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশের জন্য কোন ধরনের হেলথ ইন্স্যুরেন্স মডেল বাস্তবসম্মত হতে পারে?

এখানে অনেক ধরনেরই ইন্স্যুরেন্স রয়েছে। ক্যান্সার নিয়েই যদি বলি, আমাদের এখানে রেডিওথেরাপির কোনো ইন্স্যুরেন্স হয় না। আর আউটডোর ইন্স্যুরেন্স যেমন আমাদের এখানে আউটডোর রোগীদের কোনো ইন্স্যুরেন্স হয় না। পাশাপাশি লং টার্ম কেয়ার রোগীরা যেমন স্ট্রোকের রোগী, কার্ডিয়াক সার্জারির রোগী কিংবা ক্যান্সারের রোগী তারা। তাদের কিন্তু আসলে লং টার্ম কেয়ার কোনো প্রোগ্রাম নেই। আমি মনে করি এ ধরনের লং টার্ম কেয়ার প্রোগ্রাম কিংবা আউটডোর ক্যাশলেস ফ্যাসিলিটি, রেডিওথেরাপি, রিইম্বার্সমেন্ট এগুলো কিছু প্রোগ্রাম চালু করা দরকার। আপনি যদি আমেরিকায় যান বা বড় কোনো প্রতিষ্ঠান দেখেন, সবারই কিন্তু একটা নিজস্ব হেলথ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিও আছে। এটার কারণ, তারা তাদের নিজেদের মতো তাদের কাস্টমার বা রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী হেলথ ইন্স্যুরেন্স করে। যেটা আসলে ধরেন, আমাদের ট্র্যাডিশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো এ প্রয়োজনটা চিহ্নিতও করতে পারছে না কিংবা অ্যানালাইসিস করাটা অনেক চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আরো অনেক প্রডাক্ট আছে, যেগুলো আমি মনে করি যদি ইন্ট্রোডিউস করতে পারি, অনেক রোগীর বার্ডেন কমে যাবে। কারণ আমাদের একজন রোগীর অনেক টাকা খরচ হয়ে যায় চিকিৎসার জন্য। যেমন একজন ক্যান্সারের রোগীর লং টার্মে তার লাইফটাইমে ৫০-৬০ লাখ টাকা বাংলাদেশে খরচ হয়। বিদেশে এটা ক্ষেত্রবিশেষে অনেক টাকা, কয়েক কোটি টাকাও খরচ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি ইন্স্যুরেন্সের কোনো বিকল্প নেই এবং এতে অনেক চাপও কমিয়ে ফেলবে।