দেশে ক্যান্সার রোগীর হার এত দ্রুত বাড়ছে কেন বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশে যে হারে নতুন করে ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হচ্ছে, ক্যান্সার একটা মহামারীর দিকে যাচ্ছে। নন-কমিউনিকেবল ডিজিজে মৃত্যুর যে হার—যেমন ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাসকুলার হৃদরোগজনিত মৃত্যুর পরই ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছর নতুন করে দেড় লাখেরও বেশি নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে এত বেশিসংখ্যক ক্যান্সারের কারণ—আমার কাছে যেটা মনে হয়—বিভিন্ন ধরনের লাইফস্টাইল। মোস্টলি আমাদের লাইফস্টাইল এবং আমার কাছে যেটা মনে হয়—খাদ্যের যে ভেজাল—সব ধরনের খাদ্যে, মাছ, তরকারি, সবজি সব খাদ্যে—এত বেশি কীটনাশক এবং কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। আমার ধারণা দ্রুতবর্ধনশীল ক্যান্সার হওয়ার জন্য এর একটা দায় আছে। কারণ আমার কাছে অনেক গ্রামের রোগী আসে যারা লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত, যারা থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত। মেডিকেল গ্রাউন্ডে বিশেষ কারণ থাকলেও এত ব্যাপকসংখ্যক লিভার ক্যান্সার হওয়ার কারণ নেই। উন্নত দেশে লিভার ক্যান্সার হয় দীর্ঘমেয়াদি অ্যালকোহল সেবনের জন্য। আমাদের মুসলিম দেশ, এখানে ধর্মীয় রীতিনীতির কারণে লিভার ক্যান্সার কম হওয়ার কথা। তার পরও প্রচুর লিভার ক্যান্সারের রোগী পাওয়া যায়। এর প্রধান কারণ আমাদের ধারণা যে খাদ্যের ভেজাল। এছাড়া জমিতে কীটনাশক এবং সারের ব্যবহার।

এ প্রেক্ষাপটে সরকারের কী করা জরুরি?

সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার মাধ্যমে কাজ করছে—ভ্রাম্যমাণ আদালত হচ্ছে, কীটনাশক ও কেমিক্যাল ব্যবহারে নজরদারি চলছে। তবে এ কার্যক্রম আরো নিয়মিত ও শক্তিশালী হওয়া দরকার। পাশাপাশি দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা ও দেশীয় ওষুধের ওপর আস্থা তৈরি করতে সরকারকে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

ক্যান্সার ওষুধ উৎপাদনে বীকনের যাত্রা কীভাবে শুরু?

২০০৬ সালের আগে বাংলাদেশে প্রায় শতভাগ ক্যান্সারের ওষুধই আমদানিনির্ভর ছিল। সেই সময় বীকনের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ এবাদুল করিম স্যার ভাবলেন, যে রোগের চিকিৎসা নেই বলে মানুষ ধরে নিয়েছে, সেখানেই আশার আলো জ্বালাতে হবে। মানবসেবাকে ব্যবসার পুঁজি করে তিনি ক্যান্সার ওষুধ উৎপাদনে উদ্যোগ নেন। আমাদের স্লোগান ‘লাইট ফর লাইফ’—এটা কেবল স্লোগান নয়, এটা আমাদের দর্শন।

দেশীয় উৎপাদনের ফলে রোগীরা কীভাবে উপকৃত হয়েছেন?

সবচেয়ে বড় উপকারিতা এসেছে দামের ক্ষেত্রে। একসময় যে ওষুধ বিদেশ থেকে আনতে সাড়ে ৭ হাজার টাকা লাগত, আমরা সেটি ৭৫০ টাকায় উৎপাদন করেছি—প্রায় দশ ভাগ কম দামে। আজ আমাদের ১২৪টিরও বেশি ক্যান্সার ড্রাগ আছে, যা বাংলাদেশের প্রচলিত প্রায় সব ধরনের ক্যান্সারের সব ধাপের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায়। কার্যকারিতার জায়গায়ও চিকিৎসকেরা সন্তুষ্ট, কারণ চিকিৎসার ফলাফল স্পষ্টভাবে নির্ণয় করা যায়।

দেশীয় ক্যান্সার ওষুধ উৎপাদনে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অননুমোদিত চ্যানেলে আসা বিদেশী ওষুধ। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অনেক সময় অবৈধপথে মানহীন ওষুধ বাজারে ঢুকে পড়ে। এতে রোগীর ঝুঁকি বাড়ে এবং দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার অভিযান চালাচ্ছে, তবে এ নজরদারি আরো ধারাবাহিক হওয়া দরকার। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ‘দেশীয় ওষুধ মানে নকল’—এ মিথ ভাঙাও জরুরি।

ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা ও নতুন ওষুধ উন্নয়নে আপনারা কী করছেন?

আমাদের নিয়মিত গবেষণা চলছে। ইমিউনোথেরাপি ও মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডির মতো আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের নিজস্ব সেল কালচার ল্যাব আছে, যেখানে নতুন ওষুধ উদ্ভবনের গবেষণা হয়। আমাদের লক্ষ্য উন্নত বিশ্বের চিকিৎসা যেন বাংলাদেশের রোগীরাও পায়, সেটিও সাশ্রয়ী মূল্যে।

সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে বীকনের ভূমিকা কী?

আমরা সামাজিক সচেতনতা নিয়ে কাজ করি। আমরা মূলত লাইফস্টাইল নিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কিছু করি না। কিন্তু আমরা সাধারণভাবে মানুষকে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন রকম প্রচারণা চালাই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ প্রচারণা ডাক্তারদের মধ্যে করি, সায়েন্টিফিক ডাক্তারদের নিয়ে যাই, ক্যান্সার ডাক্তারকে নিয়ে যাই, স্থানীয় এলাকায় বা কোনো শহুরে এলাকায় সাধারণ জনগণের ভেতরে সেই ক্যান্সারের স্ক্রিনিং করাই। ক্যান্সারের সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাই, টেলিভিশনে টক শো হয়, পত্রিকা বা গণমাধ্যমে ডাক্তারের প্রতিবেদন যায়। এ রকমভাবে আমরা সামগ্রিক সচেতনতা তৈরি করি। আমরা বিশেষ করে জীবনধারা নিয়ে কোনো সচেতনতার কথা বলি না। কিন্তু আমাদের সচেতনতার বার্তার ভেতরে থাকে যে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, সঠিক জীবনাচরণ ক্যান্সারকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বীকনের সাফল্য কতটা?

বর্তমানে আমাদের ওষুধ ২৬টিরও বেশি দেশে সরাসরি রফতানি হচ্ছে এবং প্রায় ১২৪টি দেশের রোগী আমাদের ওষুধ ব্যবহার করছেন পেশেন্ট সাপোর্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে। নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে আমাদের জেনেরিক ড্রাগ ব্যবহারের পর নীতিগত পরিবর্তন এসেছে—এটি আমাদের জন্য বড় অর্জন।

প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর বীকন কীভাবে এগোচ্ছে?

বীকনের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ এবাদুল করিম স্যারের মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর শোকের বিষয়। তবে স্যারের লিগ্যাসি আমাদের প্রতিটি কর্মীর মধ্যে গেঁথে আছে। প্রায় চার হাজার কর্মী সেই মূল্যবোধ ধারণ করেই কাজ করছেন। আমরা বিশ্বাস করি—যত বেশি রোগীকে সেবা দিতে পারব, ততই তার আত্মা শান্তি পাবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আমরা কোনো র‍্যাংঙ্কিংয়ের পেছনে ছুটি না। আমাদের লক্ষ্য একটি মূল্যবোধসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হওয়া। ভবিষ্যতে আধুনিক ডায়াগনস্টিক, মলিকুলার ও জেনেটিক টেস্টিং এবং সমন্বিত ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলার জন্য পার্টনারশিপে কাজ করতে চাই।

রোগীদের জন্য বার্তা কী?

সাহস রাখুন। এটি সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের অনকোলজিস্ট, হাসপাতাল ও দেশীয় ক্যান্সার ওষুধের ওপর আস্থা রাখুন। বাংলাদেশে এখন কার্যকর ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা সম্ভব—এ বিশ্বাসই আপনাকে এগিয়ে নেবে।