বর্ষীয়ান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, তাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর। পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী বদরুদ্দীন উমর রাজনীতি ও গবেষণায় সম্পৃক্ত রয়েছেন ৫৩ বছর ধরে। দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতিসহ নানা বিষয়ে শতাধিক বই রয়েছে তার। বাংলাদেশের ইতিহাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তার এসব গ্রন্থের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সত্তরের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে তার মূল্যায়ন ও স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন

সত্তরের নির্বাচনে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের হস্তক্ষেপ না করার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে কথা শুরুর আগে প্রথমেই বলা দরকার ১৯৭১ সালের আগে এ দেশে যত নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোয় বিশেষ কারচুপি হয়নি। পরিপ্রেক্ষিতটি সত্তর সালের নির্বাচনে কারচুপি না হওয়ার পেছনে কাজ করেছে। ১৯৫৪ সাল থেকে এ দেশে যত নির্বাচন হয়েছিল তার কোনোটাই আজকাল যেভাবে হয়েছে বা শেখ হাসিনার সময়ে যে রকম বীভৎসভাবে হয়েছে সেভাবে হয়নি। তাছাড়া ১৯৭০ সালের যে নির্বাচন সে সময় মার্শাল লয়ের অধীনে রাজনৈতিক দলগুলোর তেমন কোনো অধিকার ছিল না। ইয়াহিয়াও নিরপেক্ষ নির্বাচন চেয়েছিল। এ দল বা ওই দলকে জিতিয়ে দেয়ার কোনো চিন্তা বা প্রয়োজন ইয়াহিয়া খানের ছিল না। সেজন্য সত্তর সালের নির্বাচনে কোনো কারচুপি হয়নি। আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনে ভীষণ জয়লাভ করেছিল সেটির মধ্যে কোনো কারচুপি ছিল না।

ওই সময়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেমন ছিল?

নির্বাচন কমিশন একদম স্বাধীনভাবে কাজ করেছিল। ইয়াহিয়া সেখানে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। সেনাবাহিনী বা অন্য কোনো পক্ষ—কেউই করেনি। সেটি যদি হতো তাহলে আওয়ামী লীগ জিততে পারত না। মনে রাখতে হবে সে সময়ের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেছিল। সরকারি বাহিনী বা সামরিক বাহিনী থেকে যদি হস্তক্ষেপ হতো তাহলে আওয়ামী লীগের পক্ষে এভাবে জয়লাভ করা সম্ভব হতো না।

শোনা যায় তখন পাকিস্তান সরকার ভেবেছিল যে আওয়ামী লীগ সত্তর-আশিটার মতো আসন পাবে। এ ধারণা কি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে দেয়ার পেছনে কাজ করেছে?

নাহ। এটি সঠিক না। তখন সবারই ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ বেশির ভাগ সিট পাবে। ৩০-৩৫টা সিট ন্যাপ পাবে। ন্যাপ নির্বাচন বর্জন করায় সব আসনেই আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে। কিন্তু ৭০-৮০টি পাবে এমনটি আমি কোনো জায়গায় দেখিনি। তাছাড়া আওয়ামী লীগ ৭০-৮০টি পেলে বাকিগুলো কে পেত? কারা ছিল? ছিল না। আওয়ামী লীগের সে সময় একটি জনপ্রিয়তার জোয়ার এসেছিল। এটা সবাই যেমন জানত, সরকারও তা জানত।

আওয়ামী লীগের জয়ের ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার অবগত থাকলেও তারা কেন নির্বাচন নিয়ে কারচুপি করেনি?

এটা তো তাকে দিতেই হতো। কারণ তখন সামরিক বাহিনী দেশের ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি কর্মসূচিতে ছিল। চিরকাল সামরিক বাহিনী থাকাটা অসুবিধাজনক সেটি তারা বুঝেছিল। কাজেই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সেখানে আওয়ামী লীগ জেতে। আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর কোনো প্রয়োজন তাদের ছিল না। আওয়ামী লীগকে কেন তারা ঠেকাতে যাবে? তারা একটি নির্বাচন করেছিল, সেখানে যারা জিতবে তাদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেবে। তারা তো ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিল। তা না হলে নির্বাচন দেবে কেন? কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়ে যে ভুট্টো একটি ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দেবে, সেটি সত্তর সালের নির্বাচনেও বোঝা যায়নি। মানে তার সঙ্গে সামরিক বাহিনী মিলে যে কারসাজি করবে সে চিন্তা সত্তর সালে ছিল না। এটি নির্বাচনের পর যখন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো তখন দেখা দিল। কিন্তু সত্তর সালের নির্বাচনের সময় এটি ছিল না। সে সময় তারা চেয়েছিল একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। যে জিতবে তার সঙ্গে আলোচনা করে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি ব্যবস্থা করবে।

ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় তৈরি হওয়া সংকট নিয়ে জানতে চাই।

সত্তরের নির্বাচনের আগে ইয়াহিয়ার মধ্যে যে চিন্তা ছিল নির্বাচনের পর ইয়াহিয়ার মধ্যেও সে চিন্তার পরিবর্তন হয়েছিল। প্রধানত ভুট্টোর প্রভাবে ও চাপে। ভুট্টো যেভাবে চাপ দিয়ে ইয়াহিয়ার চিন্তাকে পরিবর্তন করেছিল সেটি আগে ছিল না। পরবর্তীকালে যে অবস্থা দাঁড়াল সে অনেকটাই বলা চলে ভুট্টোর চাপে। ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিল। সে জানত পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের মধ্যে থাকলে কখনই তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হবে না। কাজেই সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে গিয়ে যদি পূর্ব পাকিস্তান চলেও যায় তাতে তার কিছু আসে যায় না। এজন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা শেখ মুজিবের চেয়ে ভুট্টো অনেক বেশি চেয়েছে। কারণ পূর্ব বাংলাকে ঝেড়ে না ফেললে সে প্রধানমন্ত্রী হতে পারত না। শেখ মুজিব চেয়েছেন পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে। সেজন্য তিনি আসলে এ দেশটা স্বাধীন হয়ে যাবে তা চাননি। দেশভাগ শেখ মুজিব চাননি; ভুট্টো চেয়েছেন।

সত্তরের নির্বাচন নিয়ে বিশেষ কোনো স্মৃতি কি আপনার মনে পড়ে?

নির্বাচনের সময় ঢাকায়ই ছিলাম। আমি ভোট দিইনি। ভোট দিই না। শুধু ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে একবার ভোট দিয়েছিলাম। এছাড়া জীবনে আর কখনো ভোট দিইনি।

আপনি কেন ভোট দেননি?

নির্বাচন দিয়ে কিছু হবে না। খামোখা। নির্বাচনে যে-ই যাবে বদমাইশি করবে। আমি একজনকে ভোট দিয়ে দায়ী হতে যাবে কেন। যারা দাঁড়িয়েছিল তাদের কাউকেই আমি পছন্দ করি না। কাজেই কাকে ভোট দেব?

সত্তরের নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য মানুষের মধ্যে কেমন আগ্রহ ছিল?

সত্তরের নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য মানুষের মধ্যে প্রবল আগ্রহ ছিল। মানুষ ভোট দিয়েছিল। নির্বাচনটি ঊনসত্তরের আন্দোলনের পরে এসেছিল। একটি পরিবর্তন লোকে চেয়েছিল। সে পরিবর্তনের মুখে নির্বাচন হওয়ায় মানুষ ভোট দিয়েছিল। নির্বাচনটি খুবই নিরপেক্ষ ছিল। যেটি বললাম পাকিস্তান আমলে নির্বাচনে এ রকম কারচুপি হতো না। ১৯৫৪-৭০ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে তেমন কারচুপি ছিল না। থাকলেও খুব সামান্য। পরবর্তী সময়ে কারচুপি একটি নিয়মে দাঁড়িয়ে গেল। শেখ হাসিনা এসে এটিকে কারচুপিও বলা চলে না; একেবারে ডাকাতি। এ রকম অবস্থা পাকিস্তান আমলে ছিল না—এটি বলতেই হবে।

একটি স্মৃতি মনে আছে। যে কেন্দ্রে আমি ভোটার ছিলাম সে কেন্দ্রে আমার নাম করে একজন ভোট দিতে গিয়েছিল। সেখানে যখন আমার নাম বলে, আমার বাবার নাম এই বলেছে, তখন যেখান থেকে কার্ড নেয় সেখানের লোকটি তাকে তাড়া করেছিল। সে তখন দৌড়ে বাইরে পালিয়েছিল।