একটা অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, উৎসবমুখর নির্বাচন হওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ ১৯৭০ সালের নির্বাচন। সদর্থক অর্থেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সাংবিধানিক, নৈতিক ও ন্যায্যতার প্রশ্নে যৌক্তিক ও জুতসই উত্তর নিহিত আছে এ নির্বাচনের ফলাফলে। ফলে এ নির্বাচন যেমন আমাদের একীভূত মানসিকতার পরিচয় বহন করে, তেমন আমাদের স্বতন্ত্রতাকেও প্রকৃষ্টরূপে হাজির করে। আমাদের আত্মপরিচয়ের গর্ব ও গৌরবের আয়নারূপেও বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। একটা ভালো বা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যে কতটা জরুরি ও অনিবার্য এক অনুষঙ্গ তার গভীর তাৎপর্য নিহিত আছে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন কেন প্রয়োজন। কেন ছাত্র-জনতা গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দেয়। এসব কেনর উত্তর নিহিত আছে ১৯৭০-এর নির্বাচনের শরীরে, তার ভেতর-বাইরে। স্বল্প পরিসরের এ লেখা সেসব তালাশ করার নিমিত্তে।

পাকিস্তানের জনগণ কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ নির্বাচনের সুযোগ পায় ১৯৭০ সালে। ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ভোটগ্রহণ। উল্লেখ্য, ১৯৪৭-৫৮ সময়পর্বে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৫৪-এর নির্বাচন ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন। ১৯৫৮-৬২ সময়পর্বে দেশে সামরিক শাসন ছিল। ১৯৬২-তে মৌলিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জাতীয় পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান আইয়ুব খানের থেকে ক্ষমতা দখল করেন এবং ১৯৬২-এর সংবিধান বাতিল করেন। তিনি ওই বছরের ২৮ নভেম্বর দুটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রথমত, পাকিস্তানের এক ইউনিট ব্যবস্থা বাতিল করেন। দ্বিতীয়ত, ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ এ নীতিতে ভোট হবে বলে ঘোষণা দেন। দ্বিতীয় ঘোষণাটাই পূর্ববঙ্গের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নির্বাচনের জন্য ১৯৭০ সালের ৩১ মার্চ ঘোষণা করেন ‘আইন কাঠামো আদেশ’। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আমাদের মোটামুটি জানা রয়েছে। আমরা দেখব এ নির্বাচন কীভাবে একটা জাতির জন্মের গুরুত্বপূর্ণ এক মানদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

দ্য ব্লাড টেলিগ্রামে উল্লেখিত হয়েছে: ‘‌১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল গণতন্ত্র নিয়ে একটি অসাধারণ পরীক্ষা। পাকিস্তানের স্বাধীনতার ২৩ বছরের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম সরাসরি নির্বাচন, যেখানে প্রথমবারের মতো নারীসহ সব প্রাপ্তবয়স্ককে ভোট দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের জনগণকে একটি গণপরিষদ নির্বাচন করতে হবে, যেটি ভঙ্গুর দেশের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা কঠিন কাজ হবে। ইয়াহিয়া হয়তো ভোটে কারচুপির চেষ্টা করতেন অথবা নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার জন্য ঘূর্ণিঝড়কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতেন, কিন্তু তিনি এ গণতান্ত্রিক মুহূর্তটিকে অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।’

‘যখন মাহেন্দ্রক্ষণটি এল, তখন ঢাকায় মার্কিন কর্মকর্তারা আনন্দিতভাবে বিস্মিত হয়েছিলেন: ভোটাভুটি অত্যন্ত সুষ্ঠু হয়েছিল, এদেশে দেখা নির্বাচনগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত সেরা। ভোট কেন্দ্রে সেনা ও পুলিশ সদস্যরা শুধু শান্তি বজায় রাখার জন্য সেখানে ছিলেন এবং ব্লাড ভোটারদের ভয় দেখানোর কোনো লক্ষণ দেখেননি। সবাই একমত যে এটি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। নারীরা দলে দলে ভোট দিয়েছেন। বুচার বলেন, ‘নির্বাচন উল্লেখযোগ্যভাবে অবাধ ছিল। এটি ছিল মোটামুটি অনন্য, একটি সামরিক সরকারকে বেসামরিক কর্তৃপক্ষে পরিণত করা। এটি একটি অসাধারণ জিনিস ছিল।’

‘‌এটি এমন একটি মুহূর্ত ছিল, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারত। সেখানে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে, যা সত্যিকার অর্থে জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ।’ [দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম: নিক্সন, কিসিঞ্জার, অ্যান্ড আ ফরগটেন জেনোসাইড]

১৯৭০ সালের নির্বাচন বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির মধ্যে অন্যতম। এ ভূখণ্ডের মানুষ নির্বাচনটির মধ্য দিয়ে তাদের দুই যুগের আন্দোলন-লড়াই-সংগ্রামের যেসব দাবিদাওয়া তার সবটাই বৈধ হয়ে যায়। এ বৈধতা কেবল সাংবিধানিকভাবে নয়, নৈতিকতা ও ন্যায্যতার দিক থেকেও। বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীরভাবে খেয়াল করার মতো। যেকোনো বিষয় বা প্রশ্ন যখন এক. সাংবিধানিকভাবে, দুই. নৈতিকভাবে, তিন. ন্যায্যতার ভিত্তিতে বৈধ হয়ে যায়, তখন সে বিষয় বা প্রশ্নকে আর আটকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। ইতিহাস এর সাক্ষ্য দেয়। বিভিন্ন দেশে আমরা এ রকম ঘটনার নজির দেখেছি। যে ঘটনা বাঁক বদলানো ইতিহাসের সূচনা করে। জাতি ভাগ্যাকাশের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের মধ্যে দিয়ে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে এবং এ নির্বাচনের ফলাফল ও তার পরিণতিকে আমরা বলতে পারি বাঙালি জাতির ইতিহাসকে কেবল মহিমান্বিত করেনি, বাঙালিকে, সেদিনের পূর্ব পাকিস্তানকে নতুন দেশ-নতুন রাষ্ট্র ও স্বাধীন জাতি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার বিরল সুযোগ দান করেছে। এ প্রেক্ষাপটে ওই নির্বাচনকে বলা যেতে পারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক, নৈতিক ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে জন্মলগ্নের ‘আঁতুড়ঘর’ বিশেষ। এ নির্বাচনের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও অবদান আমাদের পক্ষে বুঝতে অনেক বেশি সহায়ক হবে, যদি আমরা ১৯৭০ পূর্ববর্তী সময়ের ঘটনাবহুল ইতিহাসের ঘটনাক্রম একটু পরিভ্রমণ করে আসি।

বাঙালি জাতির ইতিহাস হাজার বছরের নয়, কয়েক হাজার বছরের। যারা মনে করেছিলেন এ জাতির ইতিহাস টেনেটুনে এক হাজার বছরের মতো, তারা ঠিক বলেননি। উয়ারি বটেশ্বরের প্রত্নসম্পদ অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে এ জাতির ইতিহাস কমপক্ষে দেড় থেকে দুই হাজার বছরের। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এ সময়কালকে মান্যতা দিয়েছেন। আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হলো এসব অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের অনেক আগেই আবুল মনসুর আহমদ এ জাতির ইতিহাসকে ছয় হাজারের বলে জ্ঞান করেছেন। তিনি প্রাচীন সমতটীয় সভ্যতাকে বিবেচনায় নিয়ে এ কথা হাজির করেছিলেন। এখনকার বাস্তবতায় এ কথা বলা মোটেই অত্যুক্তি হবে না যে জাতিগত সময়কালের প্রশ্নে আমরা যদি একও হতে না পারি, পূর্ববঙ্গের অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের স্থানিক ইতিহাস বা ভূখণ্ডগত সভ্যতার ইতিহাস কমপক্ষে সাত হাজারের বছরের পুরনো।

এ সভ্যতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো নানাভাবে সে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। আয়তনিকভাবে সে হয়তো মোটেই বড় মানচিত্রের নয় কিন্তু বিশিষ্টতায় প্রকৃতিগতভাবেই অর্জন করেছে স্বতান্ত্রিক সত্তা ও বিনির্মাণের গুণাবলি, যা আজও প্রবহমান। এ সিদ্ধান্ত মোটেই তর্কসাপেক্ষ নয়, ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিশেষ। যদি একটু সুক্ষ্মভাবে অতীতের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করি, তা হলে এ সত্যতা খুঁজে পাব, এ ধারণার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তিগুলোর দেখা মিলবে। এ কারণে আজকের বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় বা ভারতীয় সভ্যতার অংশ হলেও তার নিজস্ব একটা ইতিহাস ও বিনির্মাণ রয়েছে। যার প্রমাণ মিলেছে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। বিষয়টা আরো একটু খোলতাই করা যায় এভাবে।

ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় এ ভূখণ্ডের গুরুত্ব ছিল সবিশেষ। গোখলে বলেছিলেন, আজ বাঙালিরা যা ভাবে, ভারত আগামীকাল তা ভাবে। এটা কেবল কথার কথা নয়, এ কথার ঐতিহাসিক সত্যতাও রয়েছে। কিন্তু সে আলোচনার পরিসর এটা নয়। ভারত ভাগ হয়ে যে পাকিস্তান নামক স্বাধীন একটা রাষ্ট্রের জন্ম হলো তার জনয়িতা কিন্তু আর কেউ নয়, এ পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমান। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয়েছে এ পূর্ববঙ্গকে পৃথকীকরণের ঘটনায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদই কিন্তু ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উদ্গাতা।

যে পাকিস্তানের জন্ম হলো পূর্ববঙ্গের মানুষের আন্দোলন ও দাবিদাওয়ার ফলে। স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে সে পূর্ববঙ্গ হয়ে উঠল পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক বিশেষ। পাকিস্তানের রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা বনে গেল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। পূর্ববঙ্গের মানুষ চাইল নৈতিক ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সবকিছুর হিস্যা বুঝে নিতে। তখনো যেহেতু পাকিস্তানের সংবিধান প্রণীত হয়নি, এ কারণে সাংবিধানিকতার প্রশ্নটি এখানে উহ্য রয়েছে। দেখা গেল, শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা সব হিস্যায় কোনো নীতি নৈতিকতার আশ্রয় নিত না। যুক্তিকে গ্রাহ্য করত না। সবকিছু চাপিয়ে দেয়ায় হয়ে উঠল তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। ভাষার প্রশ্নে, অর্থনীতির প্রশ্নে, বাণিজ্যের প্রশ্নে, আমদানি-রফতানির প্রশ্নে, সমরনীতির প্রশ্নে তারা পূর্ববঙ্গকে ক্রমাগত উপেক্ষা করতে থাকল। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা যেহেতু বাংলা, তাই এ অঞ্চলের মানুষের দাবি ছিল উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হোক। কিন্তু সেটা দিতেও তারা কেবল অপারগতা প্রকাশ করেনি, বুলেট দিয়ে সে দাবিকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৫৪-এর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনী ফলাফলকেও তারা মেনে নিতে পারেনি। সামরিক শাসন দিয়ে দেশ পরিচালনার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু পূর্ববঙ্গের মানুষ সেটা মেনে নেয়নি। ১৯৬৬-তে পূর্ববঙ্গের মানুষের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি তুলে ধরেছেন। যাকে মুক্তির সনদ বলে বিবেচনা করেছে বাঙালি জাতি, তাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে চরমভাবে। ততদিনে দুই অর্থনীতির তত্ত্বে প্রমাণিত হয়েছে এক দেশ হলেও পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি সমতার ভিত্তিতে-সমবণ্টনের আওতায়-সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে না। এসবের কিছুই আমলে নেয়া হয়নি। উপরন্তু সামরিক স্বৈরাচার আইয়ুব খান শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। এসবের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক এক গণ-অভ্যুত্থান। যাতে মুক্তি পায় শেখ মুজিবসহ পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক নেতারা। আইয়ুব খানের পতন হয়। ক্ষমতায় আসে ইয়াহিয়া খান। তিনি পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ১৯৭০ সালের ১২ ডিসেম্বর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা সর্বজনে ১৯৭০-এর নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়। এ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে লিখিত হয় নতুন এক ইতিহাস।

এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এর মধ্যে দিয়ে বেশ কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

এক. ১৯৪৭-৬৯ সাল থেকে যেসব দাবিদাওয়া নিয়ে সোচ্চার ছিল পূর্ববঙ্গের মানুষ, তা যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত বলে প্রতীয়মান হয়।

দুই. ছয় দফা যে সত্যিসত্যি বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছিল এবং পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রাণের দাবি ছিল, সেটা ভোটাভুটির মধ্যে দিয়ে সবার কাছে স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

তিন. দুই অর্থনীতির তত্ত্ব যে অভ্রান্ত ছিল তা ব্যালটেও প্রমাণ হয়ে যায়।

চার. পাকিস্তান যে দ্বিধাবিভক্ত একটা দেশ। এবং দুই অংশের মধ্যে যে সমতা নেই, সেটা উন্মোচিত হয়। যেমন-

ক. দুই অঞ্চলে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটে। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ। পশ্চিম পাকিস্তানে পাকিস্তান পিপলস পার্টি ওরফে পিপিপি। একই সঙ্গে দুজন নেতাও হাজির হন, শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলি ভুট্টো।

খ. দুটি রাজনৈতিক দলই নিজ নিজ আসনের বাইরে কোনো আসন না পাওয়ায় প্রমাণিত হয় ওনারা নিজ নিজ অঞ্চলের স্বার্থই রক্ষা করে চলেছেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় পাকিস্তান শাসন করার অধিকার কেবল তারই রয়েছে। কিন্তু ভুট্টো দাবি করে বসেন কেবল একটা প্রদেশের বিজয়ীকে আমি পুরো পাকিস্তানের শাসনভার দিতে পরি না। অথচ ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের আগে এবং ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন কোনো প্রকার ম্যান্ডেট ছাড়া কাউকে আমি জনগণের প্রতিনিধি মনে করি না।

শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ম্যান্ডেট ছাড়া আমি নিজেকে জনগণের প্রতিনিধি দাবি করতে পারি না। কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ইয়াহিয়া যে ষড়যন্ত্রী তা প্রমাণ হয়ে যায়।

পাঁচ. এ নির্বাচন পূর্ববঙ্গের মানুষের সম্মিলিত শক্তিকে হাজির করেছে। এ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হয়েছে প্রয়োজনে, বিশেষ সময়ে এখানকার মানুষ নিরঙ্কুশ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি ও সামর্থ্য রাখেন।

এ কারণে আমরা মনে করি, ১৯৭০-এর নির্বাচন এ জাতির ইতিহাসে মাইলফলক বিশেষ। এ নির্বাচন যেমন ১৯৪৭-৬৯ পর্যন্ত সময়কালের আন্দোলন-সংগ্রাম-দাবিদাওয়া ও ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকারকে বৈধতা দিয়েছে। ঠিক তেমন নির্বাচন-পরবর্তী যেসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, তার প্রতিটি ক্ষেত্রে সবিশেষ নৈতিক শক্তি জুগিয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রে ১৯৭০-এর পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম, যা ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত হয়।

এ যুদ্ধ যে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া একটা যুদ্ধ ছিল, ওই নির্বাচন তা প্রমাণ করে। নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, বিজয়ী দলের নেতার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু সেটা করতে চাইনি পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে জুলফিকার আলি ভুট্টোর পিপিপি, পশ্চিম পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র, পশ্চিম পাকিস্তানের এলিট শ্রেণী ও সেখানকার ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। তারা সাংবিধানিকভাবে, নৈতিকভাবে, ন্যায্যতার ভিত্তিতে নির্বাচিত একটা রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। এবং পূর্ববঙ্গের মানুষ সে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়।

এখানে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার, পূর্ববঙ্গের মানুষের পক্ষে সেদিন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ন্যায়সংগত ছিল। সেটা ছিল বলেই পাকিস্তানের মতো সমরশক্তিতে পারঙ্গম এবং সে সময়ের নিরিখে বিশ্বের অন্যতম পরাক্রমশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে। সেদিন পূর্ববঙ্গের মানুষ দেখেছে এ যুদ্ধ সাংবিধানিকভাবে, নৈতিকভাবে, ন্যায্যতার প্রশ্নে বৈধ ও অনিবার্য। এ কারণে এ যুদ্ধে তাদের যুক্ত হওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। নির্বাচনটা যেহেতু সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে হয়েছে। সে ভোটের ফলাফল মেনে না নেয়ার বিষয়টাকে কেউই ভালোভাবে নেয়নি। এ কারণে কতিপয় দালাল ও সুবিধাভোগী ছাড়া সেদিনের পূর্ববঙ্গের সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। নিজেদের নানামুখী অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করে। এই যে একটা ভূখণ্ডের মানুষের সবার একটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া—এটা সম্ভব হয়েছে ১৯৭০-এর নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক বিশ্ব যেভাবে সমর্থন জুগিয়েছে, সেটাও ছিল একটা বিরল ঘটনা। কেননা কতিপয় দেশ ব্যতীত সব দেশই আমাদের যুদ্ধকে সমর্থন করেছে, সর্বাত্মকভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এমনকি কোনো কোনো দেশের সরকার বা প্রশাসনযন্ত্র আমাদের যুদ্ধে সহায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত না হলেও জনগণের অগ্রসর প্রতিনিধিরা কিন্তু ঠিকই আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। এটা কেন সম্ভব হয়েছে, কী কারণ ছিল এর পেছনে। কারণ একটাই, সেটা হলো ১৯৭০-এর নির্বাচন। এ নির্বাচন আমাদের যুদ্ধকে বৈধতা দিয়েছে। সারা বিশ্ব দেখেছে। এ যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তান সংবিধানকে পদদলিত করেছে, নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার জায়গায় নিয়ে গেছে, ন্যায্যতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে যারা সত্যটাকে দেখতে চেয়েছেন, মানবাধিকারকে বুঝতে চেয়েছেন, গণতন্ত্র চর্চিত হোক এ অভিপ্রায় জারি রেখেছেন—তাদের জন্য আমাদের যুদ্ধের পক্ষে থাকা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। এমনকি ভারত কিংবা সেদিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দেশ যে আমাদের পক্ষে ছিল, তাদেরও একটা যৌক্তিকতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এজন্য জাতিসংঘের কাছে জবাবদিহি করতে হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনা ছিল ১৯৭০-এর নির্বাচন।

লক্ষণীয় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ে বাঙালির পক্ষে, এ ভূখণ্ডের মানুষের জন্য প্রকৃতিও সহায়ক শক্তি হিসেবে সেদিন দেখা দিয়েছিল। নির্বাচন প্রথমে মার্চে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বন্যার কারণে সেটা পিছিয়ে দেয়া হয়। এবং নির্বাচনের আগের মাসে পূর্ববঙ্গের উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ করে ভোলায় প্রলয়ংকরী এক ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়। এ ঘূর্ণিঝড় গোর্কি বা ভোলা সাইক্লোন নামে পরিচিত। এ ঝড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। গবাদিপশু থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রাণীরও করুণ মৃত্যু হয়। বড় রকমের সর্বনাশ হয় প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের। কেবল জান নয়, মালের ক্ষতি হয় অবর্ননীয়। বিশ্বের ইতিহাসে যে কয়েকটা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়েছে। ভোলা সাইক্লোনকে তার প্রথম ১০টির একটি মনে করা হয়। অথচ এ রকম একটি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হওয়ার পর তদানীন্তন সরকার সাহায্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনুদারতার পরিচয় দেয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহলের কেউই সেখানে পরিদর্শনে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। পূর্ববঙ্গের রাজনীতিকরা বিশেষ করে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান সাহায্য সহযোগিতা প্রদান ও পরিস্থিতি অবলোকনের জন্য পরিদর্শনের আহ্বান জানালেও তারা এ ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকেন। পূর্ববঙ্গের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা কেবল শাসন করতে আর মুনাফা লুটতে চান। যেমন ঠিক ব্রিটিশরা করেছিল। তার পরও ব্রিটিশরা এতটা বর্বরতার পরিচয় দেয়নি, যতটা তারা দিয়েছে। এসবের জবাব দেয়ার উপযুক্ত সময়, পথ ও পন্থা খুঁজছিল পূর্ববঙ্গের জনগণ। যার সুযোগ ঘটে ১৯৭০-এর নির্বাচনে এবং পূর্ববঙ্গবাসী তার সমুচিত জবাব দেয়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পূর্ববঙ্গের মানুষ দেখেছিল তারা কতটা অরক্ষিত। ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোনে স্পষ্ট পূর্ববঙ্গের মানুষ কতটা অসহায়। মরলেও দেখার কেউ নেই, আছে কেবল শাসন ও শোষণ করার মানুষ। সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগের এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাঙালিরা সব হতমান-অপমান-বঞ্চনা-শোষণ ও নিগ্রহের সমুচিত জবাব দেন ব্যালটে ব্যালটে। প্রকৃতিও যে মানুষের সঙ্গে কীভাবে একাত্ম হয়ে উঠতে পারে, সহায়ক শক্তির ভূমিকা রাখতে পারে ১৯৭০-এর নির্বাচন তার প্রমাণ। এ কারণে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা ইতিহাসের চাওয়া। কারণ সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন জাতিকে নতুন দিশা হাজির করতে পারে বিবিধ প্রকারে। ১৯৭০-এর নির্বাচন যার উজ্জ্বল উদাহরণ, ইতিহাসে পাতায় আগুনের পরশমণিসম এক অধ্যায়, যা থেকে অনেক শেখার ও জানার রয়েছে।

কাজল রশীদ শাহীন: চিন্তক, সাংবাদিক ও গবেষক