​অত্যধিক জনসংখ্যার ভারে ঢাকা ধুঁকছে কয়েক দশক ধরেই। ভারবহন ক্ষমতার তিন-চার গুণ জনসংখ্যা হয়েছে। সেটাও অনেক দিন হয়ে গেল। কিন্তু ঢাকার বৃদ্ধিতে লাগাম টেনে ধরার কার্যকর কোনো পরিকল্পনা করছে না কোনো সরকার।

​জাতিসংঘের ‘‌ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল মেগাসিটি। ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ। শুধু তা-ই নয়, পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ২১ লাখে পৌঁছবে এবং এটি জাকার্তাকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জনবহুল শহরে পরিণত হবে।

​​ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য ও যানজট দূর করতে আমরা একের পর এক অত্যন্ত ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ করছি—ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং একের পর এক মেট্রোরেল। অতিসম্প্রতি ঢাকায় প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে আরো তিনটি নতুন মেট্রোরেল লাইন অনুমোদন করা হয়েছে। নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকাকে সচল করতে বিশাল ব্যয়ে একের পর এক যে মেট্রোরেল অনুমোদন করা হচ্ছে, তার একটা সুযোগ-ব্যয় (অপরচুনিটি কস্ট) রয়েছে। এ বিশাল পরিমাণ অর্থ যদি দেশের অন্য সাতটি বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর প্রাথমিক অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পায়ন ও স্থানীয় সেবা খাতে বণ্টন করা হতো, তবে বাংলাদেশের সার্বিক আঞ্চলিক অর্থনীতির চিত্র কতটা বদলে যেত? এ আড়াই লাখ কোটি টাকা ঢাকার বাইরে বিনিয়োগ হলে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারত। বিশ্বমানের বিশেষায়িত হাসপাতাল, সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তোলা যেত। ফলে যে লাখ লাখ মানুষ জীবিকা ও উন্নত নাগরিক সেবার আকর্ষণে প্রতিদিন ঢাকায় স্থানান্তর হচ্ছে, তাদের নিজ নিজ অঞ্চলেই ধরে রাখা সম্ভব হতো। আমরা কি এ বিকল্প স্থানিক পরিকল্পনা ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে নীতীনির্ধারক পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখেছি?

আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক হাব চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো বিভাগীয় শহরের দিকে তাকালে এ আঞ্চলিক বৈষম্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর কিংবা ময়মনসিংহ—এ বিভাগীয় শহরগুলো দীর্ঘদিনেও দেশী-বিদেশী বড় উদ্যোক্তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেনি। কারণ এসব অঞ্চলে শিল্প স্থাপন বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুবিধা ও স্থানিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। জাতীয় বাজেটের বড় একটি অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক অবকাঠামোয়ই আটকে থাকছে। ফলে মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকামুখী হতে বাধ্য হচ্ছে, আর ঢাকা শহর তার ধারণক্ষমতা হারিয়ে ক্রমান্বয়ে ভেঙে পড়ছে।​

এখন দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে মূল প্রশ্নটি হলো—ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে এবং বাংলাদেশকে সুষম উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে হলে কেবল অন্য এলাকায় বিনিয়োগই কি যথেষ্ট, নাকি ঢাকা নগরীর অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকেও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে?

​নগর পরিকল্পনার স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, ঢাকায় প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল ঢাকার বাইরে বিনিয়োগ করলে বিকেন্দ্রীকরণ সফল হবে না। ঢাকার বাইরে কিছুটা বিনিয়োগ হলেও ঢাকায় যখন লক্ষ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পগুলো চলমান থাকে, ঢাকার আশপাশের কৃষিজমি, জলাভূমি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা নির্বিচারে ভরাট করে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আবাসন প্রকল্প অব্যাহত থাকে, তখন মানুষের কাছে ঢাকার আকর্ষণই বহাল থাকে। এমনকি এ শহরে চাইলেই ফুটপাতে অনুমোদনহীন হকার বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা শুরু করা যায়, কিংবা অনুমোদনহীন অটোরিকশা নিয়ে লাখ লাখ লোক ঢাকার রাজপথে নেমে পড়তে পারে।

তাই সফল বিকেন্দ্রীকরণের প্রথম শর্ত হলো ঢাকায় উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া, যার মাধ্যমে ঢাকায় নতুন শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে যেকোনো অনুমোদনহীন অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডকেও শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।​

ঢাকার চাপ কমাতে অনেকেই ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে ‘নুসানতারা’ কিংবা মিসরের কায়রো থেকে ‘নিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাপিটাল’-এ রাজধানী সরানোর মতো উদ্যোগের কথা বলেন। মালয়েশিয়াও কুয়ালালামপুরের প্রশাসনিক চাপ কমাতে পুত্রজায়ায় মন্ত্রণালয়গুলো সরিয়ে নিয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুরো রাজধানী স্থানান্তর করাটা কার্যকর সমাধান নয়। ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে রাজধানী হিসেবে ঢাকার বিকল্প তৈরি করা কঠিন। নতুন রাজধানী তৈরি করতে বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, যার অর্থনৈতিক সক্ষমতা আমাদের সীমিত। তাই উন্নয়নকে কেবল ঢাকায় আবদ্ধ না রেখে বিভাগীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের সুষম উন্নয়ন করা এবং ঢাকার ওপর চাপ কমানোই যৌক্তিক পথ। ঢাকাকে বাসযোগ্য ও সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেয়া প্রয়োজন—

প্রশাসনিক দপ্তরের স্থানিক বিকেন্দ্রীকরণ: রাজধানী ঢাকায়ই থাকবে, তবে সরকারের বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের অধিদপ্তর, বোর্ড ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কাজের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগে ছড়িয়ে দিতে হবে। যেমন কৃষি-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলোকে উত্তরাঞ্চলে, নদী ও মৎস্যবিষয়ক দপ্তরগুলোকে বরিশাল বা খুলনায় এবং সমুদ্র ও বন্দরকেন্দ্রিক দপ্তরগুলোকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করলে ঢাকার ওপর থেকে প্রশাসনিক চাপ এক লহমায় কমে যাবে।

​আঞ্চলিক সম্ভাবনার ভিত্তিতে বিশেষায়িত শিল্পায়ন: ঢাকায় নতুন নতুন শিল্প-কারখানা বা রফতানিমুখী শিল্পের অনুমোদন দেয়া বন্ধ করতে হবে। উত্তরাঞ্চলকে কৃষি-প্রসেসিং হাব, খুলনা-বরিশালকে মৎস্য ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প, রাজশাহী অঞ্চলকে রেশম ও উদ্যানজাত শিল্প এবং চট্টগ্রাম-সিলেটকে রফতানিমুখী ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

​আধুনিক কানেক্টিভিটি ও আঞ্চলিক রেল নেটওয়ার্ক: পদ্মা ও যমুনা সেতু এবং যমুনার পৃথক ডেডিকেটেড রেল সেতু চালুর ফলে দেশের স্থানিক সংযোগ এখন অত্যন্ত শক্ত। এ সংযোগকে কাজে লাগিয়ে দ্রুতগতির আঞ্চলিক রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, যেন মানুষ নিজ জেলায় থেকেই দ্রুত সেবা ও পণ্য পরিবহন করতে পারে এবং স্থায়ীভাবে ঢাকামুখী না হয়।

​নাগরিক সেবা ও জ্বালানির সুষম বণ্টন: ঢাকার বাইরের বিভাগীয় শহরগুলোয় শিল্পভিত্তিক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে, যেন সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হতে না হয়।

​ঢাকার উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নীতি: ঢাকার কাঠামোগত পরিকল্পনা ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা মেগা অবকাঠামোর অনুমোদনে কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি শহরের অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা এবং জনসংখ্যা ধারণক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।

​সারা দেশের জন্য স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন: সারা দেশের জন্য স্পেশিয়াল প্ল্যানিং তথা স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে ‘‌স্থানিক পরিকল্পনা আইন’ তৈরি করেছে। এর আলোকে সারা দেশের জন্য সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা তৈরি করে সে অনুযায়ী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে ঢাকার ওপর চাপ ধীরে ধীরে কমে আসবে।

রাজধানীমুখী জনস্রোত না ঠেকাতে পারলে বড় বড় মেগা প্রকল্প দিয়ে ঢাকাকে বাসযোগ্য করা যাবে না। এত এত বিনিয়োগের পরও ঢাকা শহর দিনকে দিন আরো স্থবির হয়ে পড়েছে। ঢাকাকেন্দ্রিক মেগা উন্নয়নের চিন্তা থেকে সরে এসে আমাদের বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোয় কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধাদি ছড়িয়ে দিতে হবে। ঢাকার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুগুলোকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া এবং সুষম আঞ্চলিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নই ঢাকাকে বাসযোগ্য করার একমাত্র পথ। ঢাকা তথা বাংলাদেশকে বাঁচাতে রাষ্ট্র ও সরকারকে সে পথেই হাঁটতে হবে।