দেশের ব্যাংক খাতে সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন? এ খাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো কী?
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো দ্রুত ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বাড়াচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে সাইবার আক্রমণের ক্ষেত্র, পরিধি এবং ব্যাপকতা ক্রমবর্ধমান। কিন্তু অনেক সিস্টেমেই এখনো পুরনো, দুর্বল বিন্যাস ও সীমিত শনাক্তকরণ সক্ষমতা রয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক ও বিশেষায়িত আক্রমণ এবং ফিশিং, রÅvনসমওয়্যার ও সরবরাহ শৃঙ্খল ভঙ্গের মতো জটিল আক্রমণ। যেগুলো প্রায়ই কর্মীদের সচেতনতার ঘাটতি ও আক্রমণ শনাক্তের সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগায়।
ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে অনলাইনে। এ প্রেক্ষাপটে তথ্য ফাঁস বা অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকাতে আপনার এনআরবি ব্যাংক কী ধরনের কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে?
এনআরবি ব্যাংক পিএলসি ডিজিটাল লেনদেন ও তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি বহুমাত্রিক নিরাপত্তা কাঠামো অনুসরণ করছে; যেখানে প্রযুক্তিগত, প্রক্রিয়াগত ও সচেতনতামূলক তিনটি স্তরে কাজ চলছে। ব্যাংকটি তার সব অনলাইন সার্ভিস ও মোবাইল লেনদেনের জন্য এনক্রিপশনভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যবহার নিশ্চিত করেছে, এছাড়া কোড-বেসড আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য বিশেষায়িত ডব্লিউএএফ (ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনস ফায়ারওয়াল) দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে তথ্য বিনিময়ের সময় অননুমোদিত প্রবেশ বা তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি হ্রাস পায়। লেনদেন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এনআরবি ব্যাংক বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য ইএমভি চিপভিত্তিক কার্ড ব্যবহার করছে, যা ক্লোনিং ও স্কিমিং আক্রমণ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া অনলাইন লেনদেনে এককালীন পাসওয়ার্ড যাচাইকরণ এবং বহুপদে যাচাইকরণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি গ্রাহকের অ্যাকাউন্টের অননুমোদিত প্রবেশ রোধ করা যায়। তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাংক নিয়মিতভাবে সিস্টেম হালনাগাদ, নিরাপত্তা মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন করে। আমাদের ব্যাংক তথ্য ব্যাকআপ এবং নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার ব্যবস্থাপনাও বজায় রাখে, যাতে কোনো ত্রুটি বা ঘটনার সময় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক বিভাজিত কাঠামোয় পরিচালিত হয়, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিস্টেম ও গ্রাহক তথ্য আলাদা নিরাপত্তা স্তরে সুরক্ষিত থাকে।
এছাড়া এনআরবি ব্যাংক পিএলসি, কর্মী ও গ্রাহক উভয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ উদ্যোগ শুধু ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করছে না, বরং সাইবার সচেতনতা ও নিরাপদ লেনদেনের সংস্কৃতিও গড়ে তুলছে। আমাদের ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তথ্য নিরাপত্তা নীতি অনুসরণ করছে এবং ক্রমাগত ঝুঁকি মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন অবকাঠামোকে আরো শক্তিশালীকরণ প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে। এ সবকিছু মিলিয়ে এনআরবি ব্যাংক একটি নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিবেশ বজায় রাখতে সফলভাবে অগ্রসর হচ্ছে।
তদারকির কাঠামো কি পর্যাপ্ত? ব্যাংকগুলো নিয়মিতভাবে সাইবার অডিট বা ভালনারেবিলিটি টেস্ট করে কিনা? আপনি কি মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরো কড়াকড়ি হওয়া দরকার?
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে দিকনির্দেশনা প্রদান করছে ও সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলন আয়োজন করছে। তবে প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা গভীরতা ও অনুপ্রবেশ পরীক্ষার যাচাই সব ব্যাংকে সমান নয়। তদারকি আরো কার্যকর করতে হলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে সাইবার আক্রমণ সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, ত্রুটি সংশোধন, পর্যবেক্ষণ এবং আকস্মিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের বিশেষ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন করা দরকার। যাতে প্রযুক্তিগত ও প্রক্রিয়াগত ঝুঁকিগুলো আরো সুসংগঠিতভাবে চিহ্নিত ও পর্যবেক্ষণ করা যায়। এতে আইটি সিস্টেমের দুর্বলতা মূল্যায়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল ঝুঁকি, তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ্লিকেশন নিরাপত্তা ও তথ্য সংরক্ষণ নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া যাবে।
দেশে এখন কেমন প্রশিক্ষিত বা সার্টিফায়েড সাইবার বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন? ব্যাংকগুলো কি তাদের ধরে রাখতে পারছে? ঘাটতি দূরীকরণে কী ধরনের নীতিগত, প্রশিক্ষণভিত্তিক বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের দেশে ব্যাংক খাতের ঘটনার বিশ্লেষক, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও আক্রমণ অনুসন্ধানকারীর অভাব স্পষ্ট। কারণ এখনো বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও ক্ষেত্রভিত্তিক ল্যাব অভিজ্ঞতা কম। এ ঘাটতি কাটাতে ব্যাংকগুলো যৌথভাবে প্রশিক্ষণ ল্যাব, সম্মিলিত নিরাপত্তা মহড়া ও সনদভিত্তিক কর্মপথ চালু করতে পারে; যাতে দক্ষতা ও কর্মী ধরে রাখার হার দুটোই বাড়ে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য একটি হুমকি-তথ্য বিনিময় ও আক্রমণ চিহ্নিতকরণ পোর্টাল তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এ পোর্টালের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো দ্রুত ‘ইন্ডিকেটর অব কম্প্রোমাইজ’ এবং আক্রমণ প্রবণতা সম্পর্কিত তথ্য একে অপরের সঙ্গে ডাটা বিনিময় করতে পারবে। ফলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান অগ্রিম প্রস্তুতি নিতে পারবে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং, ওপেন ব্যাংকিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারি সংস্থা, ব্যাংক এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে কী ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
ডিজিটাল রূপান্তরের গতি বজায় রেখে সাইবার নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করতে ব্যাংকগুলোর জন্য একটি সমন্বিত নীতি ও কৌশলগত বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যা শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং প্রস্তুতি ও পুনরুদ্ধার সক্ষমতাকেও অগ্রাধিকার দেবে।
এজন্য সাইবার নিরাপত্তা নীতি চূড়ান্তকরণ এখন সময়োপযোগী পদক্ষেপ। ব্যাংকের প্রত্যেক প্রযুক্তিগত, পরিচালন ও ব্যবসায়িক স্তরে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব বণ্টন এবং দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনার স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। এ নীতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুসারে তৈরি হলেও সেটিকে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ঝুঁকি প্রোফাইল অনুযায়ী কাস্টমাইজ করা যেতে পারে।
জাতীয়ভাবে একটি সমন্বিত সংকট-তহবিলও গঠন করা যেতে পারে। যেখানে দেশের সব ব্যাংক যৌথভাবে অবদান রাখবে। বড় ধরনের সাইবার আক্রমণ বা দুর্যোগ ঘটলে এ তহবিল তাৎক্ষণিক পুনরুদ্ধার, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যাবে, যা ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়াবে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলে ব্যাংকগুলো শুধু নিজের নিরাপত্তা শক্তিশালী করবে না, বরং পুরো ব্যাংক খাতের সাইবার স্থিতিশীলতা, ঝুঁকি প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং গ্রাহক আস্থা, তিনটি ক্ষেত্রেই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে।










