বাংলাদেশের বাজারে স্থানীয়ভাবে সফটওয়্যার তৈরির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?

বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে সফটওয়্যার তৈরির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যথাযথ গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগস্বল্পতা। দেশে জিডিপির মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। অথচ উদ্ভাবনী অর্থনীতিগুলোর দেশগুলো এ খাতে তাদের জিডিপির ৪ শতাংশ বা তারও বেশি ব্যয় করে। ফলে আমাদের দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান উচ্চমানের সফটওয়্যার তৈরির পরিবর্তে আউটসোর্সিংয়ের দিকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য হয়।

তবে বিনিয়োগের চেয়েও বড় সমস্যা হলো যোগ্য জনবল সংকট। এআই ও সাইবার নিরাপত্তা ক্ষেত্রে দক্ষতার তীব্র অভাব রয়েছে। বাংলাদেশের ১০ লাখের বেশি আইটি বিশেষজ্ঞ দুই-তিন গুণ বেশি বেতনে বিদেশে চলে গেছেন। আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও সঠিকভাবে ভেন্ডর মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ এখানে কর্মীদের ঘন ঘন বদলি করা হয়। পরিবর্তন বা বদলির সময়সীমা বেসরকারি খাতের তুলনায় দুই-তিন গুণ বেশি, যা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিষ্ঠিত বিদেশী ভেন্ডরের দিকে ঠেলে দেয়।

থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেম কোন ধরনের সফটওয়্যার তৈরি বা সরবরাহ করছে?

থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেম মূলত বিস্তৃত ফিনটেক সলিউশন সরবরাহ ও বাস্তবায়ন করে। এর মধ্যে রয়েছে কোর ব্যাংকিং সিস্টেমস (CBS), পেমেন্ট সুইচ ও কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমস, কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (CRM) সফটওয়্যার, ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (DFS), মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS), ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং ও ল্যান্ডিং ম্যানেজমেন্ট সলিউশন।

এছাড়া থাকরাল বিশ্ববাপী সমাদৃত আইবিএমের (IBM) বিভিন্ন সফটওয়্যার এ দেশে সরবরাহ ও প্রয়োগ করছে, যেমন IBM DB2, Middleware, WebSphere, MQ, e-SSO, এবং Data Warehouse solutions.

g2

থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেম বর্তমানে বাংলাদেশে কোন প্রধান প্রকল্পগুলোতে কাজ করছে?

থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেম উল্লেখযোগ্যভাবে সোনালী ব্যাংক পে-লজিক (PayLogic) পেমেন্ট সুইচ প্রকল্প, রূপালী ব্যাংক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS) প্রকল্প, ব্র্যাক ব্যাংক ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (DFS), ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট ও সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং প্রজেক্ট এবং আইডিএলসি (IDLC) কোর ব্যাংকিং সলিউশন প্রকল্পে কাজ করছে।

বাংলাদেশে সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে এখনো কেন বিদেশী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরতা বেশি?

আমি আগেই বলেছি, বাংলাদেশের বেশির ভাগ সফটওয়্যার কোম্পানিরই পর্যাপ্ত গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) বিনিয়োগ নেই। বিপরীতে বিদেশী সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। তাই তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা স্থানীয় কোম্পানিগুলোর পক্ষে কঠিন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায়ই বিক্রেতা মূল্যায়নের মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় পিছিয়ে আছে। উপরন্তু কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে সরকারি ক্রয়নীতিতে নিরাপদ ও পরিচিত বিদেশী ব্র্যান্ডের দিকেই ঝোঁক থাকে।

স্থানীয় সফটওয়্যারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে কী ধরনের দক্ষতা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করেন?

বাংলাদেশ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বাড়াতে হবে দ্রুত। বিশেষ করে জাভা, পাইথন, এআই, মেশিন লার্নিং, ক্লাউড আর্কিটেকচার ও সাইবার নিরাপত্তার মতো যেসব দক্ষতার বিশ্বজুড়ে চাহিদা বেশি, সেগুলোর উন্নয়নে আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমানে আমাদের আরঅ্যান্ডডিতে বিনিয়োগ জিডিপির দশমিক ৩ শতাংশ। এ বরাদ্দ বাড়িয়ে কমপক্ষে ২ শতাংশ করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান শুধু সেবা বিক্রির বাইরে গিয়ে নিজস্ব পণ্য উদ্ভাবনে অর্থ ব্যয় করছে, তাদের কর প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে মেধা পাচার রোধে আন্তর্জাতিক মানের বেতন কাঠামো তৈরি করতে হবে। প্রতিভাবান জনবলকে নিজেদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা দেশের ভেতরেই কাজে লাগানোর জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও ফিনটেক খাতে সবচেয়ে সাধারণ সাইবার হুমকিগুলো কী?

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো প্রতিদিন গড়ে ৬৩০টি সাইবার আক্রমণের মুখোমুখি হয়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ফিশিং ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আক্রমণ। ২০২২ সালে ডার্ক ওয়েবে বাংলাদেশের ৩ হাজার ৬৩৯টি ব্যাংক কার্ডের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। সাইবার অপরাধের ৪২ শতাংশই ঘটে অনলাইন প্রতারণার মাধ্যমে। গত বছর র‍্যানসমওয়্যার আক্রমণ বেড়েছে ৭১ শতাংশ। আর কিছু নির্দিষ্ট ম্যালওয়্যার সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশ ছিল বৈশ্বিকভাবে শীর্ষে।

ম্যালওয়্যার, র‍্যানসমওয়্যার ও ফিশিং আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যাংকগুলোকে আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

ব্যাংকগুলোর উচিত হবে প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বাইরে গিয়ে পরিকল্পিত সাইবার নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করা। প্রথমে বিস্তারিত ঝুঁকি মূল্যায়ন করে নিজেদের দুর্বলতা শনাক্ত করতে হবে। এরপর আইএসও ২৭০০১ ও এনআইএসটির মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে মানুষ, প্রক্রিয়া ও প্রযুক্তি—তিন দিককে সমন্বিত করে বহু বছরের কৌশল তৈরি করতে হবে। নিয়মিত বিদেশী বিশেষজ্ঞ দিয়ে নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা জরুরি। কারণ অভ্যন্তরীণ টিম অনেক সময় পরিচিতির কারণে কিছু দুর্বলতা এড়িয়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকগুলো যেন টেন্ডার নথিতে (আরএফপি) তাদের নিরাপত্তা কাঠামোর বিস্তারিত প্রকাশ না করে। এসব নথি আসলে হ্যাকারদের জন্য রোডম্যাপ হয়ে দাঁড়ায়। এ তথ্য কেবল যাচাইকৃত বিক্রেতাদের সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তির (এনডিএ) আওতায় শেয়ার করা উচিত। এর বাইরে অন্য কোথাও নয়।

এআই ও অটোমেশন বাড়লে সাইবার নিরাপত্তার কোন দিকটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে?

ডিপফেক এখন দ্রুততম বৃদ্ধি পাওয়া সাইবার হুমকির মধ্যে অন্যতম। গত তিন বছরে এ ধরনের প্রতারণা ২ হাজার ১৩৭ শতাংশ বেড়েছে। সম্প্রতি এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রতারকরা এআই-সৃষ্ট ভুয়া ‘সিএফও’র মাধ্যমে ২৫ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে। এমন ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন উন্নত পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা, যেখানে মুখ, কণ্ঠস্বর ও ব্যবহারগত প্যাটার্ন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করা যায়, আসল ব্যক্তি কারা।

ব্যাংকগুলোকে তৈরি করতে হবে এমন এআই-নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা লাখ লাখ লেনদেন বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিকতা শতভাগ নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। পাশাপাশি এসব সিস্টেমকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে প্রতিকূল আক্রমণ এবং সূক্ষ্ম তথ্য কারসাজি থেকে। বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুনঃপ্রশিক্ষণ ছাড়া এআই মডেলের নির্ভুলতা মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।