বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের পথে এগোচ্ছে। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ঝুঁকিও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। দেশের ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ইনসাইডার থ্রেট বা অভ্যন্তরীণ কর্মীদের মাধ্যমে তথ্য ফাঁস, ফিশিং ও ভুয়া লিংকের মাধ্যমে প্রতারণা, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং হ্যাকিংয়ের চেষ্টা, থার্ড পার্টি সিস্টেমের দুর্বলতা এবং র‌্যানসমওয়্যার আক্রমণ। অনেক ব্যাংকে এখনো আধুনিক সিকিউরিটি মনিটরিং সিস্টেম নেই। গ্রাহক পর্যায়েও সচেতনতার ঘাটতি আছে।

তবে দেশের ব্যাংক খাতে সাইবার নিরাপত্তা নীতি ও নিয়মে গত কয়েক বছরে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও আপগ্রেড হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৩ সালে গাইডলাইন অন আইসিটি সিকিউরিটি ভার্সন ৪.০ ব্রডকাস্ট করেছে। এটি ব্যাংক ও নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের জন্য প্রযোজ্য। এ নতুন সংস্করণে আগের গাইডলাইনের চেয়ে বেশকিছু নতুন অধ্যায় ও নিয়ন্ত্রণ যুক্ত হয়েছে। যেমন ইমার্জিং টেকনোলজি ম্যানেজমেন্ট (এআই/এমএল, আরপিএ, ব্লকচেইন), এপিআই সিকিউরিটি, ক্লাউড কম্পিউটিং ইত্যাদি। সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্কে আন্তর্জাতিক মান অনুসারে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির (এনআইএসটি) ছয় ধাপের মডেল—গর্ভান আইডেন্টিফাই (চিহ্নিতকরণ), প্রোটেক্ট (সুরক্ষা), ডিটেক্ট (শনাক্তকরণ), রেসপন্ড (প্রতিক্রিয়া) ও রিকভারি (পুনরুদ্ধার) চালু হয়েছে। এছাড়া সিকিউরিটি অ্যালার্ট ও নিয়মিত তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

গত এক দশকে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে আর্থিক সেবার পরিসর কয়েক গুণ বেড়েছে। সেবার প্রসার ঘটায় ডিজিটাল জালজালিয়াতিও হরহামেশা ঘটছে। এতে প্রতি বছর বড় অংকের আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ছে ব্যাংকগুলো। এ পরিস্থিতি উত্তরণে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সততার মানদণ্ডে উন্নীত করার পাশাপাশি গ্রাহকদের মাঝেও ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। ডিজিটাল লেনদেন ও সাইবার সুরক্ষায় এসবিএসি ব্যাংক মাল্টিলেভেল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। এতে ফায়ারওয়াল, এনক্রিপশন, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, রিয়েলটাইম মনিটরিং, ডাটা ব্যাকআপ ও ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম সক্রিয় রাখা হয়। ব্যাংক কর্মী ও গ্রাহকদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও এসএমএস প্রচারণা চালানো হয়।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত বিভিন্ন পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে। ব্যাংকগুলোকে আইসিটি সিকিউরিটি কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট, সুইফট কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট, সাইবার ইনসিডেন্ট/ব্রিচ রিপোর্ট, প্যাচ অ্যান্ড হার্ডেনিং স্ট্যাটাস, ডিআর ড্রিল অ্যান্ড বিসিপি টেস্ট রিপোর্ট নিয়মিতভাবে দিতে হয়। বড় কোনো হামলা বা ত্রুটি ধরা পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক তাৎক্ষণিক অ্যাকশন প্ল্যান চায়। এতে তদারকি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কড়াকড়িভাবে হচ্ছে।

অন্যান্য ব্যাংকের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (সিআইআরটি) গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে। এর পর থেকে ব্যাংকগুলোতে সিআইআরটি গঠনের বিষয়ে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। দেশের সব ব্যাংকেই সিআইআরটি রয়েছে। যদিও দক্ষতা, প্রযুক্তি ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নানা রকম পার্থক্য রয়েছে। বড় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালোভাবে প্রস্তুত হলেও পুরো খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে প্রস্তুত নয়। এখনো দক্ষ জনবল ও টুলসের ঘাটতি রয়েছে। ধীরে ধীরে এ জায়গায় দেশের ব্যাংকগুলো আরো ভালো অবস্থানে পৌঁছবে বলাই যায়।

যদিও আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখনো পিছিয়ে। উন্নত দেশগুলোর ব্যাংকে ২৪/৭ সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার (এসওসি), জিরো ট্রাস্ট আর্কিটেকচার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক মনিটরিং আছে। বাংলাদেশে এখনো সীমিত পরিসরে এসব ব্যবস্থাপনা চলছে। ধীরে ধীরে এখানে আমরা উন্নতি করব বলাই যায়। তবে সামগ্রিকভাবে উন্নতির গতি বেশ ভালো।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোর জন্য ফিশিং, র‌্যানসমওয়্যার ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আক্রমণের মতো নানা সাইবার হুমকি রয়েছে। যদিও ফিশিং, র‌্যানসমওয়্যার ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আক্রমণ প্রতিরোধে দেশের ব্যাংকগুলো বেশকিছু প্রযুক্তিগত, নীতিগত ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এক্ষেত্রে সিকিউর ই-মেইল গেটওয়ে, ফায়ারওয়াল, ওয়েব ফিল্টারিংসহ নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সন্দেহজনক লিংক ব্লক করা, গ্রাহকদের সতর্কবার্তা পাঠানো, কর্মীদের ফিশিং সিমুলেশন প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। র‌্যানসমওয়্যার প্রতিরোধে ব্যাকআপ, প্যাচ ম্যানেজমেন্ট, এন্ড পয়েন্ট সিকিউরিটি ও নেটওয়ার্ক সেগমেন্টেশন জোরদার করা হয়েছে।

ব্যাংকগুলো কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে। তবে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সাইবার নিরাপত্তা জনবল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষায়িত জনবলের অভাবই সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে আমি মনে করি। সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার (এসওসি), ইনসিডেন্ট রেসপন্স, থ্রেট ইন্টেলিজেন্স টিমে দক্ষ লোকের ঘাটতি আছে। অনেক ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশনে বিনিয়োগ করে না। এ ঘাটতি পূরণে লোকাল ট্রেনিং, সার্টিফিকেশন ও আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো জরুরি। পাশাপাশি এসবের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখাও জরুরি।

ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি গ্রাহককেও সচেতন করতে হবে। কেননা হ্যাকার বা আক্রমণকারীরা গ্রাহককেও লক্ষ্য বানায়। গ্রাহকের অসাবধানতায় বড় ধরনের সাইবার আক্রমণ হতে পারে। সেজন্য গ্রাহককে সচেতন করতে হবে। এজন্য ব্যাংকগুলো নানা পদক্ষেপ নিতে পারে। গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে সহজ ভাষায় প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা চালানো জরুরি। ছোট ভিডিও, এসএমএস ও পোস্টারের মাধ্যমে ফিশিং, ভুয়া কল, পাসওয়ার্ড সুরক্ষা সম্পর্কে জানানো উচিত। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে নিরাপত্তা টিপস ও অভিযোগ জানানোর সহজ চ্যানেলও রাখতে হবে।