আমার বাবা স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী একজন মানুষ। তিনি সবসময় বলতেন, যে গাছে যত বেশি ফল ধরে, সে গাছ তত বেশি নুয়ে পড়ে। জীবনে যত বেশি সফল হওয়া যায়, তত বেশি বিনয়ী হতে হয়। পোশাক, গাড়ি কিংবা বাড়ি দিয়ে নিজের সাফল্য প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই—মানুষের সঙ্গে আপনার আচরণই আসল পরিচয়।

সময়ানুবর্তিতার ব্যাপারেও বাবা ছিলেন খুব কঠোর। কোনো সভা থাকলে নির্ধারিত সময়ের অন্তত ১৫ মিনিট আগে তিনি সেখানে পৌঁছে যেতেন। বয়স অনেক হয়ে যাওয়ার পরও বিমানে ভ্রমণের সময় ২ ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে গিয়ে বসে থাকতেন। সময়ের প্রতি তার এ শ্রদ্ধা আমাদেরও শিখিয়েছেন।

ব্যবসার ক্ষেত্রেও বাবা দূরদর্শী ছিলেন। তেজগাঁওয়ে একটি জমি কেনার সময় দাম বেশি হওয়ায় আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু বাবা তখন বলেছিলেন, জায়গাটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত তার সিদ্ধান্তই সঠিক প্রমাণিত হয়। তিনি সবসময় বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎটাকেও দেখতে চেষ্টা করতেন।

08

নৈতিকতার প্রশ্নে বাবা কোনো আপস করতেন না। দেশে ভ্যাট চালুর পর অনেকেই প্রকৃত টার্নওভার না দেখিয়ে কর কম দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাবা বলতেন, দিনের শেষে ভোক্তার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে সরকারি কোষাগারে আমরা জমা দিই। এ টাকার ওপরে ব্যবসায়ীদের অধিকার থাকার কোনো প্রশ্ন নেই। তাই হিসাবের ক্ষেত্রে কোনো অসততা তিনি মেনে নিতেন না।

কর্মীদের প্রতিও ছিল তার গভীর মমতা। অবসরের বয়স পেরিয়ে গেলেও অনেক পুরনো কর্মীকে তিনি প্রতিষ্ঠানে রেখে দিতেন। বাবার বিশ্বাস ছিল, যারা সারা জীবন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থেকেছেন, তাদের হঠাৎ কাজ থেকে সরিয়ে দিলে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন।

(11)

মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বাবা নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সমাজের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার বিষয়টিও তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

আমার কাছে বাবা শুধু একজন সফল উদ্যোক্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মানুষ। মানুষের প্রতি সম্মান, সততা, দায়িত্ববোধ ও বিনয়—এ মূল্যবোধগুলোই তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন। আমরা চাই মানুষের জন্য কাজ করার মধ্য দিয়ে তার সে আদর্শকে এগিয়ে নিতে।