যুক্তরাষ্ট্র এখন এক অস্থির প্রেসিডেন্টের হাতে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক এখন সংঘাতপ্রবণ। এ রকম সংঘাতময় কূটনীতি মার্কিন-চীন সম্পর্কোন্নয়নের সমাধান নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থা খুবই অস্থির ও অনিশ্চিত। অন্যদিকে শি জিনপিং কৌশলগতভাবে দৃঢ়। স্বভাবের এ বৈপরীত্য চীনের জন্য বড় সুবিধাজনক। তাই এ সংঘাতের কার্যকর সমাধান ট্রাম্প-পরবর্তী সময়েই সম্ভব।
অবশ্য আগে বিষয়টা এমন ছিল না। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে কূটনীতিই ছিল মূল পথ। হেনরি কিসিঞ্জার ও চৌ এন লাই কৌশলগতভাবে দক্ষ ছিলেন। তারা প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও মাও সে তুংয়ের পক্ষে কাজ করেন। তাদের উদ্যোগে শীতল যুদ্ধের নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়। এতে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বদলে যায়। এরপর নেতা-নেতায় বৈঠকই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখা হতো।
কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ ও আত্মকেন্দ্রিক নেতাদের উত্থানে পরিস্থিতি বদলে যায়। তারা মনে করতেন, ব্যক্তিগত প্রভাবেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। এ কারণে পরাশক্তির মধ্যকার বিরোধ এড়ানো তো দূরের কথা, তা মীমাংসা করাকেও অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। কেউই নিজেকে দুর্বল দেখাতে চায় না।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও–চীনের দ্বন্দ্ব মেটানো পরিণত হয় মুখ রক্ষার এক অনুশীলনে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে নতুন জাতীয়তাবাদ বেড়েছে। এতে কূটনীতি আরো দুর্বল হয়েছে। কারণ কূটনীতি দেশীয় রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে চীনবিরোধী মনোভাব ভয়ংকরভাবে বেড়েছে।
দেশটি ভীষণভাবে বিভক্ত হলেও চীনবিরোধিতায় দেশের দুই দলই একমত। মার্কিন কূটনীতিতেও এমন পক্ষপাত স্পষ্ট।
এদিকে চীনে একদলীয় শাসন চলমান। তবু রাজনীতি সেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। শি জিনপিং ‘চীনা স্বপ্ন’ পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মানে চীনা জাতির পুনর্জাগরণ। কিন্তু প্রবৃদ্ধি না হলে সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে যাবে।
তাহলে জনগণ ও দলের ক্ষোভ বাড়বে। এ কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঘাটতি উদ্বেগজনক। এ ঘাটতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বও জড়িত। আবার পুনর্জাগরণে ঘাটতিও বাড়ছে। এর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে রাজনীতিতে। এতে চীনের রাজনীতি আরো সীমাবদ্ধ হচ্ছে।
সমস্যার মূল শুধু নীতিগত বিরোধ নয়, নেতাদের ব্যক্তিগত অহংকারও দ্বন্দ্বকে বাড়িয়ে তোলে। যেসব নেতার আত্মবিশ্বাস কম, তারা সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। তাই তারা সঙ্গে সঙ্গে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেখান। এ দ্রুত ও ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়াই সমস্যা মেটানোর বদলে আরো খারাপ করে তোলে। তবু অনেকেই বিশ্বাস করেন, নেতা-নেতার বৈঠক যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দ্বন্দ্ব সমাধানের চাবিকাঠি। অবশ্য এ বিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন-মাও সে তুং ঐতিহাসিক বৈঠকের পর থেকে উভয় দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে এ ধরনের মোট ২২টি বৈঠক হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালে দেং শিয়াওপিং ও জিমি কার্টারের বৈঠকটি ছাড়া, যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়, বাকিগুলোর বেশির ভাগই তেমন কোনো ফল বয়ে আনেনি। ২০১৭ সালে শি জিনপিং ও ট্রাম্পের মধ্যে হওয়া দুটি জাঁকজমকপূর্ণ বৈঠকও এর ব্যতিক্রম নয়।
একটি ছিল মার-এ-লাগোতে হওয়া আনুষ্ঠানিক নৈশভোজ। অন্যটি ছিল বেইজিংয়ের ফরবিডেন সিটিতে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান। কিন্তু এর অল্প সময়ের মধ্যেই শুল্ক আরোপ শুরু হয়। এরপর ২০১৮-১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের প্রথম ধাক্কা আসে।
ট্রাম্প ও শি জিনপিং ২০২৬ সালে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর ঝুঁকি নিচ্ছেন। অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন ফোরামের বৈঠকে তারা দুটি নেতা-নেতার শীর্ষ বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে একমত হয়েছেন। তবে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত এজেন্ডা ছাড়া এ বৈঠক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বদলাতে পারবে না। সর্বোচ্চ যা আশা করা যায়, তা হলো বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জনসংযোগ ও তাইওয়ানসংক্রান্ত বিবাদে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তবে এটাও অনেকটাই আশাবাদী ধারণা। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের তাইওয়ানের জন্য নতুন ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্রস্তাব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র-চীন অস্থিরতায় নতুন ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আগ্রাসী ট্রাম্প বা তার অনুসারীরা ক্ষমতায় থাকবেন, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বের স্থায়ী সমাধানের খুব কম সম্ভাবনা রয়েছে। অবিরাম বা একটার পর একটা ‘চুক্তি’ আশা দিতে পারে না। কারণ তারা যে দ্বন্দ্বগুলো সমাধান করার লক্ষ্যে কাজ করেন তার ওপর নির্ভর করবে এর সফলতা। একই সঙ্গে চীনও এ অস্থির বিশ্বে স্থিতিশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো নিখুঁত রূপক নায়ক হতে পারেনি।
এ থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-চীন কূটনীতির জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনই মূলত প্রধান ভরসা। অবশ্য শি জিনপিং ক্ষমতা একীভূত করেছেন। ফলে চীনের একদলীয় ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন প্রায় অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রেও রাজনৈতিক পরিবর্তন সমানভাবে চ্যালেঞ্জিং। কারণ দেশটির চীনবিরোধী মনোভাবের প্রভাব এবং ট্রাম্পের ‘মেগা মুভভেন্ট’ (ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী সমর্থকদের আন্দোলন) সমস্যাটিকে আরো প্রকট করেছে।
এর মানে এই নয় যে আমেরিকা তার উদার মনোভাব পুনরায় ফিরে পেতে সক্ষম হবে না। তারা আবারো বিশ্বনেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে পারবে। যেমনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে করেছিল—পরাজিত শত্রুদের সাহায্য করে এবং মার্শাল পরিকল্পনার মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপ পুনর্গঠন করে।
চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলা মূলত নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর, যদি দেশটি তার খ্যাতি অনুসারে ‘পাহাড়ের ওপর উজ্জ্বল শহর’ হিসেবে আচরণ করে। কিন্তু আজকের বিভক্ত ও অস্থির আমেরিকাকে এমন অবস্থায় আনা দরকার, যেখানে নীতি, সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকবে। সংঘাত সমাধানের নতুন যুগে নিয়ে যেতে হলে এমন এক ধরনের রাজনৈতিক বিপ্লব প্রয়োজন হতে পারে।
অনেক আমেরিকানের কাছে এ পরিবর্তন বর্তমানে অসম্ভব মনে হচ্ছে। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরকারে তার প্রভাব শক্ত করে চলেছেন। কিন্তু ১৮৫০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের পার্টি সংযোগ ১৯ বার রিপাবলিকান ও ৪৪ বার ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে পরিবর্তিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ পার্টি পরিবর্তনের হার আরো বেশি। একইভাবে হাউজ ও সিনেট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে ট্রাম্পের মেগা আন্দোলন আমেরিকার ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে না। এজন্যই এখনই ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ের বৈদেশিক নীতিতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের কথা ভাবা উচিত। বিশেষ করে এটা করতে হলে নতুন ধরনের সংলাপ ও কার্যক্রমের সঠিক ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।
স্টিফেন এস. রোচ: ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি মেম্বার ও মরগান স্ট্যানলি এশিয়ার সাবেক চেয়ারম্যান
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ করেছেন জামাল আহমেদ










