কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরক উত্থান শুধু সফটওয়্যারের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; এর ঢেউ গিয়ে আঘাত করছে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে। বহু দশক ধরে চিপ শিল্পে যে একচেটিয়া ক্ষমতার বিন্যাস গড়ে উঠেছিল এআই সেই কাঠামোটাকেই ধীরে ধীরে অচেনা করে দিচ্ছে। বিশ্বের সিংহভাগ সেমিকন্ডাক্টর নির্ভর করছে মাত্র দুই প্রতিষ্ঠানের তৈরি নকশা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর। সেই একমুখী কাঠামো এখন ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। ঠিক এ পরিবর্তনের মাঝখানেই আবির্ভাব ঘটছে এক নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর—ওপেন–স্ট্যান্ডার্ড চিপ আর্কিটেকচার। বিশেষ করে ‘রিস্ক-ফাইভ’ প্রযুক্তি। এটি এখনো তুলনামূলক ছোট ও বিশেষায়িত একটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ কিন্তু অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ২০২৬ সাল হতে পারে এর প্রকৃত উত্থানের সময়।
রিস্ক-ফাইভ (RISC-V) এক ধরনের ওপেন-স্ট্যান্ডার্ড প্রসেসর ডিজাইন বা নির্দেশের ভাষা। সহজ করে বললে, সফটওয়্যারের কমান্ড প্রসেসর কীভাবে বুঝবে ও চালাবে সেই ভাষার নিয়মকানুনের সেট হলো রিস্ক ফাইভ। এ প্রযুক্তি কোনো একক চিপের নাম নয়, এটা প্রসেসর বানানোর একটি খোলা মানের নকশা বা আর্কিটেকচার। কম্পিউটারের ভেতরে যে প্রসেসর থাকে, সেটি সফটওয়্যার থেকে আসা নির্দেশ কীভাবে বুঝবে, কোন ক্রমে কাজ করবে, কীভাবে হিসাব করবে—এ সবকিছুরই একটি ‘ভাষা’ আছে। সেই ভাষার নিয়মকানুনের সেটকে বলা হয় ‘ইনস্ট্রাকশন সেট আর্কিটেকচার’। রিস্ক-ফাইভ হলো এ ধরনেরই একটি আর্কিটেকচার। তবে বড় পার্থক্য হলো এটি অন্যদের মতো বন্ধ ও লাইসেন্স-নির্ভর নয়, বরং সবার জন্য উন্মুক্ত।
প্রশ্ন হলো, এ প্রযুক্তি কীভাবে বিপ্লব ঘটাবে? প্রশ্নের উত্তর একটু জটিল। কয়েক দশক ধরে বিশ্বের সিংহভাগ সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত ছিল মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠিত আর্কিটেকচারের মাধ্যমে। কিন্তু এআই যুগে কম্পিউটিং চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় এ ক্ষমতার একচেটিয়া অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বড় বড় কোম্পানি এসব প্রথাগত প্রযুক্তির বিকল্প খুঁজছে। তাদের নজরে এসেছে ওপেন স্ট্যান্ডার্ড রিস্ক-ফাইভ প্রযুক্তি। এখন পর্যন্ত এর বাজার সীমিত কিন্তু ২০২৬ সালে প্রযুক্তি জগতে বড় খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে এটি।
এ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি উন্মুক্ত। এর নকশা কোনো একক কোম্পানির মালিকানায় নেই। যে কেউ এটি ব্যবহার করতে পারে। নিজের প্রয়োজনমতো বদলাতে পারে। আবার অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগিও করতে পারে। অর্থাৎ চিপ ডিজাইনের জগতে প্রথমবারের মতো ‘খোলা দরজা’ তৈরি করতে পারে এটি। আগে যেখানে প্রসেসর বানাতে চাইলে বড় লাইসেন্স খরচ, আইনি শর্ত এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাধার মুখে পড়তে হতো, সেখানে এখন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, স্টার্টআপ—অনেকেই পরীক্ষামূলকভাবে নিজের প্রসেসর বানানোর সুযোগ পাচ্ছেন। এ প্রবেশাধিকারের বিস্তারই ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
চিপ তৈরির ক্ষেত্রে মূলভিত্তি হলো ইন্সট্রাকশন সেট আর্কিটেকচার বা আইএসএ। এটি হলো, সফটওয়্যার নির্দেশনা কীভাবে প্রসেসর বুঝবে এবং কার্যকর করবে তার মৌলিক ভাষা। বর্তমানে বাজারে প্রাধান্য বিস্তারকারী দুটি আইএসএর একটি হলো ‘এক্স৮৬’, যা ইন্টেলের নিয়ন্ত্রণে। আরেকটি হলো যুক্তরাজ্যভিত্তিক এআরএম আর্কিটেকচার যা স্মার্টফোন থেকে সার্ভার, এমবেডেড ডিভাইস—প্রায় সব প্লাটফর্মেই স্ট্যান্ডার্ড হয়ে উঠেছে। এই আর্কিটেকচারগুলোর লাইসেন্সিং ও রয়্যালটি ফি বছরের পর বছর ধরে এগুলোকে একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত করেছে।
বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে এ নির্ভরতা নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে। তার অন্যতম কারণ, এআরএম আর্কিটেকচার নিজেই প্রসেসর তৈরির পরিকল্পনা নিচ্ছে। ফলে আশঙ্কা বাড়ছে যে কোম্পানিটি নিজের গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারে। এআরএম যখন নিজেই চিপ তৈরির পথে হাঁটছে, তখন কোয়ালকম বা এনভিডিয়ার মতো গ্রাহক কোম্পানিগুলো স্বাভাবিক কৌশলগত কারণেই রিস্ক-ফাইভের দিকে ঝুঁকবে।
এ প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা প্রযুক্তিনির্ভরতা কমাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বিকল্প পথ খুঁজছে। সেখানেই গুরুত্ব পাচ্ছে ওপেন-স্ট্যান্ডার্ড রিস্ক-ফাইভ। ওপেন-সোর্স হওয়ায় এটি যে কেউ ব্যবহার, পরিবর্তন বা শেয়ার করতে পারে; ফলে ভূরাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতাও কম। চীনা সরকারি নীতিপত্রে এটিকে ‘ভূরাজনীতিকভাবে নিরপেক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আলিবাবা ও হুয়াওয়ের মতো প্রতিষ্ঠান শুধু নিজস্ব চিপ উন্নয়নই করছে না, বরং রিস্ক-ফাইভ ইকোসিস্টেমের আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণেও প্রভাবশালী ভূমিকা নিচ্ছে। তবে এআরএম ও এক্স৮৬-এর প্রভাব এখনো ব্যাপক। দীর্ঘদিনের সফটওয়্যার টুলচেইন, কম্পাইলার, অপারেটিং সিস্টেম সাপোর্ট—সব মিলিয়ে প্লাটফর্ম বদল করা যেকোনো চিপ প্রস্তুতকারকের জন্য ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এজন্যই বর্তমানে রিস্ক-ফাইভ বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত নিম্নক্ষমতার ডিভাইসে।
২০২৪ সালে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলারের রিস্ক-ফাইভ কোরযুক্ত চিপ বিক্রি হয়েছে, যা মোট বাজারের প্রায় ১০ শতাংশ। পরিসংখ্যান ছোট মনে হলেও প্রবৃদ্ধির গতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক কম্পিউটিং নতুন সুযোগ তৈরি করছে। কারণ জেনারেটিভ এআই ও ডাটা সেন্টার ওয়ার্কলোডের প্রকৃতি বদলে যাওয়ায় প্রসেসর ডিজাইনে কাস্টমাইজেশনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। নির্দিষ্ট টাস্ক যেমন নিউরাল নেটওয়ার্ক ইনফারেন্স, টোকেন প্রসেসিং বা সিকুয়েন্সিয়াল ডাটা অপ্টিমাইজেশনের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কাস্টম ইনস্ট্রাকশন যোগ করতে চায়। রিস্ক-ফাইভের বড় সুবিধা হলো, এখানে এই কাস্টম ইনস্ট্রাকশন ও এক্সটেনশন যোগ করা সহজ। এমনকি সেটা করতে লাইসেন্সিং বাধাও নেই।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৭ সালের আগেই এআরএম ও এক্স৮৬-এর সমমানের পারফরম্যান্স লেভেলে পৌঁছতে পারে রিস্ক-ফাইভ, যা শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা দেবে। তবে এ পরিবর্তন কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। ওপেন-স্ট্যান্ডার্ড চিপ মানে শুধু বিকল্প প্রযুক্তি নয়, বরং সরবরাহ শৃঙ্খলে শক্তির পুনর্বিন্যাস। ২০২৬ সালের এআই দুনিয়া তাই শুধু বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা নতুন সফটওয়্যারের বিবর্তনের নয়, বরং কে কম্পিউটিংয়ের ‘বেজল্যাঙ্গুয়েজ’ নির্ধারণ করবে, সেই লড়াইয়ের গল্পও।
[রয়টার্সে প্রকাশিত রবিন ম্যাকের নিবন্ধ অবলম্বনে]










