আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। যারা নির্বাচিত হয়ে সরকারে আসবে তাদের জন্য কী রেখে যাচ্ছেন আপনারা?

তাদের জন্য অনেকগুলো পরিবর্তিত আইন রেখে যাব। যেখানে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় প্রতিফলিত হবে, যা জনপ্রত্যাশাকে ধারণ করবে। সেগুলোকে ভিত্তি করে তারা কাজ এগোতে পারবে। অনেক জঞ্জাল সরিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। অনেক কাজ তাদের দিয়ে যাচ্ছি। যেমন তিনটি বন পুনরুদ্ধারের প্রকল্প এরই মধ্যে অনুমোদিত, কাজ শুরু হয়েছে। ‘‌হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব’ ও ‘লাঠিটিলা’ এটা ধরলে মোট চারটি বনের প্রকল্প এরই মধ্যে অনুমোদিত এবং কাজ শুরু হয়েছে। এগুলো তাদেরই করতে হবে। আমরা ১৮টি নদ-নদী দখল ও দূষণমুক্ত করতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) দিয়ে যাব। তুরাগের পুরো পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা করে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু করে দেয়ার ইচ্ছা আছে। আমাদের দিকে যেমন আমলাতন্ত্র আছে তেমনি দাতাগোষ্ঠীর দিকেও আমলাতন্ত্র আছে। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করার পরিকল্পনাও আমরা এনেছি। দেড় বছরে তো আমরা এতকিছু করতে পারব না, এখন এ তালিকা আমরা ১৮-তে নামিয়ে আনা হয়েছে। এগুলোর বিস্তারিত প্রকল্প পরিকল্পনা করে অনুমোদন দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কয়েকটার কাজ আমরা শুরু করে দিয়ে যাব। যেমন সুতাং, লবণদহ, হাঁড়িধোয়া—তিনটি নদী দেশের সবচেয়ে দূষিত। এগুলো ড্রেজিং কাজের প্রকল্প আমরা অনুমোদন করে ফেলেছি। তুরাগ ড্রেজিংয়ের কাজে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি আমাদের সহায়তা করছে। এ চারটাই তো অনেক বড় কাজ। এদিকে বড়াল নদ যেসব অবকাঠামোর কারণে মরে যাচ্ছিল সেগুলো অপসারণ শুরু করে দিয়েছি। করতোয়া অবৈধ দখলমুক্ত করা হয়েছে। করতোয়ারও একটা প্রকল্প সবুজ পাতায় আছে। পরবর্তী সরকার এগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাছাড়া ওনাদেরও নিজস্ব দর্শন থাকবে। আমরা প্লাস্টিক-পলিথিনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছি। একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল ইউজ) প্লাস্টিক কিন্তু আমাদের আমলে আমরা ফেজআউট (পর্যায়ক্রমে বাদ দেয়া) করতে পারব না।

বন সম্পদ রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে যাচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে জানতে চাই।

বনের গাছ চুরি ও অন্যান্য সম্পদের অবৈধ পাচার প্রতিরোধে বনকে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে স্যাটেলাইট ইমেজ, ড্রোন প্রযুক্তি ও আধুনিক তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে দেশের বন পর্যবেক্ষণের কার্যক্রম অচিরেই শুরু করা হবে। রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি ও লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের ২০১৫, ২০২০ ও ২০২৫ সালের স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে পরিবর্তন শনাক্তকরণের জন্য বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের (স্পারসো) সহায়তা নেয়া হবে। পাশাপাশি ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে হাই রেজল্যুশন ইমেজ এবং সার্ভে অব বাংলাদেশ থেকে ড্রোন সহায়তা গ্রহণ করা হবে। অচিরেই বন অধিদপ্তর রেমা-কালেঙ্গা সংরক্ষিত বনের মাতৃগাছ জরিপ ও নম্বর প্রদানের কাজ শুরু করবে। সুফল প্রকল্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মচারীরা এ কাজে নিয়োজিত থাকবেন। দেশের সব বনাঞ্চলে মাতৃগাছ শনাক্তকরণ কার্যক্রম দ্রুত শুরু হবে এবং এজন্য বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নেয়া হবে।

মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসন এবং হাতি সুরক্ষায় কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে সহজে ও দ্রুত ক্ষতিপূরণ পান, সেজন্য সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সহজীকরণ ও সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। হাতির টিকে থাকার জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য স্থানীয়দের মধ্য থেকে দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমকে আরো সক্রিয় করতে হবে এবং তাদের ওয়াকিটকি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিতে হবে। একই সঙ্গে হাতির খাদ্যোপযোগী গাছ লাগানো জরুরি। বোরো মৌসুমে বিশেষ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত জনবল পদায়ন করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করতে হবে। হাতি বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি হাতির কাছে গিয়ে টিকটকসহ যেকোনো ধরনের ভিডিও করা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।

সিলেটে পাথর নিয়ে অনেক কিছুই হয়ে গেল। শুরুর দিকে আপনারা অবরুদ্ধ পর্যন্ত হয়েছেন। পরে দেশব্যাপী একধরনের জাগরণও উঠেছে পাথর রক্ষার পক্ষে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

পত্রিকা আর টিভিতে পাথর উত্তোলনের বিষয়টি যেভাবে এখন আসছে, আগে কিন্তু সেভাবে আসেনি। ফলে একটা জনসমর্থন তৈরি হয়েছে। এ রকম জনসমর্থন যদি পাওয়া যায়, তাহলে কিন্তু পরিস্থিতি ওভারকাম করা অনেক সহজ হয়। যেমন ধরেন ঢাকা শহরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের কথা বলবেন, পুরনো বাস তুলতে গেলে কেউ কেউ ধর্মঘটের ডাক দেবে। এতটা বছর ধরে আমরা পুরনো বাসগুলোকে চলতে দিয়েছি। আমরা কি এক বছরে এই পুরনো বাসগুলোকে রাস্তা থেকে তুলে নতুন বাস দিতে পারব? সেটা তো সম্ভব নয়।

শব্দদূষণ নিয়ে বিগত সরকারের একটা প্রকল্প ছিল। সেটাকে পরবর্তী সময়ে আপনি রিভাইজ করেছেন। এ নিয়ে জানতে চাই।

শব্দদূষণ নিয়ে বিগত সরকারের একটা প্রকল্প ছিল। আমি যখন এসে দেখলাম ওই প্রকল্পের অর্ধেক টাকাই খরচ হয়ে গেছে, তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম এ প্রকল্পের প্রভাব কী পড়েছে? আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রভাব ফিল করি না। তখন আমি বললাম যে এ প্রকল্প যেভাবে আছে আমি সেভাবে আর বাস্তবায়ন করব না। তখন প্রকল্পটা আমরা রিভাইজড ফর্মে দিলাম। রিভাইজড ফর্মে কী কী থাকবে? এক হচ্ছে যানবাহনচালকের ট্রেনিং থাকবে। দুই হচ্ছে ক্যাম্পেইন থাকবে। আপনারা হয়তো এবার দেখেছেন যে এয়ারপোর্টে আমরা একটা ক্যাম্পেইন করেছি, সচিবালয় একটা ক্যাম্পেইন করেছি। সেখানে স্কুল-কলেজের বাচ্চারা নানাভাবে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। তৃতীয়ত হচ্ছে, আইন প্রয়োগের ওপর জোর দেব। পুরো ঢাকা শহরে হয়তো পারব না, কিন্তু কয়েকটা এলাকা দিয়ে শুরু করব। এটা করতে হলে ট্রাফিক সার্জেন্টকে আমাদের ক্ষমতা দিতে হবে। আমরা নতুন যে দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা করেছি সেখানে আমরা ট্রাফিক সার্জেন্টকে ক্ষমতা দিচ্ছি। যে গাড়ি হর্ন বাজাবে তিনি সেই গাড়িকে ফাইন করতে পারবেন।

পলিথিন বন্ধের বিষয়ে শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন। এ উদ্যোগ সফল করতে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করেছেন কি?

পরিবেশ রক্ষায় পলিথিনের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ প্রচলনে সরকার ভর্তুকি মূল্যে পাটের ব্যাগ সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগ সফল করতে ভোক্তাদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এর পরও নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন পাওয়া গেলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না, জব্দসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ লক্ষ্যে নিয়মিত বাজার পরিদর্শন করা হবে। পলিথিনের বহুল ব্যবহার মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করছে। বিপরীতে পাটের তৈরি ব্যাগ টেকসই, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে গৃহীত এ প্রকল্পের আওতায় টিসিবির ডিলার এবং বাজারের বণিক সমিতির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পাটের ব্যাগ বিক্রি করা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে জনসাধারণকে পাটের ব্যাগ ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, মার্কেটিং, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন খরচ কমানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। বণিক সমিতি ও টিসিবি ডিলারদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। পাশাপাশি সভা, সেমিনার, কর্মশালা, সিম্পোজিয়াম ও গণমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কিছু কাজ আছে যেটির ভূরাজনৈতিক প্রভাব আছে। যেমন যৌথ নদী কমিশন। সেখানে কাজের অগ্রগতি কেমন?

সেখানে আপাতত রুটিন কাজই করা হচ্ছে। যে যৌথ কমিটি আছে, নির্দিষ্ট সময় পরপর যেটুকু পানি দেয়ার কথা তা দিচ্ছে কিনা পর্যবেক্ষণ করে আসে। কারণ পরবর্তী সময়ে এ-সংক্রান্ত আলোচনায় এসব তথ্য কাজে লাগবে। সেজন্য তথ্য তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের গঙ্গা চুক্তি শেষ হবে ২০২৬-এর ডিসেম্বরে। ততদিনে একটা নির্বাচিত সরকার এসে চুক্তি নবায়নের জন্য কথা বলবে। তাদের যে তথ্য-উপাত্ত দরকার সেগুলো তৈরি হচ্ছে।