বাংলাদেশের কৃষি খাতের মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
আমাদের কৃষি খাত এখনো প্রতিনিয়তই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রথমত, বর্তমানে কৃষি বা কৃষির বহুমাত্রিক এরিয়া অর্থাৎ শস্য, ফলমূল, পোলট্রি, মৎস্য—সব ক্ষেত্রেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে টেকসই উৎপাদনশীলতা। আমাদের নিজস্ব বীজের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানি হাইব্রিডসহ বিদেশী বীজ এনে সেক্টরটি সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছে, যা আমাদের দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে একধরনের হুমকির সম্মুখীন করেছে। এছাড়া কৃষি-সম্পর্কিত অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন রাসায়সিক সার, কীটনাশক, বিভিন্ন ভ্যাকসিন—এগুলোও সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। বীজসহ কৃষি উপকরণের এ আমদানিনির্ভরতা কৃষি খাতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বর্তমানে আবহাওয়া অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি উপযুক্ত বীজ উৎপাদন করা না যায় তাহলে কৃষি খাতে এগোনো যাবে না। ক্রমবিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাষাবাদ ও ফসল উৎপাদন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, আমাদের যে দক্ষ জনবল প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে সংকট আছে এবং যারা এক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করেছে তাদেরও যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। দক্ষ জনবল না থাকা এবং দক্ষতা অর্জনকারীদের সঠিকভাবে ব্যবহার না করাও কৃষি ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বিবেচনায় কৃষিশিক্ষা খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে নয়টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কৃষিশিক্ষা খাত নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
কৃষিশিক্ষা খাতে আমার কাছে মনে হয়েছে কোয়ালিটির পরিবর্তে কোয়ান্টিটিতে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কয়েক বছরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক বিবেচনায় তৈরি হয়েছে এবং সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এর পরেও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে মানসম্মত শিক্ষার অভাব তৈরি হয়েছে। এত বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের প্রয়োজন ছিল না। সরকার যদি বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত গবেষণার সুযোগ করে দিত, ল্যাবগুলোকে আরো বেশি গতিশীল করত এবং ল্যাবের জন্য হাতে-কলমে কাজ করার যেসব ইনপুট লাগে, যেমন—কেমিক্যাল, ফসলের মাঠ, গবাদিপশু, সেগুলো দিয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ করে দিত তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও গুণগত প্রবৃদ্ধি ঘটত। জায়গাটিতে আমরা এখন পিছিয়ে আছি।
দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কতটা অবদান রাখতে পারছে বলে মনে করেন?
কৃষি নিয়ে গবেষণায় দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের গবেষকরা সুনাম অর্জন করেছেন। বিশেষত বাংলাদেশের কৃষি খাতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বেশ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে, যার একটি ইতিবাচক প্রভাব আমরা অর্থনীতিতে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের গবেষকরা বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাত আবিষ্কার করেছেন, কৃষি ক্ষেত্রে যেসব রোগ কৃষকদের বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেগুলোর সমাধান করছেন। এছাড়া বৃষ্টি, খরা, তাপমাত্রাসহ আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেও বিভিন্ন জাত আবিষ্কার করেছেন। তাদের এ গবেষণাগুলো তারা কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে করছেন। ফলে কৃষক নতুন নতুন যে সমস্যায় পড়ছেন, সেগুলো তারা জানতে পারছেন এবং বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করতে পারছেন। গবেষকদের এ ধরনের প্রচেষ্টা আমাদের কৃষকদের ঝুঁকি কমিয়েছে এবং কৃষিকে লাভজনক করেছে। কৃষি খাতের এ উন্নয়নের ফলে এখন অনেকেই কৃষি খাতে ইনভেস্ট করতে আগ্রহী হচ্ছেন, ফলে কৃষিতে উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়েছে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরো কার্যকরভাবে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে সরকারের কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া উচিত?
সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের করতে হবে, যেন কানাডা থেকে ছেলেমেয়েরা আমাদের এখানে পড়তে আসে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে আবার আমার দেশের ছেলেমেয়েরা যেন কানাডায় অর্থাৎ স্যান্ডউইচ সিস্টেমে যদি লেখাপড়া, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপের সিস্টেম করা যায়, তাহলে সারা বিশ্বের গ্লোবাল কৃষি ও বাংলাদেশের কৃষির ভেতরে ফিউশন হবে, এক্সচেঞ্জ হবে। আমি মনে করি, এতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানগুলো আরো বেশি টেকসই হবে। এভাবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই বা গ্র্যাজুয়েটরা পৃথিবীতে কন্ট্রিবিউট করার সুযোগ পাবে। আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এ বিষয়গুলো টেকআপ করা উচিত এবং সরকারের এ বিষয়গুলোকে নারিশ বা সাপোর্ট করা উচিত। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের চাকরিতেই কৃষিবিদদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে, যেন তারা কৃষি খাতেই নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী হন।
আপনার মতে কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকারের কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত?
প্রথমত, কৃষি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও উপকরণের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশেই যাতে এসব উপকরণ উৎপাদন করা যায় সে উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা এবং কৃষি পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ যেন নিজেদের কৃষি খাতে সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী হয়। তৃতীয়ত, কৃষি গবেষণা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে। কৃষি খাতের গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট থাকে না। যে বাজেটগুলো থাকে সেটা দিয়ে কৃষির কার্যকর গবেষণা করা সম্ভব হয় না। কারণ কৃষির জেন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করতে হয়, ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু এ ধরনের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট আমরা পাই না। ফলে ভালো আউটপুট জেনারেট করা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে শস্য যেমন উৎপাদন হতো, এখন তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়া ও পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় তেমন হচ্ছে না। উচ্চফলনশীল যে জাতগুলোয় পোকামাকড় বেশি আক্রমণ করে সে জাতগুলোয় কীটনাশক প্রয়োগ করলে সেটি আবার ফুড সেফটির ওপর প্রভাব ফেলছে। কাজেই ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্সের পাশাপাশি ফুড সেফটির বিষয়গুলো কৃষির জন্য খুব চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে উঠছে; এ বিষয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারে সরকারকে সে সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। এছাড়া সরকার, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়—তিনের সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে কাজ করা প্রয়োজন। বাকৃবিতে অনেক দক্ষ গবেষক আছেন। আমরা দেশের কৃষির উন্নয়নে কাজ করতে চাই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার বাইরে হওয়ায় আমরা উপেক্ষার শিকার হই। সরকারের কাছে আমাদের আহ্বান, তারা যেন আমাদের কাজের সুযোগটা দেয়।










