বগুড়ায় কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অনেক হিমাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু এগুলো এখন মালিকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিমাগারের জন্য বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, শ্রমিক সংকট ও শ্রমিকের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মূল্যবৃদ্ধি, আশানুরূপ লভ্যাংশ না পাওয়া, ব্যাংক ঋণ সহজ না করাসহ নানা জটিলতায় লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন মালিকরা।
উল্লেখ্য, স্থানীয় ও উচ্চফলনশীল মিলিয়ে আটটি জাতের আলুর আবাদ হয় বগুড়ায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয় এস্টারিকস (স্থানীয়ভাবে স্টিক নামে পরিচিত) নামে উচ্চফলনশীল জাতের আলু। ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় ৫৫ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে ১১ লাখ ৯ হাজার ৯১০ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে আবাদ হয় ৬০ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে, যা গত বছরের তুলনায় ৫ হাজার ১৭৫ হেক্টর বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আবাদি জমি ও ফলন দুটিই বেড়েছে। গত বছর হেক্টরপ্রতি ২১ দশমিক ৬ টন আলু উৎপাদন হলেও কৃষি বিভাগের তদারকিতে সর্বশেষ ২৩ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে এ মৌসুমে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টনেরও বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে। আলুর বাম্পার ফলনে একদিকে দাম কমে গেছে, অন্যদিকে সংরক্ষণের জন্য হিমাগারে যথেষ্ট জায়গাও ছিল না। অনেক চাষী ও মৌসুমি ব্যবসায়ী আলু নিয়ে স্থানীয় মাচা পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করেছেন। আবার কেউ কেউ সংরক্ষণের অভাবে খোলাবাজারে আলু বিক্রি করেছে। (বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রদত্ত তথ্য)
বৃহত্তর বগুড়া কোল্ড স্টোরেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি তোফাজ্জল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বগুড়া জেলা কৃষিপ্রধান এলাকা। এ জেলা ধান, পাট, আলু, মরিচ, ডেইরি ফার্মে উৎপাদিত পণ্য, মাছ, মরিচ ও সবজির জন্য বিখ্যাত। এখানে উপযুক্ত আবহাওয়ার কারণে কৃষিতে ভালো ফলন হয়ে থাকে। বগুড়ার বেশির ভাগ হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা হয়। দুই-একটি হিমাগারে খেজুর ও কিছু ফল রাখা হয়। হিমাগার কৃষি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষকের পণ্য সংরক্ষণে হিমাগার মালিকরা ভূমিকা রাখেন। কিন্তু হিমাগার মালিকদের লোকসানের বিষয়টি কেউ দেখে না। ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে কখনই আমাদের জন্য সহজ নীতিমালা করা হয়নি। চড়া মূল্যে জমি কেনা এবং হিমাগার প্রতিষ্ঠায় অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ব্যাংকের কিস্তি জমা দিতে দেরি হলে জরিমানা গুনতে হয়। বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে। আলু থেকে যারা প্রক্রিয়া করে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করেন, তারা কম দামে বিদ্যুৎ পান। কিন্তু হিমাগার মালিকদের বেশি দামে বিদ্যুৎ নিতে হয়। অন্যদিকে শ্রমিক সংকট তো আছেই। অভিজ্ঞ শ্রমিকদের পারিশ্রমিক অনেক। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দামও বেড়েছে। এদিকে হিমাগারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সহজে বগুড়ায় পাওয়া যায় না। ঢাকা বা অনেক সময় বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। হিমাগারের জন্য অতি জরুরি অ্যামোনিয়া গ্যাসের দামও বেড়েছে।’
তোফাজ্জল হোসেন আরো জানান, বগুড়ার কাহালু উপজেলায় তার নিজস্ব মেসার্স বগুড়া ভান্ডার হিমাগারে প্রতি মাসে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। এখানে ধারণক্ষমতা দুই লাখ বস্তা। ‘হিমাগারে আলু রাখার ভাড়া নির্ধারণ করে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন। শ্রমিকের মজুরি ও বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া বাড়াতে হয়। শ্রমিক, বিদ্যুৎ, হিমাগার রক্ষণাবেক্ষণসহ এক বস্তার আলুর খরচ পড়ে ৩০০ টাকার মতো। এ আলু প্রায় ছয় মাস রাখার পর খরচ বাদে লভ্যাংশ থাকে না বললেই চলে। এর সঙ্গে ব্যাংক ঋণ যুক্ত করা হলে লভ্যাংশ খুঁজে পাওয়া যায় না।
হিমাগার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যুৎ বিল, আলু লোডিং-আনলোডিং, বস্তা পরিবর্তন খরচ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বোনাস, হিমাগারের ইন্স্যুরেন্স, অ্যামোনিয়া গ্যাস, লুব্রিক্যান্ট অয়েল খরচ, হিমাগারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও মেরামত খরচ, অন্য আনুষঙ্গিক খরচও বেড়েছে। অনেক হিমাগারের যন্ত্রপাতি পুরনো হয়ে গেছে। ব্যাংক ঋণ ও মালিকানাসহ নানা জটিলতায় তিন-চারটি হিমাগার সচল করা যায়নি। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও সুদের হার বেশি হওয়ায় অধিকাংশ হিমাগার ঋণগ্রস্ত।
এসব সংকটের বাস্তবতায় বগুড়ার আলুর হিমাগার মালিকদের দাবি:
১. প্রতিটি হিমাগারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র হলো কমপ্রেসার। এটির আমদানি শুল্ক কম। বাকি যন্ত্রের শুল্ক বেশি, সেটি কমাতে হবে।
২. বর্তমানে আলুর দাম অনেক কম। এ কারণে অনেক কৃষক হিমাগার থেকে আলু বের করতে চাচ্ছেন না। ফলে হিমাগার মালিকরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়তে পারেন। সুতরাং আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগের দায়িত্বে রয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)। সহজ ও স্বলমূল্যে বিদ্যুৎ সেবা প্রাপ্তিতে হিমাগার বা কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে।
৪. হিমাগার মালিক ও কৃষকের লোকসান কমাতে সহজ নীতিমালায় বিদেশে আলু রফতানি করার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. সরকারি উদ্যোগে ভর্তুকির মাধ্যমে আলু কিনে টিসিবির মাধ্যমে তা বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে।
লেখক: বণিক বার্তা প্রতিনিধি, বগুড়া










