শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসন ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতিকে কোথায় রেখে গেছে বলে মনে করেন?

এটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। শেখ হাসিনার পুরো মেয়াদকালেই দেশের অর্থনীতির অধোগতি হয়েছে। সে ক্ষমতাচ্যুতির সময়ে নিম্নগতি হয়েছে বিষয়টি এমন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গত দেড় দশকে সরকারি প্রতিষ্ঠান যে পরিসংখ্যানগুলো দিয়েছে, সেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল মিসগাইড করা। উন্নয়নের কথা বলে বিবিএস থেকে দেয়া প্রতিবেদনগুলোর অধিকাংশই ছিল বানোয়াট। তারা জনসংখ্যার পরিসংখ্যান পর্যন্ত ঠিক দেয়নি। ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি দেখানো হয়েছে। এটি করেছিল মাথাপিছু আয় বেশি দেখানোর জন্য। কারণ জনসংখ্যা যত কমবে মাথাপিছু আয় তত বাড়বে। তারা রফতানি আয় থেকে শুরু করে সবকিছুতেই মিথ্যা পরিসংখ্যান দিয়েছে।

এমনকি ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানও ছিল মিথ্যা। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে অর্থনীতির প্রায় সব তথ্যই ভুয়া। মিথ্যা তথ্য ও পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে আবার নীতি প্রণয়নও করেছে। এ ধারা ১৫ বছর ধরেই চলেছে। ব্যাংক থেকে টাকা লুটপাট করে বিদেশে নিয়ে গেছে। ব্যাংক লুট খুবই খারাপ, এরপর বিদেশে পাচার করা আরো নিকৃষ্ট কাজ। নির্বিচার সম্পদ পাচারের কারণে দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ গত ১৫ বছরে দেশের ব্যাংকগুলো শেষ করেছে। শেয়ারবাজার পুরোপুরি লুট করেছে। এটি একবার-দুইবার নয়, বারবার করেছে।

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পরও তারা ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুট করেছিল। তবে সেটি এতটা সর্বগ্রাসী ছিল না। দেশের বীমা খাতের অবস্থাও একই। মিথ্যা বীমার ক্লেইম দেখিয়ে কোম্পানিগুলোকে খুবই খারাপ অবস্থায় নিয়ে গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (এনবিএফআই) দেউলিয়া করে দিয়েছে। ওদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল—ওরাই ব্যাংক ও বীমার মালিক। যদিও কোনো বিচারেই ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক উদ্যোক্তারা নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিক আমানতকারী তথা জনগণ। একটি ব্যাংকের পর্ষদে যারা বসেন এবং শেয়ারহোল্ডার যারা থাকেন, তারা ব্যাংকের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ অর্থের মালিক থাকেন। বাকি ৯০ শতাংশ অর্থই জনগণের গচ্ছিত আমানত। কিন্তু ব্যাংক লুটের সময় তারা মনে করেছিল, পুরো অর্থের মালিক তারাই। আমানতকে তারা নিজের টাকা মনে করেছে।

পতিত শাসকদের পুরো অর্থনৈতিক মডেলই লুটপাটের মডেল হয়ে গিয়েছিল। এটাকে আমি ‘আওয়ামী অর্থনৈতিক মডেল’ বলি। কে কত লুট করবে, এটিই ছিল সেই মডেলের মন্ত্র। কেউ মেগা প্রকল্প, কেউ ব্যাংক, কেউ শেয়ারবাজার লুট করেছে। আবার অনেকে মিথ্যাচারের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করেছে। অর্থাৎ তাদের মডেলই ছিল মিলেমিশে লুটপাট।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক বছরে অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবে নিম্নগতির ট্রেন্ডে ছিল। একটি জিনিস ভালো হয়েছে। আগে টাকা পাচার নিয়মিত বিষয় ছিল। এখন সেটি বন্ধ হয়েছে। টাকা পাচারের মূল সুযোগ নিত যারা বিদেশে আছে। তাদের আয় রেমিট্যান্স হিসেবে না পাঠিয়ে এদের কাছে বিক্রি করে দিত। যারা চুরি করছে, তাদের তো ১০ টাকা বেশি দিলে ডলার কিনলেও গায়ে লাগত না। প্রবাসীদের কাছ থেকে কিনে নেয়া রেমিট্যান্স দেশে না পাঠিয়ে তারা ওইখানে রেখে দিত। ফলে রেমিট্যান্স কমে গিয়েছিল। এ ধরনের তৎপরতা এখন বন্ধ হয়েছে। চোরেরা সব পালিয়ে গেছে। এখন দেশে লুটপাট করার লোকও নেই। ব্যাংকেও টাকা নেই। শেয়ারবাজারের অবস্থাও খারাপ। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। সেই কারণে এখন রেমিট্যান্সের টাকা বাড়ছে। ফলে অর্থনীতির ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি রফতানিতে প্রবৃদ্ধির ধারা এখনো অব্যাহত আছে। রিজার্ভের ওপর চাপ কমেছে। অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। তবে যে টাকা লুট করে নিয়ে গেছে এবং খেলাপি ঋণ—এটি ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন। কারণ এ টাকা দেশে নেই।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ‘হাসিনোমিকস’ বলে একটা তত্ত্ব প্রচার করত। এ তত্ত্বের ওপর ভর করে দেশে ৬২টি ব্যাংক, ৮১টি বীমা, ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, যার সিংহভাগের অবস্থাই এখন দেউলিয়া। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এগুলোর উপযোগিতা কতটা? বিএনপি ক্ষমতায় এলে এত এত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে?

দেশে এতগুলো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানির প্রয়োজনীয়তা কোনো সময়ই ছিল না। বিএনপির সময় ব্যাংকের অনুমোদনের অনেক চাপ ছিল। এর পরও আমরা কোনো ব্যাংকের অনুমতি দিইনি। কারণ অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ছিল না। একইভাবে তদবির থাকার পরও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির লাইসেন্স দেয়া হয়নি। এরা (আওয়ামী লীগ) ব্যাংকের পর ব্যাংক দিয়ে গেছে। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ব্যবহার করে লুটপাট করা। জনগণ আমানত রাখবে এগুলো লুটপাট করে নিয়ে যাবে। বীমা কোম্পানির বেলায়ও এটি হয়েছে। যাদের কোনো ব্যাংকিং ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, পেশাগত জ্ঞান নেই, পরিচালন জ্ঞান নেই—এমন লোকগুলোকে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ইন্স্যুরেন্স দিয়েছে। শেয়ারহোল্ডাররা তো ব্যাংক চালায় না; চালায় নির্বাহীরা (এক্সিকিউটিভরা)। কিন্তু তারা সরাসরি ব্যাংক চালিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওয়াচডগের কাজ করে। তাদের কাজ মনিটরিং করা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরোপুরি দলীয়করণ করার ফলে এদের ওপর (ব্যাংকের পর্ষদ) কোনো মনিটরিং ছিল না। উল্টো বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। বিএনপির সময় আমরা সব ব্যাংকের দেখাশোনা ও ম্যানেজমেন্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে দিয়েছিলাম। কিন্তু আওয়ামী সরকার রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশন করে নিয়ে গেছে। সেখানে আরেকটা লুটপাটের সুযোগ তৈরি করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাদের পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। একইভাবে তারা দলীয় আনুগত্যের এমডি নিয়োগ দিয়েছে। ঋণ অনুমোদনেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ ছিল। এগুলো করে সরকারি ব্যাংকগুলোকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে সেন্ট্রাল ব্যাংকের অধীনে দিতে হবে—এটিই নিয়ম।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি ও আর্থিক খাতে সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, গত এক বছরে তার কতটুকু পূরণ হয়েছে?

সবাই আমাকে এই একই প্রশ্ন করে। সত্যিকার অর্থে আমার বড় কোনো প্রত্যাশা ছিল না। কারণ এটি ট্রানজিশন গভর্নমেন্ট (অস্থায়ী)। স্বৈরাচার পতনের পর গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার সরকার। এ রকম একটা সরকার যেখানে রাজনৈতিক সমর্থন এবং রাজনৈতিক ওয়েট নেই সেখানে বড় কিছু আশা করা যায় না। এখন যেমন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। দেশী-বিদেশী উভয় বিনিয়োগের পরিস্থিতিই খারাপ। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাচ্ছে। এমনকি কেউ ব্যবসা এক্সপানশনেও (সম্প্রসারণ) যাচ্ছে না। সবাই সবকিছু স্থগিত রেখেছে। নির্বাচনের পরে তারা আবার সিদ্ধান্ত নেবে। সেজন্য এ রকম একটা সরকারের কাছে কোনো সময়ই আমার খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না। পরিস্থিতিতে যতটুকু স্থিরতা আনা যায় তারা সেই চেষ্টা করেছে। কিন্তু বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতি পিকআপ করবে না। বিগত দিনে বিনিয়োগটা হয়েছে মূলত ঋণনির্ভর এবং টাকা ছাপানোর মাধ্যমে। এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। এটিই হচ্ছে টেকসই অর্থনীতি।

অভ্যুত্থানের সুফল হিসেবে আমরা আগামীতে একটা ভালো নির্বাচন আশা করছি। সেই নির্বাচনে বিএনপি যদি বিজয়ী হয়ে আসে তাহলে অর্থনীতিতে মৌলিক কোন সংস্কারগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেবে?

সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ একটি ওভার রেগুলেটেড কান্ট্রি (যে দেশে নিয়ম, বিধি ও নিয়ন্ত্রণের আওতা বেশি)। অন্য কোথাও এত রেগুলেশন ও রেগুলেটরি বডি (নিয়ন্ত্রক সংস্থা) নেই। এখানে একটি রেস্টুরেন্ট করতে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি লাগে। তাহলে বিনিয়োগকারীদের আমরা কী বার্তা দিচ্ছি। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে কমপ্লিটলি ডিরেগুলেট করতে হবে। আমলাতন্ত্রের জটিলতা কমাতে হবে। পাশাপাশি বাণিজ্য বা পণ্য বিনিময় সহজ, দ্রুত ও কম খরচে করার উপযোগী করতে হবে। এজন্য অবকাঠামো, বিমানবন্দর, নৌবন্দর থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, গ্যাস, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো করতে না পারলে বাণিজ্য এগোবে না। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও ব্র্যান্ডিংয়ের বিষয় আছে। দেশকে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত, যেন সবাই বোঝে আমরা ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের জন্য পুরোপুরি ডিরেগুলেশনে যেতে হবে। ব্যবসা সহজতর করতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান করব।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মৌলিক সংকট হলো অতিমাত্রায় ব্যাংকনির্ভরতা। অর্থনীতিতে শেয়ারবাজার (পুঁজিবাজার) বলে যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আছে, সেটি আমরা অনেকটা ভুলেই গেছি। লুটপাটের কারণে এ বাজারটি বিবর্ণ হয়ে গেছে। দেশের ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে। কিন্তু তারা ঋণ দেয় দীর্ঘমেয়াদি। মেয়াদের এ অসামঞ্জস্যই দেশের ব্যাংক খাতকে রুগ্‌ণ করে দিচ্ছে। সারা বিশ্বের পুঁজিবাজারে নানা ধরনের প্রডাক্ট বৈচিত্র্য আছে। যেমন বন্ড, ইকুইটি, মিউচুয়াল ফান্ড, ডেরিভেটিভস, কমোডিটিজ। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু লিস্টেড কোম্পানি ছাড়া পুঁজিবাজার পুরোপুরি অকার্যকর। বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রথম কাজ হবে পুঁজিবাজারকে প্রাণবন্ত করার পাশাপাশি প্রডাক্ট বৈচিত্র্য নিয়ে আসা ও বন্ডের বাজার বিকশিত করা।

বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন ও ব্র্যান্ডিং করতে পারলে ক্যাপিটাল মার্কেটে শুধু দেশের বিনিয়োগকারী না বাইরের অনেক বড় বড় ফান্ড অপেক্ষা করছে। এখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হতে পারে। বিশ্বে অনেকে বড় বড় ফান্ড নিয়ে বিনিয়োগের জায়গা খুঁজছে। একটু বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারলে এসব ফান্ড আসবে। অনেক ফান্ড ম্যানেজার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তারা বাংলাদেশে আসতে চায়।

বিনিয়োগের জন্য কারা যোগাযোগ করেছে, তাদের কারো নাম বলা যাবে?

এ মুহূর্তে নাম বলা ঠিক হবে না। কারণ অনেকগুলো ফান্ড প্রবাসী বাংলাদেশীরা ম্যানেজ করছেন। এ তহবিলের আকার ১০-১৫ বিলিয়ন ডলারও হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীরা এখন ব্যবসায়িকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। দেশের মানুষ হয়তো তাদের নামও জানে না। সম্প্রতি জাপানিজদের সঙ্গে একটি সেমিনার হয়েছে। জাপানিরা বাংলাদেশে আসার জন্য খুবই আগ্রহী। তারা পুঁজিবাজারেও আসতে চায়। সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগেও (এফডিআই) আসতে চায়। বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে জাপান অনেক বিনিয়োগ করেছে। তারা আরো বিনিয়োগ করতে চাইছে।

সরকারের বিদেশী ঋণ এরই মধ্যে ১০৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আগামীতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তহবিল সংগ্রহ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেয়ার জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেবে?

ঋণ সহায়তার জন্য আমরা বেশির ভাগ সময় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে থাকি। ক্যাপিটাল মার্কেট বলে একটা জিনিস যে আছে আমরা সেটি বুঝিই না। যেমন বিমান ক্রয় করবে­—সরকার টাকা দেয়। সরকারের ফান্ড থেকে কেন কিনতে হবে? বিমান তো এন্টারপ্রাইজ, এটি ব্যবসা। ওটাকে ব্যবসার মতোই চালাতে হবে। বিমানকেই ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে নিজেদের ফান্ড সংগ্রহ করতে হবে। ওই কনসেপ্টকে কাজে লাগাতে হবে। দেশে অনেক মিউনিসিপ্যাল (স্থানীয় সরকার বা পৌরসভা, সিটি করপোরেশন) ও করপোরেশন আছে। তাদের অনেক লাভজনক ব্যবসা রয়েছে। তারা অনেক প্রকল্প করতে পারে। সারা বিশ্বেই এখন মিউনিসিপ্যাল বন্ড চালু আছে। এ বন্ডের কারণে তাদের তো আসলে সরকারি টাকার প্রয়োজন নেই। এখন গ্রিন বন্ড আছে। অনেকগুলো মিশন আমাদের সঙ্গে আলাপ করছে তারা গ্রিন বন্ডে আগ্রহী। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের সঙ্গে আলাপ করেছে তারা গ্রিন বন্ড চালু করতে চায়। এছাড়া অন্যান্য জায়গায়ও ফান্ড ম্যানেজাররা আগ্রহ দেখাচ্ছে। সুতরাং আমাদের অর্থনৈতিক মডেল পরিবর্তন করতে হবে। পুরনো ধাঁচের অর্থনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের পেছনে ছোটা বন্ধ করতে হবে। মাত্র চার বিলিয়ন ডলারের জন্য আমরা আইএমএফের পেছনে যে পরিমাণ দৌড়িয়েছি, সেটি কল্পনাতীত। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য এখন চার বিলিয়ন ডলার কোনো টাকাই না।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য বিএনপির ভাবনা কী?

অর্থনীতির মূল স্রোতে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে আমাদের বিস্তৃত পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা দেশের বিরাট একটা অংশকে মনিটাইজ করতে পারিনি। সারা দেশের গ্রামে-গঞ্জে কারুশিল্পী যারা আছে—কামার-কুমার, তাঁতি থেকে শুরু করে...এদের একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ আছে। আপনি আড়ংয়ে যে পণ্যগুলো দেখেন এগুলো ওদেরই পণ্য। এটি সীমিত পরিসরে হচ্ছে। কিন্তু সারা দেশে এর সম্ভাবনা অনেক বেশি। এটি নিয়ে আমাদের বিস্তৃত পরিকল্পনা আছে। আগামী দিনে এখানে শুধু আর্থিক বিনিয়োগই নয়, তাদের কারিগরি সহায়তাও দেয়া হবে। ডিজাইনিং সাপোর্টও দিতে চাই। তাদের ব্র্যান্ডিং এবং বিক্রি করার জন্য প্লাটফর্ম দিতে চাই। উদাহরণ হিসেবে বললে, আলিবাবা, আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অ্যাভেইলেবল। কারুশিল্পীরা সারা দুনিয়ায় এগুলো অনলাইনে বিক্রি করছেন। আমাদের লোকজন তো এগুলো তৈরি করছেই। কুমার-কামার, তাঁতি একটা পণ্য হয়তো ১০০ টাকায় বিক্রি করছে। কিন্তু তাকে কারিগরি সহায়তা দিয়ে ঠিকমতো ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং করলে দেখা যাবে তার ১০০ টাকার পণ্যটা ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এটি করলে দেশের ও বৈশ্বিক বাজারেও বিক্রি করা যাবে। এ নিয়ে আমাদের একটা বড় পরিকল্পনা আছে। তাদের অর্থনীতির আওতায় আনা হবে। তাদের কাজ মনিটাইজ করা হবে। তাদের পণ্যকে ব্যবসা ও বাজার উপযোগী করা হবে। এটি করলে আমাদের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।

আপনারা বলছেন বিএনপি ক্ষমতায় এলে ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এ কর্মসংস্থান কি আপনার বর্ণনা দেয়া পদ্ধতিতেই করা হবে?

হ্যাঁ, সেই জায়গা থেকেই ১৮ মাসে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের কথা বলেছি। সারা দেশে যারা কর্মক্ষম আছে তাদের যদি সক্রিয় করা যায়, মনিটাইজ করে অর্থনীতিতে আনা যায় সেটি দেশের জন্য বিশাল কিছু হবে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বাজার অনেক বড়। দেশের ছেলেমেয়েরা কিন্তু এ খাতে কাজ করছে। দেড়-দুই লাখ ছেলেমেয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বাড়িতে ছোট ছোট কিছু কাজ করছে। এটাকেও আমরা মনিটাইজ করতে পারিনি। তারা বিদেশ থেকে যে টাকা আনে সেটিও সহজতর করা হয়নি। আমরা (ক্ষমতায় গেলে) এ সুযোগগুলো দেব। পে-পালের মতো প্লাটফর্ম অ্যালাউ করব। যাতে তাদের টাকাগুলো সহজে আসে। আবার যদি ওদের সেই টাকা বাইরে ব্যবহার করতে হয় আমরা সুযোগ দেব। মনে রাখতে হবে, ওয়ান ওয়ে স্ট্রিট (একমুখী প্রবেশ) নীতি সবসময় করলে দেশে টাকা আসবে না।৷

পে-পালের মাধ্যমে দেশ থেকে বিনাবাধায় টাকা পাঠানোরও সুযোগ রয়েছে। এজন্য এটিকে সরকার ভয় পায়।

আমরা বলছি, অর্থনৈতিক মডেল পরিবর্তন করতে হবে। ভয় পাওয়ার মডেলে এগোতে গিয়ে আমরা একই জায়গায় আটকে আছি। মানুষ যেন দেশের ভেতরে ও বাইরে আত্মবিশ্বাস পায় সেজন্য অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করতে হবে। আমরা সেই আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারিনি। আমি এমন কিছু প্রকল্প করতে চাচ্ছি, দেশের সব মানুষ যেন অর্থনীতিতে অংশ নিতে পারে। আমরা বলছি, অর্থনীতিতে গণতন্ত্রায়ণ করতে। শুধু রাজনীতিতে গণতন্ত্রায়ণ করলেই হবে না। অর্থনীতিতেও গণতন্ত্রায়ণ করতে হবে। সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টি করতে হবে। বড় বড় ব্যবসায়ীর কাছে সব ঋণ যাবে, তারাই কারিগরি সহায়তা পাবে—এটি হতে পারে না। দেশে বিশাল শ্রেণীর ছোট, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসা আছে, কারুশিল্প আছে। কিন্তু আমরা তাদের মনিটাইজ করে অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার পণ্যগুলো বাজারে বিক্রি উপযোগী করতে পারছি না। তাদের যদি সহযোগিতা দেয়া যায় তাহলে এগুলোর বিরাট মূল্য আছে। এ সহযোগিতাগুলো খুব বড়ও না। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে সরকারের ইচ্ছা আছে কিনা।

অনেকের শঙ্কা শেখ হাসিনার আমলে দেশে অলিগার্ক লালনের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, বিএনপি বা নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে সেটির চর্চা আবারো শুরু হবে। কারাগার কিংবা পালিয়ে যাওয়া অলিগার্করা পুনরায় ফিরে আসবে। এ বিষয়ে আপনার মত জানতে চাই?

বিএনপি আগে যতবার সরকার গঠন করেছে, কোনো সময়ই বাংলাদেশ ব্যাংকে দলীয় লোক নিয়োগ দেয়নি। সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনেও কখনো দলীয় লোক দেয়া হয়নি। এজন্য বিএনপির শাসনামলে ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে কোনো লুটপাট হয়নি। আমাদের সময় কোনো অলিগার্ক সৃষ্টি হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। কারণ আমরা অর্থনীতির জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টি করেছিলাম। বিএনপি শেষবার যখন ক্ষমতা ছাড়ে, তখন প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। অর্থনীতির সব ধারা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। সেই ধারা চললে এখন আামাদের প্রবৃদ্ধি ১০-১১ শতাংশ থাকত। সুতরাং বিএনপি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। আমরা অর্থনীতিকে গণতন্ত্রায়ণ করতে বরাবর সবার অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আগামী দিনে আরো বেশি গুরুত্ব পাবে। আমি সবসময় বলছি, দেশের সবাইকে যদি অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ করতে দেয়া না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে সর্বনিম্ন সীমা আমরা অতিক্রম করতে চাচ্ছি সেটি সম্ভব হবে না। একদম ছোট থেকে বড় বড় প্রকল্প যারা চালায়, অর্থনীতিতে তাদের সবার অবদান লাগবে। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতে সুযোগ রাখতে হবে।