অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়াকে কীভাবে দেখছেন?
সংস্কার এমন একটা বিষয়, যেটাকে আপনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে রাখতে পারবেন না। অন্তর্বর্তী হোক কিংবা নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশে আসা প্রতিটি সরকারই কোনো না কোনো পর্যায়ে সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আমাদের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর থেকেই এ ধারা শুরু হয়েছে এবং এখনো তা চলছে। বিষয়টি রাতারাতি সমাধান হয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে আমাদের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষ করে তরুণরা যখন নেতৃত্বে আসবে, তখন সমাজ ও অর্থনীতির নানা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে। তবে এখানে একটি বাস্তবতাও আছে। আমাদের দেশে প্রায়ই বলা হয়, ভালো লোকেরা বাইরে; আর যারা ক্ষমতায় বসে আছে তারা সবাই খারাপ উদ্দেশ্যে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ ভালো লোকগুলো কোথা থেকে আসবে? তরুণ যারা আছেন, তারাই তো একসময় নেতৃত্বে আসবেন। কাজেই তাদের সুশিক্ষিত ও নৈতিকতা বোধসম্পন্ন করে গড়ে তোলাটাই সবচেয়ে বড় সংস্কার। সুশিক্ষা যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অনেক কিছুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যাবে।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ব্যাংক খাত কেমন চলছে?
শেখ হাসিনা যাওয়ার সময় পুরো ব্যাংক খাত কার্যত ধ্বংসাবস্থায় ছিল। অস্বচ্ছ নীতি, অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত আর দীর্ঘদিনের ঋণখেলাপি সংস্কৃতির কারণে এ খাত পুরোপুরি ভেঙে পড়ার মুখে ছিল। এ পরিস্থিতিতে ড. আহসান এইচ মনসুর নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলব, তিনি যথেষ্ট দক্ষ একজন ব্যক্তি। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে অনেক সংস্কারমূলক উদ্যোগ দেখা গেছে।
তবে আমি মনে করি কিছু উদ্যোগ দ্রুতগতিতে চলছে। একসঙ্গে অনেক কাজ হাতে নিলে সব সঠিকভাবে শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাংক খাত একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর খাত। এখানে হঠাৎ করে সবকিছু বদলে দেয়ার চেষ্টা করলে উল্টো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমার বক্তব্য হলো পরিবর্তন অবশ্যই দরকার, কিন্তু তা ধাপে ধাপে করা উচিত।
আমাদের দেশে সব ব্যাংক এক অবস্থায় নেই। কিছু ব্যাংক ভালো অবস্থানে আছে, তাদের আর্থিক অবস্থা শক্ত। কিছু ব্যাংক ধারদেনা করে চলছে। আবার কিছু ব্যাংক একেবারেই ধ্বংসপ্রায়। এখন যদি একসঙ্গে সবার ওপর এক ধরনের সংস্কার চাপিয়ে দেয়া হয়, তাহলে ভালো ব্যাংকগুলোকেও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যেমন যেসব ব্যাংক ভালো করছে তাদের যদি বলা হয় পরিচালক সংখ্যা কমাতে হবে, তখন সেখানে নতুন জটিলতা তৈরি হবে। তাই ব্যাংকগুলোর অবস্থা অনুযায়ী ভিন্ন কৌশল নেয়া জরুরি।
এখন পর্যন্ত যেসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়েছে, এর মধ্যে কোনগুলো দ্রুতগতিতে হচ্ছে বলে মনে করছেন?
বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে কিছু জায়গায় সামঞ্জস্য আনা দরকার। উদাহরণ দিই—সম্প্রতি বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যাংকের ঋণখেলাপি থাকে, তাহলে তারা শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিতে পারবে না। নীতিগতভাবে এটি ভালো শোনালেও বাস্তবে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা কোনো দোষ না করেও কিছু পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় তাদের মধ্যে আস্থা কমে যাবে। অনেকেই পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রি করে দিতে চাইবেন। এতে ব্যাংকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। আমার মতে, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যতই থাকুক, সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অন্তত কিছুটা ডিভিডেন্ড দেয়া উচিত। এতে তারা অন্তত বিশ্বাস ধরে রাখবেন যে তাদের বিনিয়োগ পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। ব্যাংকের টিকে থাকার ক্ষেত্রেও এটি জরুরি।
আমাদের আরেকটি জটিলতা হলো অতিরিক্ত জনসংখ্যা। ছোট্ট একটি দেশে এখন প্রায় ২০ কোটি মানুষ বাস করে। বাস্তবতা হলো ভৌগোলিক আকার অনুযায়ী এ দেশে সর্বোচ্চ তিন-চার কোটি জনসংখ্যা থাকার মতো সক্ষমতা আছে। এত বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে শৃঙ্খলা চর্চা, ন্যায়বোধ, কিংবা সংস্কার মানসিকতা একসঙ্গে গড়ে তোলা খুব কঠিন কাজ। কে করবে এগুলো? এজন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। তার ওপর আমাদের মধ্যে পরশ্রীকাতরতা প্রবল। একজন ভালো করলে আরেকজন সহ্য করতে পারে না। সংস্কারের পথে এগোতে গিয়ে এটিও একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আবার সংস্কারকে আপনি যন্ত্রের মতো ধরে নিতে পারবেন না যে একটি কাজ করল না, সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি লাগিয়ে দিলেন। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, সময়সাপেক্ষ বিষয়। সময় দিতে হবে, ধাপে ধাপে এগোতে হবে।
আপনি বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। ব্যাংক খাত সংস্কারে বিএবির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয় কেমন হচ্ছে?
আমরা সবসময় সহযোগিতার চেষ্টা করি। তবে আমার অবস্থান সবসময় একই; সংস্কার ধাপে ধাপে করতে হবে। আগে ডুবন্ত ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে হবে। যেসব ব্যাংক ভালো করছে সেখানে অযথা হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। সরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। সেখানে জনসাধারণের বিপুল পরিমাণ টাকা ও জনবল জড়িত। সরকারি ব্যাংককে উপেক্ষা করে কেবল বেসরকারি ব্যাংকের সংস্কার করলে সমাধান আসবে না। দুটো ক্ষেত্রকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
আপনার মতে ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে সবচেয়ে জরুরি কী?
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্যাংক মূলত টিকে থাকে আমানতকারীর টাকায়। সরকার যতই চেষ্টায় নামুক, আমানতকারীরা যদি বিশ্বাস না করেন যে তাদের টাকা নিরাপদ, তাহলে তারা আমানত রাখবেন না। তখন ব্যাংকও চলবে না। সংস্কার দরকার; তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেটা ব্যাংকের অবস্থা অনুযায়ী করতে হবে। ধরুন ভালো ব্যাংক, মাঝারি ব্যাংক, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক এভাবে শ্রেণীকরণ করলে কাজটা সহজ হবে। যেগুলো ভালো করছে তাদের অযথা বিরক্ত না করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংস্কার করতে হবে। এভাবে ধাপে ধাপে এগোলে ব্যাংক খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আমানতকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন, বিনিয়োগকারীরাও সাহসী হবেন। সর্বোপরি অর্থনীতির জন্য একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।










