অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর অতিবাহিত হলো। এই এক বছরে কী পরিবর্তন দেখলেন? মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কতটুকু কাজ করতে পেরেছে?
অন্তর্বতী সরকারের কাছে মানুষের প্রথম প্রত্যাশা ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এ দুটির কোনোটিতেই সরকার সফল হতে পারেনি। এটা সত্য কভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত কিংবা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধসহ নানা কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামে অস্থিরতা ছিল। তার প্রভাব দেশের বাজারে পড়েছে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার তদারকি খুবই দুর্বলতা ছিল। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। মানুষের আরেকটি বড় প্রত্যাশা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এজন্য সংস্কার দরকার ছিল—ম্যাক্রো ও মাইক্রো লেভেলে। ম্যাক্রো লেভেলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, সংসদের কাঠামো এক নাকি দ্বিকক্ষ হবে তা ঠিক করা এবং একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন—এগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেটা সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ।
কিন্তু মাইক্রো লেভেলে সংস্কারটা সে অর্থে হচ্ছে না। যেমন রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতি কমানো, কর ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সহজীকরণ। লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা উন্নতকরণ। বিশেষ করে লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় আরো দক্ষতা দেখানো গেলে দেশের রফতানি আয় ৬০-৭০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু এসব সংস্কারের কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। যেমন শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব সংস্কার করা উচিত। কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি। সেজন্য দৃশ্যমান কোনো উন্নতি বোঝা যাচ্ছে না।
দেশের রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু বিদেশী কিংবা স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার কতটুকু হয়েছে? এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থার জায়গা বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে হবে। দেশে যদি আস্থার পরিবেশ না থাকে তাহলে বিনিয়োগকারীরা এখানে কীভাবে আসবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিয়ে বহুদিন কথা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে এ সেবা কতটুকু সহজ করা গেছে? একজন বিনিয়োগকারী সে দেশী কিংবা বিদেশী হোক-কাগজপত্রের জটিলতা কতটুকু কমানো গেছে? ফলে এগুলো আগে সংস্কার করতে হবে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিংবা বড় বড় প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদেশীদের হাতে যেমন চট্টগ্রাম পোর্টের টার্মিনালের কাজ তুলে দেয়া হচ্ছে, এটা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আমি মনে করি, এখানে সরকার ও সরকারের বাইরে যারা রয়েছে, উভয় পক্ষ থেকেই ভুল ব্যখ্যা দেয়া হচ্ছে। যেসব অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলোর পরিচালনা বিদেশীদের হাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য তুলে দেয়া যুক্তিসংগত নয়। আমাদের বৃহৎ প্রকল্প পরিচালনার জন্য হয়তো দুই-এক বছর রাখা যেতে পারে। এরপর তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে দেশীয় লোকবলকে এসব খাতে দক্ষ করে তোলা গেলে আর তো প্রয়োজন নেই। চট্টগ্রামের নিউ মুরিং টার্মিনাল এখন চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেডকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা তো কোনো অসুবিধা ছাড়াই পরিচালনা করছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমাদের অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে গ্যাস আমদানিতে অর্থের বড় সংকট রয়েছে। এসব সংকট দূরীকরণে সরকারের পরিকল্পনাগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুই ধরনের পরিকল্পনা নেয়া দরকার। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হলো চলমান সরবরাহ ব্যবস্থা কীভাবে ধরে রাখা। বিদ্যুৎ খাতে বড় সংকট গত এক বছরে দেখা যায়নি, তবে জ্বালানি সংকট রয়ে গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের এখনো বড় নির্ভরতা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর। কিন্তু এ সংকট দূরীকরণে গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যখন হবে, তখন জ্বালানির চাহিদা বাড়বে। তখন কোথা থেকে নিশ্চিত সরবরাহ বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সরকারের এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। তবে একেবারে যে দেশে বিশেষ করে অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধান হচ্ছে না, বিষয়টি এমন নয়, কিছু কিছু হচ্ছে। তবে অফশোরে কোনো কাজ হচ্ছে না। অফশোরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশীদের থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে চুক্তির মেয়াদ। স্বল্পমেয়াদে কাজ করতে আসলে বিদেশীরা কখনই আগ্রহী হয় না। বিদেশী কোম্পানিগুলো অন্তত ১৫-২০ বছরের জন্য কাজ পেতে চায়, যাতে তারা কোনো কিছু আবিষ্কার করলে তাদের বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনতে পারে।
বিশেষ আইনের আওতায় সরকার এককভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এখন আর কাউকে কাজ দিতে চায় না। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সরকার এ খাতে বিনিয়োগ টানতে চায়। কিন্তু তাতে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এটা কেন হচ্ছে?
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ এসেছে কিন্তু বিশেষ আইনের আওতায়। বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে এ আইনের প্রাসঙ্গিকতা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সবকিছু বিশেষ আইনের আওতায় করা হয়েছে, প্রশ্নটা এখানেই। কারণ এ আইনের আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অপব্যবহার হয়েছে। একটা পর্যায়ে এ খাতে দরকার ছিল স্বচ্ছ নেগোসিয়েশন আইন। যেখানে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে বৃহৎ প্রকল্পে সরকার সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে কাজ করতে পারত। কিন্তু সেটা করা যায়নি।
এ সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ব্যাংক খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কিছু সাহসী সংস্কার করেছেন, বিভিন্ন বোর্ড ভেঙেছেন এবং স্বচ্ছতা এনেছেন। ফলে ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ব্যালেন্স অব পেমেন্টস পজিটিভ হয়েছে। সরকার যেভাবে এগোচ্ছে, ভালো ব্যাংকগুলো ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে না বলে মনে হয়। ব্যাংক খাত ছাড়া অন্য কোথাও আমি উন্নতি দেখি না।
দেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে অন্তর্বর্তী সরকার আপনাদের সঙ্গে কখনো বসেছে কিনা কিংবা কোনো পরামর্শ নিয়েছে কি?
দেশের ব্যবসা এবং বিনিয়োগের নীতি সংস্কার করতে হলে আগে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে। তাদের অতীতের অভিজ্ঞতা ও প্রতিবন্ধকতাগুলোর কথা জানতে হবে। কিন্তু সরকারের সে বিষয়ে তেমন কোনো আগ্রহ আমরা দেখি না। ফলে বাস্তব সমস্যাগুলো কোথায় হচ্ছে, তা সরকার তাৎক্ষণিকভাবে ধরতে পারছে না। তারা চাইলেই স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসে একটা গঠনমূলক আলোচনা ও কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবসা এবং বিনিয়োগ খাতে মোটাদাগে সংস্কার করে ফেলতে পারে। বিগত এক বছরে প্রায় সবগুলো প্রতিষ্ঠানের বিক্রি ৩০ শতাংশ করে কমে গেছে। জিনিসপত্রের দাম এমনভাবে বেড়েছে যে প্রত্যেকটা কোম্পানির মুনাফার হার হয়তো বেড়েছে, কিন্তু বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে।
নির্বাচনের সময়সীমা সরকার ঘোষণা করেছে। এখন আর মোটাদাগে বড় কোনো সংস্কার করার সুযোগ নেই। তাৎক্ষণিকভাবে কোন সংস্কারটা সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
আমরা যেসব সংস্কারের কথা বলছি, এগুলো চাইলেই তিন মাসে করা সম্ভব। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখা, নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। আরেকটা বিষয় হলো এ সরকার হুটহাট কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে চেয়েছে, যা আদতে ফলপ্রসূ হয়নি। যেমন সরকার প্লাস্টিক ব্যাগ বন্ধ করতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি। কারণ বাজারে এর বিকল্প কিছু আগে আনতে হবে। পরিবেশ রক্ষার নামে বিভিন্ন অকার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা যায়নি।
বাংলাদেশে বর্তমান বাস্তবতায় বিদেশী বিনিয়োগের ভূরাজনৈতিক কোনো চাপ দেখেন কিনা? বিষয়টি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কিনা?
রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি হয়, এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা বিনিয়োগে সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। কাউকে বিরক্ত না করে অনেক ধরনের প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নেও করা যায়। ধরেন আপনি ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিচ্ছেন। কিন্তু কোনো কারণে সেটি ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি হতে পারে। সে প্রকল্পটি বিদেশী অর্থায়ন এড়িয়ে নিজস্ব অর্থায়নেও করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে হয়তো আন্তর্জাতিক টেন্ডার ও কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।










