বাংলাদেশ পতিত সরকারের সময় প্রত্যক্ষ করেছে বিদেশী ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণের স্ফীতি, ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণে অপচয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচের লাগামছাড়া বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির তীব্রতা এবং বিনিয়োগের ক্রমহ্রাস। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার দরপতন, আমদানিনির্ভরতার ভয়াবহতা—বিশেষত জ্বালানি খাতে। ঋণ নিয়ে যেসব বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে সেগুলো থেকে সুফল আসার জন্য যথেষ্ট বিনিয়োগ হয়নি। উপরন্তু ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধের বোঝা টাকায় বহুগুণ বেড়ে আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করেছে। খাদ্যপণ্যের দাম কখনো কমছে, আবার স্থিতিশীলতা হারাচ্ছে; সব মিলিয়ে অর্থনীতি এমন এক অচলাবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টিই সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে জানিয়েছে, বাংলাদেশে নতুন করে আরো প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ হতদরিদ্রের কাতারে নেমে আসতে পারে।
এমন এক গভীর সংকট ও খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েই শুরু হয়েছিল গণ-অভ্যুত্থান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই উত্তাল ঢেউ বাংলাদেশের মানুষকে জাগিয়ে তোলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের দাবিতে। কিন্তু এক বছর পেরিয়েও অন্তর্বর্তী সরকার কর্মসংস্থানে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি। কর্মসংস্থান বাড়ানোর সঙ্গে দেশের শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি, বিনিয়োগে অগ্রাধিকার নীতিসহ অনেক অর্থনৈতিক নীতি জড়িত। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য যে অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন তা কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, জনপ্রশাসন, সেবা খাত, পরিবহন, অবকাঠামো, পর্যটন, আবাসন ব্যবসা থেকে শুরু করে অনানুষ্ঠানিক খাতে যেমন হকার, রিকশাচালক, হোটেল, স্থানীয় ছোট ও মাঝারি ব্যবসাসহ সব ধরনের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
পতিত সরকারের উন্নয়ন দর্শনের ভিত্তি ছিল তথাকথিত চুইয়ে পড়া (ট্রিকল ডাউন) অর্থনীতির তত্ত্ব। তাদের ধারণা ছিল বড় ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করলে বিনিয়োগ বাড়বে, আর নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কর্মসংস্থানও বাড়বে। কিন্তু এ দর্শনের বড় সমস্যা ছিল ওপর থেকে দেয়া সুবিধাগুলো নিচের স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছেনি। এর পেছনে দায়ী ছিল দুর্নীতি, অর্থ পাচার, অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এবং ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে শিল্পায়ন পরিকল্পনার সমন্বয়হীনতা। উদাহরণস্বরূপ, ১০০টি শিল্প অঞ্চল গঠনের ঘোষণা দেয়া হলেও বাস্তবে বহু জায়গায় কৃষিজমি দখল করে ফেলে রাখা হয়েছে অনাবাদি অবস্থায়। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগহীন এসব অঞ্চলে কবে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে কেউ জানে না। রফতানিমুখী শিল্প গড়ার নামে স্থানীয় শিল্পকে অবহেলা করা হয়েছে, আর জমি কেনাবেচার দালাল চক্র হয়েছে শক্তিশালী।
যদিও চাকরিতে সমান সুযোগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে স্বৈরশাসনের পতনের দাবিতে রূপ নেয়, তবু বলা যায় কর্মসংস্থান, কর্মপরিবেশ ও কর্মনিরাপত্তা নিয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষাই ছিল এ আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। স্বৈরশাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষকসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ বঞ্চিত অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামে। তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের অন্তরে সুপ্ত ছিল সম্মানজনক চাকরি, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অবহেলা করে, শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থকে উপেক্ষা করে মানুষের হতাশা বাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে সরকার কোনো কমিশন গঠন না করে বরং একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে এবং ১২ সদস্যের একটি টেকসই উন্নয়নসংক্রান্ত টাস্কফোর্স গঠন করে। এ টাস্কফোর্স ১৭টি অধ্যায়ে টেকসই উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্যে প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এর অধিকাংশ প্রস্তাবই ছিল নয়া উদারীকরণ নীতির প্রতিফলন। প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ে বেসরকারি খাতের ভূমিকা জোর দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমাগার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা। অথচ বিদ্যমান হিমাগারগুলোর মালিকানা রয়েছে কতিপয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা রাজনীতিবিদের হাতে। ফলে কৃষকেরা সুলভ মূল্যে ফসল সংরক্ষণ করতে পারেন না, উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। নতুন করে ব্যক্তি খাতের উদ্যোগে হিমাগার স্থাপিত হলেও কৃষকের খরচ কমবে না; বরং তারা আরো দুর্বল অবস্থানে গিয়ে সিন্ডিকেটের কাছে কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হবে। এ প্রতিবেদনে ফসলের ন্যূনতম দাম প্রবর্তন করা এবং তা বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে কৃষকদের ঝুঁকি কমানোর ব্যাপারে কোনো সুপারিশ আসেনি। বরং বিদ্যমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ই টেকসই উন্নয়নসংক্রান্ত প্রতিবেদনে উপেক্ষিত হয়েছে। যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কার, দেশীয় শিল্প ও কৃষিতে সক্ষমতা বাড়ানো, জ্বালানি খাত সংস্কার ইত্যাদি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আলোচনায় মূল গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কেবল বিদ্যুৎ খাতকে অথচ আমাদের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা এখন জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা। এ গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রতিবেদনে সেভাবে স্থান পায়নি। এছাড়া কিছু প্রস্তাব টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে, আর কিছু প্রস্তাব বহুদিন ধরে আলোচিত হলেও এখনো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যেমন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়িয়ে সম্পদ কর আহরণ, ভ্যাটের ওপর নির্ভরতা কমানো, রেল-সড়ক ও নৌ-পরিবহনকে এক মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনার প্রস্তাব ইত্যাদি। সামাজিক সুরক্ষা খাতে কিছু সুন্দর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সরকার ব্যাংক খাত সংস্কার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীন করার লক্ষ্যে গভর্নর নিয়োগ পদ্ধতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে, যদিও এর সফলতা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর।
এ সরকার ক্ষমতায় এসে নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করেছিল। তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট—যেমন ট্রাম্প সরকারের শুল্ক আরোপ এবং এলএনজি আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি—ভবিষ্যতে এ প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনার দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা টাস্কফোর্সের প্রস্তাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। একইভাবে দেখা গেছে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের গতি আগের তুলনায় শ্লথ হয়ে গেছে। এর পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত খরচ বৃদ্ধিই অন্যতম কারণ।
অন্যদিকে গার্মেন্টস খাতে বহুদিন ধরে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ তৈরি করার কথা বলা হলেও অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং শ্রমিকেরা এখনো ন্যায্য মজুরির দাবিতে রাজপথে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। বকেয়া মজুরি ও ন্যায্য পাওনার দাবিতে পোশাক শ্রমিকরা এখনো সংগ্রাম করছেন।
মূলত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আন্দোলন ও বিক্ষোভগুলো ঘিরে ছিল চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্যতা ও ইচ্ছেমতো বরখাস্ত বা বদলির বিরোধিতা। বহু আন্দোলন ধর্মঘট, মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করেছে ভালো কর্মপরিবেশ ও চাকরির নিশ্চয়তার জন্য। এসব ব্যাপক আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা—চাকরির অনিরাপত্তা ও সুরক্ষিত অধিকারের অভাব এখনো বাংলাদেশের শ্রমজীবী ও পেশাজীবী মানুষের সংগ্রামের মূল বিষয়। চা শ্রমিকরা আন্দোলন করেছেন ন্যায্য মজুরি ও ভালো কর্মপরিবেশের দাবিতে; শিক্ষকরা ন্যায্য নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরির নিশ্চয়তার জন্য অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে মাদ্রাসা শিক্ষক, নার্স, সরকারি-বেসরকারি খাতের কর্মচারী—সবাই এক কণ্ঠে চেয়েছেন ন্যায়সংগত আচরণ আর স্থায়ী চাকরির নিরাপত্তা।
এ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন ছিল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পিবিএস) আন্দোলন, যেখানে তারা দাবি তোলে গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি একীভূতকরণের। এ দাবির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের গ্রামীণ বিদ্যুৎ সংকট। সমস্যার মূল কারণ হলো বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ—REB ও PB—যা ক্রমাগত দ্বন্দ্ব, অদক্ষতা ও হতাশা তৈরি করেছে। REB-এর নিয়ন্ত্রণে PBS কর্মীদের মধ্যে অবিশ্বাস, অকার্যকারিতা ও দুর্নীতি বেড়েছে। অনেক কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ দেয়া হয়েছে, কিংবা অযৌক্তিক বদলির মুখে পড়তে হয়েছে—ফলে নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়া, লাইন ডিজাইনের ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত সমস্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ প্রায়ই উপেক্ষিত হয়েছে, কারণ মাঠ পর্যায়ের টেকনিশিয়ানদের এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নেই। ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে তাদের অভিযোগ কখনই কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছে না, ফলে সমস্যার সমাধান হয় না এবং সেবার বৈষম্য আরো বেড়ে যায়।
প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলন ছিল অপ্রতুল বেতন, খারাপ কর্মপরিবেশ ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অবহেলার বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। দেশের ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাতারা এখনো তাদের ন্যায্য প্রাপ্য দাবি করে যাচ্ছেন, অথচ তাদের আর্তি শোনা হচ্ছে না। একইভাবে কৃষকরাও আন্দোলন করেছেন ন্যায্যমূল্যের দাবিতে, ঋণ সংকট ও অবকাঠামোগত সহায়তার অভাবে—যা প্রমাণ করে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এখনো দুর্বল ও অবহেলিত।
দুই মাসব্যাপী তথ্য আপাদের অবস্থান ধর্মঘট ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত আন্দোলনগুলোর একটি। তথ্য আপারা নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সরকারি প্রকল্পের কর্মী, যারা দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ নারীদের ডিজিটাল সেবা দিয়ে আসছেন। তারা ২২ মে থেকে প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান করছেন, এমনকি ঈদের দিনও। কুড়িগ্রাম, খাগড়াছড়ি, ঝালকাঠি প্রভৃতি দূর জেলার শত শত নারী রাজধানীতে এসে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, সন্তানদের পড়াশোনা, সংসারের খরচ ও চিকিৎসা একাই বহন করছেন। তবুও তাদের এখন রাজনৈতিক পক্ষপাত ও সন্দেহের অজুহাতে চাকরিচ্যুত করার পরিকল্পনা করছে সরকার, কারণ তারা স্থায়ী কর্মচারী নন বরং প্রকল্পভিত্তিক কর্মী।
যখন তারা ন্যায্য কর্মসংস্থান ও অধিকার দাবি করলেন, তখন তাদের ওপর নেমে এল দমন-পীড়ন—পুলিশি হামলা, আহত ও গ্রেফতার পর্যন্ত হতে হলো। এমনকি গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা, ক্যান্সার রোগী ও প্রতিবন্ধীরাও রক্ষা পাননি। সরকারের এ বর্বর প্রতিক্রিয়া শুধু তাদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনই নয়, তাদের মর্যাদা ও অবদানকে গভীরভাবে অপমান করেছে। চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য আচরণ ও কাজের স্বীকৃতির বৈধ দাবি পূরণের বদলে সরকার তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে হয়রানি, সহিংসতা ও মানবেতর আচরণ। এ নির্মমতা প্রমাণ করে বৃহত্তর অবিচারের ধারা—যেখানে সরকার নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করা মানুষদের শত্রু মনে করে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকার শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন, বেসরকারি ও সরকারি খাতের কর্মচারী এবং আউটসোর্সড কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় সংস্কার কার্যকর করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক। বরং তারা বারবার এসব আন্দোলনের বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জনগণের অভিযোগ মোকাবেলার বদলে সরকার আন্দোলনকারীদের স্বৈরশাসনের সহযোগী বলে চিহ্নিত করেছে। অথচ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আগেকার সমর্থন কারো প্রতি অবিচার করার ভিত্তি হতে পারে না। রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো সব শ্রমিককে ন্যায্যতা, মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা। কিন্তু রাজনৈতিক সংযোগকে অন্যায্য বদলি, ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ বা চাকরিচ্যুতির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সরকার শ্রমিকদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা ও অবিচারের বোধ আরো গভীর করেছে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য সরকারের প্রয়োজন ছিল একটি উন্নয়ন দর্শন। কাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে, কীভাবে উন্নয়ন হবে, কার জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা দেয়া হবে, কতটুকু দেয়া হবে—এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা দর্শন না থাকায়, বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ একে অন্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থান থেকে সামনে এসেছে। প্রকৃত অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য ‘টেকসই’ শব্দটি সবক্ষেত্রে তার অর্থকে ধারণ করতে পারেনি।
ড. মোশাহিদা সুলতানা: সহযোগী অধ্যাপক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










