সত্তর কিংবা আশির দশকে যেসব পণ্য ব্যবহার করা হতো, বর্তমানে তার অনেকগুলোই বিবর্তিত হয়েছে। বাজারও হয়েছে বিকশিত। ভারত ও বিশেষ করে চীন শিল্পায়নে অনেক এগিয়ে যাওয়ায় দেশে উৎপাদিত দৈনন্দিন ব্যবহার্য অনেক পণ্যই বাজার থেকে হারিয়ে গেছে। তবে আমদানিভিত্তিক এ বাজারে বিদেশী পণ্যের ভিড়েও দেশী অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে আছে নিজেদের মানসম্পন্ন পণ্য ও গ্রাহকদের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রেখে। গড়ে উঠেছে নতুন অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানও। রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ এমনি একটি প্রতিষ্ঠান, যারা স্বাধীনতার প্রায় কাছাকাছি সময় থেকে দেশের স্যানিটারি ও বাথওয়্যার পণ্যের বাজারে জনপ্রিয় নাম হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির কারখানার বর্তমান আয়তন ৫০ হাজার বর্গফুট। তবে রাজা মেটালের যাত্রাটা ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। বাথরুম ও কিচেনের জন্য মানসম্পন্ন ফসেট তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৩ সালে আলহাজ তাজিজুল হক (মাস্টার সাহেব) ছোট্ট একটি জায়গায় অল্পসংখ্যক পণ্য তৈরি শুরু করেন। কারখানা দেয়ার মতো পুঁজিও তখন ছিল না তার। তবে ফুফু নিজের গয়না বন্ধক রেখে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন ২ হাজার টাকা, তা দিয়েই শুরু হয় কারখানা। প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছিলেন প্রথম সন্তানের নামানুসারে ‘রানী ইলেকট্রোপ্লেটিং’।
কারখানাটির বেড়া ছিল বাঁশ দিয়ে তৈরি। তাই মেশিন যাতে চুরি না হয়ে যায়, সেজন্য তাজিজুল হক নিজেই কারখানায় ঘুমাতেন। শুরুর দিকে একজন সহকারীর সাহায্যে নিজ হাতে তৈরি করতেন সাবান হোল্ডার, তোয়ালে রাখার রেইল ইত্যাদির মতো মেটাল পণ্য। পরে সেগুলো নিজেই ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন।
১৯৭৮ সালে প্রথম ছেলের জন্মের পর কোম্পানির নাম ‘রানী ইলেকট্রোপ্লেটিং’ পাল্টিয়ে দেন ‘রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’। ওই বছর থেকেই কারখানাটি কল তৈরি শুরু করে। তখন রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের উৎপাদিত প্রায় সব পণ্যই সিলেটে বিক্রি হয়ে যেত। দেশজুড়ে পরিচিতি পাওয়ার লক্ষ্যে তাজিজুল হক ঢাকায় আয়োজিত বিভিন্ন এক্সিবিশনে অংশ নেয়া শুরু করেন। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৯০ সালে রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ জাতীয় শিল্প মেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে।
আলহাজ মো. তাজিজুল হক মাস্টার ২০০৪ সালে মারা যান। এরপর তার ছেলে নজরুল ইসলাম রাজার নেতৃত্বে শুরু হয় নতুন পথচলা। ২০০০ সালের পর দেশে ফসেট মার্কেট বড় হতে শুরু করে।
রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো ভালো মানের ফ্ল্যাট নির্মাণে মনোযোগ দেয়। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে সরকারি আবাসন প্রকল্প। মানুষ রান্নাঘর ও বাথরুমে আধুনিক ফসেট ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। নতুন ডিজাইন ও কম মূল্যের চাইনিজ পণ্য দেশের ফসেট মার্কেটে দারুণ প্রভাব বিস্তার করে। নজরুল ইসলাম বুঝতে পারলেন গুণগত মানের দ্রুত উন্নয়ন না ঘটালে দেশী-বিদেশী ফসেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে। তাই মনোযোগ দেন ফ্যাক্টরির মানোন্নয়নে। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হতে তিনি চীন, তাইওয়ান, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে নানা এক্সিবিশনে অংশ নেন। ধীরে ধীরে সেসব দেশ থেকে আধুনিক মেশিনারিজ কিনতে থাকেন। এতে ফসেটের গুণগত মানের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। স্থাপিত হয় বাংলাদেশের ফসেট ইন্ডাস্ট্রির প্রথম ও সম্পূর্ণ ইলেকট্রোপ্লেটিং প্লান্ট। কারখানার সক্ষমতা দৈনিক ৫ হাজার পিস হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ২ হাজার পিস।
রাজার প্লান্টে উৎপাদিত ফসেটে আন্তর্জাতিক মান ঠিক রেখে থ্রি লেয়ার ইলেক্ট্রোপ্লেটিং করা হয়, যার ফলে ফসেটে দ্রুত মরিচা ও গায়ে ফাটল ধরা থেকে রক্ষা পায়। দেশের লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চলেও রাজার ফসেট টেকসই হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে মরিচারোধী বৈশিষ্ট্যের ফলে। এছাড়া জার্মানি থেকে স্পেকট্রোমিটার আমদানি করা হয়েছে, যা ব্যবহার করে পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়। গ্রাহকদের সন্তুষ্টির ফলে রাজার ফসেট দেশব্যাপী জনপ্রিয় হতে শুরু করে। স্বনামধন্য সরকারি ও বেসরকারি আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার ও ডেভেলপারদের কাছে রাজার পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়।
বর্তমান চেয়ারম্যান ও সিইও নজরুল ইসলাম রাজার ভাষ্যমতে, এ ব্যবসায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গ্রাহকদের বিদেশী পণ্যের প্রতি নির্ভরতা ও কমদামি মানহীন প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্ততা। অল্প দামে প্লাস্টিকের পণ্য ফসেট আইটেমের পরিবর্তে ব্যবহারের আগ্রহ থাকায় বাজারে নিম্নমানের পণ্যের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে রাজা মেটালকে। আবার দামি পণ্যের ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন পণ্য হিসেবে শুধু বিদেশী ব্র্যান্ডেই ভরসা করছেন রুচিশীল গ্রাহক। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে বিক্রি কমে গেলেও অল্প সুদে সরকারের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার ফলে পরিস্থিতি ভালোভাবেই সামলে নিয়ে ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ।
বর্তমানে শাওয়ার মিক্সার, বেসিন মিক্সার, রেইন শাওয়ার, সিংক মিক্সার, বাথটাব মিক্সার ইত্যাদি পণ্য উৎপাদন করছে কোম্পানিটি, যার প্রতিটি পণ্যই আন্তর্জাতিক মানের। নিজেদের গুণগত মানের কারণে পণ্যগুলোর ওপর ১২ বছরের গ্যারান্টি দিয়ে আসছে রাজা মেটাল। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি এসব পণ্য মরিচারোধী এবং এতে মানবশরীরের জন্য ক্ষতিকর লেড বা সিসাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিমুক্ত।
নজরুল ইসলাম জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) কনসালট্যান্সিতে ফ্যাক্টরির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কোয়ালিটি কন্ট্রোল মেথড চালু করেন। এতে কর্মপরিবেশ ও কাজের মানের দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে। ২০২২ সালে তারই স্বীকৃতিস্বরূপ এসএমই কর্তৃপক্ষ নজরুল ইসলামকে মাঝারি শিল্পে পুরুষ ক্যাটাগরিতে জাতীয় বর্ষসেরা উদ্যোক্তা পুরস্কারে ভূষিত করে।
রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের পণ্য সারা দেশের এক হাজারেরও বেশি ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটর, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে দুই শতাধিক কর্মী। বর্তমানে রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের পণ্য বিদেশে রফতানির প্রক্রিয়া চলছে।





