বিদেশে ক্যান্সার ওষুধ রফতানিকারক প্রথম বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০০ জেনেরিকের ওষুধ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি ক্যান্সারের ওষুধ। দেশে ক্যান্সার ওষুধ উৎপাদন, বাজারমূল্য, ওষুধের গুণমান নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের অনকোলজি বিভাগের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহমুদুল হক পল্লব। 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাকেরা তাসনীম ইরা

বাংলাদেশে একসময় ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ ছিল মূলত আমদানিনির্ভর। সে অবস্থা থেকে বাংলাদেশে এখন ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি হচ্ছে। আপনারা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছেন। কবে থেকে, কীভাবে এ উৎপাদন শুরু হলো। এ সাফল্যের প্রেক্ষাপটটা বলবেন?

বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস একটি মূল্যবোধসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। আমাদের উদ্দেশ্য বিশ্বমানের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বীকনকে বিকশিত করা। মুনাফাসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পরিবর্তে আমরা সব সময়ই চেষ্টা করি কীভাবে জনগণের সেবা করার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়া যায়। 

২০০০ সালে আমরা লক্ষ করি বাংলাদেশের বেশির ভাগ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানীকৃত। বিশেষ করে ক্যান্সারের সব রকম ওষুধই আমদানি করতে হয়। একই সঙ্গে তখন সাধারণ মানুষই শুধু নয়, ডাক্তারদের মধ্যেও এ কথা প্রচলিত ছিল যে ‘ক্যান্সার হ্যাজ নো অ্যান্সার’ অর্থাৎ চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যান্সারকে জয় করার সর্বোপরি যে ব্যবস্থা থাকা উচিত তা আমাদের ছিল না। এ বিষয়টা আমাদের ভেতরে ব্যাপকভাবে আলোড়ন তৈরি করে। তখন আমরা মরণব্যাধি ক্যান্সারের চিকিৎসা জনগণের হাতের নাগালে নিয়ে আসায় মনোনিবেশ করি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের ক্যান্সার প্লান্ট প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ ২০০৭ সালে সে সময়ের সবচেয়ে যুগোপযোগী একটা ক্যান্সার ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরি আমরা করেছিলাম। এ ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সাল থেকে বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস বাণিজ্যিকভাবে ক্যান্সারের ওষুধ বাজারজাত শুরু করে। 

আজকের দিনে আমরা গর্ব করে বলতে পারি, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার চিত্রে বীকন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পেরেছে। এছাড়া বাংলাদেশে এখন বীকন ছাড়াও আরো ১৮-১৯টা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদন করছে। 

দেশে ক্যান্সারের ওষুধের যে চাহিদা তার কতটুকু দেশের উৎপাদকরা পূরণ করতে পারছেন?

চাহিদার ৯৭ শতাংশই দেশে উৎপাদন করা সম্ভব। আমাদের দেশে আগে ক্যান্সার চিকিৎসার ৯৭ শতাংশ ওষুধই আমদানি করতে হতো। বর্তমানে ৯৭ শতাংশ ক্যান্সারের ওষুধ আমরা দেশেই উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করেছি। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যান্সারের ওষুধের চাহিদা বেশ কম। এর অন্যতম কারণ ক্যান্সারের ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি। অনেকেই ক্যান্সার চিকিৎসা শুরু করেও মাঝপথে ছেড়ে দেন ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে। তাই ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিষয়টিকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। 

বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস ১৫ বছর ধরে নানান প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে অনেক মানুষ ক্যান্সার চিকিৎসায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। 

বিদেশী ওষুধ এবং দেশে উৎপাদিত ওষুধের বাজারমূল্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কিনা।

অবশ্যই আছে। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য যেসব ওষুধ আমদানি করা হতো বা হয়, সেসব ওষুধের দশ ভাগের এক ভাগ দাম দেশে উৎপাদিত ওষুধের, বিশেষ করে বীকনের ওষুধ অনেক সাশ্রয়ী। কারণ আমরা শুরু থেকেই এটা অনুধাবন করেছি যে আমাদের দেশে মানুষ ক্যান্সারের কথা শুনলে মানসিকভাবে আগেই ভেঙে পড়ে, এই ভেবে যে এর চিকিৎসা কীভাবে করবেন! তাই ব্যাপারটাকে আমরা সবার আগে আমাদের নীতিমালায় নিয়ে আসি, যাতে রোগীদের জন্য ক্যান্সারের ওষুধ সাশ্রয়ী করে দিতে পারি। আমরা সব ধরনের ক্যান্সারের প্রতিটি স্টেজের সব রকমের ওষুধ দেশেই উৎপাদন করি। 

বাংলাদেশ নানা ধরনের ওষুধ বিদেশে রফতানি করছে। ক্যান্সারের ওষুধের বিশ্ববাজারের অর্থমূল্য কত? এই বাজারে আমরা কতটা অংশীদার হতে পেরেছি?

বিশ্ববাজারে ওষুধ রফতানিতে আমাদের অংশীদারত্ব বেশ ঈর্ষণীয়। বর্তমানে ১১৪টা দেশের ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষ বীকনের উৎপাদিত ওষুধ ব্যবহার করে। বিবিসিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ডব্লিউটিএর একটা ধারা আছে পেশেন্ট সাপোর্ট প্রোগ্রাম। সেখানে বলা আছে যে একজন পেশেন্ট তার ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যেকোনো ওষুধ পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন। সেই ধারা অনুযায়ী অনেক বিদেশী নাগরিক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ক্যান্সারের ওষুধ সংগ্রহ করার জন্য। এ-সংক্রান্ত একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, নিউজিল্যান্ডের একজন সংসদ সদস্য তাদের সংসদে নিউজিল্যান্ডের বাজারে বীকনের ওষুধ আমদানি করার জন্য প্রস্তাব করেছেন। আমি মনে করি, এটা আমাদের জন্য বিরাট একটা অর্জন। যেটাকে কোনোভাবেই অর্থমূল্যে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

ওষুধের দাম নিয়ে এ দেশে রোগীদের নানা রকম মত আছে। দেশে ক্যান্সারের ওষুধের দাম নিয়ে আপনি কী মূল্যায়ন করবেন?

অবশ্যই আমাদের দেশের যে মাথাপিছু আয় সে হিসেবে দেশে ক্যান্সার ওষুধের দাম এখনো অনেক ব্যয়বহুল। কিন্তু আমরা বিভিন্নভাবে সেটা কমানোর চেষ্টা করি। যে কারণে ওষুধ উৎপাদনের শুরুতেই আমরা এর বাজারমূল্য বিদেশী যেকোনো ওষুধের দশ ভাগের এক ভাগ নির্ধারণ করি। এছাড়া আমরা বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও সচেতনতা ক্যাম্পেইনের মধ্য দিয়ে সব ওষুধই রোগীর নাগালের মধ্যে আনার চেষ্টা করি। এতে রোগীরা কোনো না কোনোভাবে কিছুটা সুবিধা পান। একই সঙ্গে আমাদের স্টোরেজ থেকে সরাসরি রোগীদের ওষুধ দেয়ার ব্যবস্থা থাকায় মধ্যস্থতাকারীদের কোনো রকম অর্থ রোগী বা তার পরিবারকে দিতে হয় না। এছাড়া বিভিন্ন রকমের প্রমোশনাল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আমরা ক্যান্সার চিকিৎসায় কিছু শতাংশ ছাড় দেয়ারও চেষ্টা করি।

দেশে ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনে আমাদের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা খাত কতটা উপকৃত হয়েছে?

যদিও আমাদের কাছে টাকার অংকের তেমন কোনো তথ্য নেই, তবুও আমরা যেটা অনুধাবন করতে পারি তা হলো দেশেই ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদিত হওয়ায় তা দেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং ভবিষ্যতেও রাখবে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের মতো যেসব দেশে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা নিতে রোগীরা যান এবং যে পরিমাণ টাকা সেখানে খরচ হয় সেটার সঠিক পরিমাণ আমার জানা নেই। তবে এটি ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব যদি দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে যে ক্যান্সারের ওষুধ পাওয়া যায় সে বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো যায়। একই সঙ্গে দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার হার বাড়লে তা আমাদের জিডিপিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে বলে আমি মনে করি।

দেশে ক্যান্সার ওষুধের বাজারের আকার এখন কেমন? সামনের দিনে এটা কেমন হতে পারে?

আসলে আগে মানুষ ক্যান্সার সম্পর্কে খুব বেশি সচেতন ছিল না। বর্তমানে সে চিত্র কিছুটা বদলেছে। ২০০৭ সাল থেকে আমরা মিডিয়া ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম পরিচালনা করছি। ফলে ক্যান্সার রোগীরা সচেতন হচ্ছেন এবং চিকিৎসার জন্য আসছেন। এতে অবশ্যই আমাদের দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা ও ওষুধের বাজার বিস্তৃত হচ্ছে। তবে এটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে এর সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি জরুরি। কারণ যে হারে আমাদের অর্থনীতি এগোবে, সেই একই হারে ক্যান্সার চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে যে বাজার গড়ে উঠেছে তা ‍বাড়বে। আমাদের মাথাপিছু আয় এখন ৩ হাজার ডলারের কাছাকাছি। সেটা যদি ৫ হাজার ডলারে যায় তাহলে আমাদের ক্যান্সার চিকিৎসা ও ওষুধের বাজার শতভাগ বিকশিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। 

ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনে দেশে প্রচলিত আইন ও নীতি কতটা সহায়ক? এক্ষেত্রে আপনাদের কোনো পর্যবেক্ষণ বা প্রত্যাশা আছে কি?

বাংলাদেশ সরকার সব সময়ই ফার্মাসিউটিক্যাল খাতকে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এ বছরও বাণিজ্য মেলায় প্রধানমন্ত্রী গার্মেন্টস শিল্পের পরপর বিশেষভাবে কতগুলো শিল্প খাতের কথা উল্লেখ করেছেন, যেসব খাতে আমাদের নজর দেয়া দরকার। সেগুলোর মধ্যে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের কথাও ছিল। সেই সঙ্গে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরও আমাদের অনেক ধরনের সহযোগিতা করে থাকে। এক কথায় বলতে গেলে সরকারের পক্ষ থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল খাতকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হয়। 

তবে একটা বিষয় না বললেই নয় তা হলো, আমরা এখনো বিপুল পরিমাণে ক্যান্সারের ওষুধ আমদানি করি, যা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। তাই যদি দেশেই পর্যাপ্তসংখ্যক উৎপাদনকারী থাকে তাহলে বাইরে থেকে আর ক্যান্সারের ওষুধ আমদানি করার প্রয়োজনই পড়বে না। 

আপনারা যে ওষুধ রফতানি করেন এবং যেটা দেশের বাজারে দেন তার গুণমানে কি কোনো ফারাক থাকে?

বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস ওষুধের গুণগত মান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। এমনকি বীকন ছাড়াও অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা গুণগত মানসম্পন্ন ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদন করছে। তাছাড়া জিএমপি (গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস) অনুসরণ করা হলে দেশে ও দেশের বাইরে দুই রকম মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনের কোনো সুযোগই নেই। শুধু  প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য থাকে। কারণ একেক দেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থান একেক রকম। যে কারণে দেশভেদে ওষুধের দামটা ভিন্ন রকম হয়। যেমন বাংলাদেশের মানুষের জন্য বীকনের বা অন্যান্য ফার্মাসিউটিক্যালের ওষুধের যা দাম, সিঙ্গাপুরের জন্য দাম সেটা হবে না। আবার বাংলাদেশে যে উৎপাদন-পরবর্তী খরচ আর বিদেশে রফতানি করার যে খরচ সেটিও এক নয়। এ কারণে ওষুধের মূল্য নির্ধারণে কিছুটা পার্থক্য হয়, গুণগত মান সব জায়গায় একই থাকে। 

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার পরিস্থিতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ...

আমি বিশেষভাবে বলতে চাই, অনেকেই বলতে চায় বাংলাদেশে ক্যান্সারের ভালো ডাক্তার নেই বা চিকিৎসা ভালো হয় না। এ ধারণা ভুল। যদিও বাংলাদেশে এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ আছেন, তবে যারা আছেন তারা অবশ্যই অভিজ্ঞ ও আন্তরিক। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে যে ক্যান্সার সেন্টারগুলো হয়েছে সেগুলোও বেশ আধুনিক ও উন্নতমানের। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য এখন আমাদের ক্যান্সার সেন্টার আছে, নবীন-প্রবীণ বিশেষজ্ঞরা আছেন, কাজেই ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসা এখন আমাদের দেশেই করা সম্ভব।