দেশে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার মধ্যে যে কয়টি রোগ এখনো প্রায় ব্যবস্থাপনার বাইরে রয়ে গেছে তার মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম। অসংক্রামক এ রোগের চিকিৎসা প্রায় শতভাগই রাজধানীকেন্দ্রিক। অন্যদিকে অভাব রয়েছে পর্যাপ্ত চিকিৎসা কেন্দ্র ও বিকিরণ যন্ত্রের। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রোগী ও মৃত্যু পরিসংখ্যান মুখ্য হলেও তার সঠিক হিসাব নেই সরকার বা বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছে। ক্যান্সার ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, দেশে ক্যান্সারের চিকিৎসার প্রসার আশানুরূপ হয়নি। বিভাগীয় পর্যায়েও পরিপূর্ণ চিকিৎসার ঘাটতি অনেক। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর রোগে ভুগে মৃত্যুবরণকারীদের ৬৭ শতাংশই অসংক্রামক রোগের শিকার। এসব রোগের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ক্যান্সার। ৩০ শতাংশের মৃত্যু হয় হৃদরোগে। আর ক্যান্সারে মৃত্যু হয় ১২ শতাংশের। তবে মৃতের এ সংখ্যা প্রাক্কলিত। বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে কোনো ক্যান্সার রেজিস্ট্রি নেই। বছরে সারা দেশে কত রোগী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে ও মারা গেছে এমন হিসাব সরকারের কাছে নেই।

তবে গ্লোবাল ক্যান্সার ইনসিডেন্স, মর্টালিটি অ্যান্ড প্রিভিলেন্স (গ্লোবোক্যান) পরিসংখ্যানের আলোকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অধীন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) সর্বশেষ হিসাবে জানিয়েছে, ২০২০ সালে দেশে ক্যান্সারের রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৫ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ক্যান্সার রোগীর। 

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাক্কলিত ক্যান্সারের রোগী রয়েছে ১৩-১৫ লাখ। আর প্রতি বছর আড়াই-তিন লাখ রোগী নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। প্রাক্কলিত রোগীর সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ ক্যান্সার রোগী বছরে রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যায়। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি রোগী রোগের শেষ পর্যায়ে চিকিৎসার আওতায় আসছে। মারা যাচ্ছে প্রায় দেড় লাখ রোগী। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাক্কলিত রোগীর সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ ক্যান্সার রোগী বছরে রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যায়। দেশে বিশেষায়িত পর্যায়ের (টারশিয়ারি) সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসার কম-বেশি সুবিধা রয়েছে। সরকারিভাবে ক্যান্সারের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিআরএইচ)। সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার রোগীরা ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য দেশের সর্বোচ্চ এ হাসপাতালে আসছে। তাদের তথ্যে তৈরি ক্যান্সার রেজিস্ট্রি দেশের ক্যান্সার রোগী সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের প্রতিনিধিত্ব করে।

হাসপাতালটির ক্যান্সার রোগতত্ত্ব (ক্যান্সার এপিডেমিওলজি) বিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ক্যান্সার রেজিস্ট্রি রিপোর্ট: ২০১৮-২০২০’ প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে মোট ৮৩ হাজারের কিছু বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য বহির্বিভাগে এসেছিল। এদের মধ্যে সাড়ে ৩৫ হাজারের ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। ২০১৮ সালের পুরো বছরে পৌনে ১২ হাজার ক্যান্সার রোগী হাসপাতালে শনাক্ত হয়েছে, চিকিৎসা নিয়েছে। পেশার বিভাজনে এদের মধ্যে ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ গৃহিণী। ২০১৯ সালে হাসপাতালে আসা সাড়ে ১২ হাজারের কিছু বেশি ব্যক্তির শরীরে নিশ্চিত ক্যান্সার শনাক্ত হয়। 

এনআইসিআরএইচ জানায়, হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি প্রথম তৈরি করা হয় ২০০৫ সালে। প্রতিবেদনটি ২০০৬ সালে প্রকাশ পায়। এরপর ২০০৫ থেকে ২০০৭ সালের তথ্যের আলোকে প্রতিবেদন প্রকাশ পায় ২০০৯ সালে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশ পায় ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের রোগীদের তথ্যে তৈরি ক্যান্সার রেজিস্ট্রি। ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তথ্যে ২০১৪, ২০১৪ সালের তথ্যে ২০১৫ সালে, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের তথ্যে ২০২০ সালের শেষে প্রকাশ পায় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি। সর্বশেষ ২০১৮ থেকে ২০২০ সালে ওই হাসপাতালে শনাক্ত হওয়া ক্যান্সার রোগীদের তথ্য নিয়ে প্রস্তুতকৃত তথ্যে গত ডিসেম্বরে রেজিস্ট্রি প্রকাশ করা হয়। এই তিন বছরে যত রোগী হাসপাতালে এসেছে তাদের ৪৩ শতাংশের ক্ষেত্রে ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বিকীরণ বা রেডিওথেরাপি। যদিও এসব হাসপাতালে বিদ্যমান রেডিওথেরাপি মেশিনের ৫০ শতাংশই নষ্ট। এতে দীর্ঘ হচ্ছে রেডিওথেরাপির জন্য সংকটাপন্ন রোগীদের তালিকা। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে যারা বেসরকারিতে যাচ্ছে তাদের ব্যয় করতে হচ্ছে কয়েক গুণ অর্থ।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি বলছে, দেশে স্বাধীনতার আগে ১৯৫৮ সালে ক্যান্সার চিকিৎসা শুরু হয়। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রথম রেডিওথেরাপি মেশিন বসানো হয় টাঙ্গাইলের কুমুদিনী হাসপাতালে। এরপর ১৯৫৮-৫৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চালু করা হয় রেডিওথেরাপির মেশিন। বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নয়টি টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতালে ক্যান্সারের রেডিওথেরাপির ব্যবস্থা রয়েছে। 

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান্সারের প্রকারভেদে ও রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করেন চিকিৎসকরা। এর মধ্যে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, বিকিরণ বা রেডিওথেরাপি সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত অস্ত্রোপচারের পর কেমোথেরাপি দেয়া হয়। এরপর দেয়া হয় রেডিওথেরাপি। একজন রোগীকে কয়টি রেডিওথেরাপি দেয়া হবে তা নির্ভর করে রোগের অবস্থা অনুযায়ী। তবে অন্তত ৮০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অন্যান্য চিকিৎসার পর রেডিওথেরাপি দেয়া হয়। 

সরকারি ব্যবস্থাপনায় জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিআরএইচ), ১৯৯৫ সালে একটি কোবাল্ট যন্ত্র দিয়ে রেডিওথেরাপির কাজ শুরু হয়। নব্বই দশকেই আরো একটি কোবাল্ট যন্ত্র যুক্ত করা হয়। এরপর ২০০৮ ও ২০১০ সালে যুক্ত করা হয় চারটি লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন। আর ব্রাকিথেরাপি দেয়ার জন্য যন্ত্র রয়েছে দুটি। এ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ছাড়া আরো আটটি প্রতিষ্ঠানে ক্যান্সারের জন্য রেডিওথেরাপি দেয়া হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্যান্সার রোগীর প্রায় ৫০ শতাংশের চিকিৎসার অংশ হিসেবে রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে স্তন, জরায়ু, কোলরেক্টাল (পায়ুপথ ও বৃহদন্ত্র) ও ফুসফুস ক্যান্সারের জন্য রেডিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ। 

রেডিওথেরাপির সুবিধা অনেক দেশেই  পর্যাপ্ত নেই। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে রেডিওথেরাপি মেশিনের সংকট বেশি। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) মতে, প্রতি দশ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে রেডিওথেরাপির মেশিনসহ একটি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র প্রয়োজন। সে হিসেবে বাংলাদেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা কেন্দ্র প্রয়োজন ১৭০টি। আর ২০৩০ সালে গিয়ে প্রয়োজন হবে ২৪০টি। 

এনআইসিআরএইচের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নিজামুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্যান্সারের চিকিৎসার প্রসারের ক্ষেত্রে অবকাঠামো ও লোকবলের সংকট রয়েছে। এ সীমাবদ্ধতা কাঠিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার ক্যান্সারের বিশেষায়িত চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ক্যান্সার চিকিৎসায় মেশিনারিজ বৃদ্ধির কাজ চলছে। আমাদের দেশে মেডিকেল অনকোলজিস্টদের বড় সংকট। এখন মেডিকেল অনকোলজিস্ট তৈরি হচ্ছে। সার্জিক্যাল অনকোলজিস্টের সংকট কিছুটা লাঘব হয়েছে। এখন দেশে ৫০ জনের বেশি সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট রয়েছেন। রেডিয়েশন টেকনোলজিস্ট বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ৫০০ শয্যার হলেও এখনো লোকবল ৩০০ শয্যার। তাতেও ঘাটতি রয়েছে। আমরা মন্ত্রণালয়ে ৫০০ শয্যার লোকবল নিয়োগের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি।’

তিনি জানান, সরকার এরই মধ্যে আট বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের জন্য স্বতন্ত্র সেন্টার করছে। এ প্রকল্প চলমান। কেন্দ্রগুলো চালু হলে ক্যান্সারের বিশেষায়িত চিকিৎসা বেগ পাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র প্রয়োজন। সে হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় দুইশ চিকিৎসা কেন্দ্র প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৩০টি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। কিছু কিছু সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সারের রেডিওথেরাপির জন্য বাঙ্কার রয়েছে। তবে সবগুলোয় মেশিন নেই। আমাদের জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে কিছু রেডিওথেরাপির মেশিন অকেজো হয়ে আছে। দুটি সচল রয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে আরো দুটি নতুন সংযুক্ত করা হবে। ক্যান্সার রোগী ও মৃত্যুর জন্য জাতীয় পর্যায়ে রেজিস্ট্রি নেই। জাতীয়ভাবে একটি রেজিস্ট্রি হলে বলা যাবে ক্যান্সারে বাংলাদেশে কী অবস্থা। গত দুই-তিন দশকে ক্যান্সার চিকিৎসার অগ্রগতি হয়নি এ কথা বলা ঠিক হবে না। ক্যান্সারের চিকিৎসায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো অনেক কাজ করতে হবে।