২০২৩ সালটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেমন ছিল?
গত বছরটি আমাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমাদের চিন্তা ছিল কভিড ও কভিড-পরবর্তী সময়ের ক্ষতি আমরা ২০২৩ সালে কাটিয়ে উঠতে পারব। যদিও এ সময়ে বেশকিছু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রতিকূলতা ছিল আমানতের সুদের হার বেড়ে যাওয়া। এতে আমাদের তহবিল সংগ্রহে সমস্যা হয়েছে। কারণ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের আমানতের সুদও বেড়ে গেছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হারও ১১ শতাংশের ওপরে চলে গেছে। আমানতকারীরা কিন্তু ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগকে বেশি নিরাপদ মনে করেন এবং এক্ষেত্রে কিছু কর সুবিধাও আছে। এসব কারণে আমাদের তহবিলের প্রবাহ গত বছর কিছুটা সীমিত হয়ে গেছে। ফলে আমাদের ঋণ বিতরণও আশানুরূপ হয়নি। একইভাবে আমাদের যেসব ঋণগ্রহীতা আছেন তারাও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন। বছরজুড়েই ডলার সংকট ছিল এবং এতে আমদানিনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যায় পড়েছে। মূল্যস্ফীতিরও প্রভাব ছিল। সাধারণত বছরের শেষ প্রান্তিকে আমাদের ঋণ আদায় কার্যক্রমে গতি আসে। কিন্তু গত বছরের শেষ প্রান্তিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ঋণ আদায়ও আশানুরূপ হয়নি।
আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে গত বছর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়েছে?
আমানতের সুদহার ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তো আমি এরই মধ্যে উল্লেখ করেছি। আরেকটি বিষয় হচ্ছে আমাদের তহবিলের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আসত ব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া মেয়াদি আমানতের মাধ্যমে। কিন্তু গত বছর আমরা ব্যাংক থেকে তেমন মেয়াদি আমানত পাইনি। বিশেষ করে দুই-তিন বছর থেকেই ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে মেয়াদি ঋণ ও আমানত দেয়ার বিষয়টি সীমিত করা হয়েছে। অতীতে কিছু এনবিএফআই সময়মতো ব্যাংকের কাছ থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধ ও আমানত ফেরত দিতে না পারার কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বেশকিছু বড় করপোরেট হাউজ যেমন অলিম্পিক, স্কয়ার, একমি ও এসিআইয়ের বড় অংকের তহবিল ছিল আমাদের কাছে। কিন্তু ডলার সংকটের কারণে এসব করপোরেট হাউজকেও সমস্যায় পড়তে হয়েছে এবং এ কারণে তারা আমাদের কাছে থাকা আমানত নগদায়ন করেছে।
এ অবস্থায় আমানত আকৃষ্ট করতে করণীয় কী?
আমানত আকৃষ্ট করার জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা। বিগত সময়ে বেশকিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের সংবাদের কারণে মানুষের মধ্যে এনবিএফআই সম্পর্কে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এটি দূর করতে আমরা ব্র্যান্ডিং ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কাজের মাধ্যমে আস্থা সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে কোনো গ্রাহক যদি তার আমানতের অর্থ উত্তোলনের জন্য আসেন সেক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সেটি ফেরত দিয়ে দিতে হবে। যদি টাকার অংক বড় হয় এবং তাৎক্ষণিক সেটি ফেরত দেয়া সম্ভব না হয় তাহলে সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহক পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কয়েক কিস্তিতে সেটি ফেরত দেয়ার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এতে গ্রাহকের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হবে না। পাশাপাশি আমরা চেষ্টা করছি ব্যাংকের কাছ থেকেও তহবিল সংগ্রহের। দ্বিপক্ষীয়ভাবে আমরা ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলছি। আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে আমানতের সংকট হবে না। আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহের চেষ্টা করছি। এটি অনেকটা ডিপিএসের মতো মাসে ৫ হাজার, ১০ হাজার বা ২০ হাজার টাকা করে তিন, চার বা পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য জমা রাখা যাবে। এটি আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে টেকসই তহবিলের নিশ্চয়তা দেবে। আমানতের মাধ্যমে আমরা যদি বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারি তাহলে আমাদের তারল্য সরবরাহ বাড়বে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক আমানত, ব্যাংকের তহবিল কিংবা কতিপয় বিত্তশালী গ্রাহকের ওপর আমাদের নির্ভরতা কমবে।
বেশকিছু সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীরা এখনো তাদের টাকা ফেরত পাননি। এতে সার্বিকভাবে এনবিএফআই খাতের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যার সমাধানে অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে আপনারা কী ধরনের ভূমিকা রাখছেন?
সংগঠন হিসেবে আমরা তো আমাদের সদস্যদের বাধ্য করতে পারি না। তবে আমরা সবার সঙ্গে কথা বলছি। তাদের বলেছি যে গ্রাহক ফোন দিলে যাতে সাড়া দেয়া হয়। কখনই যাতে এড়িয়ে না যাওয়া হয়। যখনই কেউ গ্রাহকের ফোনে সাড়া না দেয়, এড়িয়ে যায় কিংবা দেখা না করে তখনই গ্রাহক আতঙ্কিত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমরা প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বলেছি যে আমানতকারীরা যোগাযোগ করলে তারা যাতে সাড়া দেন। সমস্যা থাকলে সেটি গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের জন্য আমরা পরামর্শ দিচ্ছি। প্রয়োজনে আমানতের মেয়াদপূর্তির সময় এগিয়ে এলে প্রতিষ্ঠানকে নিজ থেকে গিয়ে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলতে হবে যে আমাকে এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ সময় দেন আমরা আপনাকে এক বা দুই কিস্তিতে টাকা ফেরত দিয়ে দেব। গ্রাহক টাকার জন্য যোগাযোগ করার আগেই প্রতিষ্ঠান নিজ থেকে গিয়ে টাকা ফেরত দেয়ার কথা বললে তাতে গ্রাহকের আস্থা সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেড়ে যাবে।
এ বছরটি কেমন যাবে বলে মনে করছেন?
গত তিন বছরে আমরা যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়েছি সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েই কিন্তু আমরা ২০২৪ সাল শুরু করেছি। কিন্তু গত বছর পাস হওয়া ফাইন্যান্স কোম্পানি আইনের কারণে আমরা এ বছর দুটো চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছি। এ আইনে কোনো ব্যক্তি একক নামে ৫০ লাখ টাকা এবং যৌথভাবে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আমরা বেশকিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। প্রথমত আমরা নতুন আমানত থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, দ্বিতীয়ত আমানত নবায়নের ক্ষেত্রে যাদের নির্দিষ্ট সীমার বেশি আমানত রয়েছে সেগুলো নবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না, বরং ফেরত দিতে হচ্ছে আর তৃতীয়ত আমাদের যারা দীর্ঘদিনের গ্রাহক রয়েছেন তাদের কাছ থেকেও আমানত পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছি। ফাইন্যান্স কোম্পানি আইনে যেকোনো ঋণ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তহবিল ব্যয় আদায়ের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে যেসব খেলাপি ঋণ রয়েছে সেগুলোর তহবিল ব্যয় আদায় করাটা বেশ কঠিন। কারণ এক্ষেত্রে ঋণের মূল অর্থের তুলনায় তহবিল ব্যয় কয়েক গুণ বেশি। আমরা এগুলো কীভাবে মোকাবেলা করব, সেটি নিয়ে কাজ করছি। এগুলো মোকাবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা চেষ্টা করব তহবিল ব্যয় আদায়ের জন্য। এর পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়গুলোয় আরো জোর দেব।





