অগ্রসর গাড়ি বাজারে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) কাছে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও বাংলাদেশে হাইব্রিড গাড়ি বেশ সম্ভাবনাময়। তুলনামূলক কম দাম ও জ্বালানিসাশ্রয়ী হওয়ায় সামনের বছরগুলোতে হাইব্রিড গাড়ি বাজার সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উপাত্তে দেখা গিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ২৯৬ কোটি টাকার ৮ হাজার ৩৬৬টি হাইব্রিড গাড়ি আমদানি হয়েছে। ২০১৮-১৯ সালে যেখানে ৪৪৫ কোটি টাকার ৩ হাজার ২৯৬ ইউনিট হাইব্রিড গাড়ি আমদানি হয়েছিল।
হাইব্রিড গাড়ি এমন একটি গাড়ি যার ইঞ্জিন জীবাশ্ম জ্বালানি ও বিকল্প জ্বালানি উৎসের মধ্যে সুইচ করতে পারে। বেশির ভাগ হাইব্রিড গাড়ি তেল ও বিদ্যুৎ উভয়ের সংমিশ্রণে চলতে পারে। এ ধরনের গাড়িতে ইঞ্জিন থাকে এবং সঙ্গে একটি ইলেকট্রিক মোটর থাকে। এই গাড়ি ইঞ্জিন এবং মোটরের কম্বিনেশনেও চলতে পারে, আবার আলাদাভাবেও চলতে পারে। হাইব্রিড মূলত দুই ধরনের। একটি সাধারণ হাইব্রিড, আরেকটি হলো প্লাগ-ইন হাইব্রিড। প্লাগ-ইন হলো সাধারণ হাইব্রিডের তুলনায় আরেকটু উন্নততর প্রযুক্তি। প্লাগ-ইন হাইব্রিড সিস্টেমে আলাদাভাবে চার্জারের সাহায্যে গাড়ির ব্যাটারি চার্জ করা যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনের পাঁচ-দশ বছরে হাইব্রিড গাড়ির বাজার বিস্তৃত হবে। জীবাশ্মচালিত গাড়ির বিপরীতে এ খাতের বিকাশের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। টেকনিক্যাল জটিলতা, ব্যবস্থাপনার সমস্যা, বিক্রয়-পরবর্তী সেবা না পাওয়ার শঙ্কা, প্রচলিত সার্ভিস সেন্টারগুলোতে প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানের অভাবে বাংলাদেশী গ্রাহকরা হাইব্রিড গাড়ি ক্রয়ে কিছুটা দ্বিধায় ভোগেন।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে গাড়ি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান অটোপ্লাসের স্বত্বাধিকারী আবু হোসেন ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, মূলত হাইব্রিড গাড়ি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো না জানার কারণে অনেকেই কেনার ব্যাপারে কিছুটা দ্বিধায় ভোগেন। আবার না জেনেবুঝেই অনেকেই বলে বসেন, ‘অটোগিয়ার গাড়ি কিংবা হাইব্রিড গাড়ি ভালো না, এ ধরনের গাড়িতে অনেক সমস্যা দেখা দেয়’। বাস্তবে এ ধরনের মনগড়া কথাবার্তার কোনো ভিত্তি নেই। হাইব্রিড গাড়ি জ্বালানিসাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম। বাস্তবতা হলো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে হাইব্রিড গাড়ির কোনো বিকল্প নেই। এখন সারা দেশে হাইব্রিড গাড়ির প্রচুর ওয়ার্কশপ গড়ে তোলা হয়েছে। দক্ষ টেকনিশিয়ানরা এসব ওয়ার্কশপে বিক্রয়োত্তর সেবা দিচ্ছেন। হাইব্রিড গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ জনবল এরই মধ্যে গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। তবে হাইব্রিড গাড়ি আরো বেশি জনপ্রিয় করতে আমাদের আরো দক্ষ জনবল এবং সারা দেশে বিক্রয়োত্তর সেবার জন্য বিপুলসংখ্যক ওয়ার্কশপ/সার্ভিস সেন্টার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশে ২০২০ সালের অটোমোবাইল উন্নয়ন নীতিমালার খসড়ায় পরিবেশবান্ধব গাড়ি, যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্কহার হ্রাস ও এ ধরনের গাড়ি উৎপাদনে বেশকিছু সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দেয়ায় ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে হাইব্রিড গাড়ি সম্পর্কে আগ্রহ বেড়েছে। ওই খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জ্বালানিসাশ্রয়ী যানবাহনের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে পরিণত করতে চায়। এখন গাড়ির দাম কমার পাশাপাশি অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার কারণেই মানুষের মধ্যে এ ধরনের গাড়ি সম্পর্কে আস্থা বাড়ছে বলে ধারণা করছেন গাড়ি আমদানি ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা।
বাংলাদেশে জনপ্রিয় হাইব্রিড ব্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে টয়োটা অ্যাক্সিও, হোন্ডা গ্রেস, নিশান এক্স-ট্রেইল। ক্রমবর্ধমান ধনাঢ্য ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিস্তার সত্ত্বেও বাংলাদেশের গাড়ি বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের গাড়ি শিল্প নিয়ে লাইটক্যাশল পার্টনার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গাড়ি ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। প্রতি ১ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে ২ দশমিক ৫টি গাড়ি। অবশ্য দেশের গাড়ি শিল্পের আকার ১০০ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
২০১০-এর দশকে দেশে গাড়ি বাজার সম্প্রসারিত হলেও গত কয়েক বছরে সংকুচিত হচ্ছে বলে লাইটক্যাশলের প্রতিবেদনে জানানো হয়। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গাড়ি বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিএ) উপাত্তে দেখা গিয়েছে, ২০১৭ সালে ৩২ হাজার ৯৪২টি যাত্রীবাহী গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ ও ২০১৯ সালে যাত্রীবাহী গাড়ি নিবন্ধন
প্রায় ৩৯ শতাংশ কমেছে। করোনার অভিঘাতে ২০২০ সালে যাত্রীবাহী গাড়ি নিবন্ধন ২০১৯ সালের তুলনায় ২১ শতাংশ কমেছে। বিআরটিএর উপাত্ত অনুযায়ী ২০২০ সালে গাড়ির নিবন্ধন ২০১৩-পরবর্তী সর্বনিম্নে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের গাড়ি বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, এখানে নতুন গাড়ির তুলনায় রিকন্ডিশনড গাড়ি বিক্রি বেশি হচ্ছে। ২০২০ সালে মোট যাত্রীবাহী গাড়ি আমদানির ৮২ শতাংশই ছিল রিকন্ডিশনড গাড়ি। বাংলাদেশে সহসাই বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না পাওয়ায় এখানে হাইব্রিড গাড়ি বেশ সম্ভাবনাময়। এছাড়া এ ধরনের গাড়ির অনেক সুবিধা রয়েছে।
প্রথমত, হাইব্রিড গাড়ি তুলনামূলক জ্বালানিসাশ্রয়ী। হাইব্রিড গাড়ি তেল ও ইলেকট্রিক ইঞ্জিন ব্যবহার করে বিধায় এগুলোর বৃদ্ধিমান ব্যবহারে কম জ্বালানি প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, এ গাড়ি পরিবেশবান্ধব। হাইব্রিড গাড়ি যখন ব্যাটারি শক্তিতে পরিচালিত হয়, তখন ইঞ্জিন বন্ধ থাকে। গাড়ি থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডও কম নির্গত হয় হাইব্রিড গাড়িতে। এতে পরিবেশদূষণের হার কমে। দেশে জ্বালানিসাশ্রয়ী হিসেবে হাইব্রিড গাড়ি জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও সারা পৃথিবীতে পরিবেশবান্ধব হিসেবেই এ গাড়িগুলো স্বীকৃত।
দেশে হাইব্রিড গাড়ি বেশ সম্ভাবনাময় হলেও বেশ কয়েকটি সমস্যার কারণে প্রত্যাশিত গ্রাহক পাচ্ছে না। প্রথমত, হাইব্রিড গাড়ির জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে অজ্ঞতা। হাইব্রিড গাড়ির পেছনের আসনে বাতাস যাওয়ার জন্য এয়ার ভেন্ট থাকে। এয়ার ভেন্ট দিয়ে বাতাস প্রবেশ করে ব্যাটারিকে শীতল রাখে। এতে ব্যাটারি দীর্ঘস্থায়ী হয়। সাধারণত গাড়ি কেনার পর গাড়ির আসনের সিট কভার নতুন করে লাগানো হয়। মাঝেমধ্যে সিট কভার এমনভাবে বানানো হয়, যা এয়ার ভেন্টকে ঢেকে ফেলে। ফলে পেছনের আসনের যাত্রীরা গরম অনুভব করেন। হাইব্রিড গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে না জানার কারণে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সিট কভার তৈরি করা কারিগররাও হাইব্রিড গাড়ির এই সিস্টেমের সঙ্গে পরিচিত নন। না জানার কারণে হাইব্রিড গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের চালকেরা এখনো হাইব্রিড গাড়িতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। দেশে ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর জন্য ড্রাইভার বা চালক রাখা হয়। চালকেরা নন-হাইব্রিড গাড়ি চালিয়ে অভ্যস্ত। হাইব্রিড গাড়ি চালানোর নিয়মকানুন না জানার কারণে চালকরা না বুঝে গাড়ির ক্ষতি করেন। হাইব্রিড গাড়ির ড্রাইভিং মোডগুলোও অনেক চালকের নখদর্পণে থাকে না। তাই গাড়ির চালক খুঁজতেও বেগ পেতে হয়।
এ গুটিকয়েক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলে এবং ক্রেতা ও চালকদের মধ্যে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারলে সামনের বছরগুলোতে হাইব্রিড গাড়ির বাজার আরো সম্প্রসারিত হবে।
বাংলাদেশ সরকার দেশে হাইব্রিড গাড়ির প্রসারে যথেষ্ট আন্তরিক বলে মন্তব্য করেছেন বারভিডার সাবেক সভাপতি ও গাড়ি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান হক’স বে’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে হাইব্রিড গাড়ির প্রসারে সরকার অনেক আগে থেকেই বেশকিছু উৎসাহমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন গত বাজেটেও হাইব্রিড গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ককর কমানো হয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সময়ও শুল্ককর কমানো হয়েছিল। সরকারের এ পদক্ষেপ বাংলাদেশে হাইব্রিড গাড়ির প্রসারে বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর যত গাড়ি আমদানি হচ্ছে, তার কমবেশি অর্ধেকই আসছে হাইব্রিড গাড়ি।
তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জ্বালানির জন্য আমাদের অবশ্যই বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির দিকে ঝুঁকতে হবে। তবে বাংলাদেশ হঠাৎ করেই বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির যুগে পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারবে না। বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির যুগে প্রবেশের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে হাইব্রিড
গাড়ি ব্যবহার বাড়ানো। এরই মধ্যে বাংলাদেশে হাইব্রিড গাড়ি প্রসারে আমরা বেশ সাফল্য লাভ করেছি।





