ভেনিজুয়েলার দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশটির রাজধানী কারাকাসে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর আকস্মিক পরিবর্তন ভেনিজুয়েলাবাসীর মনে একইসঙ্গে আশার আলো ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা তৈরি করেছে।

শনিবার সকালে কারাকাস উপত্যকায় বিস্ফোরণের শব্দের পর মানুষ যখন রাস্তায় বেরিয়ে আসে, তখন সেখানে যুগপৎ উল্লাস ও ক্ষোভ দেখা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা দিনা (নিরাপত্তার স্বার্থে ছদ্মনাম) জানান, তিনি স্বস্তিবোধ করছেন। আপাতত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞ। তার ভাষায়, মাদুরোকে এখান থেকে সরিয়ে নেয়ায় আমি অন্তত সুড়ঙ্গের শেষে কিছুটা আলোর দেখা পাচ্ছি। তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়ে তিনি তার আসল নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে হোর্হে নামে এক ব্যক্তি মার্কিন সমর্থনকে স্বাগত জানালেও সামনের দিনগুলো নিয়ে চিন্তিত। তিনি বলেন, তাকে নিয়ে যাওয়া মানেই সবকিছুর নিশ্চয়তা নয়। সামনের দিনগুলো কেমন হবে তা নিয়ে আমরা গভীর অনিশ্চয়তায় আছি।

এদিকে মাদুরো সমর্থকরা এ ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। বিক্ষোভ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের নেতাকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান তারা।

মার্কিন প্রশাসন মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘নারকো-টেরোরিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জালিয়াতি ও বিরোধী দল দমনের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা মাদুরোর বিরুদ্ধে বিরোধী দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ ও সহিংসতা ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বর্তমানে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কে মাদক ও অস্ত্র পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে।

মাদুরোর পতনের পর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, স্থায়ী নতুন নেতৃত্ব গড়ে না ওঠা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে। দেশটির তেল সম্পদের ব্যবস্থাপনাও সাময়িকভাবে তাদের হাতে থাকবে। তবে এ প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভেনিজুয়েলাবাসীর মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।

দিনা বলেন, ট্রাম্পের কথাকে গুরুত্ব দেয়া কঠিন, কারণ তিনি প্রায়ই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। তবে ভেনিজুয়েলার বিধ্বস্ত অর্থনীতিতে মার্কিন বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

তবে ভয় এখনো কাটেনি। সম্প্রতি মাদুরো-অনুগত জাতীয় পরিষদ একটি আইন পাস করেছে, যাতে মার্কিন নৌ অবরোধের পক্ষে কথা বলাকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। আর কারাকাসের রাস্তায় মহড়া দিচ্ছে সশস্ত্র সরকারপন্থী আধাসামরিক বাহিনী ‘কোলেক্তিভোস’।

২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছেন। প্রবাসে থাকা এই ভেনিজুয়েলাবাসীরা মাদুরোর গ্রেফতারের সংবাদে উদযাপন করলেও দেশটির ভেতরে থাকা সাধারণ মানুষ মনে করছেন এটি কেবল দীর্ঘ লড়াইয়ের শুরু।

নিকোলাস মাদুরো দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন অভিযোগ অস্বীকার করে আসলেও, তার পতনের পর লাতিন আমেরিকার দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্র এখন সম্পূর্ণ নতুন ও অনিশ্চিত মোড় নিয়েছে।