মার্কিন কবি টি এস এলিয়ট এপ্রিলকে বলেছিলেন সবচেয়ে ‘নিষ্ঠুর মাস’। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সদ্যসমাপ্ত জানুয়ারিও একই আখ্যার দাবিদার হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ঘরোয়া ও বৈশ্বিক অঙ্গনে শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার প্রদর্শনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে নিজের ‘লৌহ নীতি’ (শক্তি এবং ক্ষমতা) বাস্তবায়নে তিনি এ এক মাসে যে চরমপন্থা অবলম্বন করেছেন, তা একই সঙ্গে তার শক্তির দাপট ও সীমাবদ্ধতা—দুই-ই প্রকাশ করেছে।
জানুয়ারির শুরুতেই একটি আকস্মিক সামরিক অভিযানে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নেয়া হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষায় এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘হার্ড পাওয়ার’-এর নিখুঁত প্রদর্শন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও একে ভেনেজুয়েলার ‘গ্যাংস্টার স্বর্গ’ থেকে মাদুরোকে তুলে আনার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে সমালোচকদের মতে, এ অভিযান আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতিকে উপেক্ষা করার নজির সৃষ্টি করেছে।
ঘরোয়া অঙ্গনে জানুয়ারির সবচেয়ে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে মিনেসোটায়। অভিবাসনবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে প্রাণ হারান দুই মার্কিনী। পাশাপাশি পাঁচ বছরের এক শিশুকে বাবার সঙ্গে আটকের ছবি দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এখন তার রাজনৈতিক দুর্বলতায় পরিণত হচ্ছে। ফক্স নিউজের একটি জরিপ বলছে, অনেক রিপাবলিকানও মনে করেন, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের কৌশলগুলো সীমা লঙ্ঘন করেছে। এ প্রেক্ষাপটে হোয়াইট হাউস পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার ইঙ্গিত দিলেও অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান থেকে সরে না আসার বার্তা দিয়েছে প্রশাসন। বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন ইস্যুটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে রিপাবলিকানদের জন্য দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জানুয়ারি ছিল অস্থিরতাপূর্ণ একটি মাস। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্কের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি তুলেছেন ট্রাম্প। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনার বিষয়েও ইঙ্গিত দিয়েছেন। এতে ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলো। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্পষ্ট করে বলেছেন, মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে এখন একজোট হতে হবে। কারণ আমরা যদি আলোচনার টেবিলে না থাকি তাহলে আমরা তার খাবারের তালিকায় রয়েছি।
ইরানেও ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও হুমকির সুরে কথা বলছে। সেইসঙ্গে একটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জানুয়ারি ছিল ট্রাম্পের ক্ষমতার উন্মত্ত আস্ফালনের মাস। এ মাস দেখিয়েছে ট্রাম্পের শক্তি প্রয়োগের প্রবল ইচ্ছা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তার বিরুদ্ধে ঘরোয়া জনমত, মিত্রদের প্রতিরোধ ও বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা।
এতোকিছুর মধ্যেও ক্ষমতার প্রদর্শন থেকে সরে আসছেন না ট্রাম্প। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, জানুয়ারির মতো অস্থির মাস সামনে আরো আসতে পারে।















