গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশংকা ভেসে বেড়াচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই আশংকা বাস্তবে রূপ নেয় গতকাল সকালে। সামরিক কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে বড় ধরনের আঘাত সাধারণত গভীর রাতে পরিচালিত হয়। অন্ধকার আড়াল দেয়, আকাশ প্রতিরক্ষা থাকে বিভ্রান্ত। তাই প্রতিক্রিয়া দেখাতে সময় লাগে। কিন্তু এবার ভিন্ন চিত্র। শনিবার সকালেই শুরু হয় ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা। কারণ সময় নয়, লক্ষ্য ছিল এখানে পরিষ্কার—ইরানি নেতৃত্বের সমাবেশকে এক আঘাতে বিচ্ছিন্ন করা, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোলকে অচল করা।

কিন্তু কিভাবে এই হামলা পরিচালনা করা হয়েছে?

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একত্রিত হয়েছে। এরপরই শক্তিশীল যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। যে হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনি, চিফ অব স্টাফ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ইরানের বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে সিআইএ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খামেনির গতিবিধি, দৈনন্দিন রুটিন এবং অবস্থানের ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানি নেতৃত্বের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি করার সক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই সিআইএ নিশ্চিত হতে পেরেছিল যে, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি সুরক্ষিত সরকারি কম্পাউন্ডে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং সেখানে স্বয়ং সর্বোচ্চ নেতা উপস্থিত থাকবেন।

গোয়েন্দা তথ্যের এই ‘হাই ফিডেলিটি’ বা উচ্চ নির্ভুলতা নিশ্চিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলার পূর্বনির্ধারিত সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত রাতের অন্ধকারে হামলা চালানোর পরিকল্পনা থাকলেও, খামেনি ও শীর্ষ নেতাদের একসঙ্গে পাওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি তারা। শনিবার সকাল ৬টার দিকে ইসরায়েলের বিমান ঘাঁটি থেকে দূরপাল্লার এবং নির্ভুল লক্ষ্যভেদী মারণাস্ত্রে সজ্জিত যুদ্ধবিমানগুলো উড্ডয়ন করে। ঠিক দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর, তেহরান সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি ওই কম্পাউন্ডে আঘাত হানে। ওই সময় খামেনি একটি ভবনে এবং অন্য শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পার্শ্ববর্তী আরেকটি ভবনে অবস্থান করছিলেন।

cia

স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কম্পাউন্ডে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর কালো ধোঁয়া ও ব্যাপক ধ্বংসের চিহ্ন। ছবি- রয়টার্স

এই অভিযানে ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায় প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। হামলায় খামেনির পাশাপাশি আইআরজিসির প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদে এবং সামরিক পরিষদের প্রধান অ্যাডমিরাল আলী শামখানি সহ আরও অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রাখলেও এই আকস্মিক ‘ট্যাকটিক্যাল সারপ্রাইজ’ বা কৌশলের কাছে তারা পরাস্ত হয়েছে।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা, নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তারা একই স্থানে উপস্থিত—এমন সুযোগ অত্যন্ত বিরল। সেই ‘মিটিং উইন্ডো’ নিশ্চিত হওয়ার পরই হামলার সময় এগিয়ে আনা হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে। খামেনি তার নিকটতম সহযোগীদের নিয়ে যখন অভ্যন্তরীণ বৈঠকে ছিলেন, তখনই আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল।

তেহরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা বেষ্টিত খামেনির কম্পাউন্ডে তখন আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরের মতো শীর্ষ জেনারেলরা খামেনির ইনার সার্কেলে আলোচনা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে কোনো প্রকার সতর্কবার্তা ছাড়াই আকাশ থেকে নেমে আসে 'বাঙ্কার বাস্টার' মিসাইল। যা কংক্রিটের কয়েক স্তরের সুরক্ষা ভেদ করে মাটির গভীরে গিয়ে বিস্ফোরিত হতে সক্ষম। হামলার মূল কৌশলটি ছিল খামেনিকে প্রথম আঘাতেই নিশ্চিহ্ন করা, যাতে তিনি কোনোভাবেই গোপন সুড়ঙ্গ বা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ না পান।

ইসরায়েলি এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান এবং মার্কিন ড্রোন প্রযুক্তির সমন্বয়ে পরিচালিত এই হামলাটি ইরানের এস-৩০০ রাডার সিস্টেমকে পুরোপুরি অন্ধ করে দিয়েছিল। স্যাটেলাইট চিত্রে পরবর্তীতে দেখা যায়, এক সময়ের সুরক্ষিত সেই প্রাসাদটি স্রেফ ধুলোয় মিশে গেছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, সেখানেই উদ্ধার করা হয়েছে খামেনির নিথর দেহ।

cia 2

খামেনির মৃত্যুর পর তেহরানের রাজপথে শোকার্ত ইরানিরা। ছবি- রয়টার্স

এ সুপরিকল্পিত অভিযানে খামেনির পাশাপাশি তার শীর্ষ সহযোগীদেরও মৃত্যু ঘটে, যা ইরানের কমান্ড চেইনকে এক নিমেষে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে এ অভিযানের কথা জানান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, অত্যন্ত উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে খামেনির অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছিল।

স্যাটেলাইট চিত্রে কম্পাউন্ড ধ্বংস হওয়ার যে চিত্র দেখা গেছে তাতে স্পষ্ট, এটি চলমান কোনো কনভয়ের ওপর আঘাত নয়; বরং একটি স্থির কমান্ড সাইটকে লক্ষ্য করে চালানো আঘাত। সামরিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক’।

তবে অপারেশনের সব খুঁটিনাটি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ঠিক কোন কোন অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, কোন গোয়েন্দা উৎস ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এসব প্রশ্নের উত্তর সাধারণত পরে ফাঁস হয় বা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় না। কিন্তু যেটুকু জানা গেছে, তাতেই স্পষ্ট—এটি ছিল সময়, তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণের নিখুঁত সমন্বয়ে চালানো এক আঘাত।