ইরানের একটি স্কুলে ২৮ ফেব্রুয়ারির ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পেন্টাগনের কিছু কর্মকর্তা জানতে পারেন, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের চালানো। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদন্তে ঘটনাটিকে প্রতিরোধযোগ্য একাধিক ব্যর্থতার ধারাবাহিক ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ওইদিন দুটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের শাজারাহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ও চত্বরে আঘাত হানে। এতে ১৫০ জনের বেশি ইরানি নিহত হন, যাদের মধ্যে অন্তত ১২৩ জনই ছিল শিশু। সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত জমিতে নির্মিত দুইতলা স্কুলটি হামলায় পুরোপুরি ধংস হয়ে যায়। শিশু নিহতের হিসাবে, এটিকে একুশ শতকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী লক্ষ্য নির্ধারণজনিত ভুল বলে উল্লেখ করা যেতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মিনাবের এ হামলা এবং একই দিনে চালানো আরেকটি মার্কিন হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনার মতো যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রকাশ্যে এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে এ ঘটনার জন্য ইরানকেই একরকম দায়ী করেছিলেন। গত ১৪ জুলাইও ফক্স নিউজকে তিনি বলেছিলেন, সেখানে আসলে কী ঘটেছিল, তা কেউ কখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে বলে তিনি মনে করেন না।
তবে পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ তদন্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তারা তদন্তের কিছু প্রাথমিক বিবরণ তুলে ধরেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাটি কোনো একক বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তের ফল ছিল না। বরং ছোট ছোট একাধিক ভুল ও ব্যর্থতা একত্রিত হয়ে সেদিনের এমন বিপর্যয় তৈরি করেছিল। তদন্তে এমন কয়েকটি পর্যায় চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এ হামলা ও বিপুল বেসামরিক প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হতো।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন বলছে, তদন্তের পুরো বিবরণ এখনো গোপন রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তারা কতটা তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন, সে বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্চের শুরুতেই একটি প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় মিনাবের হামলার দায় যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে চলে আসার সম্ভাবনা উঠে আসে। মার্চে শুরু হওয়া পেন্টাগনের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে কর্মকর্তাদের দাবি, কয়েক মাস ধরেই তদন্ত কার্যত শেষ অবস্থায় রয়েছে।
দ্রুত হামলার চাপ
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে ব্যাপক আকাশ হামলার নির্দেশ দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। প্রথম ২৪ ঘণ্টায়ই ইরানের ১ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এত দ্রুত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও অনুমোদনের চাপের কারণে স্বাভাবিক সময়সীমা সংকুচিত হয়ে যায়। এর সঙ্গে লক্ষ্যস্থল সম্পর্কে অসম্পূর্ণ তথ্য, বেসামরিক সুরক্ষায় নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মিলিয়ে প্রাণঘাতী ভুলের পরিবেশ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরানের (এইচআরএ) সংকলিত তথ্য অনুসারে, যুদ্ধের প্রথম ৩৯ দিনে অন্তত ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। দিনে গড়ে ৪৩ জন। পেন্টাগনের কেউ কেউ ইরানি হতাহতের এ সংখ্যাকে সর্বনিম্ন অনুমান বলে মনে করেন।
এইচআরএ-এর উপ-পরিচালক স্কাইলার থম্পসন বলেন, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভূতপূর্ব গতিতে হওয়া হামলার মাঝে কীভাবে এত বেসামরিক মানুষ নিহত হলেন, তা আমাদের প্রশ্ন করা উচিত।
সম্প্রতি ইরানি কর্মকর্তা এবং জাতিসংঘের একটি সংস্থা জানিয়েছে, মিনাবের প্রায় ২০ মাইল দক্ষিণে কুহেস্তাকে গত ১ সেপ্টেম্বরের একটি হামলায় একটি আবাসিক এলাকায় বিয়েবাড়ির ওপর আঘাত হানা হয় এবং এতে অন্তত ৫ জন নিহত ও আরও ডজনখানেক মানুষ আহত হন। যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটি তদন্ত করছে বলে এই মাসের শুরুর দিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন।
পুরনো লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল মিনাব
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে কয়েক দশক ধরে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদরা হাজারো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বা ‘টার্গেট লাইব্রেরি’ সংরক্ষণ করে আসছেন। এসব তালিকায় বিমানঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা, পারমাণবিক স্থাপনা ও বন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে।
কোনো কোনো লক্ষ্যবস্তু বছরের পর বছর তালিকায় থাকার কারণে সেখানে স্যাটেলাইট ছবি, গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও আইনি পর্যালোচনার তথ্য জমা হতে থাকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব তথ্য দ্রুত পুরনো হয়ে যেতে পারে। কোনো ভবন তৈরি বা ভেঙে যেতে পারে, সামরিক সদর দপ্তর স্থান পরিবর্তন করতে পারে এবং পুরনো সামরিক স্থাপনার জায়গায় স্কুল, হাসপাতাল বা মসজিদ গড়ে উঠতে পারে।
তাই লক্ষ্যবস্তুর তালিকা নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি। কিন্তু মিনাবের মতো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কয়েক মাস ধরে নতুন করে যাচাই করা হয়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তাদের মতে, সবচেয়ে সংবেদনশীল কিছু স্থান—যেমন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো (যা ২০২৫ সালের জুনে তেহরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল আক্রমণ করেছিল)—২০২৬ সালের যুদ্ধের আগে মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের তীব্র নজরদারির মুখে ছিল। তারা আরো জানান, মিনাবের মতো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো মাসের পর মাস পুনর্বিবেচনা বা নিবিড় নজরদারি ছাড়াই রয়ে গিয়েছিল।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে সম্পন্ন করার কথা থাকা লক্ষ্যবস্তু যাচাইয়ের কাজ কয়েক দিনের মধ্যে শেষ করতে হয়। এ সময় এক হাজারের বেশি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু পুনর্বিবেচনা ও অনুমোদন করতে হয়েছিল।
গোয়েন্দা তথ্যে অতিরিক্ত আস্থা
মিনাবের লক্ষ্যবস্তুতে প্রথম টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রটি আরব সাগরে অবস্থানরত একটি জাহাজ থেকে উৎক্ষেপণের সময় পর্যন্ত ‘কিল চেইন’-এর সঙ্গে প্রায় ৩৬ জন যুক্ত ছিলেন। তাদের বেশিরভাগই ইরানের যুদ্ধ নিয়ে কাজ করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার টাম্পার ৭ হাজার মাইলেরও বেশি দূরের নিরাপদ স্থাপনায় বসে।
সাধারণত, তাদের কাজের একটি অংশ ছিল স্যাটেলাইট চিত্র এবং মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তালিকা পরিমার্জন করা, যা নির্দিষ্ট স্থানে মানুষের চলাচল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের 'প্যাটার্ন অব লাইফ' বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। তদন্তে জড়িত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রায় আধা শতাব্দী ধরে ইরানে—বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণে—এ ধরনের গোয়েন্দা তথ্য অত্যন্ত সীমিত ছিল।
কিল চেইনের অন্য ধাপগুলোয় অন্য ধরনের সমস্যা সমাধান করা হয়। আইনজীবীরা মূল্যায়ন করেন প্রস্তাবিত প্রতিটি লক্ষ্যবস্তু আইনি সামরিক উদ্দেশ্য কিনা। বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য আনুষঙ্গিক ক্ষতির হিসাব করেন। অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা কোন ক্ষেপণাস্ত্র কখন নিক্ষেপ করা হবে তা নিয়ে আলোচনা করেন। এই প্রতিটি ধাপের একটি রেকর্ড বা নথি থাকে। বিশ্লেষকরা শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে স্বাক্ষর করেন। কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোর নির্দেশ দেয়া থাকে।
এরপর জ্যেষ্ঠ কমান্ডারের পক্ষ থেকে একগুচ্ছ প্রশ্ন করা হয়, যেমন- লক্ষ্যবস্তুটি কি আইনিভাবে বৈধ? পর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য কি আছে? এবং বেসামরিক ক্ষতি কমানোর জন্য কি উপযুক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে? তদন্তে জড়িত কর্মকর্তাদের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারির ভোরের দিকে মিনাব সাইট সংক্রান্ত প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরই ছিল 'হ্যাঁ'।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পুরো ‘কিল চেইন’জুড়েই মিনাবের স্থাপনাটিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আস্থা ছিল।
এক পেন্টাগন কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতিকে বড় কোনো সমস্যা হিসেবে দেখা হয়নি। মিনাবের ঘটনা দেখিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত নয়।
আগেও ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলার নজির রয়েছে
মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রধান গোয়েন্দা ডেটাবেসে বিভিন্ন ঘাটতির কথা সরকারি গবেষক ও নিরীক্ষকরা আগেও জানিয়েছেন। এ ধরনের ভুল গোয়েন্দা তথ্যের কারণে মার্কিন অস্ত্র ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার ঘটনাও নতুন নয়।
১৯৯৯ সালে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে চীনা দূতাবাসে ভুলবশত মার্কিন হামলায় তিনজন নিহত ও ২৭ জন আহত হন। ২০১৫ সালে আফগানিস্তানের কুন্দুজে ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের একটি হাসপাতালে ভুল হামলায় ৪২ জন নিহত হন। এর পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইয়েমেনের রাস ইসা বন্দরে হামলায় অন্তত ৮০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
হামলার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
মিনাবের শাজারাহ তাইয়েবেহ স্কুলের নিহত শিশুরা হামলার পর ইরানে একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাদের ছবি বিভিন্ন স্মৃতিসৌধে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিহতদের কয়েকটি পরিবারের অভিযোগ, আহত শিশুরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে না। অন্যদিকে সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন, ইরানি কর্মকর্তারা রাজনৈতিক সুবিধা নিতে স্কুলে হামলার ঘটনাটিকে ব্যবহার করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটনাটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা হামলাটি কীভাবে ঘটল, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য জ্যাক রিড অভিযোগ করেছেন, পেন্টাগন ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্তের ফল গোপন রাখছে। একই কমিটির রিপাবলিকান সদস্য থম টিলিসও কী ভুল হয়েছিল, তা জানতে কংগ্রেসকে ব্রিফ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থালও তদন্তের তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, প্রশাসনের কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত ছিল; অথচ কয়েক মাস পরও তদন্তের ফল প্রকাশ করা হয়নি। তিনি ঘটনাটিকে ‘ক্ষমার অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন।















