এক সময় সৌদি আরবে নারী শিল্পীর মঞ্চে দাঁড়ানো ছিল কল্পনার মতো। কিন্তু এখন, সেই মরুভূমির দেশেই একদল তরুণী রক গিটারের ঝড় তুলছে, বদলে দিচ্ছে দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়। ‘সীরা’ সৌদি আরবের প্রথম অল-ফিমেল সাইকেডেলিক রক ব্যান্ড, যাদের সুরে মিশে আছে মরুর নিঃশব্দ হাওয়া, প্রাচ্য সংগীতের ধ্বনি, আর বিদ্রোহের সাহসী উচ্চারণ।
রিয়াদভিত্তিক এই চার সদস্যের ব্যান্ডে রয়েছেন— গিটারিস্ট হায়া, মুখোশধারী ড্রামার থিং, বেস গিটারিস্ট মীশ এবং ভোকাল ও কিবোর্ডে তার বোন নোরা।
জন্ম: ইন্সটাগ্রাম মেসেজ থেকে রক ব্যান্ড
২০২২ সালের একদিন, গিটারিস্ট হায়া ইন্সটাগ্রামে বার্তা পাঠালেন মীশকে, জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি কি অ্যালটন গুন-এর অ্যালবাম পছন্দ করেন? মীশ এর উত্তরে ছিল “হ্যাঁ”। হায়া তাকে জ্যাম সেশনে আমন্ত্রণ জানান, সেই জ্যাম সেশনে মীশ নিয়ে এলেন তার বোন নোরাকে এবং প্রথম দেখাতেই তিনজনের মধ্যে গড়ে উঠে দারুণ এক বোঝাপোড়া। কিছুদিন পর আল-মাশতালের এক অনুষ্ঠানে পরিচয় হলো রহস্যময় মুখোশধারী থিং–এর সঙ্গে। আশ্চর্যজনক ভাবে থিং সেদিন গিটার বাজাচ্ছিলেন। পরে তারা থিং এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এভাবেই চার নারীর, চার ভিন্ন গল্প মিলে তৈরি হয় ‘সীরা’।
সীরা: নামের মানেই এক যাত্রার গল্প
‘সীরা’ শব্দটি গল্প ও যাত্রার প্রতীক। ব্যান্ডের নামের পেছনের দর্শনটিও ঠিক তেমনি। প্রথম দিকে ‘ক্যামেল ফাংক’ (CamelPhunk’) ও ‘ম্যানকৌশ’ (Mankoush) এর মতো নাম মাথায় থাকলেও যেহেতু আরবি নামই তাদের প্রথম পছন্দ ছিল তাই শেষ পর্যন্ত ‘সীরা’ নামটাই ঠিক করেছিলেন।
সিননয়েজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যান্ডের নাম নিয়ে হায়া বলেছিলেন, ‘সীরা’ গল্প ও যাত্রার প্রতীক। এটি মূলত এই সময়ে আমাদের গল্পগুলো একত্রিত হওয়ার একটি যাত্রা।
নোরা যোগ করেন, এটা শুধু আমাদের গল্প নয়, সবার গল্প। এমন সব অভিজ্ঞতা নিয়ে গান করি, যা সবাই বুঝতে পারে, তাই শ্রোতারা নিজেদেরও খুঁজে পায় আমাদের সুরে।
প্রথম মঞ্চে উচ্ছ্বাস
২০২৩ সালের ৪ মে রিয়াদের দ্য ওয়্যারহাউস মঞ্চে প্রথমবারের মতো লাইভ পারফর্ম করে সীরা। দর্শকসংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়ে যায় যা ওই ভেন্যুতে কোনো অনুষ্ঠানে এত বেশি জনসমাগমের রেকর্ড। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে পরের বছর মে’র মধ্যে তারা লিখেছিেন ১৩টি মৌলিক গান। হায়ার আরবি সাইকেডেলিক টোন, নোরার জ্যাজ-ব্লুজের ছোঁয়া, মীশ এর ফাঙ্ক আর থিং-এর মুক্তছন্দ—সব মিলিয়ে তাদের গান হয়ে ওঠে এক বর্ণিল ক্যানভাস।
নারী হয়ে রক বাজানোর সংগ্রাম
সৌদি সমাজে নারী হয়ে রক ব্যান্ড গড়ে তোলা মোটেও সহজ ছিল না। একসময় এ স্বপ্ন অসম্ভব মনে হতো সীরার। সমাজের প্রশ্ন, বিদ্রূপ, নিষেধ— সবকিছুর ভেতর দিয়েই তারা তৈরি করেছে নিজেদের জগৎ। আজ একই সমাজের মানুষ হাততালি দেয়, ভালোবাসা পাঠায়। আজ সমালোচনার শব্দ মিশে গেছে প্রশংসার কোলাহলে।
তারা জানে, প্রতিটি বাজনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে। যখন কেউ বলে—‘নারী কেন রক বাজাবে?’ তখনই তারা আরো জোরে ছুঁয়ে দেয় তারের সুর, যেন উত্তর দেয় গানে, ছন্দে, আত্মবিশ্বাসে।
তাদের শক্তি নারী হওয়াতেই। তারা শিখেছে, প্রতিবন্ধকতাই প্রেরণা হতে পারে। এখন তাদের লক্ষ্য আরো স্পষ্ট, হয়ে উঠতে চান সেই রোল মডেল, যার অভাব একসময় তারা নিজেরাই অনুভব করেছিলেন। এই চার নারী যেন আজ এক সঙ্গীত বিপ্লবের প্রতীক, যেখানে রকের গর্জনে মিশে আছে নারীর সাহস, স্বপ্ন আর মুক্তির গল্প।
সৌদি রকের আন্তর্জাতিক মাইলফলক
২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর তারিখটি সীরার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। লন্ডনের সাউথব্যাংক সেন্টারের কুইন এলিজাবেথ হলের মঞ্চে সীরা বাজাল তাদের আত্মার সুর, বিশ্বমঞ্চে পরিচয় করিয়ে দিল সৌদি নারীদের নতুন পরিচয়। এই কনসার্টে সীরা তাদের আসন্ন অ্যালবাম ‘ইপি সারাব’ (EP Sarab) এর গান পরিবেশন করে। যা বিবিসি ইন্ট্রুডিউসিং লাইভ মিউজিক প্রোগ্রামের অংশ ছিল। এর আগে তারা প্রথম ইউরোপ ট্যুরে জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডেও পারফর্ম করেছে। লন্ডনে পারফর্ম করা তাদের কাছে কেবল একটি শো নয়—এটি ছিল এক প্রতীকী অর্জন। কারণ সৌদি আরবের ইতিহাসে তারা প্রথম এমন একটি অল-উইমেন রক ব্যান্ড, যারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে এইভাবে আত্মপ্রকাশ করল।
সংস্কৃতির গর্ব ও সুরের ঐতিহ্য
সীরার গান শুধু বিনোদন নয়, পরিবর্তনের গল্পও। তারা সৌদির নারীদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছে। তারা গর্বের সঙ্গে গায় আরবিতে। মঞ্চে পারফর্ম করার সময় থিং পরে থাকেন ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন মাথার আচ্ছাদন, যেখানে হাতে এমব্রয়ডারি করা নকশা ও রূপার অলংকার ঝুলে থাকে। মঞ্চে এক অনন্য মিশ্রণ তৈরি হয় আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের।
গানের ভেতরে গল্প
প্রতিটি গান যেন একেকটি গল্প। রাত ও দিন, আলো ও অন্ধকারের মেলবন্ধন— এই দ্বৈততা সীরার মূল থিম। ‘আর্ক’ (Ark) গানটি শৈশবের স্মৃতি নিয়ে, ‘শামস’ (Shams) প্রতিকূলতা জয়ের প্রতীক। আর ‘আখির সারকা’ (Akhir Sarkha) যার অর্থ শেষ চিৎকার–এ ব্যবহৃত হয়েছে বিলুপ্ত প্রাণীর শব্দ, ‘আর্থ সনিক’ (Earth Sonic) একটি বৈশ্বিক প্রকল্পের অংশ, যেখানে সংগীত, বিজ্ঞান ও আদিবাসী সংস্কৃতির মাধ্যমে বলা হয় জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প। ‘যেমেন’ (Zemen) গানটি গাওয়া হয়েছে আরব সংগীতের বিশেষ স্কেল ‘সাবা’ (Saba)–তে, যা ক্ষুদ্র স্বরভিত্তিক স্কেল। গানটি একদিকে বিষণ্ণতা, অন্যদিকে তিক্ত-মিষ্টি আবেগ থেকে উদ্ভূত যা মধ্য সৌদি আরবের নাজদ অঞ্চলের জন্য নির্দিষ্ট একটি বাতাসকেও নির্দেশ করে।
সম্প্রতি দ্য ন্যাশনাল-কে নোরা জানান, এই গানের কথা অনুপ্রাণিত তার মায়ের কাছ থেকে, ‘আমার মা শেখান জীবনটাকে পুরোপুরি উপভোগ করতে, নিজেকে ভালো রাখতে—এই বার্তাই আমরা দেই।’
আগামীর যাত্রা
তাদের নতুন অ্যালবাম ‘ইপি সারাব’ যার অর্থ মরীচিকা প্রকাশ পাবে আগামী মাসে। তারা পরিকল্পনা করছে আগামী বছর যুক্তরাজ্যের বড় শহরগুলোতে পারফর্ম করার।
সীরা শুধু একটি ব্যান্ড নয়, সীরা এক বিপ্লবের নাম। সৌদি আরবের নারীদের সংগীত স্বাধীনতার প্রতীক। তাদের সুরে মিশে আছে বিদ্রোহ, আত্মবিশ্বাস, আর অজানা পথে হাঁটার সাহস। এই চার নারী যেন একসঙ্গে লিখছেন এক নতুন অধ্যায়, যেখানে রক সুরে ধ্বনিত হচ্ছে নারীর নিজস্ব গল্প।





