সময় কি বৃত্তাকার? আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ আগে, ১৯২৭ সালের কোনো এক সময়ে জার্মান নির্মাতা ফ্রিৎস লাং যখন তার ক্যামেরার লেন্সে ২০২৬ সালের পৃথিবীকে আঁকছিলেন, তিনি কি জানতেন সেই কল্পনা আর আজকের বাস্তবতার রেখাগুলো এভাবে মিলে যাবে? আজ ২০২৬ সালের এক অলস দুপুরে জানালার বাইরে ঝকঝকে আকাশচুম্বী দালানগুলোর দিকে তাকিয়ে কোনো সাই-ফাই প্রেমীর মনে পড়তেই পারে সেই কালজয়ী সিনেমা 'মেট্রোপলিস'-এর কথা। উঁকি দিতে পারে প্রশ্ন— এক শতাব্দী পেরিয়ে আমরা কি তবে সেই কল্পিত ভবিষ্যৎকেই বর্তমান হিসেবে বরণ করে নিলাম?

এই কল্পনা যখন সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি হয়েছে সে সময়টা ১৯২৭ সাল। ফ্রিৎস লাং পর্দায় আনলেন তার কালজয়ী নির্বাক চলচ্চিত্র ‘মেট্রোপলিস’, তখন ২০২৬ সালকে মনে হয়েছিল এক সুদূর কল্পনা। আজ আমরা সেই ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডারের পাতায় দাঁড়িয়ে। মেট্রোপলিস আমাদের দেখিয়েছিল এক বিভক্ত শহর। উপরে আকাশছোঁয়া অট্টালিকায় বাস করে পুঁজিপতি আর অভিজাত শ্রেণী, আর নিচে মাটির গভীরে অতিকায় সব যন্ত্রের চাকা সচল রাখতে দিনরাত ঘাম ঝরিয়ে চলেছেন একদল অবহেলিত শ্রমিক। লাং-এর সেই কল্পনা আজ ২০২৬-এ এসে আমাদের চারপাশের করপোরেট দুনিয়া আর এআই বিপ্লবের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।

metropolis stracture

মেট্রোপলিস-এ সামাজিক স্তরবিন্যাসের নমুনা। ছবি- হার্ভার্ড ফিল্ম আর্কাইভ

আমরা আজ রোবোটিক্স আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বর্ণযুগে দাঁড়িয়ে। মেট্রোপলিসের সেই রোবট মারিয়া ছিল মানুষের ছদ্মবেশে এক ধ্বংসাত্মক শক্তি। আজ ২০২৬-এ আমাদের চারপাশের হিউম্যানয়েড রোবট বা এআই-চালিত যন্ত্রগুলো হয়তো শহর ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে না। কিন্তু তারা নিঃশব্দে বদলে দিচ্ছে আমাদের কর্মসংস্থানের চেনা মানচিত্র। সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, লাং দেখিয়েছিলেন প্রযুক্তি সচল রাখতে দরকার কায়িক শ্রম; আর আজ আমরা দেখছি উচ্চ প্রযুক্তির আড়ালে সেই সস্তা শ্রমের শোষণই রয়ে গেছে অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে। বড় বড় টেক জায়ান্টরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুদবুদ তৈরি করছে, তখন পর্দার আড়ালে উন্নয়নশীল দেশের হাজার হাজার মানুষ নামমাত্র মূল্যে সেই তথ্য বা ডেটা প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করে চলেছেন—যেন এক আধুনিক 'আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি'।

সিনেমার নায়ক ফ্রেডার যখন অভিজাত ঘরের সন্তান হয়েও শ্রমিকের কষ্টের ভাগ নিতে নিচে নেমেছিলেন, তখন তিনি চেয়েছিলেন দুই পৃথিবীর মধ্যে একটি সেতুবন্ধন। মেট্রোপলিসের শেষ দৃশ্যে শ্রম আর মেধার মধ্যে ভালোবাসার যে মিলন ঘটেছিল, বর্তমানের এই জটিল রাজনীতি আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের যুগে তা আজ চরম অবাস্তব মনে হয়। আজ ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি বিলিয়নিয়ার বা ধনকুবেরদের প্রভাব আকাশচুম্বী, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে তাদের এগিয়ে আসার সেই ‘মেট্রোপলিসীয়’ মানবিকতা আজ অনেকটাই দুর্লভ।

metropolis 2

মেট্রোপলিসে মাটির গভীরে যন্ত্র চালু রাখতে দিনরাত ঘাম ঝরায় অবহেলিত শ্রমিকেরা। ছবি- ব্রিটানিকা

ফ্রিৎস লাং-এর সেই চলচ্চিত্রে রোবট ছিল, ছিল অন্ধকার গুহায় খাটুনি আর ঝকঝকে সব অট্টালিকা। ২০২৬-এর আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে সেই প্রযুক্তি বা স্থাপত্যগুলো আমাদের কাছে মোটেও অবিশ্বাস্য নয়। বরং যা অবিশ্বাস্য মনে হয়, তা হলো সেই চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান।

মেট্রোপলিস সিনেমার শেষে ছিল শক্তিশালী এক বার্তা—'মস্তিষ্ক এবং হাতের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হওয়া উচিত হৃদয়ের'। আজ ২০২৬-এ আমাদের হাতে মস্তিষ্করূপে আছে অঢেল প্রযুক্তি, আর আছে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া শ্রমিকের হাত বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু অভাব শুধু সেই 'হৃদয়' বা মানবিক সদিচ্ছার। লাং-এর রোবট মারিয়া আজ আমাদের ঘরে ঘরে এআই হয়ে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু বৈষম্যহীন সেই ভালোবাসার সেতুবন্ধনটি আজও নিখোঁজ। হয়তো পৃথিবীটা এমনই—প্রযুক্তি এগোয় আলোর গতিতে, আর মানবতা এগোয় কচ্ছপ গতিতে।

কল্পনা করুন, ২০২৬ সালের এই মেগাসিটির নিওন আলো আর ড্রোনের গুঞ্জনের নিচে চাপা পড়ে আছে সেই প্রাচীন শোষণ। উপরে ধনকুবেরদের স্পেস-ট্যুরিজমের পরিকল্পনা, আর নিচে সস্তা শ্রমের কারখানায় ঘাম ঝরানো মানুষ—মেট্রোপলিস যেন কোনো সিনেমা নয়, বরং এক শতবর্ষী ভবিষ্যৎবাণী। লাং আমাদের রোবট মারিয়াকে দিয়ে সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু আমরা রোবটকে আপন করে নিলেও তার পেছনের সেই সতর্কবার্তাকে ভুলে গেছি। ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে আজ মনে হয়, আমরা আসলে একবিংশ শতাব্দীতে বাস করছি না, আমরা বাস করছি ফ্রিৎস লাং-এর সেই অদ্ভুত বিষণ্ণ অথচ জাদুকরী সেলুলয়েড ফ্রেমে।