কিছু ভ্রমণ থাকে যেগুলো কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গা পরিভ্রমণ নয়, হয়ে ওঠে দীর্ঘ অনুভূতির নাম। গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই এর গল্প শুরু হয়, আর ফিরে আসার পরও তার রেশ রয়ে যায় মনের কোণে। চীনের গুয়াংজু শহরে অবস্থিত বাওমো গার্ডেন আমার জন্য তেমনই এক অভিজ্ঞতা।

২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল, গন্তব্য চীনের গুয়াংজু। উদ্দেশ্য বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য মেলা ক্যান্টন ফেয়ারে অংশগ্রহণ। কিন্তু সে যাত্রার শুরুটা ছিল অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা আর দৌড়ঝাঁপে ভরা।

সেদিন ঢাকার আকাশ ভেঙে সকাল থেকেই নেমেছিল অবিরাম বৃষ্টি। তার সঙ্গে অসহনীয় যানজট। যে পথ সাধারণ দিনে এক ঘণ্টারও কম সময়ে পার হওয়া যায়, সেদিন পথটুকু পাড়ি দিতে লেগেছিল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। গাড়ির ভেতর বসে সময়ের কাঁটা যত এগোচ্ছিল, ততই বাড়ছিল উদ্বেগ। মনে হচ্ছিল, এত দিনের প্রস্তুতি, এত স্বপ্ন সবকিছু হয়তো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই থেমে যাবে। একপর্যায়ে আর অপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না। এক্সপ্রেসওয়ের মাঝপথে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। হাতে ব্যাগ, কাঁধে লাগেজ। বৃষ্টিভেজা পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। চারপাশে অসংখ্য মানুষের ব্যস্ততা, গাড়ির হর্ন আর বৃষ্টির শব্দের মধ্যে কখনো দ্রুত হেঁটে, কখনো প্রায় দৌড়ে নিজের গন্তব্যের দিকেই ছুটছিলাম।

অবশেষে বিমানবন্দরে পৌঁছে যখন চেক ইন কাউন্টারের সামনে দাঁড়ালাম, নির্ধারিত সময় পেরোতে বাকি মাত্র কয়েক মিনিট। সে মুহূর্তের স্বস্তি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বিমানে বসে প্রথমবারের মতো মনে হলো, হ্যাঁ, যাত্রা সত্যিই শুরু হয়েছে।

গুয়াংজুর বাইয়ুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে রাতের আলোয় ঝলমলে শহরটিকে প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছিল, আমি যেন অন্য এক পৃথিবীতে এসে দাঁড়িয়েছি। পরদিন শুরু হলো ক্যান্টন ফেয়ারের ব্যস্ততা। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ী, নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন আর সম্ভাবনার এক বিশাল মিলনমেলা। কয়েকদিন কেটে গেল কাজের মধ্যেই।

WhatsApp Image 2026-06-22 at 4.57.41 PM

তবে ভ্রমণের প্রতি আমার দুর্বলতা বরাবরের। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার ফাঁকেও শহরটাকে একটু একটু করে দেখার চেষ্টা করছিলাম। কখনো ক্যান্টন টাওয়ারের দিকে হাঁটতাম, কখনো মেট্রোতে চড়ে নতুন কোনো এলাকায় চলে যেতাম। এমনই এক সন্ধ্যায় ইন্টারনেটে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে চোখে পড়ল একটি নাম ‘বাওমো গার্ডেন’।

ছবি দেখেই থমকে গেলাম। এ যেন কোনো বাগান নয়, প্রাচীন চীনা শিল্পকর্মের ভেতরে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত স্বপ্নরাজ্য। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, যেতেই হবে।

২৩ এপ্রিল, খুব ভোরে বেরিয়ে পড়লাম। সামনে দীর্ঘ পথ। কিন্তু সে পথের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উপভোগ্য। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল দৃশ্যপট। আধুনিক নগর জীবনের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে আসছিল সবুজ, শান্ত আর নান্দনিক এক পরিবেশ। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পৌঁছালাম বাওমো গার্ডেনে। প্রবেশপথ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, সময়ের সীমানা অতিক্রম করে অন্য এক যুগে চলে এসেছি। চোখের সামনে ভেসে উঠল ইতিহাস, শিল্প আর প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয়।

WhatsApp Image 2026-06-22 at 4.57.42 PM

প্রথমেই দৃষ্টি আটকে গেল ‘অ্যালোং দ্য রিভার ডিউরিং দ্য চিংমিং ফেস্টিভাল’ নামের বিশাল পোর্সেলিন রিলিফে। বিশ্বের বৃহত্তম পোর্সেলিন রিলিফগুলোর একটি এ শিল্পকর্ম গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে নিয়েছে। বিশাল সে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, যেন শত শত বছর আগের চীনের জীবনযাত্রা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নদীর তীরে ব্যস্ত জনপদ, বাজার, নৌকা আর মানুষের চলাচল সবকিছু নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিছুক্ষণ আমি ক্যামেরা তুলতেই ভুলে গিয়েছিলাম। শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।

একসময় ক্যামেরা হাতে তুলে নিলাম। শাটারের প্রতিটি ক্লিক যেন সেই বিস্ময়ের কিছুটা অংশ ধরে রাখার চেষ্টা। এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম বাগানের গভীরে।

হাঁটতে হাঁটতে জানতে পারলাম, বাওমো গার্ডেনের ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে, ১৬৭৮ সালে চীনের চিং রাজবংশের সময় এ উদ্যান নির্মিত হয়। কিংবদন্তিতুল্য ন্যায়পরায়ণ বিচারক বাও ঝেং বা বাও গং’র স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে স্থানীয়রা এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সময়ের প্রবাহে বাগানটি হারিয়ে গেলেও ১৯৯৫ সালে পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে এটি আবার নতুন জীবন ফিরে পায়। আজকের বাওমো গার্ডেন তাই শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং চীনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার এক জীবন্ত দলিল।

WhatsApp Image 2026-06-22 at 4.57.43 PM

সামনে একের পর এক পাথরের সেতু, লাল রঙের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, শান্ত জলরাশি আর নিখুঁতভাবে সাজানো উদ্যান। কোথাও পানির ওপর ভেসে আছে স্থাপত্যের প্রতিচ্ছবি, কোথাও হাজারো রঙিন কোই মাছ জলের নিচে নীরব নৃত্য করে বেড়াচ্ছে। একটি জলাশয়ের ধারে দাঁড়াতেই শত শত কোই মাছ আমার দিকে এগিয়ে এলো। তাদের রঙিন শরীর জলের ওপর ভেসে উঠতেই পুরো জলরাশি জীবন্ত হয়ে ওঠে! এমন দৃশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি।

বাওমো গার্ডেনের প্রতিটি স্থাপনা যেন কোনো শিল্পীর নিখুঁত তুলির আঁচড়। বাঁকানো ছাদের প্যাভিলিয়ন, সূক্ষ্ম কারুকাজে ভরা করিডর, পাথরের সেতু আর স্বচ্ছ পানির জলাশয় সবকিছু মিলে মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো প্রাচীন চীনা চিত্রকর্মের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। মাঝে মাঝে থেমে শুধু চারপাশটা দেখছিলাম। ক্যামেরা দিয়ে সবকিছু ধরা সম্ভব, কিন্তু সে অনুভূতিকে বন্দী করা সম্ভব নয়।

WhatsApp Image 2026-06-22 at 4.57.44 PM

একজন ফটোগ্রাফারের জন্য এটি নিঃসন্দেহে স্বপ্নের স্থান। আলো, ছায়া, স্থাপত্য, জল আর প্রকৃতির এমন সমন্বয় খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। প্রতিটি মোড়ে নতুন একটি ফ্রেম অপেক্ষা করছিল। কখনো সেতুর ওপরে দাঁড়িয়ে, কখনো জলাশয়ের ধারে বসে, কখনো দূরের কোনো প্যাভিলিয়নকে কেন্দ্র করে একের পর এক ছবি তুলছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমার ক্যামেরার মেমোরি কার্ডের চেয়ে দ্রুত ভরে উঠছে আমার স্মৃতির ভাণ্ডার।

সেদিন বিকেলের দিকে যখন ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন একবার পিছনে ফিরে তাকালাম। দূরে শান্ত জলরাশির বুকে ভেসে আছে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের প্রতিচ্ছবি। বাতাসে হালকা নীরবতা। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব সৌন্দর্য হয়তো বড় নয়; কিছু সৌন্দর্য নিঃশব্দে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। বাওমো গার্ডেন আমার কাছে তেমনই একটি স্থান।