১৭৭০ সালের ৫ মার্চ, সন্ধ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন শহর। তুষারে ঢাকা পুরো শহরের রাস্তা। কাস্টমস হাউস পাহারা দিচ্ছেন এক ব্রিটিশ সৈনিক। প্রচণ্ড ঠান্ডায় তার নিঃশ্বাস যেন সাদা বাষ্প হয়ে বের হচ্ছিল।

এমন সময় অন্ধকারের মধ্য থেকে এক কিশোর বেরিয়ে এসে ওই সেনা সদস্যকে উত্যক্ত করতে শুরু করে। শুধু উত্যক্ত নয়, তাকে লক্ষ্য করে ছুড়তে থাকে বরফ খণ্ড। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সঙ্গে যোগ দেয় আরো কয়েকজন। ধীরে ধীরে সেখানে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।

ওই সৈনিককে সহায়তা করতে আরো কয়েকজন ব্রিটিশ সৈনিক সেখানে এলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জনতা তাদের দিকে ঝিনুকের খোলস, কয়লা ও বরফের টুকরা ছুড়তে থাকে। পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ। এক পর্যায়ে সৈনিকরা গুলি চালালে সেখানে প্রাণ হারান তিনজন। এছাড়া আরো দুজন গুরুতর আহত হন, যারা পরে মারা যান।

ব্রিটেনে ঘটনাটি পরবর্তীতে ‘কিং স্ট্রিটের ঘটনা’ নামে পরিচিতি পায়। তবে স্থানীয়ভাবে এ ঘটনাকে সবাই চেনেন ‘বোস্টন হত্যাকাণ্ড’ নামে। এ ঘটনা পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে আমেরিকার স্বাধীনতার আন্দোলনের অন্যতম অনুঘটক।

হত্যাকাণ্ডের তিন সপ্তাহ পর শিল্পী পল রেভিয়ারের তৈরি একটি তাম্রফলক খোদাইচিত্র বোস্টনের সংবাদপত্রে বিক্রির জন্য প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল ‘দ্য ব্লাডি ম্যাসাকার পারপেট্রেটেড ইন কিং স্ট্রিট, বোস্টন অন মার্চ ৫, ১৭৭০, বাই আ পার্টি অব দ্য ২৯থ রেজিমেন্ট’।

চিত্রটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকা কয়েকজন দেশপ্রেমিক এবং তাদের দিকে গুলি চালানো হাস্যোজ্জ্বল ব্রিটিশ সৈনিকদের দেখানো হয়। রক্তাক্ত এ দৃশ্য ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব আরো তীব্র করে তোলে এবং বিদ্রোহের আগুন চারপাশে বহুগুণ ছড়িয়ে দেয়।

মিডওয়েস্টার্ন স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রদর্শনীর সহ-কিউরেটর মেরি ড্রেপার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসিকে বলেন, ব্রিটিশ সেনা সদস্যদের একটি সুশৃঙ্খল সারিতে দাঁড় করিয়ে এবং নিরস্ত্র উপনিবেশবাসীদের বিশৃঙ্খল অবস্থায় দেখিয়ে কে অপরাধী আর কে ভুক্তভোগী—সে বিষয়ে একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছিলেন রেভিয়ার। এটি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে উপনিবেশবাসীদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল।

চিত্রটিতে ঘটনার জন্য কারা দায়ী, সে বিষয়েও ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল। এতে ব্রিটিশ সৈনিকদের মাথার ওপর ‘বুচারস হল’ লেখা একটি সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। অন্যদিকে উপনিবেশবাসীদের মাঝে রয়েছে একটি কুকুর, যা আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

নিউইয়র্কের দ্য মেট ফিফথ অ্যাভিনিউর ‘রেভল্যুশন’ প্রদর্শনীর সহ-কিউরেটর কনস্ট্যান্স ম্যাকফি বিবিসিকে বলেন, চিত্রকর্মে নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর সৈনিকদের গুলি আর হত্যার ঘটনা এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করা।

চিত্রটি প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এ প্রদর্শনীতে এমন সব শিল্পকর্ম একত্র করা হয়েছে, যেগুলো আমেরিকান বিপ্লবের সূচনা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ধারণা দেয়।

ম্যাকফির মতে, চিত্রটি এমন একটি বার্তা দেয় যে ব্রিটিশরা আর বন্ধুত্বপূর্ণ, অভিভাবকসুলভ শক্তি নয়, বরং একটি নিপীড়ক শক্তি। এর মাধ্যমে মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

সে সময়ে যারা পড়তে পারতেন, তাদের জন্য ছবির নিচে রেভিয়ারের লেখা ছিল আরো সরাসরি। সেখানে ব্রিটিশদের ‘হিংস্র বর্বর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে ‘খুনে বিদ্বেষ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। নিহতদের নামের নিচে লেখা হয়, দেশপ্রেমিকদের উচিত ‘নিহতদের করুণ আত্মাকে শান্ত করা’।

ইতিহাসবিদ স্টিভেন এল ড্যানভার ২০২২ সালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লিখেছেন, রেভিয়ারের এ খোদাইচিত্র ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে উপনিবেশবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একই সঙ্গে এটি তাদের একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং স্বাধীনতার দাবিতে জরুরিতার অনুভূতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।

ছবিটি প্রকাশের সময়টিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ সেনাদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই একের পর এক কর আরোপ—এসব কারণে আমেরিকান উপনিবেশবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছিল। এসব করের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের জাতীয় ঋণের বোঝাও পরোক্ষভাবে আমেরিকানদের ওপর চাপানো হচ্ছিল।

আর সেই কাস্টমস হাউসের সামনেই ঘটনাটি ঘটে, যে ভবনটি অন্যায্য করব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ফলে ঘটনাটিকে কাজে লাগানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি রেভিয়ার।

রেভিয়ার ছিলেন দেশপ্রেমিক প্রতিরোধ গোষ্ঠী সন্স অব লিবার্টির সদস্য। ১৭৭৫ সালের তথাকথিত মিডনাইট রাইডের জন্য পরে তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা পান। ওই রাতে ব্রিটিশ সেনাদের অগ্রযাত্রার খবর দিয়ে দেশপ্রেমিকদের সতর্ক করতে তিনি ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্য এ কাজে তিনি একা ছিলেন না, আরো কয়েকজনও একইভাবে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন।

বোস্টন হত্যাকাণ্ডকে কাজে লাগিয়ে সন্স অব লিবার্টির আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন বাড়াতে চেয়েছিলেন রেভিয়ার। উত্তেজনা ও জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তিনি দ্রুত নিজের খোদাইচিত্রটি বাজারে আনেন।

তবে এ কাজে তিনি শিল্পী হেনরি পেলহামের তৈরি ঘটনাটির একটি স্কেচ ব্যবহার করেছিলেন। রেভিয়ার পেলহামকে কোনো কৃতিত্ব বা পারিশ্রমিক দেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পেলহাম তাকে একটি চিঠি লিখে তার কর্মকাণ্ডের নিন্দা করেন।

চিত্রটির প্রভাবের পেছনে এর বিরলতাও ভূমিকা রেখেছিল। ম্যাকফির ভাষ্য, এটি ছিল সে সময়ের আমেরিকান কোনো শিল্পীর তৈরি হাতে গোনা কয়েকটি মুদ্রণের একটি। একই সঙ্গে এটি দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, যা থেকে বোঝা যায় মানুষ এটিকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল।

তার মতে, ওই সময়ে এত বিপুলসংখ্যক কপি তৈরি হয়েছিল—এমন আর কোনো কাজের নজির ছিল না। হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি চিত্রটি মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভও তৈরি করেছিল।

চিত্রটির বড় আকারের পোস্টার দোকান ও সরাইখানায় প্রদর্শন করা হতো। আবার সন্স অব লিবার্টির জন্য অর্থ সংগ্রহেও এগুলো বিক্রি করা হতো। একসময় গোপনে কাজ করা এ সংগঠনের সদস্যসংখ্যা বাড়তে থাকে এবং এটি দেশপ্রেমিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়।

এদিকে চিত্রটির নকল সংস্করণও ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে জোনাথন মুলিকেনের তৈরি একটি সংস্করণও ছিল। অর্থাৎ রেভিয়ার যে কৌশল ব্যবহার করে অন্যের কাজ নিজের নামে চালিয়েছিলেন, একপর্যায়ে তিনিও তার স্বাদ পান। তবে নকল সংস্করণগুলোও ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধের আহ্বানই জোরালো করেছিল।

রেভিয়ারের খোদাইচিত্রটি ১৭৭০ সালে প্রকাশিত ‘অ্যা শর্ট ন্যারেটিভ অব দ্য হরিড ম্যাসাকার ইন বোস্টন’ শীর্ষক পুস্তিকার প্রচ্ছদচিত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। পরে পুস্তিকাটি এবং চিত্রটির বিভিন্ন সংস্করণ লন্ডনেও ছাপা হয়। ফলে হাজার হাজার মাইল দূরে ব্রিটেনের নিজ ভূখণ্ডেও বোস্টন হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা ও অন্যায়ের চিত্র পৌঁছে যায়।

তবে চিত্রটিতে অনেক অতিরঞ্জন ও অসত্য তথ্যও ছিল। ঘটনাটি সেখানে দিনের আলোয় ঘটতে দেখা যায়, অথচ প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী তা ঘটেছিল রাতে। দেশপ্রেমিকদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উসকানির চিহ্নও ছবিতে রাখা হয়নি।

এমনকি সেনাদের দিকে ছোড়া তুষারেরও কোনো চিহ্ন নেই কারণ ছবিতে দেখানোর আগেই তা গলে গেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিত্রটিতে ব্রিটিশদেরই সংঘাত শুরু করতে দেখা যায়। ডান পাশে থাকা ক্যাপ্টেন থমাস প্রেস্টনকে অসহায় জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা পরে আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। প্রেস্টনও গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়ার কথা অস্বীকার করেন এবং পরে আদালতে খালাস পান।

আমেরিকান ইতিহাসবিষয়ক গিল্ডার লেহরম্যান ইনস্টিটিউটের মতে, পল রেভিয়ারের ঐতিহাসিক খোদাইচিত্রটি সম্ভবত আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে কার্যকর যুদ্ধকালীন প্রচারণা। আমেরিকান বিপ্লবের সবচেয়ে পরিচিত ছবিগুলোর একটি এটি। এর প্রভাব এখনো অনুভূত হয়।

মেরি ড্রেপার বলেন, আকারে ছোট হলেও ছবিটি এখনো দর্শকদের মধ্যে আবেগ তৈরি করে। তার মতে, ছবিটির শক্তির একটি বড় কারণ হলো এর প্রাসঙ্গিকতা এখনো শেষ হয়নি। প্রতিটি প্রজন্ম নিজেদের কর্তৃত্ব, সহিংসতা ও প্রতিবাদ সম্পর্কে ধারণার আলোকে ছবিটিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।

-বিবিসির অবলম্বনে