ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ১৩তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বুধবার ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটিতে অনুষ্ঠিত এই সমাবর্তনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ৪ হাজার ২০ জন শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এ সময় কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জনকারী পাঁচজনকে চ্যান্সেলর্স গোল্ড মেডেল, চার স্নাতককে চেয়ারম্যান গোল্ড মেডেল এবং তিনজন স্নাতককে দেয়া হয় ভাইস-চ্যান্সেলর্স গোল্ড মেডেল।
সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের প্রতিনিধি হিসেবে সভাপতিত্ব ও সনদ প্রদান করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ। সমাবর্তন বক্তা ছিলেন অর্থনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। সমাবর্তনে বিশেষ অতিথি ছিলেন, ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন।
সমাবর্তন বক্তা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আমরা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একত্রিত হয়েছি। বহু দশক ধরে আমাদের জাতীয় বয়ান গড়ে উঠেছিল “সহনশীলতা” বা রেজিলিয়েন্সের ওপর—সীমিত সম্পদের মধ্যেও টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার অসাধারণ সক্ষমতা। আজ আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি আর কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। তবে একজন অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে এবং আমাদের অর্থনৈতিক গতিপথ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে চাই—এ পর্যন্ত যেসব পরিসংখ্যানের ওপর আমরা নির্ভর করেছি, সেগুলো আর ভবিষ্যতের প্রকৃত চ্যালেঞ্জকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শুধু উৎপাদনের পরিমাণ আর যথেষ্ট নয়। গুণগত মানই এখন আসল বিষয়। আমরা যেন ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ আটকে না যাই সেজন্য শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রম বা প্রাথমিক রপ্তানির ওপর নির্ভর করা যাবে না। আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক শক্তি নিহিত রয়েছে উচ্চ-মূল্য সংযোজনমূলক অংশগ্রহণে। এর জন্য প্রয়োজন এমন এক কর্মশক্তি, যারা কেবল নির্দেশ পালন করবে না, বরং উদ্ভাবন, সৃজনশীল সম্পৃক্ততা ও আন্তর্জাতিক মানের কর্মনৈতিকতার মাধ্যমে সমাধান সৃষ্টি করবে। এই পৃথিবীই আপনাদের সামনে অপেক্ষা করছে। এটি যেমন একটি সুযোগ, তেমনি একটি চ্যালেঞ্জও।
কর্মক্ষেত্রে সফলতার জন্য গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে নিজের তিনটি উপদেশ তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আজ যে ডিগ্রিটি অর্জন করলেন, সেটিকে কোনো পুরস্কার হিসেবে দেখবেন না। এটিকে দেখুন একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে—যে প্রতিশ্রুতি দরজা খুলে দিতে পারে, নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে। ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়ে শেখার শেষ নয়। আজকের বিশ্ব চলে হার্ড স্কিল ও সফট স্কিলের সমন্বয়ে। নিজেকে একই সঙ্গে শিক্ষিত মানুষ ও দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। জীবনের যে পথেই যান না কেন, নিজেকে একজন অপরিহার্য প্রার্থী হিসেবে গড়ে তুলুন। অনিশ্চয়তা বা ব্যর্থতাকে ভয় পাবেন না। নিশ্চিততা অনেক সময় একঘেয়ে হয়ে ওঠে এবং আপনার সম্ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করে না। অনিশ্চয়তাকে নতুনভাবে পড়তে শিখুন—প্রস্তুত থাকার আহ্বান হিসেবে। কেবল সমস্যার বিশ্লেষক হয়ে থাকবেন না। সমাধানের দিকে মন দিন, কীভাবে উদ্ভাবনী চিন্তা ও সাহস নিয়ে বাধা অতিক্রম করা যায়। ব্যর্থতায় থেমে যাবেন না, বরং বারবার নতুন করে শুরু করার শক্তি জোগাড় করুন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী হোন, তবে সংকীর্ণ আত্মকেন্দ্রিকতায় নয়। আপনার সমাজ ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমনভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হোন, যাতে জীবনে তৃপ্তি আসে। কখনো শর্টকাটের পথে হাঁটবেন না, কারণ শেষ পর্যন্ত শর্টকাট কেবল আপনার জীবনের গুণগত মান ও অর্থবহতাকেই ছোট করে দেয়। কিন্তু সাফল্য অর্জন করতে হয়।
সভাপতির বক্তব্যে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আজ এমন এক পৃথিবীতে পা রাখছে যা রোমাঞ্চকর, দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং উদ্ভাবনী সম্ভাবনায় ভরপুর। শিক্ষা ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি যে অনন্য উচ্চতা স্পর্শ করেছে, তা জাতীয় অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মনে রাখবে, ডিগ্রির চেয়ে বড় হলো বিবেক। একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তোমাদের ভালো-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও দৃঢ় হওয়া উচিত। সেই নৈতিক শক্তি নিয়ে তোমরা দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করবে।’
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান বলেন, ‘এটি শুধু একটি সনদ গ্রহণের দিন নয়। এটি জীবনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়ার দিন। যদি আমরা এখানে উপস্থিত মানুষগুলোর কথা বিবেচনা করি—৪ হাজারের বেশি গ্র্যাজুয়েট—কিন্তু কারও সঙ্গে কারও কোনো মিল নেই। এটি আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন। প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব দক্ষতা রয়েছে। সুতরাং সেই দক্ষতাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। সেটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। আপনার দক্ষতার মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখার চেষ্টা করুন। এবং অবশ্যই আমরা এটাও মনে রাখি—আপনার ক্যারিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আপনাকে জানতে হবে—আপনি কোন কাজে ভালো, কোথায় আপনি মূল্য সংযোজন করতে পারেন, এবং কীভাবে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পাশাপাশি সমাজের সেবা করতে পারেন।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. আর. কবির স্নাতকদের উদ্দেশে বলেন, একটি বিকাশমান মানসিকতা গড়ে তুলুন—যেখানে আপনি উপলব্ধি করবেন যে পরিবর্তনশীল বিশ্বে স্নাতকোত্তর জীবনের পরেও শেখা অব্যাহত রাখতে হবে এবং আজীবন দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য। কখনোই সততার সঙ্গে আপস করবেন না। কারণ প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে স্বয়ংক্রিয়তার মধ্যেও নৈতিক চরিত্রই মানুষের সবচেয়ে স্থায়ী ও মূল্যবান সম্পদ। উৎপাদনশীল, উদ্ভাবনী ও সমাধানমুখী হোন।










