এটি একটি বহুমুখী বা মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিষয়, যা সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে। বর্তমান সময়ের তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি কেবল একটি বিষয় নয়, বরং আগামীর বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশে উন্নয়ন অধ্যয়ন বা ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

উন্নয়ন অধ্যয়নের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং ক্যারিয়ারের ক্ষেত্র অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও বিস্তৃত। এ বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটরা জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি, ইউনিসেফ এবং আইএলওর মতো বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। দেশীয় প্রেক্ষাপটে ব্র্যাক বা আশার মতো বড় বেসরকারি সংস্থায় নীতিনির্ধারণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার একটি বিশাল অংশ এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের দখলে থাকে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও এ বিষয়ের পাঠ্যসূচি বিসিএস (বিশেষ করে প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডার) পরীক্ষার সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বাড়তি সুবিধা পান; পাশাপাশি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কাজ করার সুযোগ তো রয়েছেই। এছাড়া গবেষণা ও শিক্ষকতায় আগ্রহী ব্যক্তিরা সিপিডি বা বিআইডিএসের মতো নামি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে অথবা উচ্চশিক্ষা শেষে শিক্ষকতায় ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। এমনকি বর্তমানে বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি এবং ব্যাংকগুলো তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রকল্পের জন্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে উন্নয়ন অধ্যয়নের শিক্ষার্থীদের গুরুত্বের সঙ্গে নিয়োগ দিচ্ছে।

স্নাতক পর্যায়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে অল্প কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এগুলো হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া যাদের স্নাতক পর্যায়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি, তারাও স্নাতকোত্তর কোর্স করতে পারবেন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক কোর্স না থাকলেও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মাস্টার অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এমডিএস) ডিগ্রি গ্রহণের সুযোগ আছে। মূলত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়নসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যারা ক্যারিয়ার গড়তে ইচ্ছুক তাদের জন্যই এমডিএস প্রোগ্রাম। এ বিষয়ে পড়তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে বিভিন্ন যোগ্যতার প্রয়োজন হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধীন উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ। এ বিভাগে চার বছর মেয়াদি স্নাতক, দুই বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামের পাশাপাশি এমফিল, পিএইচডি, গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ও বিভিন্ন সার্টিফিকেট কোর্স করার সুযোগ আছে। ঢাবির স্নাতক কোর্সে ভর্তি হতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অনুসারে পরীক্ষা দিয়ে নির্বাচিত হতে হয়। মাস্টার্স (এমডিএস) প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে প্রার্থীর তিন অথবা চার বছরের সম্মান ডিগ্রি থাকতে হবে। যেসব শিক্ষার্থী ইঞ্জিনিয়ারিং বা ব্যবসায় শিক্ষা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তারাও আবেদন করতে পারবেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল সায়েন্স স্কুলের অধীন ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ডিসিপ্লিনে চার বছরের অনার্স ও দেড় বছর মেয়াদি মাস্টার্স ডিগ্রি নেয়া যায়। মাস্টার্স পর্যায়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ভূগোল, লোক প্রশাসনসহ সার্কুলারে উল্লেখিত এ-সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট কয়েকটি সাবজেক্টে স্নাতক ডিগ্রিধারীরাই পড়তে পারবেন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে এ বিভাগে বিএসএস, এমএসএস, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি নেয়া যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু আছে। তবে সন্ধ্যাকালীন কোর্স নেই। এছাড়া বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে স্নাতক পর্যায়ে পড়ার সুযোগ আছে। রয়েছে ১৬ মাসের প্রফেশনাল মাস্টার্স কোর্স। দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিস অনুষদের অধীনে বিএসএসএস (অনার্স) ইন ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ডিগ্রি দেয়া হয়। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অধ্যয়নে ইভিনিং ও উইকেন্ড কোর্স চালু আছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে খরচ পড়বে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এক বছর, আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দুই বছরের মাস্টার্স ডিগ্রি দিয়ে থাকে। ছয় মাসের সেমিস্টার পদ্ধতিতে কোর্স বেশি হলে খরচের তারতম্য হতে পারে। তবে বেসরকারি পর্যায়ে স্নাতক পড়ার সুযোগ এখনো বেশ সীমিত। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) পরিবেশ ও উন্নয়ন অধ্যয়নকে সমন্বিত করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ নামে স্নাতক প্রোগ্রাম চালু করে।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার অবারিত সুযোগ আছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, ওহাইও ইউনিভার্সিটি, সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স, ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়, কোনিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়, উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়, সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি, এইচটিডব্লিউ বার্লিন, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল ফ্রি স্কলারশিপ নিয়ে পড়া যায়। উন্নয়ন অধ্যয়নের অনেক শিক্ষার্থী এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করেছেন। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছেন।