রুক্ষ শীতের জরাজীর্ণতা সরিয়ে প্রকৃতিতে এখন ফাগুনের আগুন। জাদুকরী স্পর্শে ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ যেন সেজেছে নবরূপে। ইট-পাথরের একাডেমিক ভবনগুলোকে ছাপিয়ে আজ মুখ্য হয়ে উঠেছে কৃষ্ণচূড়া, পলাশ আর শিমুলের রক্তিম আভা। দখিনা বাতাসের দোলায় আর কোকিলের কুহুতানে মুখর শিক্ষাঙ্গন জানান দিচ্ছে—ঋতুরাজ বসন্ত এসেছে তার সমস্ত জৌলুস নিয়ে। প্রাণের ক্যাম্পাসে আজ তাই রঙের মেলা

বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো জাবি

শীতের রাজত্ব রুক্ষতা বিদায় করে পলাশের রক্তিম রঙে রঙিন হয়ে উঠছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। নতুন কুঁড়ি আর নানা রঙের বাহারি ফুল জানান দিচ্ছে বসন্তের আগমনি বার্তা। বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সারা বছর নানা উৎসব আয়োজন করে থাকে, যার বেশির ভাগটাই প্রকৃতিকেন্দ্রিক। সবুজ এ ক্যাম্পাস একেক ঋতুতে পায় একেক রূপ। শীতের সময় যেমন অতিথি পাখির কলতানে মুগ্ধ হিম নগরী, আবার সাংস্কৃতিক উৎসবের সেরা বিদ্যাপীঠ হিসেবে সাংস্কৃতিক রাজধানী। সব ছাপিয়ে যখন বসন্তের আগমন ঘটে, তখন ক্যাম্পাস যেন ‘সবুজ ক্যাম্পাস’ তার সেই মূল সত্তাটিকেই ধারণ করে।

ঋতুরাজ বসন্তকে নানান আঙ্গিকে বরণ করে নেয় তারা। বাসন্তী রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে ছেয়ে যায় ক্যাম্পাস। বাংলা বিভাগ আয়োজন করত শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এছাড়া চারুকলাসহ সব বিভাগ নানা আয়োজন করে থাকে। তবে এবার ভোটের হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে সে আয়োজন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ভোটের আগে থেকেই ছুটি হয়েছিল। বেশির ভাগ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ভোট দিতে ছুটেছিলেন গ্রামের বাড়িতে। ক্যাম্পাস ভালোবাসার রঙে কিছুটা রাঙালেও তেমন কোনো আয়োজন ছিল না বসন্ত বরণের।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রতি বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব জাঁকজমকভাবে বসন্ত বরণ হয়ে থাকে। তবে এবার নির্বাচনের জন্য এটি মিস করেছি। তবে আমি বলব যে বসন্ত নিয়ে আয়োজনের এখনো সময় আছে। বিভিন্ন বিভাগ চাইলে সে আয়োজন করতে পারে।

তবে প্রকৃতি তার আপন রঙে রাঙাতে ভুল করেনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন, শহীদ মিনার চত্বর, আবাসিক হল, টিএসসিসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে বাহারি সব ফুলের বাগান। বসন্তের পরশে সেসব বাগানে ফুটেছে অনিন্দ্যসুন্দর হরেক রকমের ফুল। গাঁদা, কসমস, বেলি, ডালিয়া, জিনিয়া, লাল-নীল-সাদা গোলাপ, মোরগঝুঁটি, সূর্যমুখী, জুঁই, চামেলি, টগরসহ আরো নাম না জানা অগণন পুষ্পদল। জাহাঙ্গীরনগরকে অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে এরাই।

বসন্তের রঙে প্রাণবন্ত ঢাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফাল্গুন মানেই রঙের উচ্ছ্বাস, তারুণ্যের হাসি আর বাঙালিয়ানা সংস্কৃতির অনবদ্য মিলনমেলা। পহেলা ফাল্গুন দেশের অন্যতম বৃহৎ সর্বজনীন উৎসব হলেও এর সূচনা হয়েছিল খুবই সাদামাটা এক ছাত্র উদ্যোগ থেকে ১৯৯১ সালে চারুকলা অনুষদের একদল শিক্ষার্থীর হাত ধরে।

সেই সময়ের শিক্ষার্থীদের একজন ভাস্কর মুক্তি ভৌমিক জানান, আগের রাতে মৈত্রী হলে বসে ছাত্রীদের শাড়িতে ব্লক প্রিন্ট করা, পরদিন সেগুলো পরে ক্যাম্পাসে আসা সবকিছুই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। পাশেই চলা একুশে বইমেলার আবহ, আর সদ্য পতিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়ের উচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক নতুন সাংস্কৃতিক আবহ।

5

প্রথম শোভাযাত্রায় শিক্ষার্থীরা রঙিন কাগজে তৈরি ফুল, পাখি, প্রজাপতি নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন। কেউ কেউ শৈশবের ছড়া আবৃত্তি করতে করতে হাঁটেন, যা উৎসবকে দেয় এক অনন্য স্বাদ। পরবর্তী বছরগুলোতে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে আবির মাখানো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং ধীরে ধীরে অন্যান্য বিভাগের অংশগ্রহণ সব মিলিয়ে পহেলা ফাল্গুন হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক এক উৎসব।

ঢাবির চারুকলার শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম মনে করেন, এ আয়োজন মানুষকে বাঙালি সংস্কৃতির শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার এক অনন্য মাধ্যম। লেখক কামাল পাশা চৌধুরীর মতে, এ উৎসবগুলো জাতীয় গর্ব যা আরো বিস্তারে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বসন্ত উৎসব কেবল একটি দিন নয় এটি স্মৃতি, চেতনা ও সংস্কৃতির এক চলমান উত্তরাধিকার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিচ্ছে রঙিন আবহ।

বৈচিত্র্যময় রক্ত কাঞ্চনে সেজেছে রাবি

শীতের রুক্ষতা কাটিয়ে বসন্তের কোমল ছোঁয়া লাগতেই রঙিন হয়ে উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস। পাতার ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে বেগুনি-গোলাপি কাঞ্চন ফুল, যেন প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাসে আঁকা শত শত তুলির টান। ক্যাম্পাসের প্রতিটি পথ, হলের পুকুরপাড়, শহীদ মিনার কিংবা একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনের আশপাশ—সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে কাঞ্চনের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য। একটিমাত্র গাছ নয়, সারি সারি কাঞ্চন গাছের সম্মিলিত ফুলেল উপস্থিতি বসন্তকে করেছে আরো মোহনীয়, আরো জীবন্ত। সৌন্দর্যবর্ধন ছাড়াও হাঁপানি, ক্ষত এবং পেটের পীড়ায় গাছটির বিভিন্ন অংশ বেশ উপকারী।

4

এ ফুলের মনোমুগ্ধকর রূপে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীই নন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরাও মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এ অনন্য উপহার।

পুরো ক্যাম্পাসকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। কৃষি অনুষদের এ অধ্যাপক ব্যক্তি উদ্যোগে প্রথমে মাত্র একটি গাছ থেকে চারা তৈরির উদ্যোগ নেন এবং পরে তা বৃহৎ পরিসরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকল্পের মাধ্যমে ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে দেন।

অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এ গাছের ফুল এতই সুন্দর যে যে-ই দেখত, তাকিয়ে থাকত। এ কাঞ্চনের নাম অর্কিড কাঞ্চন। এ গাছের উৎপত্তি চীনে। সাধারণত বসন্তকালে ফুল দেয় এবং ফুলগুলো মাসব্যাপী থাকে। ফুল আসার আগে এর পাতাগুলো বেশির ভাগ সময় ঝরে যায়।’ প্রথম নজরে আসার পর প্রশাসন ফুলটির সৌন্দর্য লক্ষ করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকল্পের অধীনে আমি ব্যক্তিগতভাবে বীজ সংগ্রহ করি এবং ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর দেলওয়ার হোসেন স্যারের সহযোগিতায় পাঁচ শতাধিক চারা তৈরি করি।’

ববির লাল দালানের আঙিনায় পলাশরাঙা সৌন্দর্য

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল দালান যেমন আকর্ষণীয় স্থাপত্যশৈলীতে মনকে আকৃষ্ট করে, তেমনি এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বিমোহিত করে বারংবার। ছয় ঋতুতেই যেন নববধূ রূপে সেজে ওঠে সে। বসন্তের আগমনি বার্তা নিয়ে, শুষ্ক মাটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পলাশ ফুলও যেন তার সৌন্দর্য মেলে ধরে। প্রকৃতির ক্যানভাসে নিজ সৌন্দর্যের আভা দিয়ে এক অনন্য শিল্পকর্মের প্রকাশ ঘটায়।

3

লাল-কমলা রঙের আগুনঝরা এ ফুল যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব সৌন্দর্য। এটি শুধু ঋতুরাজের আগমনের বার্তাই দেয় না, বরং প্রকৃতিকে রঙিন সাজে সজ্জিত করে তোলে। শীতের সন্ন্যাসী আবহ বিদায় নিয়ে বসন্তের প্রাণোচ্ছলতা স্বাগত জানায়, আর তার অন্যতম দূত হয়ে ওঠে পলাশ ফুল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে, রাস্তার ধারে, দৃষ্টিনন্দন এ ফুল শুধু প্রকৃতির শোভাই বাড়ায় না, বরং ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস ও চিরন্তন বুনো সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। পলাশ শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি গভীরভাবে ধারণ করে বায়ান্নর ভাষাশহীদদের স্মৃতি। তরুণদের তেজি প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায় রাস্তার ধারে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা এ আগুনরাঙা ফুল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরম যত্নে কুড়িয়ে নেয় এ রক্তিম ফুল। কেউ মালা গাঁথে, কেউ এর সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করে, আবার কেউ শুধু তাকিয়ে থাকে নীরবে। বসন্তের স্নিগ্ধ আবহে ববির প্রাঙ্গণ নানা রঙের ফুলে সেজে ওঠে, যেন প্রকৃতি নিজ হাতে বিদ্যাপীঠকে সাজিয়ে দেয়।